রিজওয়ানের ফোন জব্দ ঘিরে ধোঁয়াশা, ফিক্সিং সন্দেহ নাকি ভিন্ন কোনো তদন্ত

পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ রিজওয়ানের ব্যক্তিগত ফোন জব্দের ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। কোনো লিখিত নোটিশ, অভিযোগপত্র, চার্জশিট, পরোয়ানা কিংবা ফোন জব্দের কারণ উল্লেখ করা নথি না দিয়েই তার মোবাইল নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন এই ক্রিকেটার। বিষয়টি এখন গড়িয়েছে লাহোর হাইকোর্ট পর্যন্ত।

ঘটনাটি ঘটে গত ৩০ আগস্ট রাতে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডস টেস্টে পাকিস্তানের হারের পর লন্ডনের একটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন রিজওয়ান। স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক ১টার দিকে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) দুর্নীতি দমন বিভাগের কর্মকর্তা কর্নেল আক্তার তাকে ফোনসহ হোটেলের নিচে আসতে বলেন।

রিজওয়ান নিচে নামার পর দলের এক কর্মকর্তা তাকে ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির (এফআইএ) একজন তদন্তকারীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ওই কর্মকর্তার সঙ্গে সহযোগিতা করার পরামর্শও দেওয়া হয় তাকে।

এরপর বেটিং ও অনলাইন জুয়া নিয়ে রিজওয়ানকে একাধিক প্রশ্ন করা হয়। তবে তার দাবি, কী অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বা কোন ঘটনার তদন্তের অংশ হিসেবে তার ফোন নেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ে তাকে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে সেখানে এফআইএর একজন সদস্যের উপস্থিতি। এফআইএ মহাপরিচালকের অধীনে পরিচালিত হলেও সংস্থাটি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন। আর দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি একই সঙ্গে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি।

ক্রিকবাজের হাতে আসা লাহোর হাইকোর্টে রিজওয়ানের করা পিটিশনে ওই রাতের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ২৭ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত লর্ডস টেস্ট শেষ হওয়ার পর রাত ১টার দিকে তাকে টিম হোটেলের লবিতে ডাকা হয়। সেখানে সরকারি সংস্থার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।

পিটিশনে রিজওয়ান দাবি করেন, আগে থেকে কোনো নোটিশ না থাকা সত্ত্বেও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং কোনো কারণ ব্যাখ্যা না করেই তার মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয়। ফোন জব্দের অনুমোদনসংক্রান্ত কোনো আদেশও তাকে দেখানো হয়নি বলে অভিযোগ তার।

রিজওয়ানের বক্তব্য অনুযায়ী, ডিভাইসটি পরীক্ষা করে তিন ঘণ্টার মধ্যে ফেরত দেওয়া হবে—এমন আশ্বাস পাওয়ার পরই তিনি ফোনটি দেন। কিন্তু সেই সময়সীমা পার হওয়ার পরও ফোনটি ফেরত পাননি তিনি। বর্তমানে সেটি ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির (এনসিসিআইএ) হেফাজতে রয়েছে এবং তার বিষয়ে তদন্ত চলছে।

কর্তৃপক্ষকে পাঠানো এক চিঠিতে রিজওয়ান অভিযোগ করেন, ফোন নেওয়ার পেছনে কোনো লিখিত নোটিশ, দাবি, অভিযোগ, চার্জশিট, পরোয়ানা বা প্রাপ্তিস্বীকারপত্র তাকে দেওয়া হয়নি। এমনকি কোন ঘটনার তদন্ত চলছে, তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ এবং কেন তার ব্যক্তিগত ডিভাইস প্রয়োজন—সেটিও জানানো হয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ

লাহোর হাইকোর্টে করা আবেদনে রিজওয়ান ফোন জব্দের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগও তুলেছেন।

তার পিটিশনে বলা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট আইনগত কর্তৃত্বের কথা না জানিয়ে ফোন জব্দ করে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখা এবং অভিযোগ বা প্রমাণের বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য না দেওয়া তদন্তের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। রিজওয়ানের দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ তাকে হয়রানি ও চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা হতে পারে।

তিনি আরও দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো প্রমাণ নেই। পিটিশনে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বেটিং, স্পট ফিক্সিংসহ দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের জন্য আইসিসির অ্যান্টি-করাপশন ইউনিট (এসিইউ) নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা। রিজওয়ানের দাবি, সংশ্লিষ্ট বিষয়টি এসিইউতে পাঠানো হয়নি।

পিটিশনে আরও বলা হয়, ২০১৬ বা ২০২৫ সালের আইনের অধীনে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া অবস্থায় এনসিসিআইএর তদন্তের এখতিয়ার নেওয়ার আইনগত ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

পিসিবির বক্তব্য

রিজওয়ানের ফোন জব্দ ও তদন্তের বিষয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড অবশ্য বিস্তারিত কোনো অবস্থান জানায়নি। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে ন্যায্য সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে।

পিসিবি আরও জানিয়েছে, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া অনুমাননির্ভর প্রতিবেদন বা যাচাই না করা দাবিকে নির্ভরযোগ্য তথ্য হিসেবে বিবেচনা না করাই উচিত। তবে তাদের বিজ্ঞপ্তিতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পক্ষের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

ফোন জব্দের পর রিজওয়ান এবং জাতীয় দলের আরেক ক্রিকেটার ইমাম-উল-হককে প্রথম সুযোগে পাকিস্তানে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়। দেশে ফিরে রিজওয়ানকে এনসিসিআইএতে হাজির হতে বলা হয়। সেখানে তার সম্পদ, ব্যাংক হিসাবসহ আর্থিক বিষয়গুলোর তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ফোন ফেরত দেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।

এদিকে রিজওয়ানের করা আবেদনে তাৎক্ষণিক স্বস্তি মেলেনি। আদালত জানিয়েছে, এই পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়াই উপযুক্ত বলে তারা মনে করছে।

আইনজীবীর ব্যাখ্যা

ঘটনাটি নিয়ে আইনি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন পাকিস্তানের আইনজীবী তোফাজ্জুল রিজভী। ২০১০ সালের আলোচিত স্পট ফিক্সিং মামলায় তিনি পিসিবির পক্ষে আইনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

ক্রিকবাজকে তিনি বলেন, বর্তমানে রিজওয়ানকে একটি নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং একটি প্রশ্নপত্রের উত্তর দিতে বলা হয়েছে। তার মতে, কোনো ব্যক্তিকে নোটিশ দেওয়া বা তদন্তকারী সংস্থার সামনে হাজির হতে বলা মানেই তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া কিংবা কোনো অপরাধ স্বীকার করে নেওয়া নয়।

রিজভীর ভাষ্য, এ ধরনের প্রক্রিয়া তথ্য সংগ্রহের অংশও হতে পারে। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে রিজওয়ানের বিরুদ্ধে নেতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কিংবা তার সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত নয়।

আইনি ক্ষমতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পাকিস্তানে অনলাইন বেটিং ও জুয়া ফৌজদারি অপরাধ হওয়ায় সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির তথ্য সংগ্রহ ও জিজ্ঞাসাবাদের আইনগত ক্ষমতা রয়েছে। কোনো পাকিস্তানি নাগরিকের কাছে সংশ্লিষ্ট তথ্য থাকার সম্ভাবনা থাকলে তাকে নোটিশ দেওয়া বা সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকার সুযোগও আইনের মধ্যে রয়েছে বলে ব্যাখ্যা করেন তিনি।

ফলে রিজওয়ানের ফোন জব্দ, এনসিসিআইএর তদন্ত এবং এ ঘটনায় তার করা আইনি চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তও এখন পর্যন্ত হয়নি।

আরও পড়ুন

মেসির ফুটবল সাম্রাজ্যে যুক্ত হলো এলদেনসে

0
স্প্যানিশ ফুটবলে এবার মালিক হিসেবে নতুন অধ্যায় শুরু করলেন লিওনেল মেসি। বেশ কিছুদিন ধরেই স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব ক্লাব দেপোর্তিভো এলদেনসে কেনার প্রক্রিয়া চলছিল।...

আরও পড়তে পারেন

মেসির ফুটবল সাম্রাজ্যে যুক্ত হলো এলদেনসে

স্প্যানিশ ফুটবলে এবার মালিক হিসেবে নতুন অধ্যায় শুরু করলেন লিওনেল মেসি। বেশ কিছুদিন ধরেই স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব ক্লাব দেপোর্তিভো এলদেনসে কেনার প্রক্রিয়া চলছিল।...

মালয়েশিয়ার কাছে বড় হারে আসিয়ান কাপ শুরু বাংলাদেশের

শুরুটা ছিল হতাশার। প্রথমার্ধেই দুই গোল হজম করে ম্যাচ থেকে অনেকটাই ছিটকে যায় বাংলাদেশ। বিরতির পর আক্রমণে ফেরার চেষ্টা এবং কয়েকটি ভালো সুযোগ তৈরি...

আর্জেন্টিনার স্কোয়াড থেকে ছিটকে গেলেও মেসির বিদায়ী ম্যাচে থাকবেন তাঁরা

তিনটি প্রীতি ম্যাচের জন্য আর্জেন্টিনার স্কোয়াড থেকে ছিটকে পড়েছেন থিয়াগো আলমাদা ও হুয়ান ফয়থ। চোটের কারণে তাঁদের পাচ্ছেন না আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি।আন্তর্জাতিক বিরতিতে তিনটি প্রীতি ম্যাচে বলিভিয়া, বুরকিনা ফাসো ও বেনিনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। বাংলাদেশ সময় আগামী ১, ৪ ও ৭ অক্টোবর ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে। সব কটি ম্যাচেই স্বাগতিক আর্জেন্টিনা। এর মধ্যে ৭ অক্টোবর বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ক্যারিয়ারের ইতি টানবেন লিওনেল মেসি।