কল্পনা করেন একটা সাধারণ সকাল। সূর্য উঠেছে, পাখিরা ডাকছে। ইরানের মিনাব শহরের শাজারেহ তায়্যেবাহ স্কুলে ছোট ছোট মেয়েরা হাসিমুখে ক্লাসে ঢুকছে। তাদের চোখে স্বপ্নের আলো, ব্যাগে নতুন বই, আর মনে ভবিষ্যতের হাজার রঙ। কেউ ডাক্তার হবে, কেউ শিক্ষক, কেউ হয়তো দেশের জন্য কিছু বড় কাজ করবে।
কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি সেই স্বপ্নগুলো এক নিমেষে ধুলোয় মিশে গেল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় স্কুলের ছাদ ধসে পড়ল। বোমার আঘাতে ১৬০-এর বেশি শিশু, বেশিরভাগই ৭ থেকে ১২ বছরের ছোট্ট মেয়ে, চিরতরে চলে গেল। তাদের ছোট ছোট শরীরগুলো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে রইল। কোনো সতর্কতা নেই, কোনো দয়া নেই। শুধু নির্মমতা।
আজও সেই বাবা-মায়েরা প্রতি সন্ধ্যায়, প্রতি রাতে তাদের সন্তানদের ছোট ছোট কবরের পাশে বসে থাকেন। একজন বাবা মেয়ের কবরের ওপর শুয়ে পড়েন, উঠতে চান না। মা কবরে খাবার রাখেন, পানি ছিটিয়ে দেন, মোমবাতি জ্বালান।
যেন সন্তান এখনও ক্ষুধার্ত, এখনও ঠান্ডায় কাঁপছে। খালি বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সাহস হয় না তাদের। যে ঘরে একদিন হাসির শব্দ ছিল, সেখানে এখন শুধু নীরবতা আর শূন্যতা।
আমি নিজে দুই সন্তানের বাবা। যখন এই ছবিগুলো দেখি, যখন এই বাবা-মায়ের চোখের জল দেখি, তখন আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। মনে হয়, এই শিশুগুলো তো আমারই সন্তান হতে পারত।
তাদের হাসি, তাদের খেলা, তাদের ছোট ছোট স্বপ্ন সবকিছু একটা বোমায় শেষ হয়ে গেল। কী করে কেউ ইচ্ছে করে একটা স্কুলে হামলা চালাতে পারে? কী করে কেউ শিশুদের টার্গেট করতে পারে? এই নিষ্ঠুরতার কোনো ব্যাখ্যা হয় না।
এই যন্ত্রণা শুধু ইরানের নয়। ফিলিস্তিনের মাটিতেও একই কান্না বয়ে চলেছে। ছয় বছরের ছোট্ট হিন্দ রাজাব। ফোনে কাঁদতে কাঁদতে সে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল। “আমাকে বাঁচাও, প্লিজ…” তার কণ্ঠস্বর এখনও কানে বাজে। কিন্তু তিনটে ইসরায়েলি ট্যাঙ্ক তার গাড়ি ঘিরে ফেলল। আর তারপর নীরবতা। তার মৃত্যুর ওপর তৈরি ডকুমেন্টারিটাও নিষিদ্ধ করে দিল, যাতে ইসরায়েল অসন্তুষ্ট না হয়।
আর নয় মাসের জাভেদ আবু নাসর। তার ছোট ছোট পায়ে সিগারেটের আগুন চেপে ধরা হয়েছিল।
বাবাকে জোর করে সেটা দেখানো হয়েছে, স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য। শিশুটি বেঁচে গেলেও তার শরীর ও মনের ক্ষত কখনো সারবে না। এই ছবিগুলো দেখলে মনে হয়, মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে?
ইরানের মানুষ কিন্তু ভেঙে পড়েনি। একজন ইরানি নারী বলেছেন, “আমি মর্যাদার সঙ্গে মরতে চাই।” এই একটা বাক্যে তাদের সাহস, দৃঢ়তা আর আত্মসম্মান লুকিয়ে আছে। তারা বলছে, আমরা হয়তো অনেক কিছু হারিয়েছি, কিন্তু মাথা নত করব না।
আরও দেখো, গাজায় একটা বোমা-বিধ্বস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে ইসরায়েলি সেনারা নিজেরাই একটা ছোট শিশুকে উদ্ধার করছে।
সেই মুহূর্তে হয়তো একটু আশা জাগে, কিন্তু সেই আশার পাশাপাশি প্রায় ৭০,০০০ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছে। এত মৃত্যু, এত যন্ত্রণা।
এই দুঃখের খবর কাশ্মীরেও পৌঁছেছে। সেখানকার সাধারণ মানুষ ইরানের কষ্ট অনুভব করছে গভীরভাবে। একটা ছোট কাশ্মীরি মেয়ে তার কানের দুল খুলে দান করেছে ইরানের সাহায্যে। বাংলাদেশ রাজনৈতিক নেতারা চুপ, প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে কোনো কথা বলেননি। কিন্তু সাধারণ মানুষের হৃদয় এখনও সজীব। তারা জানে, এটা শুধু রাজনীতি নয়, এটা মানবতার লড়াই।
এদিকে বিশ্বও ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। জার্মানি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICJ) ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েল এখন ক্রমশ একঘরে হয়ে পড়ছে। যারা একসময় তাদের সমর্থন করত, তারাও এখন চুপ করে যাচ্ছে। কিন্তু এই পরিবর্তনটা এত দেরিতে এল কেন? কত শিশুকে মরতে হলো যাতে বিশ্বের চোখ খুলে?
আমরা প্রতিদিন যুদ্ধের খবর দেখি। অস্ত্র, কৌশল, জয়-পরাজয়, প্রচারণা। কিন্তু কেউ কখনো বলে না যে, একটা শিশুর মৃত্যুতে পুরো একটা পরিবারের ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যায়। একটা বাবার চোখের জল, একটা মায়ের বুকফাটা কান্না, একটা খালি দোলনা এগুলো কোনো খবরে আসে না।
আজ আমি শুধু আপনাদের কাছে একটা অনুরোধ করতে চাই।
চোখ বন্ধ কোরবেন না।
এই শিশুদের ছবিগুলো দেখেন ।তাদের কবরের পাশে বসা বাবা-মায়েদের দেখেন।
হিন্দ রাজাবের শেষ কথাগুলো শোনেন ।জাভেদের ছোট পায়ের ক্ষত দেখেন।
এই যন্ত্রণা আমাদের সবার ভেতরের মানুষটাকে জাগিয়ে তুলুক।
যুদ্ধ থামুক। ঘৃণা থামুক।
আর কোনো মা যেন তার সন্তানের কবরে রাত কাটাতে না হয়।
আর কোনো বাবা যেন খালি বাড়িতে ফিরে এসে নীরবে কাঁদতে না হয়।
যতদিন না আমরা এই মানবিকতা ফিরিয়ে আনতে পারব, ততদিন আমরা সবাই কিছুটা অন্ধ থেকে যাব।
এই শিশুরা আমাদের শেখাচ্ছে—জীবন কতটা নাজুক, আর মানুষ হওয়া কতটা জরুরি।
আপনাররা এই গল্পগুলো শেয়ার করুন ,আলোচনা করুন !!চুপ করে থাকবেন না কারণ নীরবতা মানে সম্মতি।
আর আমরা আর কোনো শিশুর মৃত্যুতে সম্মতি দিতে চাই না।


