একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং একসময়কার উচ্চপদস্থ এক নেত্রীর গ্রেফতার—দুটি ভিন্ন ঘটনা, কিন্তু অদ্ভুতভাবে তারা একই প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করায়: মেধা ও অবস্থান কি কখনো দায়মুক্তির ঢাল হতে পারে?
আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। ঘটনাটি শুধু একটি প্রাণহানির নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, ক্যাম্পাস সংস্কৃতি এবং সামাজিক মূল্যবোধের গভীর সংকটকে উন্মোচিত করেছিল। সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক ছিল—যারা এই হত্যার সঙ্গে জড়িত, তারাও একই প্রতিষ্ঠানের মেধাবী ছাত্র। অর্থাৎ, এখানে অপরাধের বিপরীতে দাঁড়ানো “অশিক্ষা” নয়, বরং “নৈতিকতার অভাব”।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা লালন করেছি—যে ভালো ছাত্র মানেই ভালো মানুষ। কিন্তু বাস্তবতা বারবার দেখিয়েছে, একাডেমিক সাফল্য এবং মানবিক মূল্যবোধ এক জিনিস নয়। পরীক্ষায় প্রথম হওয়া, নামকরা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া—এসব অর্জন একজন মানুষের চরিত্রের নিশ্চয়তা দেয় না।
এই একই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে সাবেক স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরীর গ্রেফতার প্রসঙ্গে। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, পারিবারিক পটভূমি, আন্তর্জাতিক ডিগ্রি—সবকিছুই নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু যখন বিচার বা জবাবদিহির প্রসঙ্গ আসে, তখন কি এসব অর্জন তাঁকে আলাদা কোনো অবস্থান দেয়?
সমস্যাটা এখানেই—আমরা প্রায়ই ব্যক্তির অতীত সাফল্য দিয়ে বর্তমানের প্রশ্নগুলো ঢেকে দিতে চাই। সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, অনেকে তাঁর একাডেমিক কৃতিত্ব সামনে এনে গ্রেফতারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। কিন্তু আইন ও ন্যায়বিচারের জায়গায় ব্যক্তিগত গৌরবের কোনো ভূমিকা থাকা উচিত নয়।
ইতিহাসও আমাদের একই শিক্ষা দেয়। অনেক সময় বড় নেতাদের মূল্যায়নে তাঁদের সাফল্যগুলো উচ্চস্বরে বলা হয়, কিন্তু বিতর্কিত বা অন্ধকার অধ্যায়গুলো নীরবে পাশ কাটানো হয়। এই নির্বাচনী স্মৃতিই আমাদের বিচারবোধকে দুর্বল করে দেয়।
আসলে, একটি সমাজ তখনই পরিণত হয়, যখন সে তার “মেধাবী” বা “প্রভাবশালী” মানুষদেরও একই মানদণ্ডে বিচার করতে পারে। আইন যদি সবার জন্য সমান না হয়, তাহলে তা আর আইন থাকে না—তা হয়ে যায় প্রভাবের একটি হাতিয়ার।
আবরারের মৃত্যু আমাদের দেখিয়েছে—মেধা থাকলেও মানুষ নৃশংস হতে পারে। আর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে—উচ্চ অবস্থানেও জবাবদিহি থেকে মুক্তি নেই।
সবশেষে প্রশ্নটা আমাদের নিজেদের কাছেই ফিরে আসে: আমরা কি সত্যিই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ চাই, নাকি শুধু “মেধাবী” ও “ক্ষমতাবান”দের জন্য আলাদা মানদণ্ডে অভ্যস্ত হয়ে গেছি?
যদি মেধা মানবতার উপরে উঠে যায়, আর ক্ষমতা ন্যায়বিচারের উপরে দাঁড়ায়—তাহলে সেই সমাজে গর্ব করার মতো অর্জন যতই থাকুক, তার ভিতটা ভীষণ নড়বড়ে।


