back to top
Wednesday, June 3, 2026
Home ফিচার প্রযুক্তির মানুষ, রান্নার শিল্পী

প্রযুক্তির মানুষ, রান্নার শিল্পী

কখনো কখনো মানুষের বাইরের পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকে তার আরেকটি উজ্জ্বল সত্তা। পেশাগত পরিচয়ে আনিসা বেগম একজন ডিজিটাল ইঞ্জিনিয়ার। প্রযুক্তির জগতে যুক্তি, হিসাব আর সময়ের নির্ভুল সমন্বয় নিয়েই কাটে তার প্রতিদিন। কিন্তু এই ব্যস্ত জীবনের বাইরেও ছিল তার আরেকটি গভীর ভালোবাসার জগৎ— রান্না।

২৬ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ বাংলাদেশি তরুণী লন্ডনের এনফিল্ডে বসবাস করেন। সম্প্রতি তিনি জায়গা করে নিয়েছেন জনপ্রিয় টেলিভিশন প্রতিযোগিতা MasterChef UK ২০২৬-এর কোয়ার্টার ফাইনালে। আর এই অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তার পরিবেশিত একটি বাঙালি পদ— কিং প্রন ভুনা।

চিংড়ি ভুনা বাঙালি ঘরের খুব পরিচিত রান্না। কিন্তু আনিসা সেই পরিচিত স্বাদকেই নতুনভাবে তুলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক মঞ্চে। জিরা পোলাও, ক্রিসপি পেঁয়াজ আর বাংলাদেশি স্টাইলের টমেটো সালাদের সঙ্গে পরিবেশিত তার কিং প্রন ভুনা শুধু স্বাদেই নয়, নিখুঁত সময় ব্যবস্থাপনা, রান্নার কৌশল এবং দৃষ্টিনন্দন প্লেটিংয়ের মাধ্যমেও বিচারকদের মুগ্ধ করেছে।

আনিসার রান্নার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো দুই সংস্কৃতির মেলবন্ধন। তার স্বামী জেইহানের তুর্কি সাইপ্রিয়ট ঐতিহ্য এবং নিজের বাংলাদেশি শেকড়— এই দুই অভিজ্ঞতাকে তিনি একসঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করেন ভিন্নধর্মী সব পদ। ফলে তার রান্নায় যেমন থাকে ঘরের পরিচিত স্বাদ, তেমনি থাকে আন্তর্জাতিক ছোঁয়াও।

রান্নার প্রতি তার ভালোবাসার শুরু বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই। সেই সময় তিনি পরিবারের পুরনো রেসিপিগুলো নিয়ে নতুনভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। ধীরে ধীরে রান্না শুধু শখের জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি হয়ে ওঠে তার সৃজনশীলতার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশভঙ্গি। নিজের তৈরি খাবার আরও মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছাই তাকে নিয়ে আসে MasterChef-এর মঞ্চে।

একজন পেশাজীবী নারীর জন্য এমন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া সহজ নয়। প্রযুক্তির জগতে যেমন প্রয়োজন মনোযোগ, ধৈর্য আর নির্ভুলতা, রান্নার প্রতিযোগিতার মঞ্চেও ঠিক একই গুণের প্রয়োজন হয়। আনিসা দেখিয়েছেন, শৃঙ্খলা আর একাগ্রতা থাকলে ভিন্ন দুই জগতেও সমান দক্ষতা দেখানো সম্ভব।

কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছানোই বড় অর্জন। এখানে প্রতিটি প্রতিযোগীকে বারবার নিজেদের প্রমাণ করতে হয়। আনিসা তার সাহসী স্বাদ নির্বাচন, আত্মবিশ্বাস এবং সৃজনশীল উপস্থাপনার মাধ্যমে সেই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করেছেন।

তবে তার গল্পের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দিক সম্ভবত এখানেই— তিনি কখনো নিজের পরিচয়কে আলাদা আলাদা ভাগে ভাগ করেননি। পেশায় তিনি একজন ডিজিটাল ইঞ্জিনিয়ার, আবার রান্নাঘরে তিনি একজন সৃজনশীল শিল্পী। এক প্লেট খাবারের মধ্যেই তিনি তুলে আনেন পরিবারের স্মৃতি, শেকড়ের টান এবং বহুসংস্কৃতির লন্ডনে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা।

ব্রিটিশ বাংলাদেশি তরুণ প্রজন্মের জন্য আনিসার গল্প নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার। তিনি দেখিয়েছেন, নিজের সংস্কৃতি আর বৈশ্বিক পরিচয়— দুটিকে একসঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যাওয়া যায়। বরং এই মেলবন্ধন থেকেই জন্ম নিতে পারে নতুন কিছু, অনন্য কিছু।

আনিসা বেগম প্রমাণ করেছেন— বড় স্বপ্ন পূরণের জন্য সবসময় পেশা বদলানোর প্রয়োজন হয় না। নিজের ভালোবাসাকে গুরুত্ব দিলে, ব্যস্ত জীবনের মাঝেও সেই ভালোবাসা একদিন বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here