back to top
Saturday, February 28, 2026
Homeআন্তর্জাতিকনিউ ইয়র্কে জার্মানির সোনা: বাড়ছে সন্দেহ, গভীর হচ্ছে ভূরাজনৈতিক বার্তা

নিউ ইয়র্কে জার্মানির সোনা: বাড়ছে সন্দেহ, গভীর হচ্ছে ভূরাজনৈতিক বার্তা

জার্মানির মোট স্বর্ণভাণ্ডার বর্তমানে প্রায় ৩,৩৫০ টন, যা বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম। এর মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ, অর্থাৎ আনুমানিক ১,২৩৬ টন সোনা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের ভল্টে সংরক্ষিত। বর্তমান বাজারদরে (প্রতি আউন্স প্রায় ৫,০০০–৫,১০০ ডলার) এই অংশের মূল্য দাঁড়ায় ১৯০–২০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

এই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ বিদেশে রাখার বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মূল কারণটি অর্থনৈতিক নয়—বরং ভূরাজনৈতিক আস্থার সংকট। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের অবনতি এই বিতর্ককে উসকে দিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সম্ভাব্য বাণিজ্য উত্তেজনা, নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকি, এমনকি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগের বিতর্ক—যাকে কেউ কেউ “Greenland provocation” বলে অভিহিত করছেন—এসব মিলিয়ে অনেকেই মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে এত বড় একটি কৌশলগত সম্পদ রাখা আর আগের মতো নিশ্চিন্ত নয়।

Bundesbank–এর সাবেক গবেষণা প্রধান অর্থনীতিবিদ Emanuel Mönch প্রকাশ্যে বলেছেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আমেরিকায় এত সোনা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ, এবং জার্মানির strategic independence নিশ্চিত করতে ধাপে ধাপে স্বর্ণ দেশে ফিরিয়ে আনা উচিত।

এদিকে জার্মান ট্যাক্সপেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান Michael Jäger আরও কড়া ভাষায় মন্তব্য করেছেন। তার মতে,

“আমাদের সোনা আর ফেডের ভল্টে নিরাপদ বলা যায় না। ট্রাম্প একজন অপ্রত্যাশিত নেতা—রাজস্ব বাড়ানোর জন্য তিনি যেকোনো চরম সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।”

রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। কিছু সংসদ সদস্য, যেমন Marie-Agnes Strack-Zimmermann, এবং বিভিন্ন নাগরিক ও আর্থিক সংগঠন প্রকাশ্যে স্বর্ণ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি তুলছেন। ফলে বিষয়টি আর কোনো প্রান্তিক বা “fringe” ধারণা নয়—এটি এখন জার্মানির মেইনস্ট্রিম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্কে জায়গা করে নিয়েছে।

তবে জার্মান কেন্দ্রীয় ব্যাংক Bundesbank এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে। তাদের বক্তব্য—
যুক্তরাষ্ট্রে রাখা স্বর্ণের নিরাপত্তা নিয়ে তারা এখনও আস্থাশীল, এবং তাৎক্ষণিকভাবে বড় পরিসরে repatriation–এর কোনো পরিকল্পনা নেই।

উল্লেখযোগ্য যে, ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে Bundesbank নিউ ইয়র্ক ও প্যারিস থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণ জার্মানিতে ফিরিয়ে এনেছিল। বর্তমানে জার্মানির মোট স্বর্ণভাণ্ডারের অর্ধেকেরও বেশি দেশেই সংরক্ষিত। তবে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক ও জনমতের চাপে ভবিষ্যতে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে—এমন ইঙ্গিত আলোচনায় স্পষ্ট।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোও এই বিতর্ককে তীব্র করেছে। প্রতি আউন্স ৫,১০০ ডলারের বেশি দামে জার্মান স্বর্ণভাণ্ডারের আর্থিক ও প্রতীকী মূল্য—দু’টোই বেড়েছে। ফলে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আবেগও আরও গভীর হচ্ছে।

এই বিতর্ক কেবল সোনা কোথায় রাখা হবে—সে প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আসলে বিশ্ব অর্থব্যবস্থায় আস্থা, ডলারের আধিপত্য এবং পশ্চিমা জোটের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসের প্রতিফলন।
যদি জার্মানি সত্যিই বড় পরিসরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বর্ণ ফিরিয়ে আনে, তাহলে তা হবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এক শক্তিশালী বার্তা—যা ডলার-কেন্দ্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে।

এটি এখন আর শুধু হিসাবের খাতা নয়; এটি একটি স্পষ্ট ভূরাজনৈতিক সংকেত।

বিষয় ভিত্তিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত