back to top
Friday, February 27, 2026
Homeবিনোদনবদলে গেল উগান্ডার সিনেমা

বদলে গেল উগান্ডার সিনেমা

এক দশক আগেও উগান্ডার চলচ্চিত্রশিল্প ছিল ছোট। বাজেট ছিল কম, কাজ করতেন হাতে গোনা কয়েকজন শিল্পী। পেশাদার পরিবেশ তখনো গড়ে ওঠেনি। দর্শক থাকলেও নির্মাণে দক্ষ লোকবলের অভাবে বছরে খুব কম সিনেমাই মুক্তি পেত। ক্যামেরার পেছনের প্রশিক্ষিত মানুষ পাওয়া ছিল কঠিন। গত কয়েক বছরে সেই চিত্রটা বদলে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে উন্নতি করছে উগান্ডার সিনেমা। কাজটা নীরবে শুরু হলেও পরিকল্পিতভাবে এগগোচ্ছে। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন। উগান্ডার সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি কীভাবে বদলে গেল তাই নিয়ে আজকের প্রতিবেদন।

ম্যাজিক সংখ্যা ১০
প্রায় ১২ বছর আগে উগান্ডা কমিউনিকেশনস কমিশন (ইউসিসি) টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে স্থানীয় কনটেন্ট দেখানোর জন্য কোটা চালু করে। উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় গল্পকে ছড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু কয়েক দিনের মাঝেই একটি সমস্যা সামনে আসে—চাহিদা থাকলেও মানসম্মত কাজ পাওয়া যাচ্ছিল না। ইউসিসির কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার রুথ কিবুকা বলেন, ‘স্থানীয় কনটেন্টের প্রতি ব্রডকাস্টারদের আগ্রহ আছে, কিন্তু ভালো কাজ পাওয়া যাচ্ছিল না। টেলিভিশনে দেখানোর মতো ন্যূনতম মান তো থাকতে হবে।’
এই সমস্যা দেখেই নতুন পরিকল্পনা হাতে নেয় ইউসিসি, দক্ষ জনবল তৈরিতে দেওয়া হয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। পরিচালনা, প্রযোজনা, চিত্রনাট্য লেখা, সিনেমাটোগ্রাফি আর শব্দগ্রহণে ১০ হাজারের বেশি তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। এই প্রশিক্ষিত তরুণদের হাতেই ধীরে ধীরে উগান্ডার চলচ্চিত্রশিল্পের ভিত শক্ত হচ্ছে। এরা এখন শুধু উগান্ডাই নয়, আফ্রিকান সিনেমারও বড় শক্তি।

হাতে গোনা টিম থেকে পূর্ণাঙ্গ ইন্ডাস্ট্রি
আফ্রিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী মিডিয়া কোম্পানি মাল্টিচয়েস গ্রুপ। উগান্ডাসহ আফ্রিকা মহাদেশের ১৬টি দেশে তাদের কার্যক্রম আছে। প্রতিষ্ঠানটি চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন কোর্স আয়োজন থেকে শুরু করে শিল্পীদের আন্তর্জাতিক চুক্তিতে আবদ্ধ হতে সহযোগিতা করে। মাল্টিচয়েস উগান্ডার লোকাল কনটেন্ট ম্যানেজার ব্রায়ান মুলন্ডোর মতে, এই প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়া বর্তমান অগ্রগতি সম্ভব হতো না। তিনি বলেন, ‘একসময় উগান্ডায় পেশাদার সিনেমাটোগ্রাফার বা সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ছিল হাতে গোনা। এখন দক্ষ টিমের অভাব নেই।’
এই পরিবর্তনের ফলে উগান্ডার চলচ্চিত্রশিল্প এখন একই সঙ্গে একাধিক বড় প্রযোজনা সামলাতে পারে। ক্যামেরা, লাইট বা সাউন্ড—সব বিভাগেই পাওয়া যাচ্ছে প্রশিক্ষিত পেশাজীবী। মাল্টিচয়েস ট্যালেন্ট ফ্যাক্টরির মতো উদ্যোগ এই প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করেছে।

উগান্ডাসহ আফ্রিকা মহাদেশের ১৬টি দেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে ‘মাল্টিচয়েস গ্রুপ’

উগান্ডাসহ আফ্রিকা মহাদেশের ১৬টি দেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে ‘মাল্টিচয়েস গ্রুপ’ছবি: মাল্টিচয়েস গ্রুপ

প্রশিক্ষণ থেকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
এই ১০ হাজার প্রশিক্ষিত মানুষের কাজ এখন শুধু উগান্ডাতেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশটির সিনেমা ও টিভি সিরিজ এখন আফ্রিকার বড় প্ল্যাটফর্মগুলোতেও জায়গা করে নিচ্ছে, জনপ্রিয়তার পাশাপাশি মিলছে স্বীকৃতিও। আফ্রিকার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র পুরস্কারগুলোর একটি আফ্রিকা ম্যাজিক ভিউয়ার্স চয়েস অ্যাওয়ার্ডস (এএমভিসিএ)। গত কয়েক বছরে উগান্ডার বেশ কিছু চলচ্চিত্র ও টিভি সিরিজ এতে পুরস্কার অর্জন করেছে।

কমিশনিং মডেল
মাল্টিচয়েসের কমিশনিং মডেলের ফলে স্বাধীন নির্মাতারা এখন নির্দিষ্ট চুক্তির আওতায় কাজ করে নিয়মিত আয় করতে পারছেন। এই মডেলে টেলিভিশন চ্যানেল বা প্ল্যাটফর্ম নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কনটেন্ট সম্প্রচারের লাইসেন্স পায়, কিন্তু সেই সময় শেষ হলে সিনেমা বা সিরিজের মালিকানা নির্মাতার হাতেই থেকে যায়। এতে একদিকে যেমন নির্মাতারা আর্থিক নিরাপত্তা পাচ্ছেন, অন্যদিকে নিজেদের কাজের মান নিয়ে আরও সচেতন হচ্ছেন। কারণ, ভালো মানের কনটেন্টই ভবিষ্যতে এনে দিতে পারে নতুন চুক্তি ও বড় সুযোগ।

ব্যবসা এখনো দুর্বল
তবে শুধু প্রশিক্ষণই সব সমস্যার সমাধান নয়। নির্মাতা লুকমান আলী মনে করেন, দক্ষ লোকবল তৈরি হলেও ব্যবসায়িক কাঠামো এখনো নড়বড়ে। তাঁর ভাষায়, ‘নাইজেরিয়ায় ব্র্যান্ডগুলো সিনেমাকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখে। উগান্ডায় এখনো সে মানসিকতা তৈরি হয়নি।’ ফলে অনেক নির্মাতাকে নিজে টাকা ঢেলে কাজ করতে হয়, যা শেষ পর্যন্ত মান ও পরিবেশনায় প্রভাব ফেলে। দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতিমালাও হালনাগাদ না হলে এই অগ্রগতি থমকে যেতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা।

নীরব বিপ্লবের ভবিষ্যৎ
প্রশিক্ষিত তরুণেরা উগান্ডার চলচ্চিত্রশিল্পকে নতুন জায়গায় নিয়ে গেছে। যে শিল্প একসময় ছিল সীমিত, যে পথ ছিল অনিশ্চিত, আজ তা কর্মসংস্থান, সংস্কৃতি আর সম্ভাবনার এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই—এই প্রশিক্ষণনির্ভর অগ্রগতিকে ঘিরে কি সময়মতো বিনিয়োগ, নীতিগত সহায়তা আর ব্যবসায়িক আস্থা তৈরি হবে? হলে উগান্ডার সিনেমা হয়তো খুব শিগগিরই শুধু আফ্রিকা নয়, বিশ্বমঞ্চে আরও উঁচুতে পৌঁছাবে।
তথ্যসূত্র: ব্রডকাস্ট মিডিয়া আফ্রিকা

বিষয় ভিত্তিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত