যুক্তরাষ্ট্রের H-1B ভিসা কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিভা আকর্ষণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বিশেষ করে ভারত, চীনসহ কয়েকটি দেশ এই ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দক্ষ কর্মী পাঠিয়ে আসছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম—এ বাস্তবতা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আলোচনায় আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রশ্নটি শুধু “কত ভিসা পাওয়া গেল” নয়; বরং “কেন কম পাওয়া যাচ্ছে”—এই কাঠামোগত কারণগুলো বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষা ও ট্যালেন্ট পাইপলাইনের বাস্তবতা
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান থাকলেও, বিশেষ করে প্রযুক্তি ও ইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষেত্রে গবেষণা-নির্ভর (research-driven) এবং ইন্ডাস্ট্রি-ইন্টিগ্রেটেড শিক্ষা এখনো সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক টেক কোম্পানিগুলোর প্রত্যাশিত “ready-to-work global engineer” তৈরির ধারাবাহিক পাইপলাইন তৈরি হয়নি।
ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্নভাবে গড়ে উঠেছে। সেখানে IIT, NIT, IIIT-এর মতো বহু প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে কঠোর ভর্তি প্রক্রিয়া, গবেষণা পরিবেশ এবং ইন্ডাস্ট্রি কানেকশনের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী প্রতিভা প্রবাহ তৈরি করেছে। তবে এটি একমাত্র কারণ নয়—বিশাল জনসংখ্যা, দীর্ঘদিনের গ্লোবাল টেক ইন্ডাস্ট্রি কানেকশন এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমও বড় ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং খাতে সাফল্য থাকলেও প্রোডাক্ট-ভিত্তিক সফটওয়্যার কোম্পানি, গভীর গবেষণা এবং স্কেলেবল টেক স্টার্টআপ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে আন্তর্জাতিক কর্পোরেট হায়ারিং পাইপলাইনে দৃশ্যমানতা কমে যায়।
নেটওয়ার্কিং ও গ্লোবাল এক্সপোজার
প্রযুক্তি বিশ্বে “নেটওয়ার্ক ইফেক্ট” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ববর্তী ব্যাচের কর্মীরা যখন বড় কোম্পানিতে কাজ করেন, তখন নতুন প্রার্থীদের জন্য রেফারেল, ইন্টার্নশিপ এবং হায়ারিং সুযোগ সহজ হয়।
ভারতীয় প্রফেশনালদের ক্ষেত্রে এই নেটওয়ার্ক বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশি টেক কমিউনিটি তুলনামূলকভাবে ছোট এবং ছড়ানো, ফলে একই ধরনের হায়ারিং চেইন শক্তিশালী হয়নি।
নীতি, বিনিয়োগ ও ইকোসিস্টেম
গত এক দশকে বাংলাদেশে “ডিজিটাল বাংলাদেশ” ধারণা এবং বিভিন্ন হাই-টেক পার্ক প্রকল্প প্রযুক্তি খাতে আগ্রহ তৈরি করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও শিক্ষা-গুণমান, গবেষণা ফান্ডিং এবং একাডেমিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কাঠামোগত ঘাটতি রয়ে গেছে।
ট্যালেন্ট উন্নয়নের জন্য শুধু অবকাঠামো যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বিনিয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, এবং বিশ্ববিদ্যালয়-ইন্ডাস্ট্রি সহযোগিতা।
H-1B নীতি ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্রে H-1B নীতির ভবিষ্যৎও এখন পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে। উচ্চ ফি, বেতন সীমা বৃদ্ধি এবং স্কিল-বেসড সিলেকশন নিয়ে আলোচনা প্রযুক্তি অভিবাসনের পথকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে।
এ ধরনের পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য দ্বিমুখী চাপ তৈরি করতে পারে—একদিকে সুযোগ কমে যাওয়া, অন্যদিকে মানসম্পন্ন দক্ষতা তৈরি না করলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়া।
করণীয় কী?
বাংলাদেশ যদি বৈশ্বিক টেক প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থান নিতে চায়, তাহলে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে:
- বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্র্যাকটিক্যাল ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা বৃদ্ধি
- ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ জোরদার করা
- স্টার্টআপ ও প্রোডাক্ট কোম্পানির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি
- দীর্ঘমেয়াদি স্কিল ডেভেলপমেন্টে বিনিয়োগ
শুধু বিদেশে চাকরির সুযোগ নয়, বরং দেশে বসেই বিশ্বমানের প্রযুক্তি তৈরি করার সক্ষমতা গড়ে তোলাই টেকসই সমাধান।
সবশেষে বলা যায়, H-1B ভিসার পরিসংখ্যান একটি ফলাফল মাত্র—মূল গল্পটি আসলে শিক্ষা, ইকোসিস্টেম এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার।


