Homeফিচারএআই অর্থনীতির দৌঁড়ে ভারত, আলোচনায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তা

এআই অর্থনীতির দৌঁড়ে ভারত, আলোচনায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তা

শহীদুল ইসলাম
শহীদুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক। দৈনিক আমারদেশ নিউজ।

বিশ্বজুড়ে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। যে দেশ যত দ্রুত ডেটা, ক্লাউড ও কম্পিউটিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারবে, ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে তার অবস্থান তত শক্তিশালী হবে। এই বাস্তবতায় ভারতে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ডেটা সেন্টার কোম্পানি AirTrunk। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটিতে ৫ গিগাওয়াট ডেটা সেন্টার ক্যাপাসিটি তৈরির পরিকল্পনাকে ইতোমধ্যে ভারতের ডিজিটাল ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই বিনিয়োগের আরেকটি বিশেষ দিক হলো—AirTrunk-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী রবিন খুদা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই উদ্যোক্তার নেতৃত্বে ভারতের AI অবকাঠামো খাতে এমন বড় উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ার প্রযুক্তি অঙ্গনেও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ভারতের মহারাষ্ট্রের রায়গড়ে একাই প্রায় ৩ গিগাওয়াট ক্ষমতার ডেটা সেন্টার নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া অন্ধ্রপ্রদেশসহ আরও কয়েকটি অঞ্চলে সম্প্রসারণ পরিকল্পনা রয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে “ডেটা সেন্টার” হয়তো কেবল সার্ভারের ভবন মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এটি আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতির মেরুদণ্ড। AI, ক্লাউড কম্পিউটিং, অনলাইন ব্যাংকিং, ভিডিও স্ট্রিমিং, ই-কমার্স—সবকিছুর ভিত্তি এই অবকাঠামো।

ভারত বর্তমানে দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। “Digital India”, “IndiaAI Mission”সহ সরকারি উদ্যোগ, বিপুল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার প্রসার দেশটিকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এই বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করবে এবং ভারতকে বৈশ্বিক AI হাবে পরিণত করতে সহায়তা করবে।

নিশ্চয়ই এই প্রকল্প অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করবে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে, স্থানীয় ব্যবসা বাড়বে, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাত গতিশীল হবে। কিন্তু একই সঙ্গে বড় প্রশ্নও সামনে আসছে—এই বিপুল ডেটা অবকাঠামোর জ্বালানি ও পানির চাহিদা কীভাবে পূরণ হবে?

AI-নির্ভর ডেটা সেন্টারগুলো অত্যন্ত বিদ্যুৎনির্ভর। বিশেষ করে GPU-ভিত্তিক AI সার্ভার পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন হয়। ফলে ভারতের বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ বাড়তে পারে। যদিও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে তা কতটা কার্যকর হবে, সেটি এখনও দেখার বিষয়।

পানির বিষয়টিও আরও উদ্বেগজনক। ডেটা সেন্টারের কুলিং ব্যবস্থায় বিপুল পানি লাগে। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হচ্ছে, ২০২৪ সালে ভারতের ডেটা সেন্টারগুলো প্রায় ১৫০ বিলিয়ন লিটার পানি ব্যবহার করেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন লিটার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমন সময়ে যখন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ইতোমধ্যে পানির সংকটে ভুগছে, তখন স্থানীয় জনগণের উদ্বেগ অমূলক নয়।

AirTrunk অবশ্য বলছে, তারা রিনিউয়েবল এনার্জি, ওয়াটার রিসাইক্লিং এবং উন্নত কুলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বিশ্বব্যাপী AI বিস্তারের যে গতি, তাতে প্রযুক্তিগত সমাধানগুলো কি পরিবেশগত চাপ সামাল দিতে পারবে?

রবিন খুদার ব্যক্তিগত গল্পও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঢাকায় জন্ম নেওয়া একজন তরুণ, যিনি অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে নিজের সঞ্চয় ও বাড়ি বন্ধক রেখে একটি প্রযুক্তি কোম্পানি শুরু করেছিলেন, আজ তিনি বহু বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক অবকাঠামো ব্যবসার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এটি নিঃসন্দেহে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প।

তবে এই গল্প আমাদের জন্য আরেকটি প্রশ্নও রেখে যায়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কি শুধু বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানবসম্পদ সরবরাহ করেই সন্তুষ্ট থাকবে, নাকি নিজেদের দেশেও AI ও ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করবে?

কারণ ভবিষ্যতের অর্থনীতি শুধু সফটওয়্যার বা অ্যাপসের ওপর দাঁড়াবে না; এর পেছনে প্রয়োজন হবে শক্তিশালী ডেটা, বিদ্যুৎ ও কম্পিউটিং অবকাঠামো। ভারত সেই প্রস্তুতি শুরু করেছে। এখন দেখার বিষয়, এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলো কত দ্রুত সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে।

বিষয় ভিত্তিক সংবাদ
যোগাযোগspot_img

সর্বাধিক পঠিত