ওমরাহ পালন কিংবা পর্যটনের উদ্দেশ্যে যারা সৌদি আরব যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা দিয়েছেন সম্প্রতি দেশটি ভ্রমণ করে আসা এক বাংলাদেশি প্রবাসী। পবিত্র মক্কা ও মদিনাসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ভ্রমণের ১৪ দিনে তিনি অন্তত ৮টি ভিন্ন ভিন্ন কৌশল ও অভিনব প্রতারণার (স্ক্যাম) মুখোমুখি হয়েছেন। তার এই তিক্ত অভিজ্ঞতা নতুন ভ্রমণকারীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই প্রতারক চক্রগুলোর মধ্যে শুধু স্থানীয় নাগরিকরাই নয়, বরং বাংলাদেশি, পাকিস্তানি ও ভারতীয় নাগরিকরাও সক্রিয় রয়েছে। এমনকি পবিত্র কাবার সাফা-মারওয়া পাহাড় এবং মসজিদে নববীতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা মোবারকের সামনেও ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রতারণার ঘটনা ঘটছে।
এক নজরে দেখে নেওয়া যাক ওই ভ্রমণকারীর অভিজ্ঞতায় উঠে আসা ৮টি প্রধান প্রতারণার চিত্র:
- সাফা-মারওয়ায় সাহায্যের নামে প্রতারণা: মক্কায় তাওয়াফ শেষে সাফা-মারওয়া পাহাড়ে যাওয়ার পথে কিছু ব্যক্তি (যেমন: এক ভারতীয় নাগরিক) অত্যন্ত বন্ধুবৎসল আচরণ করে কথা শুরু করে। পরবর্তীতে হুট করেই পরিবারের নানা সংকটের কথা বলে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করে বসে।
- ক্ষৌরকর্ম বা চুল কাটার দামে কারচুপি: সাফা টাওয়ারের নিচে চুল কাটার জন্য প্রথমে ১০ রিয়াল চুক্তি করা হলেও, কাজ শেষে পাকিস্তানি নাপিতরা জোরপূর্বক ২০ রিয়াল দাবি করে বসে।
- খাবারের দোকানে বক্সের চালাকি: মক্কার কিছু বাংলাদেশি হোটেলেও খাবারের পরিমাণ ও বক্স নিয়ে কারচুপির প্রমাণ মিলেছে। ৩০ রিয়ালের খাবারের কথা বলে পরে ‘বক্স বড়’ এই অজুহাতে ৩৫ রিয়াল বা তার বেশি রাখা হয়।
- ট্যাক্সি চালকদের মাঝপথে নামিয়ে দেওয়া: স্থানীয় কিছু ট্যাক্সি চালক চুক্তি করার পরও গন্তব্যে না নিয়ে মাঝপথে যাত্রী নামিয়ে দেয় কিংবা অতিরিক্ত টাকা দাবি করে হেনস্তা করে।
- মানিব্যাগ দেখে টাকা হাতিয়ে নেওয়া: উমলাজ শহরের এক চালক ভাড়া দেওয়ার সময় যাত্রীর মানিব্যাগের ভেতরে থাকা বড় নোট (১০০ রিয়াল) দেখে সেটি জোরপূর্বক বকশিশ হিসেবে দাবি করে বসে।
- যাত্রী সংখ্যা নিয়ে ট্যাক্সি বিতর্ক: লোকাল ট্যাক্সি চড়ার আগে মোট কতজন যাত্রী যাবে তা সুনির্দিষ্টভাবে ভেঙে না নিলে নামার সময় প্রতি জনের জন্য আলাদা ও অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করা হয়।
- ইউরো-ডলারের খোঁজে বাংলাদেশি প্রতারক: কোনো প্রবাসী ওমরাহ করতে এলে এবং তিনি ইউরোপ বা আমেরিকায় থাকেন জানতে পারলে, কিছু চক্র বা পরিচিত ব্যক্তি তার মানিব্যাগে ইউরো বা ডলার আছে কি না তা দেখতে চায় এবং কৌশলে তা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
- রওজা মোবারকের সামনেও মিথ্যাচার: সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাটি ঘটেছে মদিনার মসজিদে নববীতে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা মোবারকের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু ব্যক্তি (যেমন: পাকিস্তানি নাগরিক) চরম বিপদের নাটক করে ২০০ থেকে ৩০০ রিয়াল পর্যন্ত সাহায্য চেয়ে প্রতারণা করছে।
সৌদি আরবে বর্তমানে পর্যটন ও ওমরাহযাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এ জাতীয় অপরাধ দমনে সৌদি পুলিশ ও ব্যাংকগুলো কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটিতে যেকোনো ধরণের আর্থিক প্রতারণা বা হয়রানির শিকার হলে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
- হেল্পলাইন ব্যবহার: মক্কা, মদিনা কিংবা রিয়াদে যেকোনো নিয়ম লঙ্ঘন বা প্রতারণার শিকার হলে সরাসরি emergency services নম্বরে কল করে পুলিশি সহায়তা নেওয়া যায়। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জন্য পুলিশি নম্বর হলো ৯৯৯ (999)।
- আর্থিক লেনদেনে সতর্কতা: অপরিচিত চালক বা কোনো বিক্রেতার সামনে কখনোই নিজের মানিব্যাগ বা কার্ড প্রদর্শন করবেন না। সৌদি ব্যাংকগুলোর নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো অবস্থাতেই আপনার ওটিপি (OTP), পিন (PIN) বা কার্ডের তথ্য কারও সাথে শেয়ার করবেন না।
- যোগাযোগ ও যাতায়াত: মক্কা, মদিনা ও রিয়াদ ছাড়া অন্য দূরবর্তী শহরগুলোতে (যেমন: দাম্মাম, আল আহসা বা উমলাজ) নিজস্ব বা নির্ভরযোগ্য গাড়ি ছাড়া যাতায়াত করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
পবিত্র ভূমির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে হোটেল বুকিং, খাবারের দাম এবং ট্যাক্সি ভাড়া সবসময় আগে থেকেই ভালোভাবে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া উচিত। “ধর্মীয় স্থান মানেই সবাই ভালো মানুষ”—এই সরল বিশ্বাস বুকে নিয়ে অসচেতনভাবে চলাফেরা করলে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরণের আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হতে পারেন ওমরাহযাত্রীরা।








