Homeগল্পদ্য কিউরেটর

দ্য কিউরেটর

জাজাফী
জাজাফীhttp://www.zazafee.com
গল্পকার,কবি ও সমাজকর্মী।

লেখক: জাজাফী

ছোট নানুর ঘরের উত্তর কোণায় রাখা কাঠের পুরোনো বাক্সটা সব সময় তালাবদ্ধ থাকে। বাক্সটা দেখতে খুব সাধারণ। কোনো কারুকাজ নেই, রংও অনেক আগেই উঠে গেছে। কিন্তু তবুও ওটার ভেতরে কী আছে, সেটা নিয়েই অনুভা আর ওর সব কাজিনদের কৌতূহলের শেষ ছিল না। চাবিটা সব সময় থাকে ছোট নানুর কাছে। তিনি না থাকলে ঘরটা বন্ধ থাকে, আর তিনি থাকলেও বাক্সটা কখনো খোলা দেখা যায় না। যেন বাক্সটা শুধু কাঠের না ওর ভেতরে লুকিয়ে আছে কোনো গোপন গল্প, যা জানার অনুমতি এখনো কেউ পায়নি। অনুভা অনেকবার চেষ্টা করেছে। কখনো চুপিচুপি ঘরে ঢুকে, কখনো নানুর মন ভালো থাকার সুযোগে সরাসরি জিজ্ঞেস করে। কিন্তু প্রতিবারই ছোট নানু হেসে এড়িয়ে গেছেন। কিছু বলেননি, আবার একেবারে না-ও করেননি। তার সেই রহস্যময় হাসিটাই যেন কৌতূহলটাকে আরও বাড়িয়ে দিত। অনুভার একটা বড় আপু আছে। ওর নাম অহনা। অহনা এসব নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না। সে বড়, একটু গম্ভীরও। কিন্তু অনুভার জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত সেও হার মানল। এবারের ঈদে তারা ঠিক করল যাই হোক, ছোট নানুর সেই সিক্রেট বাক্সের ভেতরে কী আছে, সেটা এবার দেখেই ছাড়বে। কারণ, কখনো কখনো একটা সাধারণ বাক্সের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এমন কিছু যা পুরো একটা জীবনের গল্প বদলে দিতে পারে।

অনুভা আর অহনা সহদর দুই বোন। বাবা মা ওদেরকে খুবই আদর করেন। ব্রিটিশ আমল থেকেই তাদের পূর্বপুরুষেরা ধনী ছিল। সময়ের সাথে সাথে সেই বিপুল সম্পদের পরিমাণ কিছুটা কমেছে, কিন্তু নামডাক এখনো আগের মতোই রয়ে গেছে। আশপাশের দশ গ্রামের মধ্যে তাদের নানার সমান সম্পত্তির মালিক আর কেউ নেই। তবুও মানুষটা একেবারেই সাদামাটা। কোনো অহংকার নেই, কোনো দম্ভ নেই। গ্রামের লোকেরা তাকে এখনো “জমিদার” বলেই ডাকে, কিন্তু তিনি এই সম্বোধনটা খুব একটা পছন্দ করেন না। তার বিশ্বাস এই সম্পদের প্রকৃত মালিক তিনি নন। ভাগ্য আর পরিশ্রমের সুবাদে তিনি কেবল এর অস্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণকারী। তিনি প্রায়ই বলতেন, আসল মালিক মহান আল্লাহ। তিনি যাকে ইচ্ছে সম্পদ দেন, আবার সেই সম্পদ দিয়েই মানুষকে পরীক্ষা করেন। মানুষের জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী কিছুদিনের জন্য এই পৃথিবীতে আসা, তারপর একদিন হঠাৎ ডেকে নেওয়া হয়। তখন যত সম্পদই থাকুক, সবই পড়ে থাকে পেছনে। সঙ্গে যায় শুধু কিছু নেক আমল, কিছু পাপ, আর এক টুকরো সাদা কাপড়। এই বিশ্বাসটাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। এত কিছু থাকার পরও, তিনি কখনোই সম্পদ নিয়ে গর্ব করেননি।

অনুভা আর অহনা অবাক হয়ে দেখেছে তার নানু অনেক বড়লোক হলেও তার ছোট নানু তেমন বড়লোক না। কিন্তু তিনি অনেক সৌখিন মানুষ। তিনি নানা সময়ে নানা জিনিস সংগ্রহ করেন। তার সংগ্রহ দেখলে যে কারো চোখ কপালে উঠবে। তবে তিনিও মানুষ হিসেবে খুবই ভালো। ঈদের সময় অনুভা আর অহনাকে তিনি ঈদ সালামী দেন। সেই নানুর একটা সিক্রেট বাকশো আছে। সেই বাকশোতে সব সময় তালা মারা থাকে। চাবি থাকে তার নিজের কাছে। অনুভা আর অহনা বহুবার চেষ্টা করেছে ওই বাকশোতে কী আছে তা জানার এবং দেখার। কিন্তু কখনোই সুযোগ পায়নি। একবার ঈদে নানু বাড়িতে গিয়ে অনুভা তার বাকি সব কাজিনদের নিয়ে একটা মিটিং করলো। যে করেই হোক ছোট নানুর বাকশোতে কী আছে তা দেখতে হবে। তারা সবাই যদি এক সাথে গিয়ে নানুর কাছে আব্দার করে তিনি নিশ্চই না করতে পারবেন না। যে কথা সেই কাজ। অনুভা আর তার কাজিনরা মিলে ছোট নানুর সামনে গিয়ে হাজির। নানু তখন বসে একটা বই পড়ছিলেন। বইটার নাম দ্য কিউরেটস। কোনো একজন বিদেশী লেখকের বই। ছোট নানু অনেক পড়াশোনা করেছেন। তাকে অনেক জ্ঞানী মনে হয়। কিন্তু অনুভা বুঝে উঠতে পারে না ছোট নানু এতো পড়াশোনা করেও কেন বড়লোক হতে পারলো না। অনেকে যে বলে লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে। নানুরতো নিজের কোনো গাড়িও নেই। অথচ গ্রামের অনেকে পড়াশোনাও জানে না কিন্তু নিজেদের গাড়ি আছে।

সেবার ঈদে সবাই মিলে ছোট নানুর সামনে গিয়ে হাজির। সবাইকে একসাথে আসতে দেখে নানু জানতে চাইলেন কী খবর তোমাদের? সব  দল বেঁধে হাজির হয়েছ যে। মতলবটা কী? এখনো ঈদ আসতে দুদিন বাকি। সুতরাং ঈদের দিন ছাড়া কোনো সালামী হবে না। অহনা সবার বড়। সেই কথা বললো। বললো নানু ভাই এবার তোমার কাছে ঈদ সালামী চাইতে আসিনি। দরকার হলে এবার আমাদেরকে ঈদ সালামী দিও না। কিন্তু তোমার ওই সিক্রেট বাকশোতে তুমি কী লুকিয়ে রেখেছ সেটা দেখতে চাই। দেখাতেই হবে। অনুভা বললো ওর ভিতরে কি আলাদীনের প্রদীপ লুকিয়ে রেখেছ? পাশ থেকে ইররাম বললো না না তা কিভাবে হয়? তাহলেতো সেটা ঘসা দিয়ে নানু কবেই অনেক বড়লোক হয়ে যেতো। ওর মধ্যে নিশ্চই এমন কিছু আছে যা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না। ওদের যার যা মনে আসলো অনুমান করতে থাকলো। নানু ওদের কথা শুনে শুধু হাসলেন। বুঝলেন এরা এবার দল বেঁধে এসেছে। নাছোড় বান্দা। না করার উপায় নেই। তিনি বললেন শোনো তোমরা যদি আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারো তাহলেই কেবল তোমাদেরকে দেখাতে পারি।

সবাই ঘাবড়ে গেলো। কারণ নানুতো অনেক পড়াশোনা জানা লোক। কত কঠিন প্রশ্ন করবে তার উত্তর কি ওরা ছোটরা দিতে পারবে? তারপরও অনুভা সাহস করে বললো আমরা সবাই নানুর সেনা, ভয় করিনা বুলেট বোমা। থুক্কা ভয় করিনা প্রশ্ন কোনো। হারলে হারবো তবু হাল ছাড়বো না। নানু হাতে রাখা বইটা পাশে রেখে প্রথম প্রশ্ন করলেন বলোতো এমন একটা পোকা আছে যা অধিকাংশ মানুষ দেখেনি কিন্তু তার নাম জানে। আর সেই পোকার ইংরেজী এই দেশের সব মানুষ জানে। এমনকি যারা কোনোদিন স্কুলে যায়নি,কোনো বই পড়েনি তারাও সেই পোকার ইংরেজী জানে। এখন প্রশ্ন হলো সেই পোকাটার নাম কী আর তার ইংরেজী কী? প্রশ্ন শুনে ওদের ভিমরি খাওয়ার দশা হলো। জোনাক পোকা,উই পোকা,পিপিলিকা আরও কত কিছুর নাম বললো কিন্তু কোনোটাইতো হলো না। এমনকি ওরা যে সব পোকার নাম বললো তার কোনো কোনোটার ইংরেজী নাম এতো কঠিন যে ওদের মধ্যেই অনেকে তা জানে না। তাহলে এমন কোন পোকা আছে যার ইংরেজী সবাই জানে। যারা কখনো বই পড়েনি,স্কুলে যায়নি তারাও জানে।

অনেক চেষ্টা করেও ওরা উত্তর পারলো না। নানু মুচকি হাসলেন। শর্ত পূরণ না হলে তিনি তার সিক্রেট বাকশো দেখাবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি তাতেই অটল থাকলেন। অনুভারা সবাই ফিরে আসলো। তারা বুদ্ধি আটলো আম্মু.বাবা.মামা.খালামি সবার সাহায্য নিবে। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। যাকেই জিজ্ঞেস করলো কেউ উত্তর দিতে পারলো না। নানু কি তাহলে ওদেরকে আজগুবী ভূয়া কোনো প্রশ্ন করেছে? আরিশা বললো সেটা সম্ভব না। কারণ নানু বলেছেন প্রশ্নটাও সহজ উত্তরটাও অনেক সহজ। কোথাও কোনো ভুল নেই। তার মানে হলো ছোট নানু কোনো মিথ্যা প্রশ্ন করেনি। আলভী ভাইয়ার কম্পিউটার আছে। সেখানে ইন্টারনেটও আছে। সে ইন্টারনেট সম্পর্কে খুব ভালো জানে। ওরা সিদ্ধান্ত নিলো আলভী ভাইয়াকে বলবে ইন্টারনেট থেকে উত্তর খুঁজে দিতে। সেদিন সন্ধ্যার পর আলভী ভাইয়ার রুমে গিয়ে হাজির হলো। বাইরে অন্ধকারে জোনাকীরা মিটমিট করে জ্বলছে আর নিভছে। কী সুন্দর দৃশ্য। অন্ধকার ফুড়ে আলোগুলো বেরিয়ে আসছে। ওরা আলভী ভাইয়াকে ছোট নানুর প্রশ্নটা বললো। সে তখন ইন্টারনেটে ওদের বলা কথা মত সার্চ করলো। কিন্তু কোনো উত্তর পেলো না। এখন তাহলে উপায় কী? ওরা হতাশ হয়ে যে যার রুমে চলে গেলো। দুদিন বাদেই ঈদ। তবে ঈদের আনন্দের চেয়ে ওদের মনের মধ্যে এখন একটাই ভাবনা যে করেই হোক ছোট নানুর প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতেই হবে। তারপর ছোটনানুর সেই সিক্রেট বাকশো দেখতে হবে।

মাঝরাতের দিকে অনুভার ঘুম ভেঙে গেলো। বড় আপুকে ডেকে তুললো। তার খুব পানির পিপাসা লেগেছে। পাশেই কিচেন রুমে পানি আছে কিন্তু অন্ধকারে একা যেতে ভয় লাগছে বলে অনুভা একা যেতে পারবে না। বাধ্য হয়ে ঘুম ঢুলুঢুলু চোখে উঠে বিছানায় বসলো অহনা। অহনা অনুভার বড় বোন। দুই বোন কিচেনে গেলো পানি পান করবে বলে। গ্রামের বাড়িতে চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কোথাও কোনো আলো নেই। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই মূলত মনে হয় গভীর রাত। আর রাতের খাবার খাওয়ার পরপরই সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। শহরের মানুষতো ঘুমায় না। রাত গভীর হলেও ঘুমায় না। পানি পান করে রুমে ফেরার পথে অনুভা থমকে দাড়ালো। বড় আপুকে বললো আপু এই যে একটা শব্দ শুনতেছ না? কেমন যেন কান ঝালাপালা ধরে যাওয়ার মত? এটা কিসের শব্দ? অনুভার কথা শুনে অহনা বললো আরে বুদ্ধু এটাতো ঝিঁঝি পোকা। অনুভা তখন বললো আপু ঝিঁঝি পোকার ইংরেজী কী? তখন অহনা বললো এই মাঝ রাতে ঝিঁঝি পোকার ইংরেজী জেনে কী হবে? এমনিতে তো ক্লাসের পড়া ঠিকমত পড়িস না। পড়তে বসলে ঘুমাস। বাহানা করিস। আর মাঝরাতে ঝিঝিঁ পোকার ইংরেজী জানার জন্য একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছিস।

অহনার মনে ছিল না গত কাল বিকেলে ছোট নানু কী শর্ত দিয়েছিল। অনুভা তখন মনে করিয়ে দিলো আরে আপু ছোট নানু যে প্রশ্ন করেছিল একটা পোকার কথা? এমন কি হতে পারে না যে এই ঝিঁঝি পোকাই সেই পোকা? তখন অহনা বললো আরে তাইতো। একদম ভুলে গিয়েছিলাম। ঝিঝিঁ পোকার ইংরেজী হলো ক্রিকেট। আর ক্রিকেট হলো একটা খেলা। কেউ বই পড়ুক বা না পড়ুক,স্কুলে যাক বা না যাক সবাইতো ক্রিকেট শব্দটা জানে। তার মানে সবাই ঝিঝিঁ পোকার ইংরেজী জানে। আর দেখ ঝিঝিঁ পোকার ডাক শুনলেও আমরা তাকে দেখতে পাচ্ছি না। মানে অধিকাংশ মানুষই ঝিঁঝি পোকা দেখে না। শুধু ডাক শোনে। সব কিছুতো মিলে গেলো। ছোট নানুর প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়ে মনের অজান্তে দুই বোন হুররে পেয়েছি বলে চিৎকার করে উঠলো। কিছু সময়ের জন্য ওরা ভুলেই গিয়েছিল যে এখন মাঝরাত আর সবাই ঘুমিয়ে আছে।

হঠাৎ ওদের এমন চিৎকার শুনে ছোট মামা ছুটে আসলেন। ছোট মামার রুম ওদের রুমের পাশেই। একটু পর আম্মু আর ছোট খালাও আসলেন। কী হয়েছে কী হয়েছে হাজারটা প্রশ্ন তাদের। অনুভা আর অহনা পড়লো মুশকিলে। কোনো ভাবেই ছোট নানুর প্রশ্নের বিষয়ে বলা যাবে না। ওরা বললো অন্ধকারে কী যেন একটা দেখলাম। এটা শুনে সবাই টর্চ লাইট দিয়ে চারদিক ভালোমত দেখলো। কিন্তু কিছু দেখা গেলো না। তারপর সবাই নিজ নিজ রুমে ঘুমাতে গেলো। বাকি রাতটা আর অনুভাদের ঘুম হলো না। তাদের ইচ্ছে করছিল এখনি গিয়ে ইররাম,আরিশা সহ সবাইকে ডেকে তুলে প্রশ্নের উত্তর জানাই। পরদিন সকালে সবাই জড় হলো। অনুভা বললো ছোট নানুর প্রশ্নের উত্তর জেনেছি। এটা শুনে বাকিরা খুব খুশি হলো আর বিস্মিত হলো। তারা তখনই উত্তরটা জানতে চাইলেও অনুভা এবং অহনা তা বললো না। ওরা বললো চল আগে ছোট নানুর কাছে যাই তারপর সেখানেই বলি। সবাই আবার দল বেঁধে গিয়ে হাজির হলো ছোট নানুর বাড়িতে। নানু তখন সকালের নাস্তা সেরে কোথাও যাবেন বলে রেডি হচ্ছেন। নাতিপুতির দল দেখে তিনি বললেন কিহে ফেল্টু বাহিনী আজ আবার কোন মতলবে আসলে? অহনা বললো নানু ভাই আমাদেরকে কোনো ভাবেই ফেল্টু বাহিনী বলবা না। আমরা তোমার প্রশ্নের উত্তর জানি। উত্তর দেওয়ার জন্যই এসেছি। ওরা প্রশ্নের উত্তর বলার আগেই নানু ভাই বললেন কিন্তু গতকালকের প্রশ্নের উত্তর আজকে দিলেতো হবে না। উত্তর সাথে সাথে দেওয়া চাই। একদিন পরে দেওয়া মানে তোমরা নকল করেছ। কোনো নকল চলবে না। নকল আর হবে না? পড়তে হবে বুঝছো? নানুর কথা শুনে ওরা কিছুটা হতাশ হলো। অনুভা বললো নানু এটা চিট করলে তুমি। প্রশ্ন করার আগেতো তুমি কোনো শর্ত দাওনি যে সাথে সাথে উত্তর দিতে হবে।

অনুভার কথায় যুক্তি আছে। আর ছোট নানু কখনো যুক্তি দিয়ে কথা বললে তা অবহেলা করেন না। তিনি বললেন ঠিক আছে এবার তোমরা উত্তরটা বলো আর কিভাবে উত্তর খুঁজে পেলে সেই গল্প বলো। ওরা তখন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার পুরো গল্পটা বললো। ছোট নানু খুব মুগ্ধ হলেন। তিনি বললেন উত্তর সঠিক হয়েছে। এটা শুনে সবাই ইয়াহু। বলে উল্লাস করলো। এবার অন্তত ছোট নানুর সেই বাকশোতে কী আছে দেখা যাবে। কিন্তু ছোট নানু বললেন আমিতো বাজারে যাবো। ফিরে এসে সন্ধ্যার পর তোমাদেরকে দেখাবো ওই বাকশে কি আছে। অনুভাদের যেন তর সইছিলো না। ওরা চাচ্ছিল তখনই দেখতে। কী আর করা ওদেরকে অপেক্ষা করতেই হবে। ওরা ফিরে গেলো আর নানু সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো। ওরা ছোট নানুর বাড়িতে হাজির। কিন্তু গিয়ে শুনলো ছোট নানু ফিরে আসেনি। ওরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো। তবুও নানুর ফেরার নাম নেই। শেষে ওরা ফিরে আসলো। সবার মন খারাপ তাছাড়া ছোট নানুর উপর রাগও হলো।

অহনা ওদেরকে বুঝালো বড় মানুষের কত রকম কাজ থাকে,দায়িত্ব থাকে। তাই হয়তো ছোট নানু কোথাও আটকা পড়েছেন বলে ফিরতে দেরি হচ্ছে। পরদিন না হয় যাওয়া যাবে। রাতের খাবার খেয়ে ওরা যে যার মত ঘুমিয়ে গেলো। পরদিন সকালে সোরগল পড়ে গেলো। ছোট নানুকে পাওয়া যাচ্ছে না। গতকাল সেই যে বেরিয়েছে আর ফিরে আসেননি। পুরো জেলা তন্নতন্ন করে খোঁজা হলো কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া গেলো না। ছোট নানুর গায়েব হয়ে যাওয়াটা সবার কাছে রহস্যজনক মনে হলো। থানায় জিডি করা হলো। অনুভাদেরও মন খারাপ। ছোট নানুর বাকশোতে কি আছে সেটা দেখতে না পাওয়ার দুঃখ ছিল এখন সেই দুঃখ চারগুন বেড়ে গেলো। ছোট নানুকে খুঁজে পাওয়া না গেলে এবারের ঈদ আর ঈদ থাকবে না। বাড়ির বড়রা সারাদিন রাত ছোটনানুর সন্ধ্যানে চারদিক চষে বেড়ালো। কিন্তু তার কোনো সন্ধ্যান মিললো না। ঈদের দিনটাও কাটলো সবার খুবই দুঃখ নিয়ে।

এক সপ্তাহ পর অনুভারা ফিরে আসলো শহরে। ওর কাজিনরাও যে যার মত নিজেদের বাড়িতে চলে গেলো। অপূরণীয় রয়ে গেলো অনুভাদের ইচ্ছে। আর কোনোদিন অনুভারা ওদের ছোট নানুকে দেখবে কি না তাও জানে না। পত্রিকায় ছবি সহ হারানো বিজ্ঞাপন দেওয়া হলো। সাথে মোবাইল নাম্বার দেওয়া হলো যেন কেউ সন্ধ্যান পেলে জানাতে পারে। এক মাস দু মাস করে দশ বছর পেরিয়ে গেলো কিন্তু ছোট নানুকে আর পাওয়া গেলো না। তিনি আর ফিরে আসলেন না। তিনি আর কোনো দিন ফিরে আসবেন কেউ তা আশাও করলো না। ততোদিনে অনুভারাও ছোট নানুর সেই বাকশোর কথা ভুলে গিয়েছে। কাঠের একটা বাকশো। বিক্রি করলে তেমন বেশি দামও হবে না। প্রায় দশ বছর পর মিলন মামা মানে ছোট নানুর ছোট ছেলে বাড়িতে বড় বিল্ডিং দিলেন।

সেই বিল্ডিংএ নতুন নতুন আধুনিক ফার্নিচার আনলেন। তখন পুরোনো কাঠের সাদামাটা জিনিসগুলো বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কী একটা কারণে যেন সেই সময়ে অনুভারাও নানা বাড়িতে ছিল। ঘুরতে ঘুরতে ছোট নানুর বাড়িতে গিয়ে হাজির হলো। দেখলো পুরোনো আসবাব গুলো বাড়ির উঠনে নামিয়ে রাখা হয়েছে। সেই আসবাবের মধ্যেই ছোট নানুর সেই বাকশোটা চোখে পড়লো। অনুভার হঠাৎ পুরোনো দিনের কথা মনে পড়লো। সেতো আর তখন আগের মত ছোট্ট মানুষটি নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছে। বড় আপু পড়াশোনা শেষ করে লন্ডনে চলে গেছে। অবশ্য যাওয়ার আগে আবির ভাইয়ার সাথে তার বিয়েও হয়েছে। আবির ভাইয়া লন্ডনেই সেটেলড। আপুও তাই সেখানেই থাকছে। ছোট নানুর সেই বাকশোটা চোখে পড়তেই দ্রুত পায়ে সেটার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কোনো তালা দেওয়া নেই। হাত দিয়ে অনুভা বাকশোর ঢাকনাটা তুলে ধরলো। ভেতরটা একদম ফাঁকা। অথচ নানু থাকতে ওটা সব সময় তালা দেওয়া থাকতো।

অনুভার মনে একটা প্রশ্ন জাগলো নানুর ওই বাকশোর মধ্যে আসলে কী ছিল? নানু যেহেতু নেই তাহলে সেটা কেউ না কেউতো খুলেছে। আর ওর ভিতরে যা কিছু ছিল তা বের করে নিয়েছে। সে তাই মিলন মামার কাছে গিয়ে হাজির হলো। অনুভাকে দেখে মিলন মামা খুশি হলেন। অনেক দিন পর দেখা। মিলন মামা প্যারিসে থাকতেন। দীর্ঘ সময় সেখানেই ছিলেন। এমনকি ছোট নানু যেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসেননি তখনও মিলন মামা প্যারিসে থাকতেন। বাবার হারিয়ে যাওয়ার সংবাদ শুনে তিনি অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন। বাবাকে যে আর কখনো ফিরে পাওয়া যাবে না তা তিনি কল্পনাও করেননি। তাছাড়া সবচেয়ে বড় আফসোসের বিষয় হলো ছোট নানুর কী হয়েছিল,কোথায় হারিয়ে গেলেন তার রহস্য কেউ আজও ভেদ করতে পারেনি। অনুভাকে বসতে বললেন। তারপর হালচাল জিজ্ঞেস করলেন। কথার এক ফাঁকে অনুভা জানতে চাইলো মামা নানুর যে বাকশোটা উঠোনে রাখা আছে ওটাতো নানু বেঁচে থাকতে সব সময় তালা দেওয়া থাকতো। চাবিটাও তার কাছে থাকতো। ওটার ভিতরে এমন কিছু ছিল যা অন্য কেউ জানতো না।

তারপর সে সেই দিনের গল্পটা যতটুকু মনে ছিল জানালো। তখন মিলন মামা বললেন বাবা ছিলেন সৌখিন মানুষ। নানা জিনিস সংগ্রহ করতেন। তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে বাংলাদেশ জাতীয় যাদুঘর আছে না? ওখানে যেমন অনেক জিনিস আছে। তেমনি বাবাও নানা জিনিস সংগ্রহ করতেন। আর যারা এসব সংগ্রহ করে তাদেরকে বলে কিউরেটর। অনুভার মনে পড়লো সেই লাস্ট দিন নানুর হাতে একটা বই দেখেছিল “ দ্য কিউরেটর” নামে। লেখকের নাম জানা নেই। তখন অনুভা বললো নানুর হাতে একটা বই দেখেছিলাম “ দ্য কিউরেটর” কোনো একজন বিদেশীর লেখা মনে হয়। বিদেশীর কথা শুনে মিলন মামা হাসলেন। তিনি বললেন বইটা আসলে বাবার নিজের লেখা! তিনি ছদ্ম নামে বই লিখতেন। মামার কথা শুনে অনুভা চমকে উঠলো। তার ছোট নানু লেখক ছিলেন! মিলন মামা অনুভাকে নিয়ে লাইব্রেরী রুমে ঢুকলেন। নতুন বিল্ডিংএর একটা রুমকে লাইব্রেরী বানিয়েছেন। মেঝে থেকে ছাদ পযর্ন্ত বই আর বই। কত হাজার বই আছে তা অনুভা কল্পনাও করতে পারে না। এই সব বই ছোট নানুর সংগ্রহ করা। মিলন মামা তা খুব যত্ন করে রেখেছেন। বাবা নেই তাই এই বইগুলোই বাবার স্মৃতি হয়ে থেকে গেছে।

মিলন মামা অনুভাকে সব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন। অনুভা যে বইটির কথা বললো সেটিও তাক থেকে নামিয়ে দেখালো। সেটার বেশ কয়েকটি কপি আছে লাইব্রেরীতে। লেখকের নামটি বিদেশী হলেও অনুভার কাছে বেশ পরিচিত । এই লেখকের অনেক বই সে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর মূলত এই লেখকের নাম জেনেছে। ফিজিক্সের অধ্যাপক আহমেদ ইশতিয়াক স্যার একদিন কোয়ান্টাম ফিজিক্স পড়ানোর সময় রেফারেন্স হিসেবে এই লেখকের কিছু তত্ত্ব উপস্থাপন করেছিলেন। অনুভার বেশ মনে আছে ইশতিয়াক স্যার বলেছিলেন এই লেখক অনেক বিখ্যাত। তবে দুঃখের বিষয় হলো তিনি হঠাৎ করে হারিয়ে গেছেন। কোথাও আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনুভার বেশ মনে আছে সেদিন ইশতিয়াক স্যারের কথা শুনে ওর ছোট নানুর কথাও মনে পড়েছিল। ছোট নানুওতো হঠাৎ হারিয়ে গেছেন। আর কোনোদিন ফিরে আসেননি। আর তাকে খুজেঁ পাওয়া যায়নি। মানুষ মারা গেলেও অন্তত তার কবর থাকে। বলা যায় এইতো আমার প্রিয়জন এখানে ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু ছোট নানু যেভাবে হারিয়ে গেলেন তাতে কোথাও তাকে আর অনুভব করার সুযোগ নেই। সেদিন ইশতিয়াক স্যার যার কথা বলেছিলেন, যে লেখকের কথা বলেছিলেন তিনিই যে অনুভার ছোট নানু তা সে কল্পনাও করেনি। এমনকি আজকে মিলন মামার সাথে কথা না হলে হয়তো কোনোদিনই জানা হতো না। কেননা তার লেখা বইয়ে তার কোনো ছবি ছিল না। ইশতিয়াক স্যার যে কয়টা বইয়ের রেফারেন্স দিয়েছিলেন অনুভা নীলক্ষেত থেকে তা কিনে এনে পড়েছে। একাডেমিক তুখোড় সব বই। কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে এতো অসাধারণ বই আর কেউ লিখেছে বলে তার মনে হয় না। সেই লেখক যে তার ছোট নানু তা জানতোই না অনুভা।

মিলন মামার কথা শুনে ধপ করে সে সোফায় বসে পড়লো। হাতে তখন ছোট নানুর লেখা বই “ দ্য কিউরেটর”। কিছুক্ষণের জন্য সে পাতা উল্টাতে ভুলে গেলো। একটি মানুষ কতটা সাদামাটা হলে এতো বিখ্যাত লেখক হয়েও এমন আড়ালে থাকা যায় সেটা অনুভা ভাবতেই পারছে না। পরক্ষণেই মিলন মামার ডাকে সে সম্বিত ফিরে পেলো। বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে অনুভা মিলন মামাকে প্রশ্ন করলো আচ্ছা মামা নানুর যে বাকশোটাতে সব সময় তালা মারা থাকতো সেটার মধ্যে কী কী ছিল? অন্য একটি সোফাতে বসতে বসতে মিলন মামা জানালেন বাবার অনেক অদ্ভুত শখ ছিল। বাবা বিভিন্ন জিনিস সংগ্রহ করতেন। সেগুলোতে ঠাসা ছিল। কৌতুহলী হয়ে অনুভা জানতে চাইলো সেই সংগ্রহ করা জিনিসগুলো কোথায়? মিলন মামা তখন ওকে বললেন সবই আছে। আয় তোকে দেখাই। এরপর দক্ষিণ সাইডের দেয়ালের দিকে থাকা বুকশেলফ ধরে টান দিলেন। যে দৃশ্যটা অনুভা দেখলো সেটা এর আগে সে শুধুমাত্র সিনেমাতে দেখেছে। বইয়ের আলমারির একটা অংশ দরজার মতে সরে আসলো। সিক্রেট ডোর যেটাকে বলে। ওপাশে সুন্দর একটা চমৎকার রুম। আলো ঝলমল করছে। মূলত এমনিতে অন্ধকার থাকে। কিন্তু দরজা খুলতেই আলো জ্বলে ওঠে। সেখানে পুরো রুমটা একটা মিনি মিউজিয়ামের মত। কত শত জিনিস যে সেখানে আছে। ছোট নানু সব সংগ্রহ করেছিলেন।

ছোট্ট রুমটার মাঝখানে একটা বড় টেবিলের মত আছে। ঠিক জাতীয় যাদুঘরে ঢুকতেই সিড়ির সামনে প্রথম রুমটাতে যেমন বিরাট একটা টেবিলের উপর বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা। বোতাম চাপলেই নির্দিষ্ট জেলাতে আলো জ্বলে ওঠে। ঠিক তেমন একটা টেবিল এখানেও সেট করা আছে। তবে এই টেবিলটা ছোট। আর এটার উপর কোনো মানচিত্র নেই বরং বান্ডেল বান্ডেল টাকা। অনুভা ঘুরে ঘুরে সবগুলো টাকা দেখলো। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে যত রকম নোট বেরিয়েছে সবগুলোর একটা করে বান্ডেল আছে। ব্যাংক থেকে যেভাবে সিনক্র্যাপ করা থাকে সেরকমই আছে। মামা জানালেন এগুলোকে ইউএনসি নোট বলে। যেগুলো সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে সরাসরি সংগ্রাহকের কাছে চলে এসেছে। এগুলো কখনো লেনদেন হয়নি। অনুভা অনুমান করে দেখলো সেখানে অনেক টাকা আছে। এই টাকা গুলো ঠিকমত ব্যবহার করলে নানু অনেক কিছু করতে পারতেন। ছোটবেলায় দেখেছে অনুভার নানুর বাড়িতে বিল্ডিং উঠেছে। গাড়ি কিনেছে। কিন্তু ছোট নানু কখনো তেমন কিছু করেননি।

নানুর সংগ্রহে থাকা টাকার একটা ছবি তুলে নিলো অনুভা। পরে এগুলো নিয়ে ভাবতে পারবে। তারপর মিলন মামার সাথে সে ঘুরে ঘুরে বাকি সব কিছু দেখলো। দেখা শেষ হলে বেরিয়ে আসলো। লাইব্রেরী রুমের সোফায় বসে অনুভা মিলন মামাকে আরও অনেক কিছু প্রশ্ন করলো। জানতে চাইলো আচ্ছা মামা নানু যে এতো কিছু সংগ্রহ করতেন তা তোমরা কি ছোট বেলা থেকেই জানতে? মিলন মামা জানালেন ছোট বেলায় তারা নানুকে অনেক ভয় পেতো। তাছাড়া নানু যা কিছু সংগ্রহ করেছেন তা কখনো মামাদেরকে দেখাতেন না। আসলেইতো এগুলো দেখালে সবাইতো নিতে চাইতো। তারপর অনেক অনেক গল্প হলো নানুকে নিয়ে। অনুভা অবাক হয়ে মুগ্ধ হয়ে সব শুনতে লাগলো। সবচেয়ে বেশি বিস্মিত হলো এটা জেনে যে ছোট নানু যে এতো এতো বই লিখেছে এটা মিলন মামারাও কেউ জানতো না। মূলত ছোট নানু সেই যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফিরে এলেন না তারপর কয়েক বছর কেটে যাওয়ার পর পারিবারিক ভাবে সিদ্ধান্ত হলো নানুর সেই বাকশোটার তালা ভাঙ্গা হবে। অবশ্য অন্য একটা কারণও ছিল। মূলত একটা জমির বিষয়ে মিমাংসা করতে গিয়ে জমির মূল দলিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সবার ধারণা হলো দলিল হয়তো ওই বাকশোটার মধ্যে আছে। তাই তালা ভাঙ্গা হলো। ছোটবেলায় অনুভাদের যেমন খুব আগ্রহ ছিল ওই বাকশোটার বিষয়ে তেমনি অন্যদেরও আগ্রহ ছিল। অনুভারা ছোট ছিল বলে সেটা প্রকাশ করেছিল। বড়রা কেউ প্রকাশ করেনি। যেদিন বাকশোটার তালা ভাঙ্গা হলো সেদিন উৎসব জমে গিয়েছিল। অবশ্য অনুভারাই শুধু থাকতে পারেনি। তালা ভাঙ্গার পর দেখা গেলো সেখানে কোনো দলিল নেই বরং আছে রাজ্যের সব হাবিজাবি জিনিসপত্রে ঠাসা।

সাধারণ যে কারো কাছে ওই সব জিনিস একদম হাবিজাবি বলেই মনে হবে। কিন্তু ছোট নানু যেহেতু যত্ন করে রেখেছে তাই ওগুলো মামুলি কিছু হবে না এটাই সত্যি। ওর মধ্যে বিভিন্ন সময়ের ওই নোটগুলোও ছিল। ততোদিনে প্যারিস থেকে মিলন মামা ফিরে এসেছেন। বিস্তর টাকা পয়সা ইনকাম করেছেন। মামা যেহেতু প্যারিসে ছিলেন তাই মাঝে মাঝেই ল্যুভর মিউজিয়ামে যেতেন। প্যারিস হলো শিল্প সংস্কৃতির জন্য পৃথিবী বিখ্যাত শহর। ল্যুভর মিউজিয়ামেই পৃথিবীর সবচেয়ে দামী দামী চিত্রকলা সংরক্ষিত আছে। যার মধ্যে সবচেয়ে নামকরা চিত্রকর্মের নাম মোনালিসা। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা বিখ্যাত ছবি। তাই সংগ্রহ বিষয়ে কিছু ধারণা তৈরি হয়েছিল মিলন মামার মধ্যে। সেই বাকশোর মধ্যেই ছোট নানুর একটা ডায়েরিও পাওয়া গিয়েছিল। সেখানে খুটিনাটি অনেক কথা লিখে রাখতেন। সেখানে সর্বশেষ যে পাতাটি ছিল তাতে অনুভাদের কথাও লেখা ছিল। বাচ্চারা বাকশোতে কী আছে সেটা দেখতে চেয়েছে আর তিনি তাদেরকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছেন। বাচ্চারা উত্তর পারেনি। তিনি অবশ্য আরও লিখেছেন বাচ্চারা হয়তো কালকে আবার আসবে সঠিক উত্তর নিয়ে। এর পর আর কিছু লিখতে পারেননি। কারণ সেদিনইতো তিনি হারিয়ে গেছেন। ডায়েরিতে আরও অনেক কিছু লেখা ছিল। তার মধ্যে একটা পৃষ্ঠায় লেখা ছিল তার লেখা পান্ডুলিপি বিষয়ে। তিনি লিখেছিলেন আমি কোয়ান্টাম ফিজিক্সের উপর বেশ কিছু বই লিখেছি। প্রকাশ করা হয়নি। তবে ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে তা প্রকাশ করবো। আর যদি সুযোগ না পাই তাহলে আমার পরবর্তী বংশধররা যেন তা প্রকাশ করে। সেই অংশটুকু পড়ে মিলন মামা অবাক হয়েছিলেন যে তার বাবা বই লিখেছে। তারপর তিনি বাকশোর মধ্যে আরেকটা ছোট বাকশো পেলেন। সেটার মধ্যেই ছিল অনেক গুলো পান্ডুলিপি। মিলন মামা কমার্সের ছাত্র ছিল। ফলে ফিজিক্স বিষয়ে তার তেমন ধারণা ছিল না। একদিন তিনি স্কুলের বিএসসি টিচারের কাছে সেই পান্ডুলিপি গুলো নিয়ে গেলেন। টিচার সেগুলো দেখে  তিনি বললেন এগুলো এতো উচ্চমানের বিষয় যে তিনি কিছুই বুঝতে পারবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের দেখাতে পারলে ভালো হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদেরকে কিভাবে দেখাবে? তারতো কারো সাথে পরিচয় নেই। তখন তার মনে পড়লো মেহরাবের কথা। মেহরাব তারই বন্ধু। একসাথে পড়াশোনা করেছে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে শিক্ষক হিসেবে জয়েন করেছে। মেহরাবের ফোন নাম্বার তার কাছেই ছিল। সাথে সাথে সে ফোন করে বিস্তারিত জানায়। মেহরাব শুনে অবাক হয়। তারপর তাকে পান্ডুলিপি গুলো নিয়ে ঢাকায় যেতে বলে। তাহলে সে সাথে থেকে সিনিয়র কোনো প্রফেসরের সাথে দেখা করে আলোচনা করে দেখবে। মেহরাব তাকে জানায় আজই সে প্রফেসর হারুনুর রশীদ স্যারের সাথে কথা বলে রাখবে। প্রফেসর হারুনুর রশীদ স্যার নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী প্রফেসর আবদুস সালামের সাথেও কাজ করেছেন। হারুনুর রশীদ স্যার নিজেও কোয়ান্টাম ফিজিক্সের উপর বই লিখেছেন। একটি বই লেখার সময় টাইপিংএর বিষয়ে মেহরাব হারুনুর রশীদ স্যারকে সহযোগিতা করেছিল। বইটার নাম ছিল “ কণা জ্যোতি পদার্থ বিজ্ঞান”। বুয়েটের ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী স্যার মূলত মেহরাবকে হারুন স্যারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। যেহেতু আগে থেকেই পরিচয় আছে তাই স্যারের সাথে কথা বলা সহজ হবে। মেহরাবের কাছ থেকে এতো কিছু জানার পর আর অপেক্ষা না করে পরের সপ্তাহেই মিলন মামা পান্ডুলিপি সহ হাজির হলেন মেহরাবের ফুলার রোডের বাসায়। হারুনুর রশীদ স্যার থাকেন ধানমন্ডিতে নিজের বাসায়। মেহরাব মিলন মামাকে সাথে নিয়ে সেখানে গেলেন। পান্ডুলিপিগুলো হাতে নিয়ে একটু নেড়েচেড়ে দেখে স্যার বললেন রেখে যাও। আমি সময় করে দেখে জানাবো।

মিলন মামা অবশ্য মূল পান্ডুলিপি না নিয়ে ফটোকপি করে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফলে সেটা রেখে আসতে তার কোনো অসুবিধা হলো না। দুদিন ঢাকা শহর ঘুরে ফিরে বাড়ি চলে আসলেন। এর ঠিক এক সপ্তাহ পর মেহরাবের ফোন। সে ভীষণ উত্তেজিত। মিলন মামাকে জানালেন সাংঘাতিক বিষয় ঘটে গেছে। প্রফেসর হারুনুর রশীদ স্যার তোমার বাবার লেখা পান্ডুলিপি পড়ে বিস্মিত হয়েছেন। হতবাক হয়েছেন। কোয়ান্টাম ফিজিক্সের অনেক জটিল বিষয়,অমিমাংসিত বিষয় কত সহজে সমাধান করে রেখেছেন। তিনি চান তোমার বাবার সাথে দেখা করতে।

মেহরাবের সাথে মিলন মামার দীর্ঘ দিন দেখা হয়নি। প্যারিস চলে যাওয়ার পর থেকে আর যোগাযোগও হয়নি। তাই মেহরাব জানতেও পারেনি যে মিলন মামার বাবা মানে অনুভার ছোট নানু একদিন বাজারে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর কোনোদিন ফিরে আসেনি। তিনি কোথায় গেলেন কী হলো পৃথিবীর কেউ কিছু জানতে পারেনি। যেহেতু মেহরাব জানতো না তাই সে বললো প্রফেসর হারুনুর রশীদ স্যার যেহেতু দেখা করতে চান তাই তুমি যত দ্রুত সম্ভব তোমার বাবাকে সাথে করে অরিজিনাল পান্ডুলিপি সহ ঢাকায় চলে আসো। আমার বাসায় এসে ওঠো। যে কয়দিন থাকা দরকার থাকো। মেহরাব এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে থামার পর মিলন মামা সেদিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো বাবাতো কয়েক বছর আগেই নিখোঁজ হয়েছেন। অল্প কথায় যতটুকু বলা যায় সেটা বললেন। শুনে মেহরাব খুব দুঃখ বোধ করলো। সমবেদনা জানিয়ে বললো তাহলে তুমি নিজেই আসো। পরের সপ্তাহে মূল পান্ডুলিপি নিয়ে হাজির হলেন মিলন মামা।

প্রফেসর সাহেব দীর্ঘ সময় তার মুগ্ধতা প্রকাশ করলেন। তার কথা থেকে মিলন মামা বুঝতে পারলেন তার বাবা যা কিছু লিখে গেছেন সেটি শুধু সাধারণ কোনো বই না বরং সারা বিশ্বের ফিজিক্সের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য অমূল্য সম্পদ। এগুলো সব বই আকারে প্রকাশ হওয়া জরুরী।সেদিন মিলন মামা আর মেহরাব ছাড়াও আরও একজন উপস্থিত ছিলেন। প্রফেসর ডক্টর হারুনুর রশীদ স্যারই পরিচয় করিয়ে দিলেন। ইনি হলেন মিস্টার শাহনেওয়াজ আহমেদ। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের কর্ণধার। তোমার বাবার লেখা বইগুলোর সবগুলোই তিনি প্রকাশ করবেন। এর পর সে দিনই কিছু চুক্তিপত্রে সাইন করে পান্ডুলিপিগুলোর ফটোকপি দিয়ে আসলেন। দুই মাস পর প্রথম বইটি প্রকাশ হলো। প্রকাশের পর পরই বিজ্ঞান প্রেমীদের মাঝে হৈচৈ পড়ে গেলো। প্রফেসর ডক্টর হারুনুর রশীদ স্যার নিজ উদ্যোগে বইয়ের কপি পৃথিবীর নামি দামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠালেন। বিশ্বের বাঘাবাঘা প্রফেসররা সেই বই পড়ে হতবাক হয়ে গেলো।

লাইব্রেরী রুমে বসে এতোক্ষণ মিলন মামার মুখেই এসব গল্প শুনছিল অনুভা। এর মাঝে ঘন্টা পেরিয়ে গেছে। শিউলির মা চা দিতে আসলে ওরা গল্প থামালো। অনুভার মনে হলো এই গল্পটা অনেক লম্বা। অনেক কিছু জানার আছে। অনেক কিছু প্রশ্ন করার আছে। চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে সে চুমুক দিল। খুব সুন্দর চা করেছে শিউলির মা। অনুভার চেয়েও বয়সে ছোটই হবে সে। অথচ তাকে শিউলির মা বলতে হচ্ছে। তার নিজের নামটাও আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার পর সন্তান হয়ে এখন সে সন্তানের নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। অবশ্য অনুভাও জানে মেয়েরা মা হওয়ার পর তাদের নিজেদের নাম একটু একটু করে হারিয়ে যায়। যেমন অনুভার মাকে মানুষ অহনার মা বলে ডাকতো। ছোটবেলায় এসব শুনলে অনুভার খুব রাগ হতো। সে ভাবতো মা কি শুধু অহনার? তার কি মা না? তাহলে লোকে কেন শুধু অহনার মা বলে ডাকে? অনুভার মা বলতে সমস্যা কোথায়? অনুভা এখন বোঝে যে, আসলে প্রথম সন্তানের নামেই বাবা মাকে মানুষ সম্মোধন করতে বেশি পছন্দ করে। অভ্যাসও হয়ে যায়।

মামার কথা শুনে বুঝলো নানুর হারিয়ে যাওয়ার পরই মূলত তার লেখা বইগুলো প্রকাশ হয়েছে। এ কারণেই নানু যে এতোটা বিখ্যাত তা অনুভারা কখনো জানতে পারেনি। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কত কিছু মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেলো। হঠাৎ একটা কথা তার মনে পড়লো। সে মামাকে আবার প্রশ্ন করলো। আচ্ছা মামা তুমি যে বললে নানু উধাও হয়ে যাওয়ার পর তুমি নিজে দায়িত্ব নিয়ে তার লেখা বইগুলো প্রকাশ করেছ। তাহলে আমরা যে ছোটবেলায় নানুর হাতে “দ্য কিউরেটর” বইটি দেখেছিলাম যেটা এখন এই যে টেবিলের উপর রাখা। বইয়ের উপরে নানুর নাম লেখা। তাহলে এই বইটা কিভাবে নানুর নামে হলো? তখন মিলন মামা বললেন বইটার আর কোনো কপি নেই। এই একটা কপিই এখানে আছে। বাবা নিজে টাকা খরচ করে বইটার কয়েকটা কপি ছাপিয়েছিলেন। কাকে কাকে যেন সৌজন্য কপি দিয়েছিলেন আর একটা নিজের কাছে রেখেছিলেন। এটা ছিল বাবার শখ। আমরা তখন ছোট ছিলাম তাই অতোটা বুঝিনি। বইটার পাতা উল্টে দেখো এটা প্রকাশ হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। অনুভা হাত থেকে চায়ের পেয়ালাটা নামিয়ে রেখে বইটা আবার হাতে নিলো। মামা যা বলেছে সেটাই সত্যি। কোনো প্রকাশনীর নাম নেই। আর প্রকাশ সাল হিসেবে ১৯৭৯ সাল লেখা আছে।

এই বইটি চমৎকার। ছবি আর লেখায় ভরপুর। এমন অনেক অনেক জিনিসের ছবি আর বিবরণ আছে এখানে যা অনুভা একটু আগে নানু ভাইয়ের সংগ্রহশালাতে দেখেছে। প্রতিটি জিনিসের ছবি আর সেই সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ লেখা আছে। অনুভা তখন বললো মামা তাহলেতো এই বইটার নতুন করে ছাপানো উচিত। মিলন মামা ওর কথার সাথে একমত হলেন। তিনি বললেন খুব শীঘ্রই প্রকাশনীতে কথা বলবেন।

সেদিনের মত ছোট নানুর বাড়ি থেকে চলে আসলো অনুভা। নিজের নানা বাড়িতে আসার পর তার মনে হলো নানার সাথে এ নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। কাচারি ঘরে বসে নানু ভাই আরাম করছিলেন। অনুভা সেখানে গিয়ে হাজির হলো। ওকে দেখে তিনি সোজা হয়ে বসলেন। জানতে চাইলেন এতোক্ষণ কোথায় ছিলে? দেখলাম না তোমাকে। অনুভা তখন বললো মিলন মামার সাথে গল্প করলাম। তারপর ছোট নানুর সংগ্রহশালা আর লেখালেখি নিয়ে কথা বললো। ওর কথা শুনে নানু ভাই বললেন ছোটর আসলে তেমন বোধ বুদ্ধি ছিল না। ১৯৭৮ সালে যখন নতুন দশ টাকার নোট বাজারে আসলো তখন ঈদের সময় বাবা ওকে আর আমাকে এক বান্ডেল করে ১০ টাকার নোট দিয়েছিল। ও সেই টাকা কোনোদিন খরচ করেনি। সেভাবেই রেখে দিয়েছে। আর আমি সেই টাকা জমিয়ে রাখিনি। নানার কথা তখনো শেষ হয়নি। অনুভা বললো ছোট নানুতো ভালোই করেছে। টাকাগুলো এখনো সেভাবেই জমানো আছে। তুমিতো জমিয়ে রাখতে পারোনি বরং খরচ করে ফেলেছ। তাহলে তুমি ছোটনানুকে কেন বোকা বলছো?

অনুভার নানা ওর কথা শুনে একটু হাসলেন। তারপর বললেন আমি সেই টাকাতো খেয়ে ফেলিনি। সেই সময় প্রতি শতাংশ জমির দাম ছিল মাত্র ৩০০ টাকা। আমি বাবার দেওয়া ১০ টাকার সেই বান্ডেলে থাকা এক হাজার টাকা দিয়ে সাড়ে তিন শতক জমি কিনেছিলাম। সেই জমি থেকে বছর ধরে ফসল ফলেছে। সেই ফসল বিক্রি করে টাকা জমিয়ে আমি আরও জমি কিনেছি। এভাবেই একটু একটু করে নিজের টাকায় অনেক জমি কিনেছি। এই যে আমার এখন অনেক জমিজমা এগুলোর অধিকাংশই আমার নিজের বুদ্ধিতে কেনা। বাবার দেওয়া সেই টাকার সঠিক ব্যবহারের ফসল এগুলো। সেই সময় স্বর্ণের দাম ছিল প্রতি ভরি মাত্র সাড়ে আটশো টাকা যা এখন দুই লাখ টাকা। ও যদি ওই টাকা দিয়ে এক ভরি স্বর্ণও কিনতো তাও আজকে তা দুই লাখ টাকা দাম হতো। কিন্তু ও সেই টাকাগুলোই রেখে দিয়েছে। তোমার একটা মুরগি আছে। সেই মুরগিতে ডিম দেয়। এখন ডিমগুলো যদি সব তুমি ফ্রিজে রেখে দাও তা থেকে কি কখনো বাচ্চা হবে? হবে না। সঠিক নিয়মে এগোতে হবে। ঠিক একই ভাবে টাকাও সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে না পারলে তা বৃদ্ধি পায় না।

নানুর কথা গুলো শুনে সাময়িক ভাবে অনুভারও মনে হলো ছোট নানুতো আসলেই বোকামি করেছে। জমি কিনলে সেটা একটু একটু করে বৃদ্ধি পেতে পেতে কত সম্পদ হয়ে উঠতে পারতো। নানুর সাথে আরও অনেক গল্প করে উঠে পড়ে অনুভা। এখন আর এ নিয়ে সে ভাবতে চায় না। ছুটি শেষ হয়ে এসেছে। তাকে আবার ফিরতে হবে ক্যাম্পাসে। কিছুদিন আগে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে আবেদন করেছে। এখনো কোনো রেসপন্স পায়নি। যদি ফুল স্টাইপেন্ড পায় তবে শিকাগোতে চলে যাবে। তার খুব ইচ্ছে বিদেশে পড়তে যাওয়ার। অবশ্য বড় আপু ওদের ওখানে যেতে বলেছিল কিন্তু অনুভার ইচ্ছে শিকাগোতে পড়ার।গ্রামে  ইন্টারনেটের অবস্থা খুবই দুর্বল তাই সে মেইলও ঠিকমত চেক করতে পারছে না।

ক্যাম্পাসে ফিরে আসার পর এক সকালে ঘুম থেকে উঠে ল্যাপটপ অন করে মেইল খুলতেই অনুভা দেখলো ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো থেকে ওকে মেইল পাঠিয়েছে। ওর একটা ইন্টারভিউ করতে চায়। যদি সব ঠিক ঠাক থাকে তাহলে ও আন্ডারগ্রাজুয়েট প্রোগ্রামে ফুল স্টাইপেন্ড সহ ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে পড়তে যেতে পারবে। মেইলটা দেখে অনুভার এতো আনন্দ হলো যে জীবনে এর চেয়ে বেশি আনন্দিত আগে কখনো হয়নি। মেইলের ভাষ্য অনুযায়ি ১৫ই মে ওর ইন্টারভিউ নেওয়া হবে। ইন্টারভিউ হবে জুমের মাধ্যমে। হাতে আছে আর চারদিন। এর মধ্যে তাকে বেশ প্রস্তুতি নিতে হবে। সাম্ভাব্য প্রশ্ন আর উত্তর খুঁজতে হবে। সে প্রথমেই আম্মুকে ফোন করে জানালো যে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো থেকে মেইল এসেছে। ১৫ই মে তার ইন্টারভিউ। শুনে মা খুব খুশি হলেন। তিনি বিশ্বাস করেন অনুভা ইন্টারভিউতে ভালোভাবেই পাশ করবে। অবশ্য তার আনন্দের সাথে সাথে একটু দুঃখও হলো। বড় মেয়েটা চলেগেছে দেশের বাইরে। এবার ছোট মেয়েটাও চলে যাবে। সে আাবার একা হয়ে যাবে। কিন্তু বাবা মা সব সময় সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যত কামনা করে। তাই অনুভা বিশ্ব বিখ্যাত ইউনিভার্সিটিতে সুযোগ পেলে সেটাতো আসলে তারই সাফল্য। তিনি নিজে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। কারও ইচ্ছে ছিল কানাডা অথবা অস্ট্রেলিয়ার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবেন। কিন্তু সেটা আর সম্ভব হয়নি। নিজের অপূরণীয় স্বপ্ন মেয়েদের মধ্যে পূরণ হতে দেখাও বাবা মায়ের জন্য অনেক আনন্দের। তিনি অনুভাকে অভিনন্দন জানালেন এবং অভয় দিলেন,সাহস দিলেন।

তারপর একে একে অনুভা তার বড় আপু অহনা আর অন্যান্য কাজিনদেরকেও বিষয়টা বললো। সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিভাগের শিক্ষকদের জানালো এবং পরামর্শ চাইলো। তারা সাধ্যমত ওকে সহযোগিতা করলেন। বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে কথা বলতে হবে,কিভাবে বিনয় প্রকাশ করতে হবে এবং কিভাবে প্রফেসরকে খুশি করতে হবে। এরপর ইন্টারভিউয়ের আগের দিন পযর্ন্ত খুব মনোযোগ সহকারে অনুভা পড়াশোনা করলো। ইন্টারনেটে ঘাটাঘাটি করলো। ইন্টারভিউতে কত জন প্রফেসর থাকবেন তাও সে জানে না। কী ধরনের প্রশ্ন করা হবে তাও জানে না। তবুও সে আত্মবিশ্বাসী। আশা করা যায় সে ভালোই করবে। ইন্টারভিউয়ের দিন নির্ধারিত সময়ে অনুভার মেইলে মেইল আসলো। একটা লিংক আছে সেখানে। সেটাতে ক্লিক করে জুমে ইন্টারভিউয়ের জন্য জয়েন করলো। প্রথমে একটি মেয়ে এলসা নাম। সম্ভবত বিভাগের কোনো দায়িত্বে আছে অথবা বিভাগের টিচারও হতে পারে। তিনি ওর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করে তাকে বুঝিয়ে দিলেন প্রফেসর লুকাস তার ইন্টারভিউ নিবেন। এর মাঝেই প্রফেসর লুকাস জুমে জয়েন করলেন। তার ক্যামেরা অফ ছিল তাই অনুভা তাকে দেখতে পায়নি। এর কিছুক্ষণ পরই তার ক্যামেরা চালু হলো। বেশ বয়স্ক এক প্রফেসর। অনুভার দিকে তাকিয়ে হাই বললেন। পিওর অ্যামেরিকান একসেন্টে কথা বলেন। প্রফেসর লুকাসকে দেখে অনুভা কথা বলতে ভুলে গেল। এ অসম্ভব। এটা হতেই পারে না। যাকে প্রফেসর লুকাস বলা হচ্ছে তিনি দেখতে হুবহু ছোট নানুর মত। অনুভা কোনো ভাবেই মেলাতে পারছে না। আসলেই কি তিনি দেখতে ছোট নানুর মত? নাকি তিনিই ছোট নানু?

অনুভা কোনো কথা বলছে না দেখে প্রফেসর লুকাস আবার ওর দৃষ্টিআকর্ষণ করলেন। তখন অনুভা সম্বিত ফিরে পেলো। সে প্রফেসরকে প্রথম যে কথাটা বললো সেটা হলো হাই ছোট নানু!

১ মে ২০২৬

লেখক: জাজাফী। একজন গল্পকার,কবি ও সমাজকর্মী।

বিষয় ভিত্তিক সংবাদ
যোগাযোগspot_img

সর্বাধিক পঠিত