আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে রাষ্ট্রনেতা হত্যার ঘটনা নতুন নয়, তবে প্রতিবারই তা বিশ্বব্যবস্থার ভেতরের ভঙ্গুরতাকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। আলি খামেনিকে লক্ষ্য করে চালানো সামরিক হামলা এবং তাঁর মৃত্যুর দাবি ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি দেশের শাসকের পরিণতি নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও শক্তির রাজনীতির এক জটিল পরীক্ষা।
বহু বছর ধরে তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উচ্চারিত হয়েছে—ভিন্নমত দমন, বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর পদক্ষেপ, নারীর স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ—সেগুলো আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়েছে। তবে এই সমালোচনার প্রতিকার কীভাবে হবে, তা নিয়ে বিশ্ব কখনো একমত হয়নি। কেউ বলেছে নিষেধাজ্ঞা, কেউ বলেছে কূটনৈতিক চাপ, আবার কেউ অভ্যন্তরীণ গণআন্দোলনের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে। সরাসরি সামরিক আঘাত ও নেতৃত্বকে নির্মূল করার পথ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়মের মধ্যে পড়ে কি না, সেটাই এখন মূল বিতর্ক।
জাতিসংঘের সনদ রাষ্ট্রসার্বভৌমত্বকে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার ভিত্তি হিসেবে ধরে। আত্মরক্ষার স্পষ্ট পরিস্থিতি বা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া শক্তি প্রয়োগ সাধারণত বৈধতা পায় না। কোনও দেশের বিদ্যমান সর্বোচ্চ নেতাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো তাই শুধু সামরিক পদক্ষেপ নয়, এটি আইনি ও নৈতিক প্রশ্নও তোলে। যদি এতে বেসামরিক মানুষ—নারী ও শিশু—নিহত হয়ে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের ‘পার্থক্য’ ও ‘অনুপাত’ নীতির আলোচনাও অনিবার্য হয়ে ওঠে। সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার নামে বেসামরিক প্রাণহানি ঘটলে তা মানবাধিকারের ভাষায় বৈধতা পায় না।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানের নীতি ও আঞ্চলিক প্রভাবকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছে। তাদের যুক্তি, একটি কঠোর ও প্রভাবশালী নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া ভবিষ্যৎ সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে পারে। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড প্রায়ই শূন্যস্থান তৈরি করে, এবং সেই শূন্যস্থান কখনো আরও কঠোরতা, কখনো আরও অস্থিরতার জন্ম দেয়। প্রতিশোধের রাজনীতি দ্রুত বিস্তৃত হয়, আঞ্চলিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে সীমান্তের বাইরে।
মানবাধিকার রক্ষার নামে যদি এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয় যা আরও রক্তপাত ডেকে আনে, তবে নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের পথ—কূটনীতি, বহুপাক্ষিক চাপ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সহায়তা—ধীর এবং জটিল হলেও দীর্ঘমেয়াদে কম বিধ্বংসী হতে পারে। রাষ্ট্রনেতা হত্যার নজির যদি স্বাভাবিক হয়ে যায়, তবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি হয়, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজেদের নিরাপত্তা ব্যাখ্যার ভিত্তিতে অন্য দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে টার্গেট করতে পারে।
অতএব প্রশ্নটি একমাত্রিক নয়। একজন শাসকের কঠোরতা বা বিতর্কিত নীতির সমালোচনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি তার অবসান কোন পথে ঘটবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শান্তি-ভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই হামলাকে অনেকে তাৎক্ষণিক কৌশলগত সাফল্যের বদলে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। বিশ্বরাজনীতির এই অধ্যায় আমাদের আবার মনে করিয়ে দিল—শক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যায়, কিন্তু তার মূল্য প্রায়ই সময়ের সঙ্গে আরও ভারী হয়ে ফিরে আসে।
—আবু হেনা তিমু
বাংলানগর, কেরানিগঞ্জ, ঢাকা
মার্চ ০১ ২০২৬


