back to top
Saturday, February 28, 2026
Homeমতামতউপসম্পাদকীয়মুক্তিযুদ্ধ, ধর্ম ও ক্ষমতার রাজনীতি: শেখ হাসিনার শাসনের আদর্শিক নির্মাণ

মুক্তিযুদ্ধ, ধর্ম ও ক্ষমতার রাজনীতি: শেখ হাসিনার শাসনের আদর্শিক নির্মাণ

সম্পাদক
সম্পাদকhttps://amardeshnews.com/
সম্পাদক ও প্রকাশক, শহীদুল ইসলাম। ১৩৩, ফ্রি রোড, বি-৬, ৬ এনডি, বার্মিংহাম,যুক্তরাজ্য। Contact us: amaardeshnews@gmail.com

ফ্যাসিবাদ কেবল সামরিক বুট বা পুলিশের লাঠিতে জন্ম নেয় না; এটি জন্ম নেয় একটি সর্বগ্রাসী ন্যারেটিভের ভেতর দিয়ে—যে ন্যারেটিভ নিজেকে প্রশ্নাতীত করে তোলে এবং ভিন্নমতকে রাষ্ট্রদ্রোহে রূপান্তরিত করে। ইতিহাসে হিটলার, মুসোলিনি কিংবা ফ্রাঙ্কোর শাসনে আমরা তা দেখেছি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকাল (২০০৯–২০২৪) সেই একই কাঠামোর ভেতরেই একটি ভিন্ন রূপে আত্মপ্রকাশ করে—যেখানে আদর্শের নাম করে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার চেষ্টা হয়েছে।

এই শাসনের আদর্শিক ভিত্তি মূলত দুটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল—মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জঙ্গিবিরোধী সেক্যুলারিজম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দুই ধারণা আর নীতিগত অবস্থান হিসেবে থাকেনি; বরং ক্ষমতা রক্ষার রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তি। কিন্তু শেখ হাসিনার আমলে এই ঐতিহাসিক সত্য ধীরে ধীরে একটি রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া মতাদর্শে রূপ নেয়। মুক্তিযুদ্ধ আর সকল নাগরিকের সম্মিলিত স্মৃতি থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি দলীয় লাইসেন্স—যার মালিকানা কার্যত এককভাবে ক্ষমতাসীনদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।

এই ন্যারেটিভের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, বিরোধিতা আর রাজনৈতিক মতভেদ থাকে না—সবকিছু হয়ে ওঠে “মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতা”। সরকারকে প্রশ্ন করলেই রাজাকার, যুদ্ধাপরাধীর দোসর, পাকিস্তানপন্থী—এই তকমাগুলো অবধারিত হয়ে যায়। ফলে বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন, গণমাধ্যম, গুম-খুন, দুর্নীতি—কোনো কিছু নিয়েই স্বাধীনভাবে প্রশ্ন তোলার নৈতিক জায়গা ধ্বংস হয়ে পড়ে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখানে আর মুক্তির প্রতীক নয়; এটি হয়ে ওঠে বর্জনের রাজনীতি। কে দেশপ্রেমিক, কে নয়—সে সিদ্ধান্ত আর ইতিহাস দেয় না, দেয় ক্ষমতা।

শেখ হাসিনার দ্বিতীয় বড় আদর্শিক অস্ত্র ছিল ধর্ম ও জঙ্গিবাদের প্রশ্ন। একদিকে তিনি বারবার বলেছেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম; অন্যদিকে যেকোনো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক বিরোধিতাকে প্রায়শই “জঙ্গি”, “উগ্রবাদী” কিংবা “সন্ত্রাসী” ছাঁচে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

এখানে সমস্যা জঙ্গিবিরোধী অবস্থানে নয়—বরং জঙ্গিবিরোধিতার রাজনৈতিক ব্যবহারে। প্রকৃত নিরাপত্তা উদ্বেগ আর রাজনৈতিক সুবিধাবাদের মধ্যে সীমারেখা মুছে ফেলা হয়েছে। হেফাজত ইসলাম হোক কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠী—তাদের সঙ্গে মতপার্থক্য রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার বদলে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল নির্বাচনী বৈধতা সংকট ঢাকার একটি কার্যকর কৌশল

ফলে এক অদ্ভুত বাস্তবতা তৈরি হয়—রাষ্ট্র নিজেকে সেক্যুলার বলে দাবি করে, কিন্তু একই সঙ্গে ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতার সমীকরণ ঠিক করে নেয়। এটি প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা নয়; এটি নিয়ন্ত্রিত ধর্মনীতি

আদর্শ যখন প্রশ্নাতীত হয়, তখন গণতন্ত্র মরে। এই দুই ন্যারেটিভ একত্রে শেখ হাসিনার শাসনকে একটি শক্ত আদর্শিক বর্ম দেয়। এই বর্মের আড়ালে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, গণমাধ্যম স্তব্ধ হয়, বিরোধী রাজনীতি ভেঙে পড়ে, গুম-খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন “রাষ্ট্রের স্বার্থে প্রয়োজনীয়” হয়ে ওঠে।

ফ্যাসিবাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য এখানেই—রাষ্ট্র নিজেকে নৈতিকতার সর্বোচ্চ অভিভাবক ঘোষণা করে এবং বলে দেয়, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা মানেই আদর্শের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র

শেখ হাসিনার শাসন তাই কেবল প্রশাসনিক কর্তৃত্ববাদ ছিল না; এটি ছিল একটি আদর্শিক কর্তৃত্ববাদ—যেখানে মুক্তিযুদ্ধ ও সেক্যুলারিজমের মতো উচ্চমূল্যের ধারণাগুলোকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

“মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলের সম্পত্তি নয়। সেক্যুলারিজম কোনো দমননীতির লাইসেন্স নয়। আদর্শ যদি প্রশ্নাতীত হয়ে ওঠে, তবে সেটি আর আদর্শ থাকে না তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার হাতিয়ার ”

বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি আদর্শের নামে শাসন চাই, নাকি আদর্শের আলোয় গণতন্ত্র?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র মুক্ত থাকবে, না ইতিহাসের আরেকটি কর্তৃত্ববাদী অধ্যায়ে বন্দি হবে।

বিষয় ভিত্তিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত