সালমান খান জুয়েল
১
কাক ডাকা ভোরে শরীফুলের ঘুম ভাঙ্গলো, গড়াই কাঠের কপাট ভেদে পূর্ব-গগণে উঁকি দেওয়া প্রভাতরশ্মির মৃদু আলো তার আধো ঘুমো চোখের পাপড়ি স্নেহভরে ছুঁয়ে দিলো। কাকের ডাকে চোখের তন্দ্রাচ্ছন্ন ভঙ্গ হওয়ায় শরীফুলের মুখময় জুড়ে বেশ বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠেছে, তবুও কাকের প্রতি তার যেন বিন্দুমাত্রও কোন অভিযোগ রইলো না। সে ভেবে নিলো, এ যেন প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম। নিদ্রা থেকে জাগরণ, আঁধার হতে আলোর শহরে বিচরণের অনন্তকালের প্রক্রিয়া।
তাছাড়া কাকপক্ষী কোন এক বৈচিত্র্যময় কারণে শরীফুলের হৃদয়ের জমিনে ভালোবাসার একটি স্থায়ী আসন দখল করে রয়েছে। মানবকুলের বহুলোক-ই’ যেখানে কাকপক্ষীকে অপছন্দের তালিকায় স্থান দেয়, সেখানে শরীফুলের কাছে তারা যেন এক অনন্য সৌন্দর্যের প্রতীক। সে কোথাও পড়েছিল, পক্ষীকুলের মধ্যে একমাত্র কাকই এমন একটি প্রাণী, যে তার সঙ্গীকে নিঃশেষ ভালোবেসে যায়, সঙ্গী বিচ্ছেদের বেদনা তারা সারাজীবন বয়ে বেড়ায়। বিরহের অগ্নিতে দগ্ধ হয়ে তারা একাকিত্বকে সঙ্গী করে বাকি জীবন পার করে দেয়। কাকের সেই অটুট ভালোবাসা, অন্তিম মায়া দেখে শরীফুল প্রায়ই অবাক হয়।
তার মনে প্রশ্ন জাগে, যদি কাকের মতো সঙ্গীর প্রতি এমন নিখাদ মায়া ও অবিচল প্রেম মানুষের হৃদয়েও বিরাজ করতো, তবে কি পৃথিবীটা আরও সুন্দর হতে পারতো না?
বিশেষত, এই কারণেই কাকের প্রতি তার হৃদয়ে বিন্দুমাত্রও অভিযোগ কোনকালেই জমে ওঠেনি।
হঠাৎ টেবিলের উপর রাখা মুঠোফোনে দৃষ্টি পড়তেই শরীফুলের চোখে একচোট বিস্ময়ের ঝলক জ্বলে উঠলো। মনে পড়লো আজ তাদের অভয়নগর ট্যুর রয়েছে। পূর্বাকাশে সূর্যের প্রথম কিরণ ছড়িয়ে পড়ার আগেই তার বাসস্টপে পৌঁছানোর কথা ছিল। অথচ নিদ্রার মোহে আচ্ছন্ন দেহে সময়ের কোনো বোধই যেন তার ছিল না। মুহূর্তেই ঘুমের আবেশ ঝেড়ে উঠে সে তড়িঘড়ি করে মুঠোফোন হাতে নিলো। স্ক্রিনে চোখ বোলাতেই দেখতে পেল, সাগরের প্রায় গোটা বিশেক কল মিস কলের তালিকায় যুক্ত হয়ে আছে। সে আর বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে চটজলদি সাগরকে কল ব্যাক করলো। মুঠোফোনের ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গেই ভেসে এলো সাগরের তিরিক্ষ এবং বিরক্তির স্বর।
-তোর কি সময় বোধ বলে কোন জ্ঞান নেই? কতবার কল করেছি? রিং হয়েই চলেছে অথচ ফোনকল রিসিভের কোন নাম গন্ধও নেই। তুই এখন কোথায়? গাড়ি ছাড়ার সময় হতে চললো, সেদিকে খেয়াল আছে কি?
-এইরে, Sorry বন্ধু আসলে ঘুম ভাঙ্গতে বিলম্ব হয়ে গেলো, তুই একটুখানি অপেক্ষা কর আমি এখনই আসছি।
২
বাসের জানালার পাশে গম্ভীর মুখে বসে আছে সাগর। তার মুখের অভিব্যক্তিতেই বোঝা যায়, মেজাজটা একেবারেই বিগড়ে রয়েছে। শরীফুলের বিলম্বে তারা প্রথম বাসটি মিস করেছে, শেষমেশ বাধ্য হয়ে নতুন করে টিকিট কেটে অন্য বাসে উঠতে হয়েছে তাদের। অযথা টাকা গুলো জলে গেলো, যদিও টাকার জন্য সে খুব একটা মনঃক্ষুণ্ন নয়, তার ক্ষোভের মূল কারণ অন্যত্র। দিনের শুরুতেই যাত্রাপথে এই অযথা ব্যাঘাত যেন তার মনে অস্বস্তির ছায়া ফেলেছে।
সাগর বরাবরই কিছুটা আধ্যাত্মিক প্রকৃতির মানুষ, বলা যায় সমাজে প্রচলিত কিছু কুসংস্কারেও তার দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে। যেমন বলা চলে যাত্রার শুরুতে কেউ পেছন থেকে ডাকলে কিংবা পথে কালো বিড়ালের দেখা মিললে, তা শুভ লক্ষণ নয়। বরং আগাম বিপদের ইঙ্গিত, শরীফুলের বিলম্বে বাস মিস হওয়ায় আকাশের মনে যেন এক অজানা অশুভ আশঙ্কার ভয় ভর করেছে। জানালার বাইরে দৃষ্টিহীন চোখে তাকিয়ে সে মনে মনে ভাবছে,
“আজকের দিনটা কি তবে এমনই অশুভ ঘটনার পূর্বলক্ষণ দিয়ে শুরু হলো?”
সে বহুবার নানাভাবে শরীফুলকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে, তার মতে এই অবস্থায় রওনা দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বরং অন্য কোনো শুভক্ষণে যাত্রা শুরু করাই উত্তম। না হলে অজানা কোনো ভয়ংকর বিপদের ছায়া হয়তো তাদের ওপর নেমে আসতে পারে।
কিন্তু শরীফুল সম্পূর্ণই সাগরের বিপরীত স্বভাবের মানুষ। বলা চলে, তাদের দু’জনের চিন্তাচেতনা যেন উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর মতো পরস্পর বিপরীত। সাগর যেখানে বিশ্বাস করে অলৌকিকতা, সেখানে শরীফুল নির্ভর করে বিশুদ্ধ যুক্তি ও বাস্তবতার ওপর। তবু একে অপরের ভিন্নতা পেরিয়ে, শরীফুলের যৌক্তিক আশ্বাস এবং আসমান সমান অনুরোধে শেষ পর্যন্ত তারা পরবর্তী বাসে অভয় নগরের পথে যাত্রা শুরু করলো।
সবুজ স্নিগ্ধ শস্য মাঠ পেরিয়ে, পিচঢালা রাস্তায় পূবালী বাতাসের বকু চিরে বাসটি ছুটে চলেছে অভয় নগরের উদ্দেশ্যে।
গন্তব্যের পথ কিছুদূর অতিক্রম করতেই শরীফুল মুঠোফোনে চলমান এক ফেসবুক লাইভ ভিডিও সাগরের সামনে বাড়িয়ে ধরলো। মুখে হালকা হাসি খেলছে তার।
-দেখ বন্ধু, তোর সেই আধ্যাত্মিক ভাবনাতে যেন প্রকৃতি আজ জল ঢেলে দিয়েছে, আমরা যে বাসটা মিস করেছিলাম, সেটা দেখ রায়গঞ্জে ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। আমার দেরি করাটাই বুঝি নিয়তির আশীর্বাদ ছিল, সৃষ্টিকর্তা হয়তো এইভাবে আমাদের রক্ষা করেছেন।
সাগরের মুখে উদ্বেগের ছাপ আরও ঘন হয়ে উঠলো।
-এতে এত খুশী হওয়ার কিছু নেই, কে জানে এই দুর্ঘটনা হয়তো আরও বড়ো কোনো বিপদের পূর্বাভাস দিচ্ছে। আমার মন বলছে, আজকের যাত্রা শুভ নয়। চল বন্ধু ফিরে যাই, কাল নাহয় আবার রওনা হওয়া যাবে।
সাগরের এমন উদ্ভট কথা বার্তায় শরীফুল বেশ চটে গেলো, বিরক্তির সুরে সে বলে উঠলো।
-এই থামতো, যত্তসব আজগুবি চিন্তা মাথা থেকে নামা, এখন যুগ পাল্টেছে সাগর, এসব কুসংস্কার আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকলে চলবে না। তোর এসব আধ্যাত্মিক ভাবনায় যদি বদল না আনিস, একদিন দেখবি নতুন প্রজন্ম তোকে হাসির পাত্র বানিয়ে মজা নিবে। (আচ্ছা একমিনিট শুভকে একটা কল করতে হবে, ওদিকটার কি খবর সব প্ল্যান প্রোগ্রাম ঠিকঠাক আছে কি-না জানতে হবে। তুই আর কোন উদ্ভট না বকে, চুপ করে বস।)
শহরের এক স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তারা তিনজন একসঙ্গে পড়াশোনা শেষ করেছে। দীর্ঘদিন শহরের ইট-পাথরের চার দেওয়ালের ভেতর বন্দি থেকে জীবনের প্রতিটি দিনই যেন একঘেয়েমির শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। শহুরে কোলাহলে জীবন যেন বিষাদময় হয়ে উঠেছে। তাই তাদের একটু মানসিক প্রশান্তির প্রয়োজন, শহুরে জীবনের তিক্ততা কাটিয়ে প্রাণটাকে নতুন করে চাঙা করতে গ্রাম্য প্রকৃতির জুড়ি নেই।
তাই তারা রওনা দিয়েছে অভয় নগরের পথে। শুভর গ্রামের বাড়ি সেখানেই, অভয় নগরের নিসর্গময় প্রান্তে। বন্ধুরা তার গ্রামে যাবে জেনে, কলেজ বন্ধ হওয়ার দিনেই সে তড়িঘড়ি করে বাড়িতে ফিরেছিল। যেন প্রিয় বন্ধুদের আগমন উপলক্ষে উষ্ণ অভ্যর্থনা আর আন্তরিক আপ্যায়নে কোনো ঘাটতি না থাকে, সেই প্রস্তুতিতেই সে ব্যস্ত রয়েছে।
অভয় নগরের গড়াই নদীর তীর ঘেঁষে বিস্তৃত এক গহীন অরণ্য, যেন সবুজের রাজ্য। সেই অরণ্যের গভীরে দেখা মেলে বানর, বাঘডাশা, মেছোবাঘসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ। শহর থেকে বন্ধুরা আসছে জেনে শুভ আগে থেকেই সব প্রস্তুতি সেরে রেখেছে। একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা জুগিয়ে রেখেছে সে, যাতে বন্ধুরা অভয়নগরে পৌঁছালেই সবাই মিলে বেরিয়ে পড়তে পারে নদীপথে ”অভয় নগরের গহীন বনে” রোমাঞ্চকর অভিযানে।
৩
পূবালী ঠান্ডা হাওয়া বইছে, গড়াই নদীর বুক চিড়ে ইঞ্জিনের নৌকা ঢেউ ভাঙ্গা গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। গড়াই নদীর দু’পাড় বুনোফুলে সেজে উঠেছে, জলে ইঞ্জিনের নৌকার তোলা ঢেউয়ের ভাজ ভেঙ্গে মাঝেমধ্যে দুয়েকটা শুশুক উঁকি মেরে চোখের পলকেই জলের অতল গহবরে ডুবিয়ে যাচ্ছে।
আসমান মেঘলাটে, তবু মেঘের আড়াল ভেদ করে কিঞ্চিত সূর্যের ঘোলাটে আলো গড়িয়ে পড়ছে গড়াই নদীর স্বচ্ছ জলে। সেই আলোয় নদীর ঢেউগুলো যেন রুপালি আভায় ঝিলমিল করছে। শরীফুল, সাগর ও শুভ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রকৃতির এই অপূর্ব সৃষ্টির দিকে। গড়াই নদীর এহেন সৌন্দর্যে তাদের মন ভরে উঠেছে এক অনির্বচনীয় আবেগে। মায়াবী, স্নিগ্ধ দৃশ্যে প্রকৃতির প্রেমে আবেগাপ্লুত হয়ে, মুহূর্তগুলো স্মৃতির পাতায় অঙ্কিতের জন্যে গড়াই নদীর সৌন্দর্য ধারণ করছে তাদের মুঠোফোনের ক্যামেরায়।
দিবালোকে সৌন্দর্য বিলিয়ে প্রকৃতি এখন যেন নিশীথের রূপলাবণ্য বাড়ানোর প্রয়াসে মত্ত। পশ্চিমা আসমানে সূর্যের আলো ধীর গতিতে নিভিয়ে যাচ্ছে, দিনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে সে যেন রাত্রির কোলের দিকে যাত্রা করছে। মেঠোপথের শেষ প্রান্তে পড়ন্ত বৈকালির ঘন্টা বেজেছে। এ যেন এক স্বর্গীয় সৌন্দর্যের মায়াবী প্রতিচ্ছবি।
তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালেই যেন এক দুশ্চিন্তার আশঙ্কা হাতছানি দিচ্ছে, আসমান জুড়ে কালো মেঘের দ্রুত বিস্তার দেখে মনে হয়, প্রকৃতির এই রূপসজ্জা কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝড়ে ভেসে যাবে, গড়াই নদীর বুকে বয়ে যাবে যেন এক ভয়ঙ্কর কালবৈশাখী ঝড়। মিনিট কয়েকের মধ্যেই প্রবল ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করলো, আসমান জুড়ে কালো মেঘ যেন শৈশব খেলায় মেতেছে। মুহূর্তেই চারদিকের আলো নিভে এলো, বাতাসের তেজ ক্রমশ বাড়ছে, আর সেই সঙ্গে আকাশের গর্জন যেন অশুভ কোনো বার্তা দিচ্ছে। খুব সম্ভাব্য এই ঝোড়ো হাওয়া শেষ হলেই ওরা মুষলধারে বৃষ্টির সঙ্গ পাবে। বিপদের আশঙ্কা টের পেয়ে শুভ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে সকলের উদ্দেশে বললোঃ
-আকাশের অবস্থা খুব একটা সুবিধাজনক মনে হচ্ছে না, আমার মনে হয় নৌকাটা ঘোরানো উচিৎ। যতটা দ্রুত সম্ভব, আমাদের নিরাপদ স্থানে যেতে হবে।
(প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সাগরও শুভর কথায় সায় জানালো, তার চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু শরীফুল বেঁকে বসলো সে যেন উল্টো সুরে বাজলো একরাশ উচ্ছ্বাস আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে সে বললোঃ
-আরে বন্ধু, তোরা মেঘ দেখে এতোটা বিচলিত হচ্ছিস কেন? তোদের এটা মনে রাখতে হবে, আমরা এখানে এসেছি এডভেঞ্চার মুহূর্ত উপভোগ করতে, ভয় পেতে নয়। সুতরাং ভয়ঙ্কর কিছুর মুখোমুখি হওয়াই তো আসল এডভেঞ্চার, ভয়ঙ্কর কিছু ঘটলে সেটার মোকাবেলা করাটা আমাদের এডভেঞ্চারকে অন্য লেভেলে নিয়ে যাবে।
আমার ধারণা, এই ঝড়ো বৃষ্টি আমাদের অভিযানে নতুন মাত্রা যোগ করবে, আমাদের অভিজ্ঞতাকে আরও রোমহর্ষক, এবং স্মরণীয় করে রাখার সুযোগ তৈরী করে দিচ্ছে। অতএব, আমরা কোথাও ফিরে যাচ্ছি না, বরং পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনামাফিক অভয়নগরের গহীন বনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি। সেই সঙ্গে আজ রাতে আমরা অরণ্যের ভেতরেই কাটাবো। জোছনার আলো থাকলে অবশ্য মুহূর্তগুলো আরও অপূর্ব হতো, বনভূমির বুকজুড়ে রূপালী আলোয় ভেসে বেড়াতো এক অদ্ভুত মায়া। তবে বৃষ্টিভেজা রাতও খুব একটা খারাপ হবার কথা নয়, বরং এডভেঞ্চার উপভোগে নতুন অভিজ্ঞতা হবে। প্রকৃতির সঙ্গে এমন নিবিড় সখ্যতার অভিজ্ঞতার সুযোগ, হয়তো জীবনে দ্বিতীয়বার আর নাও মিলতে পারে। অতএব ছুটে চলো গহীন জংগলে….
৪
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বাতাসের তীব্রতা কমে, প্রকৃতির বুকে নেমে এলো মুষলধারে বৃষ্টি। মাঝেমধ্যে সেই বৃষ্টির সঙ্গে দমকা হাওয়া এসে কাঁপিয়ে দিচ্ছে নদীর পাড়ের বৃক্ষরাজি। ওরা তিনজন নৌকার ছইয়ের নিচে গা ঘেঁষে বসে আশ্রয় নিয়েছে। সঙ্গে আনা ফ্লাস্ক থেকে গরম রঙ চায়ের সঙ্গ নিলো, মাথার ওপর নৌকার ছইয়ে বৃষ্টির ফোঁটার টুপটাপ শব্দে মিশে গেছে চায়ের ঘ্রাণ আর নাকে এসে লাগছে কাঁদা ধোঁয়া জলের মৃদু গন্ধ। সাগর মুখে হালকা লাজুক হাসির ছলে বললোঃ
-সত্যিই অসাধারণ মুহূর্ত, বেশ উপভোগনীয়। তোকে অসংখ্য ধন্যবাদ বন্ধু, আমাদের জোর করে আটকে রাখার জন্য।
কিন্তু তাদের সেই সুখময় মুহূর্ত বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। প্রকৃতি ক্রমশ রুদ্ররূপ ধারণ করে চলছে, বৃষ্টির ঝাঁপটা কমে গিয়ে পরক্ষণেই গড়াই নদীর বুকে শুরু হলো ভয়াবহ তুফান।
বাতাসের প্রচণ্ড দাপটে নদীর ঢেউগুলো উন্মত্ত হয়ে উঠলো, তুফান এবং নদীর ঢেউ যেন একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। সেই বিক্ষুব্ধ ঢেউয়ের তাণ্ডবে নদীর পাড় ভাঙ্গতে শুরু করেছে, নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক মরা গাছের গুড়ি তুফানের তেজে উপড়ে গিয়ে উড়ে এলো সরাসরি তাদের নৌকার দিকে। নৌকার মাঝি চিৎকার করে সবাইকে সতর্ক করতেই, প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে মুহূর্তের মধ্যেই শরীফুল, সাগর আর শুভ নৌকা থেকে লাফিয়ে পড়লো নদীর তীরে। মুহূর্তেই প্রচণ্ড শব্দে নৌকার ছাউনি ছিঁড়ে ছিটকে গেলো নদীর বুকে। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই বিপদে সবাই দিশেহারা হয়ে পড়লো, বজ্রপাতের ঝলকানিতে চারপাশ একেকবার আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। ভয়ঙ্কর তুফানের তাণ্ডবে গড়াই নদী, যেন মৃত্যুর নৃত্যে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে।
অধিক সতর্কতায় তারা সকলেই অক্ষত অবস্থায় গড়াই নদীর পাড়ে এসে আশ্রয় নিলো। চারদিকে এখন শুধু অরণ্যের গাঢ় অন্ধকার, রাত নেমেছে বিদঘুটে আঁধারে। তুফানের তাণ্ডব কিছুটা থেমে গেলেও বাতাসে এখনো নদীর ভেজা কাঁদামাটির গন্ধে মিশে আছে।
ধীরে ধীরে তারা গহীন বনের দিকে পা বাড়ালো, কর্দমাক্ত মাটিতে টিপে টিপে পা ফেলছে, কাঁদামাটির গায়ে চপচপ আওয়াজ তুলছে প্রতিটি পদক্ষেপে। গভীর জংগলের মধ্য হতে মাঝেমধ্যে শেয়ালের হাঁক ভেসে আসছে, সেই হাঁক তাদের কর্ণপাতে কেমন অদ্ভুত শোনাচ্ছে, মনের গভীরে ভয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির ঝাপটা এখন অনেকটাই কমে এসেছে, তবুও সিক্ত বাতাসে কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ছে তাদের ভেজা শরীরে।
নিশীথের গভীর অন্ধকারে পা ফেলতে ফেলতে তারা এগিয়ে চলেছে গহীন বনের অন্তঃস্থলে। হঠাৎই এক অজানা গর্তে পা পিছলে সাগর নিচে পড়ে গেলো। অন্ধকারে মুহূর্তের জন্য যেন চারপাশ স্তব্ধ হয়ে গেলো। শরীফুল আর শুভ ছুটে গিয়ে কোনো রকমে তাকে টেনে তুললো উপরে। প্রাণে বেঁচে গেলেও, সাগরের শরীরজুড়ে নানান জায়গায় রক্তাক্ত আঁচড় আর যখমের দাগ ফুটে উঠেছে। খুব সম্ভবত গর্তের মধ্যে মেছোবাঘ প্রকৃতির কোন প্রাণীর বসবাস, তার বাসায় দু’পায়ে প্রাণীর হটাৎ প্রবেশ সে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি বলেই, সে আক্রমণ করে বসেছে। ব্যথায় কাতর মুখে সাগর পথ চলতে পারছে না, শরীফুল ও শুভর কাঁধে ভর করে সামনের দিকে এগুতে লাগলো।
কিছুদূর অগ্রসর হতেই নজরে পড়লো প্রায় দু’শতক বছরের পুরনো এক বিশাল বটবৃক্ষ, বটবৃক্ষের মগডাল হতে শত শত শিকড় সাপের মতো মাটিতে নেমে এসেছে। গাছের গায়ে শ্যাওলা জমে এক অদ্ভুত রহস্যময় আবরণ তৈরি করেছে। চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার নিরবচ্ছিন্ন ডাক আর মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসা ব্যাঙের ডাক মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে ভয়াল নিস্তব্ধতা।
নৌকার মাঝি তখন কণ্ঠে ক্লান্তির সুর মিশিয়ে বললোঃ
-এর থাইকা নিরাপদ যায়গা পাওন যাইবো না, বটগাছের লতা জন্তু জানোয়ার থাইকা আমগো মইধ্যে দেওয়ালের মতোন বাঁধা দিবো, তয় এইহানে ডর একখান আছে মেলা পুরোইনা গাছতো সাপ কোপের আনাগোনা থাইকবার পারে। কিন্তুক এই ঠান্ডার রাইতে সাপ গাড়া থাইকা বাইর হইবো না, আপ্নেরা চাইলে এইহানে কেলা গাছের পাতা বিছাইয়া রাইতটা থাকোনের বন্দোবস্ত করুম।
মাঝির কথায় সম্মতি জানিয়ে তারা সেখানেই রাত্রিযাপনের সিদ্ধান্ত নিলো। তাছাড়া সাগরের আহত দেহ টেনে পথ চলা আর সম্ভব হচ্ছিল না। কলা পাতার পাটাতনে, বটবৃক্ষের গায়ে পিঠ ঠেকাতেই অরণ্যের গভীর নীরবতা আর বৃষ্টির পরের কাঁচামাটির গন্ধে চোখের পাতা ক্রমে ভারী হয়ে এলো। মুহূর্তের মধ্যেই নয়নযুগলে নেমে এলো রাজ্যের ঘুম।
৫
পাখিদের কিচিরমিচির ডাকে তাদের ঘুম ভাঙলো। পূর্বগগনে তখন সোনালি সূর্যের প্রথম কিরণ উঁকি দিচ্ছে। সোনালী রৌদ্রের আলোকরশ্মি, ঘন অরণ্যের পত্রপুট ভেদ করে বনের মাটি ছুঁয়েছে। ডালে ডালে কাঠবিড়ালিরা লাফিয়ে বেড়াচ্ছে, পত্রছায়ায় খেলা করছে রঙিন প্রজাপতি। কলার পাতার আড়াল থেকে একটা হনুমান কলা হাতে ওদের দিকে দাঁত খিঁচিয়ে কলার ছোকলাটা ছুড়ে মেরে চোখের পলকেই লাপাত্তা হয়ে গেলো।
প্রকৃতির এমন মনোরম চিত্র দেখে কে-ই বা বিশ্বাস করবে? গতরাতে এই গড়াই নদীর বুকজুড়ে তুফানের তাণ্ডব চলেছিল।
গতরাতের ভয়াবহ ধাক্কা সামলে, ভোরের মিষ্টি রৌদ্রস্নাতে সকলেই যেন ক্লান্তির আবরণ ধুয়ে নিলো। চারপাশে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে আছে, বৃষ্টিভেজা অরণ্যের মাটিতে রোদের সোনালি আলো ছুঁয়েছে, পত্রপল্লবের ডগায় জলবিন্দুর ঝিলিক, আর বাতাসে কাঁচামাটির গন্ধ। এমন দৃশ্য দেখে সকলেরই হৃদয়, আনন্দে ভরে উঠলো।
কিন্তু শরীর তখন অন্য কথা বলছে, দীর্ঘ সময় না খাওয়ায় পেটে টান ধরেছে, ক্ষুধায় প্রায় কাঁপতে শুরু করেছে তারা। গতকাল দুপুরের পর থেকে পেটে এখনও কিছু পড়েনি। ক্ষুধায় শরীর অবসন্ন, মুখ শুকিয়ে এসেছে। কিছু খাওয়া প্রয়োজন। শুভ নৌকার মাঝিকে নিয়ে জংগলে বেরিয়ে পড়লো কিছু ফলমূলের সন্ধানে, এদিকে শরীফুল মন দিলো আহত বন্ধুর সেবাযত্নে। অরণ্যের ঝোপ থেকে সংগ্রহ করলো কিছু লতা-পাতা, যেগুলোর চিকিৎসাগুণের কথা লোকমুখে শোনা যায়। হাতের তালুতে ঘষে সেগুলো তৈরী করলো বনজ অ্যান্টিসেপটিক ঔষধ হিসেবে, অতি সাবধানতায় লাগিয়ে দিলো ক্ষত স্থানে, বনজ ঔষধে সাগরের ব্যথা কিছুটা প্রশমিত হলো।
আসমান পরিষ্কার বৃষ্টি নেই, তবু অরণ্যের বুকজুড়ে এখনও টুপটাপ শব্দে ঝরে পড়ছে বৃক্ষের পাতায় জমে থাকা জলবিন্দু। বটবৃক্ষের গায়ে সাগর আধশোয়া হয়ে আছে, নয়নযুগলে তন্দ্রাচ্ছন্ন। ক্ষতস্থানে শরীফুলের লাগানো বনজ ওষুধ কিছুটা আরাম দিয়েছে, কিন্তু ক্লান্তি আর দুর্বলতায় চোখ বুজে এসেছে তার, সাগরের বিশ্রামের ফাঁকে শরীফুল পানির খোঁজে নদীর দিকে রওনা হয়েছে।
প্রায় অর্ধঘণ্টা অতিবাহিত হতে চললো, এমন সময় শুভ ও নৌকার মাঝি আশ্রয়স্থলের দিকে ফিরে এলো। হাতে কিছু কলা ও বুনো ফল, খাবারের সন্ধান মেলায় এখন তাদের মুখে যেন হাসি ঝরে পড়ছে। কিন্তু সে হাসি মুহূর্তেই ছারখার হয়ে গেলো। বটবৃক্ষের গোড়ার দিকে তাদের নজর যেতেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
মাটির বুক ঘেঁষে ফসফস শব্দ তুলে সাগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এক বিশাল আকৃতির কালচে সাপ। শুভর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, আতঙ্কে তার মুখ ফেটে চিৎকার বেরিয়ে এলোঃ
-সাগর, সামনে দেখ।
শুভর চিৎকার শুনে সাগর ঘুমচকিতের মতো চমকে উঠলো, কিন্তু ততক্ষণে সাপটি তার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। মাঝি দ্রুত আশেপাশ থেকে একটা মোটা লাঠি কুড়িয়ে নিয়ে তেড়ে গেলো সাপের দিকে, লাঠির মাথা উঁচিয়ে আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। ঠিক তখনই শরীফুল ফিরে এলো হাতে নদীর জলভর্তি পাত্র নিয়ে, হঠাৎ এই দৃশ্য দেখে তার মুখে বিস্ময়ের ছাপ, সে গলা ঊঁচিয়ে মাঝির উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠলোঃ
-থামো মাঝি, আঘাত করো না।
সে দ্রুত সামনে গিয়ে বললো,
ওরা বন্যপ্রাণী, এই বনে আমরা অতিথি। এদের হত্যা করা ঠিক হবে না। সাপ ভয়ঙ্কর ঠিকই, কিন্তু অকারণে জীবন নেওয়া প্রকৃতির প্রতি অন্যায়। আমাদের কাজ হলো বাঁচা, বিনাশ নয়। সাপ সহ সকল প্রাণী আমাদের উপকারের জন্য, এরা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
সে সাগরকে উদ্দেশ্য করে বললোঃ
-ভয় পাস না বন্ধু, সাবধানে পিছনে সরে আয়, আমরা সাপটাকে ভয় দেখিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা করছি।
শরীফুলের যৌক্তিকতায় এক মুহূর্তের জন্য সবাই থমকে গেল। সে ধীরে ধীরে হাত নাড়িয়ে সাপটিকে ভয় দেখিয়ে দূরে সরানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ঠিক যখন সে মনে করেছিল সাপটি পিছিয়ে যাচ্ছে, তখনই হঠাৎ সাপটি ফোঁস করে উঠে, বজ্রপাতের মতো দ্রুত গতিতে ছোবল মেরে বসলো সাগরের ডান পায়ে। সাগর যন্ত্রণায় ছিটকে পড়ে গেলো মাটিতে। মুখ থেকে এক অসহায় আর্তনাদ বেরিয়ে এলোঃ
-আহ্… শরীফুল, তুই আমাকে মেরেই ছাড়বি।
চারপাশের বাতাস আবারও ভারী হয়ে উঠলো, অরণ্যের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল সাগরের হাহাকারে। বটবৃক্ষের ছায়াতলে আবারও যেন নেমে এলো গাঢ় নীরবতা। কেবল সাগরের যন্ত্রণার কাতর শব্দ ভেসে আসছে। শুভ মুহূর্তের মধ্যে তার পাশে ছুটে এলো, তার চোখে তখন ভয় নয়, কেবল প্রবল দায়িত্ববোধ ফুটে উঠেছে। সে নিজের শার্ট ছিঁড়ে পায়ের উপরে শক্ত করে বাঁধলো, বিষ যাতে শরীরে ছড়িয়ে না পড়ে। শরীফুল ছুটে গেল কাছের ঝোপে, লোকমুখে শোনা বনজ প্রতিষেধক খুঁজে আনতে। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে, প্রকৃতি যেন আবারও তাদের সাহস ও সহানুভূতির পরীক্ষা নিচ্ছে এই গহীন অরণ্যে।
কিন্তু কোনো প্রতিষেধকেই যেন সাগরকে আর ফিরিয়ে আনতে পারছে না। তার মুখশ্রী নিস্তেজ হয়ে পড়েছে, ঠোঁটের কোণে ফ্যাকাশে রক্তরেখা শুকিয়ে গেছে। চারপাশে নেমে এসেছে ভারী এক স্তব্ধতা, বটবৃক্ষের পাতাগুলোও যেন নিঃশব্দে কেঁপে উঠছে তার যন্ত্রণায়। শুভ ও মাঝির চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে নোনতা জল, শরীফুলের চোখে যেন জমে আছে অজস্র কথা, কষ্টে বুক ভারি হয়ে আছে অথচ কোনোভাবেই প্রকাশ করতে পারছে না।
সাগরের নিস্তেজ শরীরকে বুকে টেনে নিয়ে শরীফুল ব্যাকুল হয়ে উঠলো। সে কাঁপা কণ্ঠে ডেকে উঠলোঃ
-সাগর, চোখ খুলে দেখ, আমরা তোর পাশে আছি। ভয় পাস না, তোর কিছু হবে না সৃষ্টি কর্তার উপর বিশ্বাস রাখ।
সাগরের কন্ঠস্বর থেকে জবাব এলো ক্ষীণ, কাঁপা স্বরেঃ
-প্লিজ তুই আমার কাছে আসবি না শরীফুল, দূরে সরে যা। তোর জন্যই আজ আমার এই পরিণতি। তুই মানুষ ভালোবাসিস না, তুই কেবল প্রকৃতি ভালোবাসিস, সাপ, গাছ, পাখি, সবাই তোর আপন, কেবল আমি নই। তুই বন্ধুত্বের মানে বুঝিস না, তুই আমার থেকে দূরে সরে যা….
ক্রমশঃ সাগরের দেহ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলছে। পুরো শরীর নীল বর্ন হয়ে আসছে, সকলের আর বুঝতে বাকি রইলো না তার সময় ফুরিয়ে আসছে। অভয় নগরের গহীন বনে যেন কান্নার রোল পড়ে গেলো, এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবী থমকে গেলো। সকলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে, শরীফুলের বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠলো। সে নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো, তার কারণেই সাগরের আজ এই অবস্থা। মৃত্যুপথযাত্রী বন্ধুর এক অনুচ্চারিত বিদায়ে তার হৃদয় দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে, সে গলা ছেড়ে কান্না শুরু করলো। তার কান্নার আওয়াজে যেন অভয়নগরের আসমান কেঁপে উঠল।
তথাপি বনবিভাগের একদল কর্মকর্তা সেদিন সকালেই অভয়নগরের গড়াই নদীর তীর ঘেঁষে ঘন অরণ্যে পরিদর্শনে বেরিয়েছিল। আগের রাতের প্রচণ্ড তুফান বনের বুক চিরে বহু গাছ উপড়ে ফেলেছে, তাই তারা ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করতে এসেছিল। দু’শতক ধরে বেঁচে থাকা বটবৃক্ষের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতেই তাদের কানে এলো মানুষের কান্নার শব্দ। তারা দৌড়ে গেল সেই দিকে, দেখলো এক তরুণ একটি নিস্তেজ দেহকে কোলে নিয়ে বসে আছে, পাশে আরেকজন ভয়ে ও আতঙ্কে কাঁদছে। মুহূর্তেই সব বুঝে ফেললো কর্মকর্তারা। সাগরের পায়ে সাপের দংশনের দাগ, শরীরে বিষের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। দলনেতা তৎক্ষণাৎ নির্দেশ দিলেন, দ্রুত এন্টিভেনম দাও।
সঙ্গে থাকা কর্মকর্তারা দ্রুত ইনজেকশন প্রস্তুত করলো, এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সাগরের দেহে প্রবেশ করানো হলো সেই প্রতিষেধক। সবাই নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে লাগলো, বাঁচা মরার এই সন্ধিক্ষণে সময় যেন থেমে গেছে।
কিছুক্ষণ পর সাগরের বুকে একটুখানি নড়াচড়া, তারপর মৃদু নিশ্বাস। শুভর চোখ ছলছল করে উঠলো, শরীফুলের ঠোঁট কেঁপে উঠলো নিঃশব্দ কৃতজ্ঞতায়।
অতঃপর বনবিভাগের কর্মকর্তারা সাগরকে সতর্কতার সঙ্গে স্ট্রেচারে তুলে নিয়ে গেলেন নৌকায়, সেখান থেকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হলো। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার চিকিৎসা ও পরম করুণাময়ের অশেষ কৃপায় অবশেষে সাগর ফিরে এলো জীবনের আলোয়।
৬
সেই ঘটনার পর কেটে গেছে বহুদিন। সময় গড়িয়েছে, ঋতু বদলেছে, তবু সাগর আর শরীফুলের মধ্যে নেমে আসা নীরবতার দেয়াল যেন আরো পাথর হয়ে জমাট বেঁধেছে। সাগরের অন্তরে রয়ে গেছে এক অমোচনীয় অভিমান,রাগ,ক্ষোভ, আর বুকের ভেতর জ্বলে থাকা গভীর কষ্টের আগুন। অন্যদিকে শরীফুল প্রতিদিনই বন্ধুর স্মৃতিতে ভেসে যায়, সম্পর্কের বিচ্ছেদে মন খারাপ হয়। শুভর সঙ্গে আলাপের ফাঁকে বারবার খোঁজ নেয়, সাগর কেমন আছে? কখন উত্তর মেলে, কখনও নিরুত্তরে কাটে সময়।
এক কাকডাকা ভোরে শরীফুলের ঘুম ভাঙলো। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা আলোর রেখা তার মুখে পড়ছে, আধোঘুমে হাত বাড়িয়ে সে মুঠোফোনটা তুলে নেয়, মুঠোফোনের স্কিনে চোখ পড়তেই থমকে গেল। স্ক্রিনে ভাসছে পরিচিত এক নাম, সাগর।
কম্পিত হাতে ফোনলক খুলে দেখলো একটি মেসেজ,
“এই পৃথিবীতে আমাদের সঙ্গে, অন্য প্রাণীদেরও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।”
শরীফুলের ঠোঁটের কোণে আনন্দের হাসি ফুটে উঠলো, বুকের ভেতর জমে থাকা বহুদিনের বন্ধুত্ব বিচ্ছেদের কষ্ট, অশ্রু হয়ে নেমে এলো গাল বেয়ে। জানালার বাইরে পাখিরা কিচিরমিচির করছে, যেন তারাও দুই বন্ধুর ভাঙা বন্ধুত্বের নতুন সূচনায় সঙ্গ দিচ্ছে।


