সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দিতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে কিংবা লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালীর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি। গোষ্ঠীটির দাবি, পশ্চিম এশিয়ায় থাকা মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো তখন হামলার লক্ষ্যবস্তু হবে।
মঙ্গলবার ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ হুঁশিয়ারি দেন হুথিদের সামরিক উপদেষ্টা আবেদ মোহাম্মদ আল-থাওর।
চলতি মাসে লোহিত সাগরের প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেয় হুথিরা। এর পর থেকেই গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামরিক সহযোগিতা চেয়ে আসছে সৌদি আরব।
এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আল-থাওর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করলে কিংবা বাব আল-মানদেবের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চালালে সেটিকে চরম সীমা অতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করবে হুথিরা। এমন পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
হুথিদের আরোপ করা অবরোধে বড় ধরনের চাপে পড়েছে বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অংশ হিসেবে কৌশলগত হরমুজ প্রণালীতে তেহরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে সৌদি অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ে। এর মধ্যে বাব আল-মানদেব প্রণালীর অবরোধ দেশটির তেল রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
এর আগে লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনীকে সরিয়ে দিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে হুথি বিদ্রোহীরা। এ সংঘাতে শত শত সৈন্য নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে কয়েক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো সৌদি রাজধানী রিয়াদও হামলার শিকার হয়।
মার্কিন বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সহায়তা চেয়েছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। চার বছরের যুদ্ধবিরতির পর গত জুলাইয়ে ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। হুথিদের দাবি, এরপর থেকে সৌদি আরব শত শত বিমান হামলা চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ালে হুথিদের প্রতিক্রিয়া কী হবে, সে বিষয়েও সতর্কবার্তা দিয়েছেন আল-থাওর। তাঁর ভাষ্য, ওয়াশিংটন যদি বিমান হামলা কিংবা আকাশপথে সহায়তার মাধ্যমে রিয়াদকে সমর্থন দেয়, তাহলে হুথিরা তাদের আশপাশে থাকা যেকোনো মার্কিন স্বার্থকে বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করবে। এ ক্ষেত্রে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
শুধু স্থাপনা নয়, মার্কিন জাহাজের জন্য বাব আল-মানদেব প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ারও হুমকি দিয়েছেন হুথি সামরিক উপদেষ্টা।
ইয়েমেনের সংঘাত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের তুলনায় অনেক পুরোনো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের দুই মিত্র এখন সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে, হুথিদের কর্মকাণ্ডে ইরানের সরাসরি নির্দেশনা থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন আল-থাওর। তিনি ইরানকে হুথিদের বন্ধু, মিত্র ও ভাইপ্রতিম দেশ হিসেবে উল্লেখ করলেও দাবি করেন, তাদের সিদ্ধান্ত ইরান নিয়ন্ত্রণ করে না। নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে হুথিরা সম্পূর্ণ স্বাধীন বলেও জানান তিনি।
ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠায় মানবিক পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। মঙ্গলবার সংস্থাটি জানিয়েছে, নতুন করে গৃহহীন ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বর্তমানে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে আগামী কয়েক মাসে বেড়ে ২ লাখ ৩০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের অবস্থানও কঠোর বলে জানিয়েছেন আল-থাওর। তাঁর বক্তব্য, সৌদি আরব যতদিন ইয়েমেনে হত্যাযজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালিয়ে যাবে, ততদিন হুথিরাও কঠোর জবাব দিয়ে যাবে। সৌদির তেল খাত ও অর্থনৈতিক শিল্পে আঘাত হানা, দেশটিকে শাস্তি দেওয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ছিটকে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা তাদের রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।








