back to top
Saturday, February 28, 2026
Homeসারাদেশগুমে জড়িতদের নিয়ন্ত্রণে ছিল বিচারব্যবস্থাও

গুমে জড়িতদের নিয়ন্ত্রণে ছিল বিচারব্যবস্থাও

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশের বিচারব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে দমন-পীড়নকে বৈধতার ছদ্মবেশ দেওয়ার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। আইনের সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণের বদলে এটি বারবার এমনভাবে ব্যবহার করা হতো যাতে ভুক্তভোগীদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। অবৈধ আটককে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আর জোরপূর্বক তৈরি করা গল্প ও স্বীকারোক্তি আদালতের নথিতে ‘আইনি সত্য’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ফলে বিচারব্যবস্থা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বদলে অনেক সময় দমনমূলক রাষ্ট্রীয় শক্তির অংশে রূপান্তরিত হয়।

গত মঙ্গলবার গুমসংক্রান্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রকাশিত ২২৩ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিশন জোরপূর্বক আদায় করা স্বীকারোক্তি, পদ্ধতিগত হেরফের এবং কৌশলগতভাবে মামলা দায়েরের একটি ধারাবাহিক প্রবণতা শনাক্ত করেছে। এসব কৌশলের মাধ্যমে জোরপূর্বক গুমকে আইনের আড়ালে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছিল।

কমিশন বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, বিচারব্যবস্থা নাগরিক অধিকার রক্ষার পথ থেকে সরিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতো। যেখানে মূল লক্ষ্য ছিল ভুক্তভোগীদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা এবং দমন-পীড়নকে বৈধতা দেওয়া।

জবরদস্তিমূলক বিবৃতি

আওয়ামী আমলে বিভিন্ন জেলা ও সংস্থার অসংখ্য সাক্ষ্য থেকে দেখা যায়, জোরপূর্বক গুম ও নির্বিচারে আটক ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতি আদায়ে একটি ধারাবাহিক ও উদ্বেগজনক প্যাটার্ন রয়েছে। এসব বিবৃতির অভিন্নতা থেকে বোঝা যায়, জবরদস্তি, পদ্ধতিগত আইন লঙ্ঘন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার মাধ্যমে অভিযুক্তদের নিজের বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করার একটি সুসংহত পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো।

এক ভুক্তভোগী বলেছিলেন, আমাকে সারা রাস্তা বলে রাখছে- তুই যদি উল্টাপাল্টা করিস বা ১৬৪ না দিস, তাহলে তোর স্ত্রীকে নিয়ে আসব। তোকে ইচ্ছামতো মারব। এখানে কোনো রুলস নেই, কেউ কিছু করতে পারবে না।

অন্য একজন বলেছিলেন, গুমের শিকার চার মাস পর আমাকে চোখ বেঁধে নিয়ে গিয়ে বলা হলো- তুমি কি বের হতে চাও, নাকি এভাবেই জীবন শেষ হবে? আমি বললাম, অবশ্যই বের হতে চাই। তখন তারা বলল, আমরা যা বলব, কোর্টে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সেটাই বলতে হবে। যদি বল, ছাড়া পাবে; না হলে ক্রসফায়ার দিয়ে মারা হবে।

আরেক ভুক্তভোগী জানালেন, একটা কাগজ দিয়ে বলা হয়েছিল- এভাবে স্বীকারোক্তি দিতে হবে, না হলে বাঁচানো হবে না। আমি প্রথমে দিতে চাইনি। ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, আসামি ঠিকভাবে স্বীকারোক্তি দিচ্ছে না। এরপর তারা আমাকে বাইরে নিয়ে শাসালো। আমি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে কেঁদে কেঁদে অনুরোধ করেছি, আমার মা ও ছোট ভাইদের কাছে যেতে দিতে। তবুও কোনো সাহায্য হয়নি।

জোরপূর্বক স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করানো হতো

বিভিন্ন সময় গোপন আটককেন্দ্রে থাকা ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের জোরপূর্বক স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করতে বাধ্য করতো। এসব বক্তব্য বারবার রিহার্স করানো হতো এবং পরে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছে বলে উপস্থাপন করা হতো।

এক ভুক্তভোগী আরো জানান, সারারাত ধরে ফরম্যাট মুখস্থ করিয়েছে- এইটা এইটা বলবা। সকালে আবার বলেছে, কোর্টে যা জিজ্ঞেস করবে, ঠিক এভাবেই বলবে। আমি ম্যাজিস্ট্রেটকে বলেছিলাম, স্যার, এগুলো আমি করিনি, আমাকে জোর করে বলানো হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট বলেছিলেন, ‘দেখছি’। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিপক্ষের দিকেই লিখেছেন। কারণ, এতদিন গুমের পর তারা যখন নিজেদের পছন্দের ম্যাজিস্ট্রেট পেয়েছে, সেদিনই আমাকে কোর্টে হাজির করিয়েছে।

আইনি প্রতিনিধিত্বের অনুপস্থিতি

ভুক্তভোগীদের প্রায়ই কোনো আইনজীবীর উপস্থিতি ছাড়াই ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হতো এবং তাদের স্বীকারোক্তি রেকর্ড করা হতো। আইনে এই পর্যায়ে আইনজীবীর থাকার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে তা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে জবরদস্তিমূলক স্বীকারোক্তি প্রতিরোধ বা চ্যালেঞ্জ করার কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা কার্যকর হয়নি।

এক ভুক্তভোগী বলেন, জজ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের কোনো উকিল আছে কি না। আমাকে তো গুম অবস্থায় সরাসরি এখানে আনা হয়েছে- উকিল ধরব কীভাবে? বললাম, উকিল নেই। এরপর জজ চার দিনের রিমান্ড দিলেন।

অপর একজন বলেন, ম্যাজিস্ট্রেট জিজ্ঞেস করলেন, উকিল নেই- কিছু বলার আছে? আমি পুরো গুমের ঘটনা বললাম। ম্যাজিস্ট্রেট নিজেও অবাক হলেন। তিনি পুলিশকে জিজ্ঞেস করলেন- যদি গুম হয়ে থাকে, তাহলে গত পরশু গ্রেপ্তার করা হয়েছে কেন বললেন? পুলিশ বলল, ওরা টর্চারপ্রাপ্ত, টর্চারপ্রাপ্ত না হলে এমন কথা বলত না। তারা বলল, গুমে থাকলে গোঁফ কাটা কেন, পরিষ্কার কাপড় কেন? অথচ মিডিয়াতে দেখানোর আগের দিনই আমাদের গোঁফ কেটে পরিষ্কার কাপড় পরানো হয়েছিল। এরপরও ম্যাজিস্ট্রেট তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলেন এবং নির্দেশ দিলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী নির্যাতন ছাড়া রিমান্ড শেষ করতে হবে।

বিচারহীনতার চক্র তৈরি

একাধিক সাক্ষ্যে দেখা যায়, ম্যাজিস্ট্রেটরা স্বীকারোক্তি স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছে কি না- এই ন্যূনতম আইনি যাচাই অনেক ক্ষেত্রেই করেননি। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তাদের নির্যাতনকারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে নেওয়া হয়েছে এবং স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটদের উদাসীন বা তাড়াহুড়ো করতে দেখা গেছে। প্রশ্ন না করেই কেবল বিবৃতিতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আবার কিছু ঘটনায় স্বীকারোক্তির নথিতে যা লেখা হয়েছে, তার সঙ্গে ভুক্তভোগীর বক্তব্যের কোনো মিল নেই- যা জবরদস্তির পাশাপাশি সরাসরি জালিয়াতির ইঙ্গিত দেয়।

এক ভুক্তভোগী বলেন, আমি বলেছিলাম, স্যার, পুলিশদের রুম থেকে বের করেন -আমার অনেক কথা আছে। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, ওরা বের হবে না, এখানেই বল। আমি বললাম, আমাকে গুম করে রাখা হয়েছে, আমার বাবা-মা জানে না আমি বেঁচে আছি কি না। এগুলো আমাকে মুখস্থ করানো হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট কিছু লেখা কেটে দিয়ে বললেন, আর কাটা যাবে না, যা আছে সাইন কর। আমাকে কোনো সুযোগ বা সময় দেওয়া হয়নি।

অপর এক ভুক্তভোগী বলেন, ১৬৪ ধারায় জোর করে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে। আমার হাত বাঁধা ছিল। ম্যাজিস্ট্রেট প্রশ্ন করছিলেন, আর নিজের মতো করে লিখছিলেন। আমি বলেছিলাম, বাসায় বই ছিল—তিনি লিখেছেন আমি জিহাদি কর্মকাণ্ডে জড়িত। র‍্যাব আমাকে বলেছিল, আমরা যেভাবে শিখিয়েছি সেভাবেই বলতে হবে, না হলে এখান থেকে বের হওয়ার পর আর জীবন দেখব না।

এই সবকিছু মিলিয়ে দেখা যায়, অনেক মামলায় স্বীকারোক্তি নেওয়ার প্রক্রিয়া শুধু পদ্ধতিগতভাবে ত্রুটিপূর্ণই নয়, বরং পদ্ধতিগতভাবে নির্যাতনমূলক। হুমকি, পূর্বনির্ধারিত স্ক্রিপ্ট, আইনজীবীর অনুপস্থিতি এবং বিচারিক সহযোগিতা মিলিয়ে এমন এক বিচারহীনতার চক্র তৈরি হয়েছে, যেখানে আইনিভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও বাস্তবে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

বিচার বিভাগের প্রতি বার্তা

কমিশন বলছে, বিচার বিভাগ সংবিধানের রক্ষক এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ। একটি স্বাধীন, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বিচার বিভাগ ছাড়া গণতন্ত্র ও মানবাধিকার টেকসই হয় না। বিচারিক স্বাধীনতা শুধু বিচারকদের জন্য নয়, বরং বিচারপ্রার্থীদের জন্য। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। হেফাজতে নির্যাতন, জোরপূর্বক গুম এবং হেফাজতে মৃত্যু সংবিধানবিরুদ্ধ এবং নিন্দনীয়। এমনকি সবচেয়ে কঠোর অপরাধীরও ন্যায়বিচারের অধিকার আছে।

বিষয় ভিত্তিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত