Homeমতামতসম্পাদকীয়ইরান: সাম্রাজ্যের কবরস্থান — ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও আমেরিকার নতুন পরীক্ষা

ইরান: সাম্রাজ্যের কবরস্থান — ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও আমেরিকার নতুন পরীক্ষা

শহীদুল ইসলাম
শহীদুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক। দৈনিক আমারদেশ নিউজ।

ইতিহাসের পাতা উল্টালে একটি বিষয় বারবার চোখে পড়ে—বিশ্বের পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যগুলো ইরান (প্রাচীন পারস্য) জয় করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। কেউ সাময়িকভাবে দখল করেছে, কিন্তু স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেনি। কেউ ধ্বংস হয়েছে, কেউ দুর্বল হয়ে পড়েছে, আর কেউ পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।

আজকের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারায় কি যুক্তরাষ্ট্রও যুক্ত হতে যাচ্ছে?

ইতিহাসের আয়নায়: ইরানের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যগুলোর পরিণতি

আলেকজান্ডার থেকে পার্থিয়ান পুনরুত্থান

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট পারস্য জয় করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার মৃত্যু হয় অল্প সময়ের মধ্যেই। তার বিশাল সাম্রাজ্য দ্রুত ভেঙে পড়ে। এরপর পার্থিয়ানরা পুনরায় ইরানি ভূখণ্ডে শক্তি প্রতিষ্ঠা করে।

পার্থিয়ান কারা?
পার্থিয়ানরা ছিল প্রাচীন পারস্যের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (বর্তমান ইরান ও তুর্কমেনিস্তান) ভিত্তিক এক শক্তিশালী সাম্রাজ্য (খ্রিস্টপূর্ব ২৪৭ – খ্রিস্টাব্দ ২২৪), যারা রোমান সাম্রাজ্যের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। পার্থিয়া অঞ্চলের অধিবাসী বা সেই সাম্রাজ্যের সাথে সম্পর্কিত বিষয়কে বোঝায়।

সহজভাবে এর মূল দিকগুলো হলো:

১. পার্থিয়া অঞ্চল: এটি ছিল বর্তমান উত্তর-পূর্ব ইরান এবং দক্ষিণ-পশ্চিম তুর্কমেনিস্তানের একটি অঞ্চল।
২. পার্থিয়ান সাম্রাজ্য: খ্রিস্টপূর্ব ২৪৭ থেকে ২২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত টিকে থাকা এই সাম্রাজ্যটি প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী শক্তি ছিল। এটি রোমান সাম্রাজ্যের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল।

রোমান সাম্রাজ্য পার্থিয়ানদের  (ইরানিদের) সঙ্গে ৩০০ বছর ধরে যুদ্ধ করেও সফল হয়নি। শেষমেশ রোম ধ্বংস হয়, আর পারস্য টিকে থাকে।

৭ম শতাব্দীতে আরব খিলাফত ইরান জয় করে। কিন্তু ইরান আরব সংস্কৃতিকে নিজের মধ্যে  নেয়, রূপান্তরিত করে এবং পরবর্তীকালে নিজস্ব ইরানি রাজবংশ আবার প্রতিষ্ঠা করে।

১৩শ শতাব্দীতে মঙ্গোলরা ইরান দখল করে। কিন্তু তারাও শেষ পর্যন্ত ইরানি সংস্কৃতি ও ধর্মের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ২০শ শতাব্দীতে দুবার উত্তর ইরান দখল করেছিল, কিন্তু চাপে পড়ে সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়, বিশেষ করে ১৯৪৬ সালের সংকটের সময়।

 গত ৩,০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো বড়সড় সাম্রাজ্যই ইরানকে স্থায়ীভাবে পরাধীন করতে পারেনি। ইরানের সভ্যতা অসাধারণ তাদের স্বকিয়তা দেখিয়েছে  সাময়িক পরাজয় সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত টিকে থেকেছে এবং ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

আরব বিজয় ও সাংস্কৃতিক আত্মীকরণ

৭ম শতাব্দীতে আরব খিলাফত ইরান জয় করে। কিন্তু ইরান পুরোপুরি আরব হয়ে যায়নি; বরং ইসলাম গ্রহণ করলেও তারা নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয় ধরে রাখে। পরবর্তীতে আবার ইরানি শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

মঙ্গোল আক্রমণ: জয় থেকে বিলীন

১৩শ শতাব্দীতে মঙ্গোলরা ইরান দখল করে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারাও ইরানের সংস্কৃতি ও ধর্মের মধ্যে আত্মীকৃত হয়ে যায়।

সোভিয়েত ব্যর্থতা

২০শ শতাব্দীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তর ইরানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপ ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ১৯৪৬ সালে তাদের সরে যেতে হয়।

গত তিন হাজার বছরের ইতিহাসে কোনো বড় শক্তিই ইরানকে স্থায়ীভাবে পরাধীন করতে পারেনি। সাময়িক পতন হয়েছে, কিন্তু ইরান বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

কেন ইরান এত কঠিন প্রতিপক্ষ?

১. কৌশলগত গভীরতা

ইরানের বিশাল ভূখণ্ড, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল ও মরুভূমি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা তৈরি করে। প্রায় ৯ কোটির জনসংখ্যা এবং বিস্তৃত ভূগোল আক্রমণকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

২. অসম যুদ্ধের কৌশল (Asymmetric Warfare)

ইরান প্রচলিত যুদ্ধের বদলে কম খরচে কার্যকর যুদ্ধ কৌশল ব্যবহার করে।
যেমন:

  • সস্তা ড্রোন বনাম অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
  • প্রক্সি গ্রুপের মাধ্যমে পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি

এতে প্রতিপক্ষের খরচ বাড়ে, কিন্তু ইরানের খরচ তুলনামূলক কম থাকে।

৩. লড়াইয়ের মানসিকতা ও জাতীয় পরিচয়

ইরানের সভ্যতা হাজার বছরের পুরোনো। রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় বর্ণনায় এই লড়াইকে অনেক সময় অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।

৪. বহুমাত্রিক যুদ্ধ কৌশল

আধুনিক যুদ্ধ শুধু সামরিক নয়—অর্থনীতি, রাজনীতি ও জনমতও গুরুত্বপূর্ণ।

  • আমেরিকার কৌশল: সামরিক শক্তির মাধ্যমে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা
  • ইরানের কৌশল: সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ একসঙ্গে প্রয়োগ

ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে, আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারসাম্য তৈরি করে এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পক্ষে ন্যারেটিভ গড়ে তোলে।

পেট্রোডলার ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার উপর প্রভাব

বিশ্বের তেলের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। এই রুটে বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেতে পারে।

ডলারভিত্তিক তেল বাণিজ্য (Petrodollar system) দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তি। যদি এই ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে, তাহলে তার প্রভাব বিশ্বজুড়ে পড়বে।

১৯৭৩ সাল থেকে বিশ্বের তেল শুধুমাত্র ডলারে কেনাবেচা হয়  এটাই আমেরিকার বৈশ্বিক আর্থিক আধিপত্যের মূল ভিত্তি। ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে (বিশ্বের ২০% তেল এখান দিয়ে যায়)। এটি বন্ধ হলে তেলের দাম ১৫০ ডলারের ওপরে উঠতে পারে, বিশ্বব্যাপী মন্দা দেখা দিতে পারে।

উপসাগরীয় দেশগুলো খাদ্য ও পানির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তারা আমেরিকার বাজারে বিনিয়োগ কমিয়ে দিলে আমেরিকার  শেয়ারবাজার ধসে পড়তে পারে। এভাবে ইরান ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের রক্তক্ষরণ করছে।

ইরান কেন সাম্রাজ্যগুলোকে হারিয়ে দেয়  কাঠামোগত কারণসমূহ

কারণব্যাখ্যা
কৌশলগত গভীরতাইরানের আয়তন বিশাল (ইরাকের চেয়ে ৪ গুণ), ভূখণ্ড দুর্গম (পাহাড়, মরুভূমি) এবং জনসংখ্যা প্রায় ৯ কোটি। এসব স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে। ইরান জয় করতে ৩০-৪০ লাখ সৈন্য লাগবে, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের মোট সক্রিয় সেনাবাহিনী মাত্র ১৩ লাখ।
বিপরীত সামরিক পিরামিডসাধারণ সেনাবাহিনীতে পদাতিক সৈন্য থাকে ভিত্তি হিসেবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের কারণে অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিমানশক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। ফলে যুদ্ধ জয়ের সক্ষমতা কমে যায়।
অসম খরচের খেলাইরানের সস্তা ড্রোন (প্রতিটি প্রায় ৫০,০০০ ডলার) বনাম আমেরিকার দামি ইন্টারসেপ্টর মিসাইল (৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ডলার)। ইরান শত শত সস্তা ড্রোন পাঠিয়ে আমেরিকার ব্যয়বহুল মিসাইল শেষ করে দিতে পারে।
লড়াইয়ের ইচ্ছাশক্তিইরানি সভ্যতার ৩,০০০ বছরের ইতিহাস আছে। তারা এই যুদ্ধকে “শয়তান”এর বিরুদ্ধে পবিত্র যুদ্ধ হিসেবে দেখে। জাতীয় ঐক্য ও দৃঢ় সংকল্প আছে। অন্যদিকে আমেরিকার জনগণের সমর্থন মাত্র ৩০% এর কাছাকাছি, রাজনৈতিক বিভক্তি প্রকট।

যুদ্ধের চারটি মাত্রা এবং দুই পক্ষের কৌশল

যুদ্ধ চারটি মাত্রায় হয়: সামরিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক  (ন্যারেটিভ)।

আমেরিকার কৌশল: সামরিক শক্তি দিয়ে অন্য তিনটি মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় — বোমা মেরে ইরানকে দমিয়ে, অনুগত সরকার বসিয়ে, তেল নিয়ন্ত্রণ করে।

ইরানের কৌশল: সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে একসঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিকভাবে ক্ষেত্রগুলোকে প্রভাবিত করে। এতে ইরানের কৌশলগত পরিপক্বতা অনেক বেশি।

ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু চীন, কাতার, ওমানের মতো বন্ধু দেশগুলোকে অবাধে তেল চলাচল করতে দেয়। রাজনৈতিকভাবে সে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরি করছে। সর্ব ক্ষেত্রেও ইরান বিশ্বব্যাপী সহানুভূতি পাচ্ছে, এমনকি আমেরিকার ভেতরেও।

শাসনব্যবস্থা পরিকল্পনার পার্থক্য

চীন দীর্ঘমেয়াদি, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে বিস্তারিত পরিকল্পনা করে। আর আমেরিকা তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেয়  যেমন ২০২৫ সালের ট্যারিফ যুদ্ধ বা ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত। তারা ইরানের সক্ষমতা ও লড়াইয়ের ইচ্ছাকে একেবারেই খাটো করে দেখেছে।

ভবিষ্যদ্বাণী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

১।ট্রাম্প জিতবেন → হয়েছে??

২।আমেরিকা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যাবে → হয়েছে!!

৩।আমেরিকা এ যুদ্ধে হারবে → প্রত্যাশিত

“হার বলতে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয় নয়, বরং অসহনীয় খরচের কারণে পিছু হটতে বাধ্য হওয়া। যুদ্ধ শেষে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের আধিপত্য বাড়বে।

সাম্রাজ্যগুলোর পতনের কারণ অতিরিক্ত ছড়িয়ে পরা বা বিস্তার লাভ,অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, দুর্নীতি, উদ্দেশ্যহীনতা এবং অহংকার। যুক্তরাষ্ট্র এখন এসব লক্ষণ স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে।

ইরান সত্যিই “সাম্রাজ্যের কবরস্থান”। আফগানিস্তান নয়, ইরানই হাজার হাজার বছর ধরে এই ভূমিকা পালন করে আসছে। ইরানের সভ্যতাগত স্থিতি, কৌশলগত দক্ষতা এবং ধৈর্য আমেরিকার সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স ও রাজনৈতিক অদক্ষতার চেয়ে অনেক বড় প্রমাণিত হবে।

ইরানকে অনেকেই “সাম্রাজ্যের কবরস্থান” বলে আখ্যায়িত করেন। ইতিহাসে দেখা গেছে, বাহ্যিক শক্তি ইরানকে দখল করতে পারলেও তার ভেতরের শক্তিকে ভাঙতে পারেনি।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—
ইতিহাস কখনো হুবহু পুনরাবৃত্তি হয় না, কিন্তু তা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়।

আজকের বিশ্বে ইরান-আমেরিকা সম্পর্ক শুধু দুই দেশের বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

লেখক: শহীদুল ইসলাম, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক আমারদেশ নিউজ।

বিষয় ভিত্তিক সংবাদ
যোগাযোগspot_img

সর্বাধিক পঠিত