সম্প্রতি দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন আহমেদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান, তার বক্তব্য এবং দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব। দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার পর দলের স্থায়ী কমিটির মতো সর্বোচ্চ ফোরামে বহু প্রবীণ, ত্যাগী ও প্রভাবশালী নেতা থাকা সত্ত্বেও যেভাবে সালাউদ্দিন আহমেদকে বিশেষভাবে ‘উন্নীত’ বা লাইমলাইটে নিয়ে আসা হচ্ছে, তা কেবল জ্যেষ্ঠতার সাধারণ কোনো সমীকরণ নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে এক গভীর কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।
রাজনৈতিক মহলে একটি গুঞ্জন বেশ জোরালো যে, সালাউদ্দিন আহমেদকে মূলত দলের ভেতরে একটি ‘যৌথ উদ্যোগের প্রতীক’ হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি দলের দুটি ভিন্ন প্রভাবশালী সত্ত্বা—লন্ডনভিত্তিক শীর্ষ নেতৃত্ব এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে প্রতিবেশী ভারতের অংশীজনদের মধ্যকার এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক সমন্বয়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন। দলের এক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বের কিছুটা অন্তরালে চলে যাওয়া এবং একই সময়ে সালাউদ্দিনের আকস্মিক গুরুত্ব পাওয়া ইঙ্গিত দেয় যে, দলের ভেতরকার কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন এখন প্রকট। বহু প্রবীণ নেতাকে ছাপিয়ে এই উত্থান স্বাভাবিকভাবেই দলের অভ্যন্তরে অনেকের কাছে বিস্ময়, ক্ষোভ ও অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে সালাউদ্দিন আহমেদের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে যখন এই সময়কার আন্দোলনকে একটি ঐতিহাসিক বিপ্লব হিসেবে দেখা হচ্ছে, তখন তার বক্তব্যে এই সময়কালের ব্যাপকতাকে কিছুটা ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। সমালোচকদের মতে, এই বয়ান বা ন্যারেটিভের সাথে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থানের এক ধরনের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, দল কি জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে কোনো একক ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারছে না? একদিকে যখন মাঠপর্যায়ে আন্দোলনের বড় বড় আখ্যান তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে শীর্ষ পর্যায় থেকে তার ভিন্ন ব্যাখ্যা দলটির আদর্শিক স্পষ্টতা ও নেতৃত্বের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ‘জুলাই সনদ’ বা এই সময়কালের প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে দলের ভেতরের এই আদর্শিক অমিল বিএনপির দীর্ঘমেয়াদী রাজনীতির জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
বিএনপির জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা। অভিযোগ উঠছে, দলের কিছু প্রভাবশালী দায়িত্বশীল ও সাবেক নীতি-নির্ধারকদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড, বিভিন্ন সেক্টরে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে কার্যকর ভূমিকা না রাখা দলের ভাবমূর্তিকে মারাত্মক সংকটে ফেলেছে। এই ধরনের বিশৃঙ্খলা একদিকে যেমন দলের নেতৃত্বের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সালাউদ্দিন আহমেদের মতো একজন প্রতীকী ব্যক্তিত্বের ওপর দলের অতি-নির্ভরশীলতা বিএনপির প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক শক্তিকে নয়, বরং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও উপদলীয় ভাঙনকেই বেশি স্পষ্ট করে তোলে।
পরিশেষে বলা যায়, সালাউদ্দিন আহমেদের বর্তমান রাজনৈতিক ভূমিকা মূলত বিএনপির বর্তমান বাস্তব রাজনীতির একটি নিখুঁত আয়না। যেখানে সমষ্টিগত আদর্শ বা প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের চেয়ে ব্যক্তিপরিচয়, উপদলীয় গোষ্ঠীস্বার্থ, জোরপূর্বক সমন্বয়ের চেষ্টা আর ক্ষমতার দ্বন্দ্বই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। দলের ভেতর বাহ্যিক বা প্রতিবেশী দেশের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার এই চেষ্টা মাঠপর্যায়ের ত্যাগী নেতাকর্মীদের কতটা আশ্বস্ত করতে পারবে, তা দেখার বিষয়। এই জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলগত সমীকরণ ভবিষ্যতে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত ও শক্তিশালী করবে, নাকি অভ্যন্তরীণভাবে আরও দুর্বল ও দ্বিধাবিভক্ত করে তুলবে—তা সময়ই বলে দেবে।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, আমারদেশ নিউজ।
