Homeমতামতআন্দোলন, আবেগ নাকি অভিনয়: শহীদুল আলমের বিতর্কিত উপস্থিতি

আন্দোলন, আবেগ নাকি অভিনয়: শহীদুল আলমের বিতর্কিত উপস্থিতি

শহীদুল আলমের ব্যাপারটা আমার কাছে পরিস্কার হয় গত বছর জুনে। ফিলিস্তিনিদের জন্য বিখ্যাত মানবাধিকার ও জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থুনবার্গের আয়োজন করা ’গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার’ সময়।

হঠাৎ করে আমরা জানতে পারলাম যে, বাংলাদেশ থেকে শহীদুল আলম সেই যাত্রায় অংশ নিয়েছে। এটা নি:সন্দেহে ভাল খবর।

ফিলিস্তিনের প্রতি বাংলাদেশের একটা সফট কর্নার আছে। একটা অন্যায্য যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুতে গোটা বাংলাদেশ ব্যথিত! ওরকম সময়ে বাংলাদেশ থেকে কেউ একজন ফিলিস্তিনের দিকে যাচ্ছে-আবেগকে নাড়া দেওয়ার মত খবর।

কিন্তু এরপরই শুরু হল শহীদুল আলমের খেলা।

শুরু করলেন ’তিনিই সুমুদের শেষ যাত্রী হিসেবে সুযোগ পেয়েছেন’ গল্প দিয়ে। এরপর জাহাজে বসে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লাইভ, কয়েক মিনিট পরপর পোস্ট, যাত্রার রোমহর্ষক বর্ণনা যখন তিনি দিচ্ছেন, তখনো তাদের জাহাজ মুলত স্পেনের সীমান্তে। ফিলিস্তিন তখনো হাজার কিলোমিটার দূরে।

কিন্তু এত গভীরে ঢোকার সময় যেমন মানুষের হাতে নেই, অধিকাংশ মানুষও বুঝেও না এত চক্রান্ত! ফলে শহীদুল আলমের ফলোয়ার বাড়তে থাকলো হুহু করে। লোকটা এতটা এটেনশন সিকার যে, প্রতিদিন কতজন ফলোয়ার বাড়ছে- সেসময় ওটার আপডেট দিতেও ভুলেনি। ভাবুন একবার? একটা মানুষ জীবন হাতে নিয়ে ফিলিসতিন যাচ্ছে, আর এর মধ্যেই আপডেট দিচ্ছে যে, তার কত ফলোয়ার বাড়ছে 🤓

এর মধ্যে তিনি একটা ব্লান্ডার করে ফেললেন! তার জাহাজে যদি ইসরায়েলের নৌবাহিনী হামলা করে তখন কি পরিস্থিতি হবে, সেটা একটা ডেম্যু ভিডিও শ্যুট করে ঢাকার টিমের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। বলে রাখলেন যে, ঢাকার সাথে শহীদুলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে যেনো এই পোস্টটা শেয়ার করা হয়।

সম্ভবত তাদের নিজেদের মধ্যে কমিউনিকেশন গ্যাপ হওয়ার কারণে সেই ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট হয়ে যায়। যদিও তারা বলেছে যে, ভুলে পোস্ট হয়ে গেছে। আর সঙ্গে সঙ্গে তাদের পালিত মিডিয়া নিউজ করে দেয় যে, ’শহীদুলদের জাহাজে ইসরায়েলি বাহিনী হামলা করেছে।’ শিবির ঢাকায় মিছিল বের করে, ’শহীদুলের কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে।’ বিবৃতি ইউনূসও ফেসবুকে গল্প লিখে শেয়ার করে দিল।

পরে জানা গেল, গোটা জিনিসটাই ছিল ভুয়া। ইসরায়েলতো দূরের কথা, শহীদুলদের জাহাজ কখনো স্পেনের সমুদ্র সীমাই পার হয়নি। শহীদুল যখন এসব নাটক করছেন, ততক্ষণে গ্রেটা থুনবার্গ গ্রেপ্তার হয়ে, তার দেশ সুইডেনে ডিপোর্ট হয়ে গেছে।

ধরুন, এই ভিডিওটা ’ভুল করে পোস্ট’ হয়নি। শহীদুলদের জাহাজে ইসরায়েলি বাহিনী হামলা করেছে এবং এরপর তার টিম এই ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করেছে। মানুষ ওই ভিডিওতে শ্যুট করা ঘটনা সত্যি হিসেবে ধরে নিতো না? এটা কি এথিক্যাল হত?

দেশে ফেরার তিন দিন পর, গ্রেটা থুনবার্গ সংবাদ সম্মেলন করতে এসে জানালেন যে, তিনি সমুদ ফ্লটিলার স্টিয়ারিং কমিটি থেকে পদত্যাগ করছেন, যার কারণ হলো শহীদুলের মত এটেনশন সিকারদের নাটক। না, তিনি শহীদুলের নাম বলেন নি। বলেছেন, ”সুমুদ ফ্লোটিলা ক্ষতিগ্রস্ত গাজাবাসীর চেয়ে মিডিয়া ফোকাসের ওপর বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।”

মানবিক সাহায্য কাজে যারা যুক্ত, তারা জানে যে এটা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। আপনি যখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে যাবেন, সেখানে আপনাকে চারটা মূল নীতি মেনে চলতেই হবে। humanity, impartiality, neutrality, independence। এর বাইরে কাজের স্বচ্ছতা, জবাবহিদীতা ও জনসমর্থন পাওয়ার জন্য গণমাধ্যমকে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সেটা যেনো কোনোভাবেই মূখ্য হয়ে না ওঠে।

মানবিক সাহায্য কর্মসূচি চালাতে গিয়ে মিডিয়ার ব্যবহার নিয়ে একটা বহুল প্রচলিত উক্তি আছে। বলা হয়, মিডিয়ার কাজ হবে, মানুষের কষ্ট ”দেখানো”, ‘বিক্রি’ করা না।

অথচ প্রথম দিন থেকে শহীদুল ফিলিস্তিনবাসীর প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আবেগকে বিক্রি করে ফেসবুকে ফলোয়ার বাড়িয়েছেন।

…..
সে সময় ”ভুলে পোস্ট হয়ে যাওয়া” ভিডিওটা দেখে আমার হুট করে ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কথা মনে পড়ে গেল।

ধানমন্ডিতে আন্দোলনকারীদের সাথে হেলমেটবাহিনীর সংঘর্ষ হয়। তখন ওই হেলমেটবাহিনীকে আমরা ছাত্রলীগ বললেও, এখন আর সরাসরি ছাত্রলীগ বলতে রাজি নই আমি। তারা যে গুপ্ত বাহিনী নয়, সেটার নিশ্চয়তা কে দেবে?

তো সন্ধ্যায় যখন ওই এলাকাটা থমথমে, শহীদুল তার ক্যামেরা নিয়ে বের হলেন। কিছুক্ষণ আগে মারপিট হয়েছে বলে থমথমে সন্ধ্যার ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে ভয়ার্ত গলায় এমনভাবে ধারাভাষ্য দিতে থাকলেন যে, মনে হচ্ছে কোনো যুদ্ধের ময়দানে হাঁটছেন তিনি। তার যেহেতু বিদেশী কানেকশন ভাল, সাথে সাথে সেই গুজব ছড়িয়ে পড়ল এবং গুজব ছড়ানোর অভিযোগে তখনকার সরকার শহীদুলকে গ্রেপ্তার করল।

ব্যস, শহীদুল তার গায়ে মজলুমের কুর্তা পরার সুযোগ পেয়ে গেলেন। দেশের চেতনার শরীরে আঘাত করার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্প শুরু হল তার।

শেখ হাসিনা তাকে বেশিদিন আটকে রাখতে পারেনি। বিদেশী চাপে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এরপর শহীদুল তার সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেছেন শেখ হাসিনাকে গদিচ্যুত করতে। বলা হয়, বাংলাদেশে তুরস্ক কানেকশনের প্রধান কুশীলব এই শহীদুল। আমেরিকার বিরুদ্ধে একটা শব্দ লিখলে যেখানে ভিসা বাতিল হয়, সেখানে ফিলিস্তিনের পতাকা গায়ে ফ্লটিলায় চড়লেও একমাত্র ওনারই ভিসা বাতিল হয়না। আজব ব্যাপার না?

জুলাই-আগস্টে যে শহীদুল খুবই এক্টিভ রোল প্লে করেছেন, সেটাতো সবারই জানা। বলা হয়, ইউনূসের সময়ে যে ডিপ স্টেট কার্যকর ছিল, তার প্রধান সংযোগ কর্তা শহীদুল। তবে এই বক্তব্যের পেছনে শক্ত কোনো প্রমাণ আমি দিতে পারবনা।

যে সব কারণে ইউনূসকে গদি ছাড়তে হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল দীপু দাশকে পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনা। এই নারকীয় তান্ডবের ভিডিও যখন পৃথিবীব্যাপি ছড়িয়ে পড়েছে, তখন ইউনূসকে বাঁচানোর জন্য শহীদুল ময়মনসিংহ গিয়ে হাজির হন। দীপুর স্ত্রী ও পরিবারের লোকজনের ছবিটবি তোলেন। তারপর এই মর্মে স্ট্যাটাস প্রসব করেন যে, ’শেখ হাসিনার স্বৈরাচারি শাসনের ফলে মানুষ এতটাই ক্ষুব্ধ যে, তারা একে অপরকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে।’ কথায় আছে, ১০ দিন চোরার হলে একদিনতো গৃহস্থের হবেই। এই স্ট্যাটাসের কারণে দেশেতো বটেই; এমনকি বিদেশী কমিউনিটির কাছেও শহীদুল সমালোচিত হন।

প্রথম আলো ডেইলি স্টারে আগুন দেওয়ার রাতের কথাও মনে করতে পারেন। প্রথম আলোয় আগুন দেওয়ার পর নিউ এইজের সম্পাদক নূরুল কবীর সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন। তৌহিদী জনতাকে নিবৃত্ত করার অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন তিনি। এরপর সরকারের সব গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টােদেরকে ফোন দিয়েও কিছু করতে পারেন নি জনাব কবীর। পারবেন কি করে? আগুন দেয়া লোকেরাতো নূরুল কবীরকে চিনেনা। কথিত আছে, এরপর প্রথম আলোর অনুরোধে শহীদুল আলম ঘটনাস্থলে হাজির হন। তিনিই তৌহিদী জনতাকে নিবৃত্ত করেন। খুবই স্বাভাবিক। তার লোকেরাতো তার কথা শুনবেই।

লেখাটা শেষ করি। যদিও মূল কথা এই লেখায় বলা গেলনা।

একটা চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে দেশ যখন ক্রমশ নরমালাইজ হতে শুরু করেছে, তখন শহীদুল আলমও সক্রিয় হতে শুরু করেছেন। সংসদ ভবনের সামনে মানববন্ধন থেকে শুরু করে জামায়াত-শিবিরের সেমিনার, কিংবা ঢাকায় প্রগতিশীলদের আলোচনা সভা, সবখানে শহীদুল হাজির।

একটা নির্বাচিত সরকার শপথ গ্রহণের ৪৪ দিনের মাথায় শহীদুল হুমকি দিচ্ছে যে, সে সরকারকে ফেলে দেওয়ার ক্ষমতা তিনি রাখেন। সরকারের ভুল থাকলে তার সমালোচনা হতে পারে, ভুল সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে, এটাইতো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া! কিন্তু ৪৪ দিন বয়সী সরকারকে ফেলে দেওয়ার হুমকি আর যে-ই দিক, সেই সরকারের শুভাকাঙ্খী কেউ যে দিতে পারেনা, এটি নিশ্চয় না বললেও চলবে? তাহলে তিনি কার শুভাকাঙ্খী?

শহীদুল এখন জাশির অনুষ্ঠানে হাজিরা দিচ্ছেন। এতে লাভটা কি হয় জানেন? প্রগতিশীলতার ভেক ধরা লোকটা যখন জাশির অনুষ্ঠানে হাজির হয়, তখন জাশির দর্শনকে বৈধতা দেওয়া হয়, তাদের দেশবিরোধী, মানবতাবিরোধী রাজনীতিকে নরমালাইজ করা হয়। এছাড়া আর কোনো কারণ নেই এ কারণে বলছি যে, জাশি এখন আর কোনো মজুলম সংগঠন নয়। গত পৌনে দুই বছর ধরেতো নয়ই, অবশ্য এর আগেও ছিল বলে আমি মনে করিনা। এটাই হল শহীদুলদের প্রজেক্ট!

এই গোটা চক্রান্তে শহীদুল একা নয়, তার সাথে তথাকথিত বাম ও প্রগতিশীলতার বেশ ধরে সভা সেমিনারে বক্তৃতা ঝাড়ার একটা বড় গ্রুপ আছে। ঢাকার আকাশ-বাতাসে এ খবর ছড়িয়ে আছে যে, গত দেড় বছর এদের প্রত্যেকেই নানাভাবে সিন্নি-রুটির ভাগ পেয়েছে।

কিছুদিন আগে দৃকে শহীদুল শেখ হাসিনার ছবির নানা বিকৃত ভঙ্গিমার একটা প্রদর্শনী করেছেন। বেশ ভাল কথা! এবার খোঁজ নিয়ে দেখুন তো, একাত্তরের গণহত্যার কুশীলব ইয়াহিয়া কিংবা টিক্কা খানদের ছবি নিয়ে ওরকম কোনো প্রদর্শণী শহীদুল কখনো করেছেন কিনা? এতেই পরিস্কার হবে, সুমুদে চড়ে বসা কিংবা গলায় ফিলিস্তিনের মাফলার ঝুলিয়ে ঘোরাটা স্রেফ মৌলবাদী চরিত্রকে আড়াল করার ঢাল ছাড়া আর কিছুই নয়।

লেখক: রাজু নরুল। এক্টিভিস্ট,ফেসবুক।

মূল লেখা: ফেসবুকে প্রকাশিত

বিষয় ভিত্তিক সংবাদ
যোগাযোগspot_img

সর্বাধিক পঠিত