বাংলাদেশের মতো একটি দেশে এখনো শিশু পাচার, বাল্যবিবাহ এবং শিশুশ্রম বড় সামাজিক সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান। ওয়ার্ল্ড ভিশনের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মহামারির সময় বাল্যবিবাহের হার ৪৮% বেড়েছে। ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রম ২৮% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের মধ্যে তা পৌঁছেছে ৩৫%-এ। একই সময়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০,০০০ শিশু পাচারের শিকার হয়।এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও নাইমের মতো তরুণরা আশার আলো জ্বালাচ্ছে—শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের টঙ্গীর ঘনবসতিপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে বেড়ে ওঠা মাহমুদুর রহমান নাইম বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের ন্যাশনাল চাইল্ড অ্যান্ড ইয়ুথ অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য এবং ইয়ুথ ফোরামের আইটি সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি জেলা শিশু ফোরামের সহ-সভাপতি ছিলেন।মাত্র ২১ বছর বয়সে, ২০২১থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে তিনি ১১৮টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, ১৫ জন শিশু যৌন হয়রানির শিকার ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছেন, ১৮টি শিশু ধর্ষণ মামলায় অপরাধীদের গ্রেপ্তারে সহায়তা করেছেন এবং ১১ জন শিশুকে পাচার থেকে উদ্ধার করেছেন।“মিতার নিখোঁজ হওয়ার খবর শুনে আমি তার বাড়িতে যাই এবং তার মায়ের সঙ্গে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সাত দিন পর আমরা তাকে খুঁজে পাই। মনে হয়েছিল যেন আমি আমার নিজের বোনকে ফিরে পেয়েছি,” নাইম স্মৃতিচারণ করেন।
প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই
নাইম অল্প বয়সেই বাবা-মাকে হারান এবং দাদি ও চাচার তত্ত্বাবধানে বড় হন। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন লাজুক ও অন্তর্মুখী, জনসম্মুখে কথা বলতে ভয় পেতেন।“একদিন দেখলাম আমার বয়সী কয়েকজন ছেলে মিটিং করছে। জানতে পারলাম তারা শিশু ফোরামের সদস্য। সেখান থেকেই আমার জীবনের পরিবর্তন শুরু,” তিনি বলেন।শিশু ফোরামের মাধ্যমে তিনি শিশু অধিকার, সুরক্ষা, সাংবাদিকতা, শিশু আইন, নেতৃত্ব ও অ্যাডভোকেসি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। ধীরে ধীরে তিনি নিজেও একজন প্রশিক্ষক এবং উল্লেখযোগ্য যুব নেতা হয়ে ওঠেন।### শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রমনাইমের নেতৃত্বে টঙ্গী ও আশপাশের ৩০টির বেশি স্কুল ও কলেজের ৩,০০,০০০-এরও বেশি শিক্ষার্থী শিশু অধিকার, সুরক্ষা, পাচার এবং বাল্যবিবাহ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ পেয়েছে।এছাড়াও, ফেসবুক লাইভ ও অনলাইন ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে তিনি ৩,০০,০০০-এরও বেশি মানুষের মধ্যে শিশু সুরক্ষা বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করেছেন।তিনি নিজ উদ্যোগে ফেসবুকভিত্তিক তিনটি সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করেছেন:১. শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা২. শিশুশ্রম প্রতিরোধ৩. প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সম্মাননাতার মানবিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ নাইম পেয়েছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মাননা:* ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক “ইন্টারন্যাশনাল লিডার” উপাধি* ওয়ার্ল্ড ভিশন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও হংকং থেকে আন্তর্জাতিক শিশু ও যুব অ্যাডভোকেট হিসেবে বিশেষ স্বীকৃতি* *দ্য বিকন* ম্যাগাজিনে “ইন্টারন্যাশনাল হিরো” হিসেবে প্রকাশ* লন্ডনের লিগ্যাসি প্রজেক্ট থেকে “গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর” সম্মাননা* জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে সেমিনার ও আলোচনায় অংশগ্রহণ“আগে পুলিশ বা সরকারি কর্মকর্তাদের দেখলে ভয় পেতাম। এখন তাদের সঙ্গে কাজ করি। তারা আমার কাজকে সমর্থন ও অনুপ্রাণিত করেন,” বলেন নাইম।গ্যাংস্টার ও অপরাধীদের হুমকি থাকা সত্ত্বেও তিনি জেলা প্রশাসক, পুলিশ ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে শিশু সুরক্ষায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
নাইমের লক্ষ্য হলো একটি সহিংসতামুক্ত, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা।তিনি এমন একটি “শিশুবান্ধব সমাজ” গড়তে চান, যেখানে প্রতিটি শিশুর অধিকার, শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।“পরিবর্তন আনা সবসময়ই কঠিন। কিন্তু আমার স্বপ্ন এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কোনো শিশুর চোখে আর অশ্রু থাকবে না,” আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন নাইম।


