Homeআন্তর্জাতিকক্ষমতা, সংযম ও বিদায়ের রাজনীতি: এঞ্জেলা মার্কেলকে ঘিরে সত্য আর ভাইরাল মিথ

ক্ষমতা, সংযম ও বিদায়ের রাজনীতি: এঞ্জেলা মার্কেলকে ঘিরে সত্য আর ভাইরাল মিথ

শহীদুল ইসলাম
শহীদুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক। দৈনিক আমারদেশ নিউজ।

আধুনিক ইউরোপীয় রাজনীতির ইতিহাসে এঞ্জেলা মার্কেল একটি ব্যতিক্রমী নাম। ২০০৫ থেকে ২০২১—টানা ১৬ বছর তিনি জার্মানির চ্যান্সেলর ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্ব রাজনীতি দেখেছে আর্থিক সংকট, শরণার্থী ঢল, ব্রেক্সিট, কোভিড মহামারি ও ইউক্রেন সংকটের সূচনালগ্ন। অথচ এত দীর্ঘ ক্ষমতায় থেকেও এঞ্জেলা মার্কেলের ব্যক্তিগত জীবন ও ক্ষমতা চর্চা নিয়ে বিতর্ক ছিল আশ্চর্যজনকভাবে কম।

মার্কেলের শাসনামলে তার বিরুদ্ধে কোনো বড় ধরনের দুর্নীতি বা স্বজনপোষণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। জার্মান রাজনীতিতে প্রভাবশালী হওয়া সত্ত্বেও তার পরিবারের কাউকে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর কোনো নজির নেই। ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান হয়েও ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ থেকে তিনি নিজেকে দূরে রাখতে পেরেছিলেন।

ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও মার্কেলের জীবনযাপন ছিল সাধারণ। বার্লিনে তিনি থাকতেন একটি তুলনামূলক সাধারণ অ্যাপার্টমেন্টে—যেটি তিনি ও তার স্বামী ইয়োয়াখিম সাওয়ার বহু আগেই কিনেছিলেন। ব্যক্তিগত বিমান, ইয়ট, বিলাসবহুল ভিলা কিংবা দামী গাড়ির মালিক হওয়ার কোনো তথ্য নেই।

তার পোশাকও হয়ে উঠেছিল আলোচনার বিষয়। বছরের পর বছর প্রায় একই ডিজাইনের রঙিন জ্যাকেট বা টিউনিক পরতে দেখা গেছে তাকে। ২০১৪ সালে জার্মান ট্যাবলয়েড Bild–এ এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তার সংক্ষিপ্ত জবাব ছিল,

“আমি রাজনীতিবিদ, মডেল নই।”
এই মন্তব্যই যেন তার ব্যক্তিত্বের সারকথা।

মার্কেলকে ঘিরে একটি বহুল পরিচিত ঘটনা আছে তার গৃহস্থালি জীবন নিয়ে। এক সাংবাদিক জানতে চেয়েছিলেন—তার বাসায় কি কাজের লোক আছে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, তার বাড়িতে দুজন “কাজের লোক” আছেন—একজন নারী (তিনি নিজে) এবং একজন পুরুষ (তার স্বামী)।
কাপড় ধোয়ার কাজ ভাগাভাগি করে করার কথাও তিনি হাসিমুখে বলেছিলেন—তিনি কাপড় মেশিনে দেন ও সাবান যোগ করেন, আর তার স্বামী মেশিন চালান। রাতেই কাজটি করা হয়, কারণ তখন বিদ্যুতের খরচ কম।

এঞ্জেলা মার্কেলের রাজনৈতিক স্টাইল ছিল সংযত ও বাস্তববাদী। টেলিভিশন শো বা জনসভায় নিজের কৃতিত্ব নিয়ে বড়াই করা তার অভ্যাস ছিল না। আবেগী বক্তৃতার বদলে তিনি পছন্দ করতেন তথ্য, যুক্তি ও ধীর সিদ্ধান্ত।

২০২১ সালে চ্যান্সেলর পদ ছাড়ার সময় তিনি কোনো অস্থিরতা তৈরি করেননি, ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার চেষ্টাও করেননি। বরং শান্তিপূর্ণভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।

বিদায়কালে তাকে দেওয়া হয় জার্মান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা—Großer Zapfenstreich।
জার্মান পার্লামেন্ট বুন্ডেস্টাগে তিনি পান দীর্ঘ স্ট্যান্ডিং ওভেশন।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের নেতারাও প্রকাশ্যে তার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।

এর আগেও, ২০১৮ সালে তিনি যখন নিজ দল CDU–এর নেতৃত্ব ছাড়েন, তখন তার বক্তব্যের পর দলীয় প্রতিনিধিরা টানা ছয় মিনিটের বেশি সময় দাঁড়িয়ে করতালি দিয়েছিলেন।

তবে এঞ্জেলা মার্কেলকে ঘিরে কিছু অতিরঞ্জিত ও মিথ্যা গল্পও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে।

  • পুরো জার্মানির মানুষ একসঙ্গে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ৬ মিনিট করতালি দিয়ে তাকে বিদায় জানিয়েছে—এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।
  • “Lady of the World” বা “ষাট লক্ষ পুরুষের সমান”—এ ধরনের কোনো অফিসিয়াল উপাধি বা স্বীকৃতি তিনি পাননি।
  • সারা দেশ একযোগে আবেগে ভেসে যাওয়ার গল্পগুলো মূলত ভাইরাল পোস্ট ও কল্পনাপ্রসূত বর্ণনা।

এঞ্জেলা মার্কেলকে মহান করে তুলেছে অতিরঞ্জিত কিংবদন্তি নয়, বরং তার সংযম, ধারাবাহিকতা এবং ক্ষমতার প্রতি অনাসক্তি। সত্য আর মিথ আলাদা করে দেখলে স্পষ্ট হয়—তিনি ছিলেন একজন শক্তিশালী নেতা, কিন্তু ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন নন। রাজনীতিতে যেখানে নাটকীয়তা প্রায়ই মুখ্য, সেখানে মার্কেলের শক্তি ছিল নীরবতায়।

-শহীদুল ইসলাম, সম্পাদক, আমারদেশ নিউজ।

বিষয় ভিত্তিক সংবাদ
যোগাযোগspot_img

সর্বাধিক পঠিত