হরিদ্বার থেকে কানপুর, কুম্ভ থেকে কানাডা ক্যানবেরা ভারতের এবং বাংলাদেশের ঢাকা সহ প্রতিটি জেলার ‘পরিচ্ছন্নতার প্যারাডক্স’ নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ!!
⚠️ সতর্কবার্তা: এই প্রতিবেদন পড়ার আগে নিজের আঙিনায় একবার চোখ বুলিয়ে নিন!
একটু চোখ বুলাই প্রতিবেশি দেশ পরিচ্ছন্ন ভারত? নাকি ‘পরিচ্ছন্ন ঘর-মলিন রাস্তা’ ভারত? প্রিয় পাঠক, আপনি কি কখনও লক্ষ্য করেছেন আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজের ঘর এতটাই পরিষ্কার রাখেন যে ফ্লোরিংয়ে পড়লে কলিজা ফাটে! কিন্তু সেই একই মানুষ ঘরের বাইরে পা দিলেই যেন বদলে যায়! ঘরের সীমানা পেরোলেই থুতু ফেলা, ময়লা ফেলা, হর্ন বাজানো, আর রাস্তাকে নিজের ‘পার্সোনাল ডাস্টবিন’ বানিয়ে ফেলা এটাই কি আমাদের ‘সভ্যতা’?
আপনি যদি ভাবেন আমি অতিরঞ্জিত বলছি?? তাহলে জেনে রাখুন হরিদ্বারের কুম্ভমেলায় ৭০০০ টন আবর্জনা জমেছিল! সাত হাজার টন! ভগবানের প্রতি ভক্তি ছিল অপরিসীম, কিন্তু সেই ভক্তি কি গঙ্গার জলে মিশে গেল আবর্জনার সঙ্গে?
ভারতের অবস্থা সংখ্যায় যা বলছে!
আমরা যদি পরিসংখ্যান দেখি, তাহলে মাথা হেঁট হয়। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকা ভারতের ১৪টি শহর শীর্ষ ২০-তে!মানে হলো ২০ টি বাজে শহরের মধ্যে ১৪ টি শহর ভারতের!! শব্দদূষণে বিশ্বে ভারত শীর্ষে বিশেষ করে রাজধানী দিল্লি! সড়ক দুর্ঘটনায় বার্ষিক মৃত্যু প্রায় ১.৫ লাখ বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ! পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের হার গ্রামীণ ভারতে ৬০% এর কম মানুষ এখনও খোলা জায়গায় শৌচকর্ম করেথাকে! এখন প্রশ্ন হলো আমরা কি সত্যিই ‘অসভ্য’ নাকি ‘অব্যবস্থাপনার’ শিকার?
রোয়ান্ডা থেকে জাপান যে দেশগুলো আমাদের লজ্জা দেয়!
রোয়ান্ডা আফ্রিকার একটি দেশ যেখানে ভারতের চেয়েও কম মাথাপিছু আয়। অথচ তাদের রাজধানী কিগালি আফ্রিকার সবচেয়ে পরিষ্কার শহর! সেখানে মাসে একদিন ‘উমুগান্ডা’ সমগ্র জাতি একসঙ্গে রাস্তা পরিষ্কার করে! সেখানে আবর্জনা ফেললে জরিমানা কেবল টাকার নয়, সামাজিক বয়কট! জাপান যেখানে শিশুরা স্কুলে নিজেরাই শ্রেণিকক্ষ ও টয়লেট পরিষ্কার করে! তাদের শেখানো হয় পাবলিক প্লেস মানে সবার বাড়ি। আপনারা নিশ্চয় দেখেছেন বিশ্বকাপের পর জাপানি সমর্থকরা স্টেডিয়াম পরিষ্কার করে ফিরে গিয়েছিল! আমাদের দেশে স্টেডিয়াম তো বটেই,ওয়াজের প্যান্ডেল ও আবর্জনা ফেলে আসি!
সিঙ্গাপুর যেখানে রাস্তায় থুতু ফেললে প্রথমবার ১০০০ ডলার জরিমানা, দ্বিতীয়বার পাবলিক ক্লিনিং সার্ভিস! সেখানে ‘কেউ পরিষ্কার করবে’ বলে অপেক্ষা না করে সবাই নিজেকে দায়ী মনে করে। আমাদের সামনেই ‘ভালো’ উদাহরণ ভারতের ইন্দোর শহর! ভারতের মধ্যেও আশার আলো আছে। মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর টানা ৮ বছর ভারতের সবচেয়ে পরিষ্কার শহর! তাদের রহস্য কী? প্রতিদিন বাড়ি থেকে আবর্জনা তোলা, কঠোর নজরদারি, জনসাধারণের অংশগ্রহণ এটা আমার শহর এই মানসিকতা! ইন্দোর প্রমাণ করেছে, অতিরিক্ত টাকা নয়, দরকার সঠিক ব্যবস্থা ও জনসচেতনতা।
আসল সমস্যা কোথায়? ৫টি গভীর কারণ
১. ‘আমার’ বনাম ‘আমাদের’ মনস্তত্ত্ব
আমরা ঘরের ভেতর পরিষ্কার রাখি কারণ সেটা ‘আমার’। রাস্তা ‘আমাদের’ আর ‘আমাদের’ মানে ‘কারও না’! এই মনোবৈজ্ঞানিক সীমানা বাড়াতে হবে শুরু করতে হবে নিজের দরজা থেকে আরও এক মিটার এগিয়ে।
২. শাস্তি নেই বলেই নিয়ম নেই
ভারতেএবং বাংলাদেশ এ অনেক আইন আছে পরিবেশ সুরক্ষা আইন, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধি, মোটর যান আইন কিন্তু সেগুলো প্রয়োগের অভাব রয়েছে। ট্রাফিক সিগন্যালে কে না থামে? পুলিশ থাকলেও হর্ন বাজে! আইন থাকলেও তার বাস্তবায়ন শূন্যের কোঠায়।
৩. শুচিতা ও অস্পৃশ্যতার কালো ছাপ
গবেষণায় দেখা গেছে, ঐতিহাসিকভাবে পরিচ্ছন্নতাকে ‘নিচু কাজ’ হিসেবে দেখা হয়েছে। সরকার টয়লেট বানিয়েও দেয়, কিন্তু মানুষ ব্যবহার করে না কারণ ‘পরিষ্কার করা’ মানে ‘অপবিত্র কাজ’ এই মানসিকতা এখনও গ্রামে-গঞ্জে বিদ্যমান।
৪. অভাবের ‘টানেল ভিশন’
গরিব মানুষ যখন বাঁচার তাগিদে থাকে, তখন সে দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশ নিয়ে ভাবার সুযোগ পায় না। অভাব মানুষকে ‘আমি আজ বাঁচি, কাল দেখব’ এই মনোভাব দেয়। কিন্তু এটা কি শুধু গরিবদের সমস্যা? মধ্যবিত্ত অফিসার গাড়ি থেকে খালি বোতল ছুড়ে ফেলে দেন এখানে অভাব নয়, অভ্যাস!
৫. আমরা সব দোষ ‘সরকারের’ ঘাড়ে চাপাই
‘সরকার পরিষ্কার করবে’, ‘মিউনিসিপ্যালিটি কাজ করছে না’ আমরা নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাই। অথচ জাপানে সরকার কিছু না করলেও মানুষ নিজেরাই পরিষ্কার রাখে আমরা যা বলি বনাম যা করি: এক চমকপ্রদ দ্বন্দ্ব। আমরা যা দাবি করি আমরা যা করি “গঙ্গা পদ্মা আমাদের মা” গঙ্গায় পদ্মায় প্লাস্টিক , ময়লা, এমনকি মড়া ফেলি! যাস্ট বুড়িগংগার দিকে তাকালে বুঝতে পারবেন!! “পরিবেশ বাঁচাও” ওয়াজের পরে, মিটিং এর পরে ,পূজার পর প্যান্ডেলের নিচে আবর্জনার স্তূপ! “আমরা সভ্য জাতি” রাস্তায় থুতু ফেলি, সিগারেটের টুকরো ফেলি! “ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলি” সিগন্যালে দাঁড়িয়েও হর্ন বাজাই!
কী করলে বদলাবে? ৬টি কার্যকরী উপায়
১. নিজের সীমানা বাড়ান
শুধু ঘর নয় বাড়ির সামনের রাস্তাটুকুও ‘আমার’ বলে মনে করুন। এক মিটার, তারপর দুই মিটার এভাবেই পুরো শহর ‘আমার’ হয়ে যাবে।
২. শিশুদের শেখান
জাপানের মতো স্কুলে পরিচ্ছন্নতাকে শিক্ষার অংশ করুন। বাচ্চারা যদি শেখে, তাহলে বড় হয়ে তারা অভ্যাস করবে।
৩. সামাজিক লজ্জার ব্যবস্থা করুন
সিঙ্গাপুরে আবর্জনা ফেললে শুধু জরিমানা নয়, পাবলিক প্লেসে পরিষ্কার করাতে বাধ্য করা হয়। আমাদেরও দরকার ‘সামাজিক শাস্তি’ যাতে লোকে লজ্জা পায়।
৪. ভারতের ইন্দোরের মডেল অনুসরণ করুন
প্রতিটি শহর ইন্দোরের মতো পরিচ্ছন্ন হতে পারে দরকার শুধু সঠিক পরিকল্পনা ও জনগণের অংশগ্রহণ।
৫. পুরস্কার ও স্বীকৃতি দিন
যারা পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখে, তাদের সামাজিক স্বীকৃতি দিন। প্রতিযোগিতার আয়োজন করুন। ‘পরিচ্ছন্নতা হিরো’ তৈরি করুন।
৬. নিজে শুরু করুন
অন্যকে বদলানোর আগে নিজে বদলান। রাস্তায় ময়লা না ফেলুন। থুতু না ফেলুন। ময়লা কোথায় ফেলতে হবে, তা জানুন এবং অন্যদেরও শেখান।
পরিচ্ছন্ন দেশ ‘ গড়তে হলে ‘পরিচ্ছন্ন মন’ চাই
বাংলাদেশে সমস্যা অর্থনৈতিক নয়, মানসিক। আমরা যদি প্রতিটি পাবলিক প্লেসকে ‘আমার বাড়ির অংশ’ মনে করি, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তন আসবে।
রোয়ান্ডা, জাপান, সিঙ্গাপুর এরা আমাদের চেয়ে বড় নয়। কিন্তু তারা নাগরিক দায়িত্ববোধে বড়। ভারতের ইন্দোর শহর প্রমাণ করেছে, ভারতেও সম্ভব—শুধু দরকার সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
“পরিচ্ছন্নতা শুরু হয় নিজের চিন্তা থেকে। যদি প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে এক ইঞ্চি এগিয়ে আসে, তাহলে সমগ্র দেশ একদিন পরিচ্ছন্ন হবে সেটাই হবে সত্যিকারের ‘স্বচ্ছ ভারত’!”
প্রতিটি নাগরিকের জন্য ৫টি সোনালি নিয়ম
১.নিজের আবর্জনা নিজেই ফেলুন নির্দিষ্ট স্থানে রাস্তা পরিষ্কার থাকবে, ড্রেন আটকাবে না
২. গাড়িতে ডাস্টবিন রাখুন জানালা দিয়ে ময়লা ফেলার অভ্যাস বন্ধ হবে
৩.পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করুন এবং পরিষ্কার রাখুন খোলা যায়গায় শৌচকর্ম বন্ধ হবে, রোগ কমবে
৪.থুতু ফেলবেন না টিস্যু ব্যবহার করুন সংক্রমণ ও দূষণ কমবে
৫. অন্যদের শেখান ও উৎসাহিত করুন একা নয়, সম্মিলিত প্রচেষ্টাই বড় পরিবর্তন আনে
শেষ কথা: ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’ এই পথেই মুক্তি
পরিচ্ছন্নতা একটি অভ্যাস, আইন নয়। অভ্যাস বদলাতে সময় লাগে, কিন্তু শুরু করতে পারলে অসম্ভব কিছু নয়। পরিছন্ন দেশের স্বপ্ন !! স্বচ্ছ একটি দেশ!! সেটা সরকারের নয়, প্রত্যেক নাগরিকের স্বপ্ন হওয়া উচিত।
দেশ বদলাবে—যদি বদলাই আমরা!








