গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, নর্মদা—ভারতীয় উপমহাদেশের এই নদীগুলো কেবল জলধারা নয়; কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারক। হিন্দু ধর্মে এগুলোকে ‘মা’ বলে সম্মান করা হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যাকে মা বলা হয়, তাকে কি আমরা এভাবেই ভালোবাসি?
বাস্তবতা বলছে, ভারতের বহু পবিত্র নদী আজ ভয়াবহ দূষণের শিকার। শিল্পকারখানার বর্জ্য, অপরিশোধিত পয়ঃনিষ্কাশন এবং নগরায়ণের চাপ যেমন এর জন্য দায়ী, তেমনি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পর নদীতে ফুল, প্লাস্টিক, স্টাইরোফোম, রঙিন মূর্তি, কাপড়, খাদ্যসামগ্রী ও নানা ধরনের বর্জ্য ফেলার প্রবণতাও দূষণকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই বলতে হয়—প্রকৃতির ক্ষতি করে কোনো ধর্মেরই মর্যাদা বাড়ে না।
ধর্ম মানুষকে শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ শেখায়। হিন্দু দর্শনেও প্রকৃতিকে দেবত্বের আসনে বসানো হয়েছে। উপনিষদ, গীতা ও অন্যান্য শাস্ত্রে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপনের শিক্ষা রয়েছে। সেখানে নদীকে দূষিত করার কোনো নির্দেশ নেই। তাই পরিবেশবিরোধী কোনো কাজকে ধর্মের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ভারতের বিভিন্ন নদীতীরে আজ অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবক প্রতিদিন আবর্জনা পরিষ্কার করছেন। তারা কোমরসমান পানিতে নেমে প্লাস্টিক, ফুলের মালা, স্টাইরোফোম, কাপড় ও অন্যান্য বর্জ্য সংগ্রহ করেন। অথচ পরের দিন আবার নতুন করে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। এটি শুধু পরিবেশের জন্য নয়, আমাদের সামাজিক সচেতনতার জন্যও উদ্বেগজনক।
এই সমস্যাকে কোনো একটি ধর্মের বিরুদ্ধে প্রচারণা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আয়োজনেও পরিবেশ দূষণের উদাহরণ রয়েছে। তাই সমাধানও হতে হবে দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও পরিবেশ সংরক্ষণ—দুটিই একসঙ্গে সম্ভব।
অনেক পরিবেশবিদ ও ধর্মীয় নেতাই এখন পরিবেশবান্ধব আচার পালনের আহ্বান জানাচ্ছেন। নদীতে প্লাস্টিক বা স্টাইরোফোম না ফেলে মাটির তৈরি পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার, রাসায়নিক রং পরিহার, ফুল ও জৈব উপাদান কম্পোস্ট করা, ব্যবহারযোগ্য কাপড় ও খাদ্য দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ—এসব উদ্যোগ ধর্মীয় অনুভূতিকে অক্ষুণ্ন রেখেই পরিবেশ রক্ষা করতে পারে।
সরকারেরও দায়িত্ব কম নয়। শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, নদী দখল রোধ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান শেষে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতি ও আইন প্রয়োগ জরুরি। পাশাপাশি মন্দির, ধর্মীয় সংগঠন, পরিবেশবাদী প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অধিকাংশ বড় নদীর উজান ভারতে। উজানে নদীর পানি ও পরিবেশ দূষিত হলে তার প্রভাব ভাটির দেশ বাংলাদেশেও পড়ে। তাই আন্তসীমান্ত নদী রক্ষার প্রশ্নটি কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি পুরো অঞ্চলের পরিবেশগত নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।
প্রকৃত ভক্তি কখনো প্রকৃতিকে ধ্বংস করতে শেখায় না। বরং যে নদীকে ‘মা’ বলা হয়, তাকে পরিষ্কার রাখা, তার প্রবাহ রক্ষা করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তাকে জীবন্ত রেখে যাওয়াই প্রকৃত শ্রদ্ধা। ধর্মের মাহাত্ম্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন বিশ্বাসের পাশাপাশি দায়িত্ববোধও সমান গুরুত্ব পাবে।
নদী বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে, সভ্যতা বাঁচবে। তাই সময় এসেছে অন্ধ অনুশীলন নয়, সচেতন দায়িত্ববোধকে ধর্মীয় চর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলার।


