― Advertisement ―

spot_img

হরিদ্বার টু ঢাকা: পরিচ্ছন্নতার আড়ালে বৈশ্বিক দূষণের মহাকাব্য

হরিদ্বার থেকে কানপুর, কুম্ভ থেকে কানাডা ক্যানবেরা ভারতের এবং বাংলাদেশের ঢাকা  সহ প্রতিটি জেলার 'পরিচ্ছন্নতার প্যারাডক্স' নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ!!⚠️ সতর্কবার্তা: এই প্রতিবেদন পড়ার আগে...
Homeপ্রবাসে প্রতিদিনবার্মিংহাম: নোংরা শহর, নাকি বহু সংস্কৃতির এক জীবন্ত গল্প?

বার্মিংহাম: নোংরা শহর, নাকি বহু সংস্কৃতির এক জীবন্ত গল্প?

সেদিন ফেসবুকে একজনের লেখা পড়ছিলাম। বার্মিংহাম ঘুরে এসে শহরটি সম্পর্কে তাঁর বেশ হতাশাজনক একটা বর্ণনা। মাছের বাজার, চিটাগাং মিষ্টির দোকান, কিছু পুরোনো এলাকা—সব মিলিয়ে বার্মিংহামকে প্রায় একটা ‘নোংরা’ শহর হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন।

পড়তে পড়তে কয়েকবার মনে হলো—ভাই, আপনাকে যদি সামনে পেতাম, একটু বলতাম, বার্মিংহামকে আপনি একটু ভুল জায়গা থেকে দেখেছেন।

আমি শহীদুল ইসলাম। থাকি ইংল্যান্ডে। বার্মিংহামে আমার বসবাস । তাই শহরটিকে নিজের শহর বলেই মনে করি। বহু বছর ধরে এখানকার মানুষজনকে দেখেছি, বিভিন্ন এলাকা ঘুরেছি। আর সবচেয়ে বড় কথা, ব্রিটেনে বসবাস করতে করতে একটা বিষয় বুঝেছি—কোনো শহরের একটি নির্দিষ্ট এলাকার চেহারা দেখে পুরো শহরের চরিত্র নির্ধারণ করা যায় না।

সৈয়দ মাহমুদ
সৈয়দ মাহমুদ,লেখকের বন্ধু।

আপনি যে মাছের বাজার আর চিটাগাং মিষ্টির দোকানের কথা বলেছেন, ছবি দেখে আমার কিন্তু জায়গাটা চিনতে খুব একটা কষ্ট হয়নি। বুঝলাম, আপনি সম্ভবত Lozells–Aston এলাকার দিকে ছিলেন।

হাসতে হাসতে মনে হলো—এই জায়গাটাই যদি আপনার কাছে এত ‘নেস্টি’ মনে হয়ে থাকে, তাহলে একটা মজার তথ্য দিই। এই তথাকথিত ‘নেস্টি’ এলাকার মাত্র দুই-তিন শ গজের মধ্যে একসময় থাকতেন এমন একজন, যিনি নিজের সন্তানদের সেখানকার পাবলিক স্কুলে পড়িয়েছেন। আর সেই সন্তানরা পরে পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাধিকটিতে পড়াশোনা করেছে।

তাই একটা এলাকার পুরোনো বাড়ি, ঘিঞ্জি রাস্তা কিংবা বাজার দেখে সেখানে বেড়ে ওঠা মানুষগুলোর জীবনকে বিচার করতে আমার একটু আপত্তি আছে।

Lozells–Aston বার্মিংহামের পুরোনো শিল্পাঞ্চলঘেঁষা এলাকা। ষাট-সত্তরের দশকে দক্ষিণ এশিয়া, ক্যারিবিয়ানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ যখন কাজের সন্ধানে ব্রিটেনে এসেছিল, তাদের বড় একটি অংশ এসব এলাকাতেই বসতি গড়েছিল। তখন কারখানা ছিল, কাজ ছিল, শ্রমিকদের প্রয়োজন ছিল। মানুষ এসেছিল। পরিবার গড়েছিল। প্রজন্ম তৈরি হয়েছে।

আজও সেই ইতিহাসের ছাপ এলাকাটিতে স্পষ্ট।

হ্যাঁ, সেখানে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা আছে। পুরোনো বাড়ি আছে। কোথাও রাস্তা সুন্দর নয়। কোথাও অপরাধের সমস্যা আছে। এসব অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই।

কিন্তু ভাই, ওই ছবির আরেকটা দিকও আছে।

একটা ছোট এলাকার মধ্যেই আপনি ২৫–২৬টি মসজিদ দেখতে পাবেন। আছে বড় হিন্দু মন্দির, বেশ কয়েকটি গুরুদুয়ারা, মাদ্রাসা ও মক্তব। স্কুল ছুটির পর ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা যখন দল বেঁধে মক্তব-মাদ্রাসার দিকে যায়—আমার কাছে সেটি কোনো ‘নোংরা এলাকার’ দৃশ্য নয়।

এটা অভিবাসী মানুষের নিজের পরিচয়, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসকে ধরে রাখার গল্প।

যে মানুষটি একদিন পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত কিংবা কাশ্মীর থেকে একটি সুটকেস হাতে নিয়ে ব্রিটেনে এসেছিলেন, তিনি শুধু নিজের শ্রমটুকু নিয়ে আসেননি। সঙ্গে এনেছেন নিজের ভাষা, খাবার, ধর্ম, পোশাক, উৎসব, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং স্মৃতি।

পৃথিবীর যেখানেই বাঙালি কিংবা পাকিস্তানি মানুষ গেছেন, তারা নিজেদের একটা ছোট্ট পৃথিবী সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন।

বার্মিংহামেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

আর একটা কথা—Lozells–Aston কিন্তু Birmingham নয়।

যেমন লন্ডনের কোনো একটি এলাকায় দাঁড়িয়ে পুরো London-এর বিচার করা যায় না, তেমনি বার্মিংহামের একটি পুরোনো অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকা দেখে পুরো শহরের মূল্যায়ন করাটাও একটু অন্যায় হয়ে যায়।

আপনি যদি দিনের আলোয় Aston Villa-এর এলাকা, Aston Hall, শহরের পার্কগুলো, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা কিংবা Birmingham-এর বিখ্যাত খালগুলোর পাশে একটু হাঁটতেন, হয়তো শহরটাকে অন্যরকম মনে হতো।

বিশেষ করে Gas Street Basin এলাকায় গেলে আপনার অভিজ্ঞতাটা আরও ভিন্ন হতে পারত। পুরোনো শিল্পনগরীর সেই খালপাড় এখন রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে, সংগীত আর নগরজীবনের এক চমৎকার মিলনস্থল।

Birmingham-এর খালগুলো তো নিজেরাই ইতিহাসের গল্প বলে। শিল্পবিপ্লবের সময় যে খালপথ দিয়ে পণ্য পরিবহন হতো, আজ সেই একই খালের পাশে মানুষ হাঁটে, বসে, খায়, গল্প করে।

আর Birmingham-এর City Centre, Edgbaston, Harborne কিংবা অন্য অনেক এলাকা—প্রতিটির নিজস্ব চরিত্র আছে।

তাই ভাই, আপনার অভিজ্ঞতা খারাপ হয়ে থাকলে অবশ্যই সেটি আপনার অভিজ্ঞতা। সেটাকে আমি ছোট করছি না।

কিন্তু একটা শহরকে শুধু তার সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটা দিয়ে বিচার করলে শহরটির প্রতি যেমন অন্যায় হয়, তেমনি সেখানে বসবাস করা লাখ লাখ মানুষের প্রতিও অন্যায় হয়।

আর নতুন মহল্লায় গিয়ে কিছু দোকান, কিছু মানুষ, কিছু পুরোনো বাড়ি দেখে ‘এ কেমন শহর!’—এই সিদ্ধান্তটা হয়তো একটু দ্রুত হয়ে যায়।

আমি লন্ডনে থাকি। লন্ডনেও এমন এলাকা আছে যেখানে প্রথমবার গেলে ভালো লাগবে না। আবার এমন জায়গাও আছে যেখানে দাঁড়িয়ে মনে হবে—এই শহরের মতো শহর পৃথিবীতে আর নেই।

একই শহরে দুই বাস্তবতা পাশাপাশি থাকে।

বার্মিংহামেও তাই।

হয়তো আপনি বার্মিংহামের একটা দিক দেখেছেন। আমি শুধু বলব—আরেকবার গেলে অন্য দিকটাও দেখে আসবেন।

কারণ বার্মিংহামকে শুধু মাছের বাজার, মিষ্টির দোকান কিংবা রাতের কয়েকটি রাস্তা দিয়ে বিচার করলে শহরটির প্রতি সুবিচার করা হবে না।

আর একটা কথা না বললেই নয়।

আপনার লেখার শেষের কথাটা আমার বেশ ভালো লেগেছে—

“Expectation ছিল না, কিন্তু ভালো লেগেছে।”

হয়তো এটাই Birmingham-এর আসল সৌন্দর্য।

শহরটা প্রথম দেখায় আপনাকে মুগ্ধ করার জন্য বসে নেই।

একটু সময় দিন। একটু হাঁটুন। মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। ইতিহাসটা দেখুন। তারপর হয়তো দেখবেন—যে শহরটাকে প্রথমে খুব সাধারণ মনে হয়েছিল, তার ভেতরেই কত গল্প লুকিয়ে আছে।

শহীদুল ইসলাম
ইংল্যান্ড