Homeঅন্যান্যসফলতা নাকি অন্যকিছু

সফলতা নাকি অন্যকিছু

​সফলতা কী? অনেক টাকা, বড় ডিগ্রি, নাকি সমাজের বুকে বুক ফুলিয়ে হাঁটার মতো কোনো বড় পদবী? আমরা যখন সাফল্যের পেছনে অন্ধের মতো ছুটছি, ঠিক তখন আমাদের চারপাশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সবচেয়ে দামি অনুভূতিগুলো। এমনই এক চরম অবক্ষয় আর নির্মমতার গল্প রচিত হলো রাজধানীর মিরপুরের বুকে।

​মিরপুরের ছয় নম্বর সেকশনের একটি আবাসিক ফ্ল্যাট। পুলিশ ঘরের দরজা খুলে যা দেখলো, তা দেখার জন্য হয়তো কোনো সন্তানই প্রস্তুত থাকে না। বিছানায় পড়ে আছে ৭২ বছর বয়সী বৃদ্ধা নূরজাহান বেগমের নিথর দেহ। দেহ বললে ভুল হবে, তীব্র পচনে মাংস গলে বিছানায় খসে পড়েছে, বাসা বেঁধেছে পোকা। চিকিৎসকদের ধারণা, অন্তত সাত থেকে আট দিন আগে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন তিনি।

​কিন্তু ট্র্যাজেডি এখানে নয়, ট্র্যাজেডি হলো যে ঘর থেকে এই পচা গন্ধ বেরোচ্ছিল, সেই একই ফ্ল্যাটের পাশের রুমেই থাকতেন তার মেয়ে। একই ছাদের নিচে মাত্র কয়েক হাত দূরত্বে মা মরে পচে রইলেন, অথচ সাত-আট দিন ধরে মেয়ে টের পেলেন না।

​রোববার রাতে যখন তিনি মাকে ডাকতে যান, সাড়া না পেয়ে ভাবলেন মা হয়তো অসুস্থ। ডেকে আনলেন নার্স। সেই নার্স ঘরে ঢুকে যখন এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখলেন, তখন পুরো এলাকায় স্তব্ধ হয়ে গেলো। পুলিশও বিস্মিত—মা ঘরে মরে পচে গেলো, অথচ মেয়ের নাকে কোনো গন্ধ পৌঁছালো না! এই অসাড়তা কি কেবলই ঘ্রাণশক্তির, নাকি আমাদের ভেতরের মানবিকতার? আমরা কি এতটাই যান্ত্রিক হয়ে গেছি যে, পাশের ঘরে জন্মদাত্রী মায়ের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার শব্দও আমাদের কানে পৌঁছায় না? নাকি একই ছাদের নিচে থেকেও আমাদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব আজ আলোকবর্ষ দূরে দাঁড়িয়ে?

​এবার তাকানো যাক এই মায়ের সফলতার খতিয়ানের দিকে। নূরজাহান বেগম কোনো সাধারণ মা ছিলেন না। তিনি সন্তানদের তথাকথিত প্রতিষ্ঠিত করে গড়ে তুলেছিলেন। তার এক ছেলে মংলা স্থলবন্দরের যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বুয়েটের শিক্ষক।

​কী চমৎকার এক সফল পরিবার! কিন্তু মায়ের শেষ সময়ে এই সফল সন্তানরা কেউ তার পাশে ছিলেন না। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে শিক্ষক ছেলেটি এলেও, সেই সচিব ছেলেটির আসার সময়টুকুও হয়নি। যে মা নিজের রক্ত জল করে সন্তানদের সমাজের উঁচু তলায় বসালেন, সেই মায়ের গলিত লাশের পাশে দাঁড়ানোর ফুরসত মিললো না তার সন্তানদের। সচিব ছেলের ব্যস্ত ফাইলপত্র কিংবা বুয়েট শিক্ষকের অ্যাকাডেমিক লেকচারের চেয়েও কি মায়ের পচা লাশের গন্ধটা কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল? যে মা একদিন আঙুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন, আজ তার শেষ যাত্রার খাটিয়া ধরার মতো চারটে কাঁধও জুটলো না এই জৌলুসময় পরিবারে।

​এই সমাজ আমাদের বড় বড় ডিগ্রি দিচ্ছে, বড় বড় চাকরি দিচ্ছে, কিন্তু আমাদের ভেতর থেকে ‘মানুষ’ শব্দটাকে কেড়ে নিচ্ছে। একই ঘরে থেকেও যে সন্তান মায়ের বেঁচে থাকা বা মরে যাওয়ার খবর রাখে না, সেই সন্তানের সাফল্যের মূল্য কতটুকু? জিপিএ-৫ আর কর্পোরেট সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার এই অন্ধ ইঁদুরদৌড়ে আমরা আসলে কী অর্জন করছি? আমরা সন্তানদের ‘উচ্চশিক্ষিত’ করছি ঠিকই, কিন্তু ‘মানুষ’ করতে ভুলে যাচ্ছি। যে শিক্ষা জন্মদাত্রীর প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ববোধ শেখায় না, সেই শিক্ষা আসলে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

​আজ নূরজাহান বেগমের এই করুণ পরিণতি কেবল একটি লাশ উদ্ধারের ঘটনা নয়, এটি আমাদের সমাজের বিবেকহীনতা আর চরম পারিবারিক দূরত্বের এক জীবন্ত দলিল। আমরা কি আসলেই উন্নত হচ্ছি, নাকি দিন দিন একেকটি জীবন্ত রোবটে পরিণত হচ্ছি?

মিরপুরের এই ফ্ল্যাটের বদ্ধ দেয়াল আজ আমাদের পুরো সভ্যতার মুখে এক বিরাট চড় মেরে গেল। নূরজাহান বেগম একা মরেননি, তার সেই গলিত লাশের সাথে পচন ধরেছে আমাদের পারিবারিক বন্ধনে, আমাদের সামাজিক মূল্যবোধে। আজ বৃদ্ধাশ্রমের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে সন্তানের পাশের ঘরটি, যেখানে মা একা, নিঃসঙ্গ এবং উপেক্ষিত। সময় এসেছে একটু থামার, নিজেকে প্রশ্ন করার—এই অন্ধ সাফল্যের শেষ কোথায়? দিনশেষে যদি ঘরে ফেরার পর মায়ের হাতটাই মাথায় না থাকে, তবে সেই রাজপ্রাসাদ সমতুল্য ফ্ল্যাট আর কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স আসলে এক টুকরো শ্মশান বৈ তো কিছু নয়!

বিষয় ভিত্তিক সংবাদ
যোগাযোগspot_img

সর্বাধিক পঠিত