সুইডেনের সাধারণ নির্বাচনে এখনো কোনো পক্ষের জয় নিশ্চিত হয়নি। ভোট গণনা প্রায় শেষের দিকে থাকলেও বামপন্থী জোট সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে।ফলে দেশটির পরবর্তী সরকার কে গঠন করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সোমবার ভোরে ৯০ শতাংশের বেশি ভোট গণনা করা হয় বলে জানায় বিবিসি। তখন বামপন্থী জোট প্রায় ২০ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল। সুইডেনের নির্বাচন কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সামাজিক গণতন্ত্রী দলের নেত্রী ম্যাগদালেনা আন্দেরসনের নেতৃত্বাধীন জোট সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে। প্রাথমিক ফলাফলে জোটটি বর্তমান রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টেরসনের নেতৃত্বাধীন চার দলের জোটের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ৯৪ শতাংশ ভোটের হিসাব অনুযায়ী, আন্দেরসনের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী জোট ১৭৬টি আসনে এগিয়ে ছিল। অন্যদিকে ক্রিস্টেরসনের নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট পেয়েছিল ১৭৩টি আসন। ব্যবধান মাত্র তিনটি আসনের।তবে ভোট গণনা পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফলাফল পরিবর্তিত হতে পারে। এ কারণে সুইডেনের বড় কোনো সংবাদমাধ্যম এখনো কোনো পক্ষকে বিজয়ী ঘোষণা করেনি।
সুইডেনে দুটি বড় রাজনৈতিক জোট রয়েছে। প্রতিটি জোটে চারটি করে দল রয়েছে। নির্বাচনে কোনো জোট স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে অন্য দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে হয়।এ কারণে দেশটিতে জোট সরকার ও সংখ্যালঘু সরকার গঠন নতুন কিছু নয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টেরসনের সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে কট্টর ডানপন্থী সুইডেন ডেমোক্র্যাটস দল। দলটির রাজনৈতিক শিকড় নব্য নাৎসিবাদে।
ক্রিস্টেরসন ক্ষমতায় থাকলে সুইডেন ডেমোক্র্যাটস দলের সদস্যদের মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। এই বিষয়টি এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
সোমবার ভোরে সমর্থকদের উদ্দেশে ক্রিস্টেরসন বলেন, পরবর্তী সরকার কে গঠন করবে, তা এখনো বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ভোটাররা তাদের মতামত জানিয়েছেন। কিন্তু এখনো চূড়ান্ত ফল পাওয়া যায়নি। আগামী বছরগুলোতে সুইডেনের নেতৃত্বে কোন সরকার থাকবে, সেটি এখনো খোলা প্রশ্ন। অন্যদিকে, রবিবার রাতে আন্দেরসনও সমর্থকদের চূড়ান্ত ফলের জন্য অপেক্ষা করতে বলেন। তবে তিনি জানান, বর্তমান ফলাফল শেষ পর্যন্ত একই থাকলে সুইডেনে নতুন সরকার গঠিত হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই সামাজিক গণতন্ত্রী দল সুইডেনের রাজনীতিতে বড় শক্তি হিসেবে রয়েছে। তবে এবারের নির্বাচনে দলটির ভোট কমেছে।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সোমবার সকাল পর্যন্ত সামাজিক গণতন্ত্রী দল প্রায় ২৮ শতাংশ ভোট পাওয়ার পথে ছিল। এই ফল চূড়ান্ত হলে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি দলটির সবচেয়ে খারাপ নির্বাচনী ফল হতে পারে। তবে বামপন্থী জোটের অন্য কয়েকটি দলের সমর্থন বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাম দল, গ্রিনস এবং সেন্টার পার্টি। কট্টর ডানপন্থী সুইডেন ডেমোক্র্যাটস দলও এবারের নির্বাচনে সমর্থন হারিয়েছে বলে প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে। ১৯৮০-এর দশকে নাৎসি সমর্থকদের হাতে প্রতিষ্ঠিত দলটি বহু বছর সুইডেনের মূলধারার রাজনীতির বাইরে ছিল। তবে ২০২২ সালের নির্বাচনে দলটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। সে সময় দলটি মূলত অভিবাসন এবং সহিংস অপরাধের মতো বিষয়কে সামনে রেখে প্রচার চালায়।
এবারের নির্বাচনে সেই দলটির ভোটও কমেছে। ২০১০ সালে রিক্সদাগে প্রবেশের পর এই প্রথম দলটির সমর্থন কমার চিত্র দেখা গেল। এবার সুইডেনের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও কমেছে। প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। ২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোট পড়ার হার প্রায় ৪ শতাংশ কম। রবিবার ভোট দেওয়ার পর আন্দেরসন নির্বাচনের মূল রাজনৈতিক প্রশ্নটি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সুইডেন কি এমন একটি সরকার চায়, যেটি পুরোপুরি সুইডেন ডেমোক্র্যাটস দলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে? নাকি এমন একটি সরকার চায়, যার নেতৃত্বে থাকবেন তিনি এবং নতুন রাজনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করবেন? অন্যদিকে, ক্রিস্টেরসন বলেন, তার জোট যাতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো চালিয়ে যেতে পারে, সেটি মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের ভোটকেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর তিনি বলেন, মানুষ চায় তার সরকার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো চালিয়ে যাক। এবারের নির্বাচনী প্রচারে কয়েকটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা, গ্যাং অপরাধ এবং সামাজিক কল্যাণ খাতে সরকারি ব্যয়। ভোট গণনা শেষ হওয়ার পর কোন জোট সরকার গঠন করবে, তা নির্ধারণ হবে। তবে কোনো পক্ষ স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনে ছোট দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সুইডেনে আসন বণ্টন হয় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে। দেশটির পার্লামেন্ট রিক্সদাগে কোনো দলকে আসন পেতে হলে সাধারণত অন্তত ৪ শতাংশ ভোট পেতে হয়। ফলে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর ছোট দলগুলোর অবস্থানও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
