যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেনের যোগাযোগ অবকাঠামো নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজধানী কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় ডেটা সেন্টার এবং ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের স্থাপনায় হামলার পর প্রায় ১ লাখ পরিবার সাময়িকভাবে ইন্টারনেট সংযোগ হারিয়েছে।
ইউক্রেনের ডিজিটাল রূপান্তর মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রুশ হামলার পর কিয়েভ ও সংলগ্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের ইন্টারনেট সেবায় বিঘ্ন ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পরিদর্শন, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং নেটওয়ার্ক পুনরায় সচল করতে প্রকৌশলীরা কাজ করছেন।
এর পরদিন বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) আবারও কিয়েভের ইন্টারনেট অবকাঠামোতে হামলার খবর পাওয়া যায়। কয়েকটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শহরের বিভিন্ন এলাকায় সংযোগে সমস্যা দেখা দেয়।
ডেটাগ্রুপের কার্যালয়ে ড্রোন হামলা
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) কিয়েভের কেন্দ্রীয় এলাকায় ড্রোন হামলার শিকার হয় দেশটির বড় টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ডেটাগ্রুপের কার্যালয়। এতে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অন্তত চারজন নিহত হন। ভবনের আশপাশে আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সেন্টারগুলোকে উদ্দেশ্য করেই হামলা চালাচ্ছে। তার মতে, এর মাধ্যমে ইউক্রেনের তথ্যপ্রবাহে বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে ডেটাগ্রুপ জানিয়েছে, হামলায় তাদের একটি ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো কর্মী আহত হননি। গ্রাহকদের তথ্যও নিরাপদ রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিকল্প ব্যাকআপ সাইট ব্যবহার করে সেবা চালু রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পোল্যান্ডের স্টারলিংক স্টেশনেও আগুন
ইউক্রেনের বাইরে প্রতিবেশী পোল্যান্ডের একটি ঘটনাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বুধবার রাতে মধ্য পোল্যান্ডে থাকা একটি স্টারলিংক গ্রাউন্ড স্টেশনে আগুনের ঘটনা ঘটে। স্টেশনটি ইউক্রেনসহ আশপাশের অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ সরবরাহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পোল্যান্ডের উপপ্রধানমন্ত্রী ও ডিজিটালবিষয়ক মন্ত্রী ক্রিস্তফ গাওকোভস্কি ঘটনাটিকে নাশকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ধারণা, স্টেশনটি অচল করে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানোর উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
তবে আগুনের প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। এর আগে এ ধরনের নাশকতার অভিযোগে রাশিয়ার সম্পৃক্ততার কথা উঠলেও মস্কো তা অস্বীকার করেছে।
শীত সামনে রেখে বাড়ছে শঙ্কা
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইউক্রেন সরকার ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগ সচল রাখাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলেও যাতে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রাখা যায়, সে জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিকল্প বিদ্যুৎ ও ব্যাকআপ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ইউক্রেনের ইন্টারনেট ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে বিকেন্দ্রীভূত হওয়ায় কোনো একটি স্থাপনা আক্রান্ত হলে পুরো শহর বা বড় কোনো অঞ্চল দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি তুলনামূলক কম। তারপরও শীতের আগে ধারাবাহিক হামলার আশঙ্কা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ডিজিটাল লেনদেন, সরকারি সেবা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় অংশই এখন ইন্টারনেটনির্ভর। ফলে যোগাযোগ অবকাঠামোয় বড় ধরনের ক্ষতি হলে এর প্রভাব শুধু সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, অর্থনীতি ও দৈনন্দিন সেবাতেও পড়তে পারে।
ইউক্রেনের জনপ্রিয় ব্লগার ও সাবেক সরকারি উপদেষ্টা সেরহি স্তেরনেঙ্কো কিয়েভের বাসিন্দাদের শীত আসার আগেই বিকল্প যোগাযোগের ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মধ্যে স্টারলিংক টার্মিনাল রাখার কথাও রয়েছে।
স্তেরনেঙ্কোর দাবি, রাশিয়ার হামলার লক্ষ্য কেবল কিয়েভের জ্বালানি অবকাঠামো নয়; ডেটা সেন্টার এবং ইন্টারনেট অপারেটরদের স্থাপনাও হামলার আওতায় আসছে।
এর পাশাপাশি ইউক্রেনের অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোতেও রুশ বিমান হামলা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও নতুন ধরনের জেটচালিত ড্রোন ব্যবহার করে গুদাম, পেট্রল স্টেশন, বন্দরসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনায় হামলা চালানো হচ্ছে।
প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের মধ্যে এসব হামলা ইউক্রেনের অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।








