একটি দেশের অর্থনীতির শক্তি অনেকাংশে নির্ভর করে তার ব্যাংকিং খাতের ওপর। কারণ ব্যাংক শুধু আমানত গ্রহণ করে না, সেই অর্থ উৎপাদন, শিল্প, কৃষি ও ব্যবসায় বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির পথও তৈরি করে। কিন্তু যখন সেই ঋণের বড় একটি অংশ আর ফেরত আসে না, তখন সংকট শুধু ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন এমনই এক বাস্তবতার মুখোমুখি। খেলাপি ঋণের পরিমাণ কয়েক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে এবং মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি অর্থনীতির ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, অনিয়ম এবং জবাবদিহির সংকটের প্রতিচ্ছবি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে প্রকৃত আদায়ের চেয়ে হিসাবের কৌশল অনেক বেশি আলোচিত হচ্ছে। ঋণ পুনঃতফসিল, সংজ্ঞা পরিবর্তন, কম ডাউন পেমেন্টে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বিন্যাস কিংবা বিশেষ এক্সিট সুবিধার মাধ্যমে অনেক ঋণকে কাগজে খেলাপির তালিকা থেকে সরানো সম্ভব হলেও বাস্তবে সেই অর্থ ব্যাংকে ফিরে আসে না। ফলে কাগজে পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক দেখালেও মূল সমস্যা থেকে যায় আগের জায়গাতেই।
একইভাবে বিপুল পরিমাণ সুদ মওকুফ বা ওয়েভারের নীতিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রকৃত সংকটে পড়া উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়তা প্রয়োজন—এ নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু যখন একই সুবিধা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কাছেও পৌঁছে যায়, তখন এটি সৎ ঋণগ্রহীতাদের প্রতি অন্যায় এবং আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য ক্ষতিকর বার্তা হয়ে দাঁড়ায়। এতে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতিও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
অন্যদিকে উচ্চ সুদের হার, কঠোর মুদ্রানীতি, কমে যাওয়া বেসরকারি বিনিয়োগ, ধীর ঋণপ্রবাহ এবং নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে অর্থনীতি একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের বেতন বকেয়া, নতুন শিল্প বিনিয়োগে অনীহা এবং বাজারে আস্থার ঘাটতি এই সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ। ব্যাংকের অর্থ যদি উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত না হয়, তবে কর্মসংস্থান, আয় ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ঋণ কেলেঙ্কারির ইতিহাসও নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনিয়মিত ঋণ গ্রহণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল তদারকির অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনার দায় শুধু একটি সরকারের ওপর চাপিয়ে দিলে বাস্তবতা পুরোপুরি ধরা পড়ে না। বরং দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব, জবাবদিহির অভাব এবং ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের সংস্কৃতি মিলেই আজকের সংকট তৈরি করেছে।
তবে এটিও সত্য যে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করার জন্য কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। খেলাপি ঋণ কমানো, ব্যাংকের মূলধন শক্তিশালী করা, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন বা একীভূতকরণ এবং আইনি কাঠামো উন্নয়নের চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও আর্থিক খাত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কেবল নীতিমালা পরিবর্তন করলেই হবে না; সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
এখন সবচেয়ে প্রয়োজন চারটি বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি। প্রথমত, প্রকৃত অর্থে ঋণ পুনরুদ্ধার করতে হবে; প্রয়োজনে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সম্পদ জব্দ ও বিক্রির মতো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রভাবশালী বা সাধারণ—সব ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরতে হবে; কাগজে-কলমে সংখ্যা কমিয়ে সমস্যাকে আড়াল করলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিই বাড়বে। চতুর্থত, ব্যাংকিং সংকটের সামাজিক প্রভাব কমাতে শ্রমিকদের বেতন, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অর্থনীতি বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আমানতকারী বিশ্বাস করেন তার অর্থ নিরাপদ, বিনিয়োগকারী বিশ্বাস করেন নীতিমালা সবার জন্য সমান, আর উদ্যোক্তা বিশ্বাস করেন সৎভাবে ব্যবসা করলে তিনি ন্যায্য সুযোগ পাবেন। সেই বিশ্বাস দুর্বল হয়ে গেলে শুধু ব্যাংক নয়, পুরো অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
খেলাপি ঋণের সংকট তাই কেবল একটি আর্থিক সমস্যা নয়; এটি সুশাসন, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতারও পরীক্ষা। কাগজে সংখ্যা কমানো নয়, বাস্তবে অর্থ ফেরত আনা, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।


