যুক্তরাষ্ট্রের এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচি বিশ্বের প্রতিভাবান পেশাজীবীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ তৈরি করলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই কর্মসূচির অপব্যবহার উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাংবাদিকদের একাধিক তদন্তে ভিসা জালিয়াতির অসংখ্য অভিযোগ উঠে এসেছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো টেক্সাসের একটি আইটি কনসালটিং প্রতিষ্ঠান গ্রেট আমেরিকা টেকনোলজিস ইনকর্পোরেটেড। এই প্রতিবেদনে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উঠে আসা জালিয়াতির অভিযোগ, তদন্তের ধারা এবং আইনি দিকগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গ্রেট আমেরিকা টেকনোলজি ২০১৭ সালে অন্ধ্রপ্রদেশ, ভারতের কিছু ব্যক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় । প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত ঠিকানা ছিল টেক্সাসের প্ল্যানো শহরের ৮১০৫ রেজর বুলেভার্ড, স্যুট ২০৯ ।
২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। পূর্ববর্তী পরিচালক লক্ষ্মী বোগগুলা ও অপর এক ব্যক্তি নিজেদের পদ থেকে সরিয়ে নিলে নতুন পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার হিসেবে যোগ দেন নাগার্জুনা রেড্ডি শাকাম । তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, এই নাগার্জুনা রেড্ডি পূর্ববর্তী পরিচালক লক্ষ্মীর স্বামী, যা একটি সম্ভাব্য এইচ-১বি/এইচ-৪ ডিপেন্ডেন্সি পরিস্থিতি নির্দেশ করে—যেখানে স্ত্রী নামে ব্যবসা চালালেও প্রকৃতপক্ষে স্বামী (এইচ-১বি ভিসাধারী) তা পরিচালনা করেন ।
সাংবাদিক ও ব্লেজটিভির হোস্ট সারা গনজালেস দীর্ঘদিন ধরে এইচ-১বি ভিসা জালিয়াতি নিয়ে তদন্ত করছেন। গ্রেট আমেরিকা টেকনোলজি সম্পর্কে ইউএসসিআইএস (ইমিগ্রেশন ও নাগরিকত্ব বিভাগ) তথ্যে একাধিক এইচ-১বি কর্মী স্পনসরের উল্লেখ পেয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে সন্দেহবাতিক হন ।
১. ভুয়া অফিস
গনজালেস এবং তাঁর টিম কয়েক মাস ধরে প্রতিষ্ঠানটির প্ল্যানোর ঠিকানায় একাধিকবার যান। কিন্তু সেখানে কোনও কর্মী বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি অফিসটি ছিল পুরোপুরি ফাঁকা । প্রতিষ্ঠানের ফোন নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যায় এবং ওয়েবসাইটটি অকার্যকর ছিল ।গনজালেসের ভাষ্য অনুযায়ী, “আমরা একাধিকবার ৮১০৫ রেজর বুলেভার্ডে গিয়েছি। সেখানে কেউ নেই। বিল্ডিংটি ঠিক সেই বিল্ডিং যেখানে ‘মেইলবক্সে কর্মী’ বিষয়টি সামনে এসেছিল”!! অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি একটি মেইলবক্স সার্ভিসকে নিজের অফিস ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করছিল।
২. মালিকানার সন্দেহজনক স্থানান্তর
তদন্তে উঠে আসে, ২০২৪ সালে পূর্ববর্তী মালিকরা নিজেদের সরিয়ে নিয়ে নাগার্জুনা রেড্ডিকে পরিচালক করেন । ধারণা করা হচ্ছে, নাগার্জুনা রেড্ডি পূর্ববর্তী পরিচালক লক্ষ্মীর স্বামী এবং তিনি যখন এইচ-১বি ভিসায় অন্য চাকরি করতেন, তখন স্ত্রীর নামে ব্যবসা চালিয়ে বাড়তি আয় করতেন পুরাপুরি এইচ-১বি ভিসার শর্তাবলীর সরাসরি লঙ্ঘন ।
৩. পাবলিক অ্যাক্সেস ফাইল প্রদানে অস্বীকৃতি
এইচ-১বি কর্মী স্পনসরকারী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ডিপার্টমেন্ট অফ লেবার শ্রম বিভাগ -এর নির্দেশনা অনুযায়ী পাবলিক অ্যাক্সেস ফাইল (PAF) তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। এই ফাইলে এলসিএ লেবার কন্ডিশন অ্যাপ্লিকেশন বেতন কাঠামো, কর্মীদের নোটিশ ইত্যাদি নথি থাকে এবং যেকোনো ব্যক্তি তা দেখতে চাইলে দেখানোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে ।গনজালেস নাগার্জুনার ব্যক্তিগত বাসভবনে গিয়ে পাবলিক অ্যাক্সেস ফাইল দেখতে চাইলে তিনি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান এবং ফাইল দিতে অস্বীকৃতি জানান ।তিনি দাবি করেন ফাইলগুলো ফ্রিসকোতে নতুন অফিসে আছে, কিন্তু সেখানে গিয়েও কোনো কর্মী বা ফাইল পাওয়া যায়নি ।
৪. স্ববিরোধী বক্তব্য
সাংবাদিকের জিজ্ঞাসাবাদে নাগার্জুনা রেড্ডি পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেন
প্রথমে তিনি দাবি করেন, ইউএসসিআইএসের তথ্যে উল্লেখিত সংখ্যক এইচ-১বি কর্মী তাঁর প্রতিষ্ঠানে নেই এবং অনেক আবেদন প্রত্যাহার করা হয়েছে ।
তিনি ব্যবসা পরিচালনার কথা স্বীকার করে বলেন, “আমি” এবং পরে বলেন, “আমরা দুজনই স্ত্রী স্বামী এই ব্যাবসা চালাই”।
সাংবাদিক যখন প্রশ্ন করেন, “আপনি যখন এইচ-১বি ভিসায় চাকরি করতেন, তখন কীভাবে এই ব্যবসা চালাতেন?” তিনি স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি ।
৫. পিপিপি ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ
পরবর্তী তদন্তে জানা যায়, গ্রেট আমেরিকা টেকনোলজি কোভিড-১৯ মহামারির সময় পিপিপি পেচেক প্রোটেকশন প্রোগ্রাম ঋণ নিয়েছিল, যা পরবর্তীতে ২,৬৬,৫৪২ ডলার মওকুফ করা হয় ।
গনজালেসের প্রশ্ন “একটি সফটওয়্যার কনসালটিং প্রতিষ্ঠান, যার কোনো অফিস নেই এবং কর্মীরা হয় রিমোটে কাজ করেন, তাদের পে-রোলের জন্য পিপিপি ঋণের প্রয়োজন কেন?”
এই প্রশ্নের জবাব আজও মেলেনি। পাবলিক অ্যাক্সেস ফাইল সংক্রান্ত আইন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি এইচ-১বি স্পনসরকারী প্রতিষ্ঠানকে এলসিএ ফাইলের এক কার্যদিবসের মধ্যে পাবলিক অ্যাক্সেস ফাইল তৈরি করতে হয় এবং তা যেকোনো সময় জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য প্রস্তুত রাখতে হয়
এই ফাইলের অন্তর্ভুক্ত নথিগুলো হলো
স্বাক্ষরিত এলসিএ-র কপি
কর্মীর বেতন কাঠামো
প্রচলিত বেতনের নথি
কর্মীদের নোটিশের প্রমাণ
সুবিধার সারাংশ
ফাইল দিতে অস্বীকৃতি বা তা যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করলে প্রতি লঙ্ঘনে ৫৫,৫৭০ ডলার পর্যন্ত জরিমানা এবং প্রতিষ্ঠানকে এইচ-১বি কর্মসূচি থেকে ১-৩ বছরের জন্য নিষিদ্ধ (debarment) করার বিধান রয়েছে ।
এইচ-১বি ভিসার শর্ত লঙ্ঘন
এইচ-১বি ভিসাধারী ব্যক্তি শুধুমাত্র সেই স্পনসরকারী প্রতিষ্ঠানের জন্যই কাজ করতে পারেন যার মাধ্যমে তিনি ভিসা পেয়েছেন। অন্য কোনো ব্যবসা পরিচালনা বা সেখান থেকে আয় করা নিষিদ্ধ ।
নাগার্জুনা রেড্ডি যখন স্বীকার করেন যে তিনি ও তাঁর স্ত্রী উভয়েই ব্যবসা চালান, তখন তা ভিসার শর্তের সরাসরি লঙ্ঘন । শুধু গ্রেট আমেরিকা টেকনোলজিই নয়, টেক্সাসের আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এইচ-১বি ভিসা জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে । সারা গনজালেসের মতে, “আমরা গত কয়েক মাস ধরে একাধিক ভারতীয় ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ‘ঘোস্ট অফিসে’ এইচ-১বি কর্মী নিয়োগের অভিযোগ উন্মোচন করেছি” ।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, “অনেক ছোট ব্যবসা আইনগতভাবেই আবাসিক ঠিকানা থেকে পরিচালিত হয়” এবং সারা গনজালেস “প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছাড়াই প্রতিবেদন তৈরি করছেন” । নাগার্জুনা রেড্ডি সাংবাদিককে হুমকি দিয়ে বলেন, তিনি মামলা করবেন এবং অভিযোগ করেন যে তাঁকে “ভারতীয়” বলে জাতিগতভাবে টার্গেট করা হচ্ছে ।
সারা গনজালেজ এর জবাব
“আমি জালিয়াতি উন্মোচন করছি, জাতিগত বিদ্বেষ নয়”
গ্রেট আমেরিকা টেকনোলজির ঘটনা এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির দুর্বল দিকগুলোর একটি উদাহরণ—যেখানে:
১. প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত ঠিকানায় কার্যক্রম নেই (ঘোস্ট অফিস)
২. মালিকানা ও পরিচালনায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে
৩. পাবলিক অ্যাক্সেস ফাইলের মতো আইনি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করা হচ্ছে
৪. ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে
৫. সরকারি অর্থ (পিপিপি ঋণ) সম্ভাব্য জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়েছে
এই তদন্ত শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয় এটি একটি বৃহত্তর সমস্যা যেখানে ভিসা কর্মসূচির অপব্যবহার মার্কিন কর্মীদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং অভিবাসন ব্যবস্থার প্রতি জনবিশ্বাস কমিয়ে দিচ্ছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দ্রুত পদক্ষেপ ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, যাতে এই ধরনের জালিয়াতি বন্ধ করা যায় এবং সৎ ও যোগ্য অভিবাসীদের জন্য কর্মসূচিটি সুরক্ষিত থাকে ।
এই প্রতিবেদনটি সারা গনজালেসের তদন্ত, ব্লেজ মিডিয়ার প্রতিবেদন এবং যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগের প্রকাশিত আইনি নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
