ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের বিক্ষোভ, সংঘর্ষে আহত শতাধিক

বিদ্যালয়গুলোর অব্যবস্থাপনা, শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষার অনুপযোগী পরিবেশের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা। রাজধানী প্যারিসের পাশাপাশি মার্সেই, লিওঁ, নান্তেস ও রেনসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতেও মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে।

বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কয়েকটি এলাকায় পুলিশ টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জ করেছে। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ সময় অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।

সরকারি হিসাবে মঙ্গলবারের কর্মসূচিতে প্রায় দুই লাখ মানুষ অংশ নেন। এর মধ্যে শুধু প্যারিসেই প্রায় ৫৬ হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন। তবে আন্দোলনকারীদের সংগঠকদের দাবি, সারা দেশে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার।

ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবারের কর্মসূচি ঘিরে প্রায় ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের অন্তত ৪৩ সদস্য আহত হয়েছেন। আন্দোলন শুরুর পর গত দুই সপ্তাহেরও বেশি সময়ে প্রায় ৬ হাজার ১০০ জনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম চলছে এবং তাদের প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে।

সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান ল্যকরনু। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর পর থেকে অন্তত ২১৫ জন কিশোর-কিশোরী এবং ৮৫ জন শিক্ষক ও স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন। সাম্প্রতিক কয়েক দশকে দেশটির শিক্ষা খাত এমন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও পরবর্তী করণীয় নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এলিসি প্যালেসে সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ পুলিশের কর্মকাণ্ডের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ পরিস্থিতির তুলনায় সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তাঁর ভাষ্য, বিক্ষোভের কিছু অংশ সহিংস হয়ে ওঠায় পুলিশকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।

তবে পুলিশের এই অবস্থানের সঙ্গে একমত নয় শিক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলে এর সমালোচনা করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংগঠনটির ফ্রান্স শাখার প্রধান আন সাভিনেল-বারাস বলেন, গত কয়েক দিনে প্রকাশিত ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পুলিশের টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জ এবং অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

চাপের মুখে ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পুলিশের আচরণ নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে অন্তত ১০টি ঘটনার বিষয়ে তদন্ত চলছে।

বিক্ষোভের সময় আহত কয়েকজন শিক্ষার্থীর ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করেছে। উত্তর ফ্রান্সে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর গুরুতরভাবে আহত হয়ে হাতের কবজি হারিয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে টুর্স শহরে ১৬ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর মাথায় প্রতিরক্ষামূলক বিস্ফোরকজাতীয় অস্ত্রের আঘাত লাগে। এতে তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়েছে।

এ ছাড়া প্যারিসের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ১৪ বছর বয়সী আরেক কিশোর পুলিশের নিক্ষেপ করা গ্রেনেডসদৃশ অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছে। তার মুখের একাধিক দাঁত ভেঙে যায় এবং মুখমণ্ডলে ব্যাপক ক্ষত তৈরি হয়। অস্ত্রোপচারের পর কপাল ও চোয়ালে চিকিৎসা দেওয়ায় বর্তমানে সে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছে না; তরল খাবারও স্ট্র দিয়ে খেতে হচ্ছে।

প্যারিসের প্লাস দে লা নেশন এলাকায় মঙ্গলবারের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অ্যানা বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো মূলত শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক বিষয়কে ঘিরে—ভালো শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং নিরাপদ ও উপযুক্ত স্কুল ভবন। তাঁর অভিযোগ, এসব দাবির জবাবে কর্তৃপক্ষের আচরণ পরিস্থিতিকে আরও সংঘাতপূর্ণ করেছে।

মার্সেইয়ের শিক্ষার্থী ওশিয়ানের অভিযোগ, বছরের পর বছর তিনি এমন শ্রেণিকক্ষে পড়েছেন যেখানে শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলেও তাদের জায়গায় যথাযথ বিকল্প শিক্ষক দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদের একটি অংশও আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন।

রেন শহরের শিক্ষক রোমেন দুবার্গ জানান, শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের আচরণের কিছু ঘটনা সামনে আসার পর সহকর্মীদের সঙ্গে তিনিও বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

আগামী বছর ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচনের কয়েক মাস আগে শিক্ষাব্যবস্থা ঘিরে এমন বড় আন্দোলন ম্যাক্রোঁ সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। একই সময়ে বাজেট ঘাটতি কমানোর চাপও রয়েছে সরকারের ওপর।

সরকার বিরোধী দল ‘লা ফ্রান্স ইনসোমিজ’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন উসকে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। তবে দলটি সহিংসতা এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের আহ্বান জানিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

আরও পড়ুন

রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত, নিখোঁজ ১১

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় দুই বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে নিহতদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। এ ঘটনায় আরও ১১ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। হতাহতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর এই হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। দূতাবাসের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য তারা পেয়েছে। তবে নিহতদের নাম-পরিচয় শনাক্ত করতে কাজ চলছে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার আগে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা গেছে। রিয়াদে থাকা আরেকটি সূত্রের দাবি, ৪১ জন বাংলাদেশি ওমরাহ যাত্রীর একটি দল জেদ্দার উদ্দেশে যাত্রা করতে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন।

আরও পড়তে পারেন

রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত, নিখোঁজ ১১

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় দুই বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে নিহতদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। এ ঘটনায় আরও ১১ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। হতাহতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর এই হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। দূতাবাসের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য তারা পেয়েছে। তবে নিহতদের নাম-পরিচয় শনাক্ত করতে কাজ চলছে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার আগে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা গেছে। রিয়াদে থাকা আরেকটি সূত্রের দাবি, ৪১ জন বাংলাদেশি ওমরাহ যাত্রীর একটি দল জেদ্দার উদ্দেশে যাত্রা করতে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন।

নাইজেরিয়ায় সামরিক উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত, নিহত ৩২

নাইজেরিয়ায় সামরিক বাহিনীর একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে ৩২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২৫ জন যাত্রী এবং সাতজন পাইলট ও ক্রু সদস্য ছিলেন। সোমবার (৫ অক্টোবর) দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ওন্দো রাজ্যে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ভয়াবহ এ ঘটনায় শোক জানিয়েছেন নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা তিনুবু। এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট বলেন, বিমানবাহিনীর প্রধান তাকে দুর্ঘটনার বিষয়ে অবহিত করেছেন। দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করতে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট। নাইজেরিয়ার বিমান চলাচলবিষয়ক মন্ত্রী ফেস্টাস কিয়ামো জানান, বিমানবাহিনীর এটিআর-৪২ মডেলের উড়োজাহাজটি বেনিন সিটি থেকে লাগোসের উদ্দেশে একটি নিয়মিত মিশনে যাত্রা করেছিল। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ১৩ মিনিটে উড়োজাহাজটির সঙ্গে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এসএম-৬ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে ২৪.৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে সামরিক অস্ত্রের ঘাটতি পূরণ ও মজুত বাড়াতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য ‌‘স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল-৬’ (এসএম-৬) ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ২৪.৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে পেন্টাগন। পাঁচ বছর মেয়াদী এই কাজটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান আরটিএক্স-এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘রেথিয়ন’-কে। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ এক বিবৃতিতে চুক্তিটির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। চুক্তির শর্তানুযায়ী, পাঁচ বছরের পাশাপাশি অতিরিক্ত আরও দুই বছর মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। আক্রমণাত্মক হামলা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিরোধ-উভয় মিশনেই এসএম-৬ ক্ষেপণাস্ত্র যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করা যায়, সেই লক্ষ্যেই চুক্তিটি তৈরি করা হয়েছে।