ভারতীয় চলচ্চিত্রের শক্তিমান অভিনেতা নানা পাটেকার আর নেই। হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে চার দশকের বেশি সময় ধরে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করা এই অভিনেতা ৭৫ বছর বয়সে মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে ভারতের গোয়ায় নিজের বাসভবনে তাঁকে অচেতন হয়ে পড়েন নানা পাটেকার। পরে তাঁকে মণিপাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। জানা যায়, প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে সিপিআর দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হয় বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। নানা পাটেকারের মৃত্যুর খবর ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতে শোকের ছায়া ফেলেছে।
নানা পাটেকারের পুত্র মালহার পটেকর জানিয়েছেন, বুকে ব্যথা অনুভব করার পরেই চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন নানা। তার পরেই চিকিৎসকদের একটি দল অভিনেতার গোয়ার বাড়িতে যায়। কিন্তু চিকিৎসকদের দল সেখানে পৌঁছে দেখে, সংজ্ঞা হারিয়েছেন নানা। একটানা সিপিআর দেওয়ার পরেও নানার সংজ্ঞা না-ফেরায় অভিনেতাকে দ্রুততার সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সাড়ে ৫টা ২০ মিনিট নাগাদ নানাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন নানা পাটেকার। তাঁর প্রকৃত নাম বিশ্বনাথ পাটেকার। তবে অভিনয়জগতে তিনি নানা পাটেকার নামেই পরিচিতি পান। ১৯৭৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হিন্দি চলচ্চিত্র ‘গমন’-এর মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিনয় শুরু করেন তিনি। ছবিটির পরিচালক ছিলেন মুজাফফর আলি। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ফারুক শেখ ও স্মিতা পাতিল। এরপর কয়েকটি মারাঠি ও হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও ১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘পরিন্দা’ তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রভাবশালী অভিনেতা হিসেবে বিবেচিত নানা পাটেকার তাঁর অভিনয়শৈলীর জন্য তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, চারটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, দুটি মহারাষ্ট্র রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার মারাঠি পুরস্কার লাভ করেন। চলচ্চিত্র ও শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে তাঁকে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রী প্রদান করা হয়।
১৯৭৮ সালে ‘গমন’ দিয়ে অভিনয়জীবন শুরু করার পর নানা পাটেকার বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৮৮ সালে একাডেমি পুরস্কারের জন্য মনোনীত ‘সালাম বোম্বে’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর ‘পরিন্দা’তে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন।
এরপর নিজের পরিচালনায় প্রথম চলচ্চিত্র ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ (১৯৯১)-এ অভিনয় করেন তিনি। নব্বইয়ের দশকে ‘রাজু বান গয়া জেন্টলম্যান’ (১৯৯২), ‘অঙ্গার’ (১৯৯২), ‘তিরঙ্গা’ (১৯৯৩), ‘ক্রান্তিবীর’ (১৯৯৪), ‘অগ্নি সাক্ষী’ (১৯৯৬) এবং ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ (১৯৯৬)-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করেন।
‘অঙ্গার’-এ অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ খলনায়ক বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান। ‘ক্রান্তিবীর’-এর জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন। আর ‘অগ্নি সাক্ষী’ তাঁকে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে দ্বিতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এনে দেয়।
২০০০-এর দশকেও নানা পাটেকারের অভিনয়দক্ষতা দর্শকদের মুগ্ধ করে। ‘শক্তি: দ্য পাওয়ার’ (২০০২), ‘আব তক ছাপ্পান’ (২০০৪) ও ‘অপরাহান’ (২০০৫)-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। ‘অপরাহান’-এর জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ খলনায়ক বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া ‘ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১’ (২০০৬)-এও অভিনয় করেন তিনি।
‘ওয়েলকাম’ (২০০৭) এবং এর সিক্যুয়েল ‘ওয়েলকাম ব্যাক’ (২০১৫)-এ হৃদয়বান গ্যাংস্টার উদয় শেঠির চরিত্রে অভিনয় করে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন নানা পাটেকার। রাজনৈতিক থ্রিলার ‘রাজনীতি’ (২০১০)-এ একজন রাজনীতিকের চরিত্রেও প্রশংসা কুড়ান তিনি।
২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া মারাঠি চলচ্চিত্র ‘নটসম্রাট’-এ একজন অবসরপ্রাপ্ত মঞ্চ অভিনেতার চরিত্রে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে আলোচিত হয়। ছবিটির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা পাটেকার কখনো কঠোর ও দুর্র্ধষ চরিত্রে, কখনো আবেগপ্রবণ মানুষ হিসেবে, আবার কখনো হাস্যরসাত্মক ভূমিকায় দর্শকদের সামনে হাজির হয়েছেন। চরিত্রের গভীরে প্রবেশ, সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ভঙ্গি এবং শক্তিশালী পর্দা-উপস্থিতি তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রে আলাদা অবস্থান তৈরি করে দেয়।
২০২৬ সালের ৫ মার্চ মুক্তি পাওয়া ‘সুবেদার’ চলচ্চিত্রে নানা পাটেকারকে নানা ওয়াঘমারে চরিত্রে দেখা যায়। ‘গমন’ দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর দীর্ঘ অভিনয়যাত্রার শেষ অধ্যায়ে এসে এই চলচ্চিত্রের নামও আলোচনায় উঠে এসেছে। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রজগৎ হারাল এক স্বতন্ত্র অভিনয়শিল্পীকে।








