শুনলে অবাক হবে কিছু পোকা আমাদের বন্ধু। তারা নানা ভাবে আমাদের উপকার করে। তেমনই এক বন্ধু পোকার নাম ‘লেডি বার্ড বিটল’। আমরা আমাদের চারপাশে কতো ধরনের পোকা দেখি। এদের কোনোটা ক্ষতিকর,কোনোটা অক্ষতিকর।কিন্তু আমরা তাদের মাঝে পার্থক্য করতে পারি না। এর কারণ হয়তো আমরা তাদের চিনি না বা দূর থেকে তাদের ক্ষতিকর পোকা ভাবি। আজ আমরা এমন এক পোকা নিয়ে কথা বলবো যে আমাদের এবং আমাদের পরিবেশের জন্য বন্ধু। কি ভাবছো? তোমরা হয়তো ভাবছো পোকা আবার বন্ধু হয় নাকি? হ্যাঁ, এর জন্য তোমাদের পড়তে হবে এই পুরো লিখাটি যেখানে তোমরা জানবে বন্ধু পোকার পরিচয়, তাদের দৈহিক গঠন,তাদের জীবনচক্র, কীভাবে তারা আমাদের বন্ধু পোকা হিসেবে প্রকৃতিতে বিরাজ করে এবং কেনই বা সে আমাদের বন্ধু ইত্যাদি।
আমাদের আজকের বন্ধু পোকার নাম লেডি বার্ড বিটল(Lady Bird Beetle). যার বৈজ্ঞানিক নাম Coccinellidae septempunctata এবং এরা Coccinellidae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবী জুড়ে এদের ৬০০০ এর বেশি প্রজাতি রয়েছে।

ছবিতেই তোমরা দেখতে পাচ্ছো পোকাটি কতো সুন্দর! এরা সাধারণত উজ্জ্বল(লাল,কমলা,হলুদ ইত্যাদি) রঙের হয়। এদের মাথাটি(Head)বেশ ছোট। মাথার সামনে রয়েছে দুটি শুঙ্গ(Antenna)। আমরা আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে যেমন দেখা,শোনা ঘ্রাণ, স্বাদ, স্পর্শের অনূভুতি নেই ঠিক তেমনই ছোট্ট এই বন্ধু পোকার শুঙ্গ তাকে ঘ্রাণশক্তি, স্পর্শ,স্বাদ, জীবনসঙ্গীকে আকর্ষণ, খাদ্য ও শিকারি খুঁজে পেতে সাহায্য করে। মাথার পরের অংশটি হলো বক্ষ (Thorax),তার পরের অংশটি উদর (Abdomen)। উদরের অংশটি শক্ত খোলসে আবৃত এবং মাঝে কিছুটা উঁচু। খোলসে তোমরা গোল গোল স্পট দেখতে পাবে। প্রজাতি অনুযায়ী এই স্পটের সংখ্যা কম বেশি হতে পারে। এদের রয়েছে ছয়টি পা,দুই জোড়া ডানা। সাধারণত উপরের শক্ত দুইটি ডানা নিচের দুইটি ডানাকে(যা উড়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়) রক্ষা করে।
সুন্দর জিনিসের প্রতি আমাদের যেমন আকর্ষণ থাকে, সে জিনিসকে নিজের কাছে রাখতে চাই, বন্ধু পোকার এই সৌন্দর্যই কিন্তু তাকে ক্ষতিকর পোকা থেকে রক্ষা করে। কি অবাক করা কথা তাই না? উজ্জ্বল রঙ দেখে অনেক ক্ষতিকর পোকা বন্ধু পোকাকে বিষাক্ত বা স্বাদহীন ভেবে পালিয়ে যায়। কখনোও বা যদিও আক্রমণের শিকার হয় তখন বন্ধু পোকা তার পা থেকে আঠালো এক ধরনের রস নির্গমন করে যা ক্ষতিকর পোকাকে তাড়িয়ে দেয়। বন্ধু পোকার পরিচয় তো হলো। তাহলে চলো এবার আমরা তার জীবনচক্র দেখি।

চিত্র: বন্ধু পোকার জীবনচক্র
লেডি বার্ড বিটলের ডিমের রঙ সাধারণত উজ্জ্বল হলুদ, কমলা বা সাদা রঙের হয়। এরা সাধারণত গুচ্ছাকারে পাতার নিচে ডিম পাড়ে যাতে করে তার ডিম ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফেলতে না পারে।
এতে করে তার ভবিষ্যৎ বাচ্চাগুলো সুরক্ষিত থাকে। ছবিতে বন্ধু পোকার ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার যে ধাপগুলো দেখছো তাতে করে তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছো যে বাচ্চাগুলো কি রকম ভয়ংকর দেখতে! যেন একদম পিচ্চি কুমির। হ্যাঁ প্রায় অনেক পোকার জীবনচক্র ঠিক এমনই। প্রাপ্ত বয়স্ক পোকার সাথে তার বাচ্চার কোনো মিলই নেই। বাচ্চাগুলো ধীরে ধীরে পরিবর্তনের মাধ্যমে তার বাবা মায়ের মতো দেখতে হয়।
এবার আসি তারা কিভাবে বন্ধু পোকা হিসেবে আমাদের এবং আমাদের পরিবেশের উপকার করছে। আমরা একটু লক্ষ্য করলেই আমাদের বাগান,জমিতে এদের উপস্থিতি দেখতে পারি। এরা মূলত ছোট ছোট পোকা খেয়ে থাকে, যেসব পোকা আমাদের ফসল, শাকসবজির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ। ক্ষতিকর পোকা দমন করার জন্য আমরা রাসায়নিক ওষুধ স্প্রে করি কিন্তু বেশি বেশি ওষুধ স্প্রে করলে কিন্তু তা আমাদের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এসব রাসায়নিক ওষুধ মাটি, পানিতে মিশে পরিবেশের ক্ষতি করে। বন্ধু পোকা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০-৬০ টি জাবপোকা/এফিড(Aphid)নামক ছোট ছোট পোকা খেয়ে থাকে।এছাড়াও ক্ষতিকর পোকার ডিম,লার্ভা খেয়ে থাকে। তাহলে ভাবো বন্ধু পোকা বেশি পরিমাণ থাকলে কোনো ক্ষতি ছাড়াই আমরা ফসলকে অনেকাংশেই মন্দ পোকা থেকে বাঁচাতে পারবো। আমরা চাইলে বন্ধু পোকাকে আলাদাভাবে প্রতিপালন করতে পারি এবং যখন ফসলের পোকার আক্রমণ বেশি হবে তখন তাদের বাগান বা জমিতে ছেড়ে দিতে পারি।

বন্ধু পোকা বিশ্বজুড়ে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।আর হবেই বা না কেন? ক্ষুদ্র এই পোকা কৃষককের বন্ধু, পরিবেশের বন্ধু। বন্ধু পোকার মতো এরকম আরও অনেক পোকা আছে যারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবদান রাখছে। সৃষ্টিকর্তার কি অপরূপ সৃষ্টি! ক্ষুদ্র এসব পোকার অবদানও কতো সুন্দর!
লেখক: মাহমুদা সাথী
শিক্ষার্থী, কীটতত্ত্ব বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,ময়মনসিংহ।

