একটা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে কাকে বসানো হলো, সেটা শুধু একটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটা একটা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন। এটা বলে দেয় যে রাষ্ট্র কাকে সম্মান করে, কাকে পুরস্কৃত করে, এবং কার স্বার্থ রক্ষা করতে চায়।বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার বিরুদ্ধে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ৮৯ কোটি ২ লাখ টাকার ঋণখেলাপির রেকর্ড রয়েছে। গত বছরের জুনে মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে বিশেষ বিবেচনায় সেই ঋণ ১০ বছরের জন্য পুনঃতপশিল করা হয়েছে।
এই “বিশেষ বিবেচনা” শব্দটি আমাদের সকলের কাছে পরিচিত। এর মানে আমরা জানি। এটা সেই একই পথ, যে পথে আওয়ামী লীগের আমলে এস আলমের শত শত কোটি টাকার ঋণ মওকুফ হয়েছিল, যে পথে ছাত্রলীগের নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ে বারবার ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল। পদ বদলায়, দল বদলায়, কিন্তু “বিশেষ বিবেচনা”র সংস্কৃতি বদলায় না।এখানে একটু থামা দরকার। এস আলম প্রসঙ্গটি এখানে কাকতালীয় নয়। আহসান এইচ মনসুর গভর্নর থাকাকালীন ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করেছিলেন। এস আলম গংদের দেশে ফেরার পথ বন্ধ ছিল, তাদের ব্যাংক ফ্রিজ ছিল।
এখন যখন বিএনপির রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি গভর্নর পদে বসলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, ফ্রিজ করা ব্যাংকগুলো কি আবার সচল হবে? যারা পালিয়ে আছেন, তারা কি ফিরে আসার সুযোগ পাবেন? একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব পরিবর্তন যদি এই প্রশ্নগুলো তোলে, তাহলে সেই পরিবর্তন জনগণের জন্য নয়, এটা স্পষ্ট।এবার একটু পেছনে তাকানো যাক। জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে অর্থনীতির যে অবস্থা ছিল, তা যে কোনো বিচারে ভঙ্গুর ছিল। রিজার্ভ তলানিতে, মুদ্রাস্ফীতি লাগামহীন, ব্যাংক খাত দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে। সেই পরিস্থিতিতে আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব নিলেন এবং যা করলেন, তা ইতিহাসে লেখার যোগ্য। মুদ্রানীতি এমন শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করলেন যে স্বর্ণের আন্তর্জাতিক মূল্য হু হু করে বাড়ার পরেও ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখলেন। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালেন না। বিদ্যুতের দাম বাড়ালেন না। একটি ব্যাংকও দেউলিয়া হতে দিলেন না।
উপরন্তু আইএমএফের সামনে মেরুদণ্ড সোজা রেখে তাদের শর্তে নয়, বাংলাদেশের স্বার্থে ঋণ ছাড় করিয়ে আনলেন।এই কাজ সহজ ছিল না। বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাসে আবুল মাল আব্দুল মুহিত বা এম সাইফুর রহমানের মতো অভিজ্ঞ অর্থমন্ত্রীরাও এই মাপের চাপের মধ্যে এই ধরনের ফলাফল আনতে পারেননি। ২০২১ থেকে ২০২৬ এর মধ্যে রিজার্ভ, মুদ্রাস্ফীতি, রাজস্ব, বিনিয়োগ এবং মানব উন্নয়ন সূচক পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ইন্টেরিম সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল মনসুরের মুদ্রানীতির।ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলতে গেলে, আমানতদারি একটি ফরজ দায়িত্ব। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আমানত যিনি সততার সাথে রক্ষা করেছেন, তাকে সম্মানের সাথে বিদায় দেওয়া কেবল নৈতিকতার নয়, ঈমানের দাবি। কিন্তু এই দেশে তা হয়নি।আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এক টাকাও অনিয়মে নেননি। রিজার্ভ চুরি হয়নি তার আমলে। কোনো ব্যাংক পদ্মা ব্যাংক বা বেসিক ব্যাংকের মতো লুণ্ঠিত হয়নি। তার বেতন ছিল মাত্র দেড় লাখ টাকা, তার আগের আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কাজের বেতনের চেয়ে বহুগুণ কম। কেন এলেন তিনি? কারণ দেশের জন্য কিছু করার একটা টান ছিল। একটা দায়িত্ববোধ ছিল।
এই মানুষটিকে তার সেই অবদানের বিনিময়ে দেওয়া হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসের সবচেয়ে অপমানজনক বিদায়। মব সন্ত্রাস করে, কর্মীদের দিয়ে ঘেরাও করে তাকে এবং তার উপদেষ্টাকে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিক অব্যাহতির চিঠিটুকু পর্যন্ত দেওয়ার প্রয়োজন মনে করা হয়নি।এখানে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের যে কর্মচারীরা আতিউর রহমানের আমলে রিজার্ভ চুরির পর একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি, তারাই আজ সৎ ও দক্ষ গভর্নরদের বিরুদ্ধে মব করছেন। এটা শুধু অকৃতজ্ঞতা নয়, এটা একটি রাষ্ট্রীয় মানসিকতার লক্ষণ যেখানে দুর্নীতিবাজরা নিরাপদ, আর সৎ মানুষেরা শিকার।এম সাখাওয়াত হোসেনের কথা মনে পড়ে।
জামাল নজরুল ইসলামের কথা মনে পড়ে। কাঙালিনী সুফিয়ার কথা মনে পড়ে। এই দেশে গুণী মানুষেরা চিরকাল নীরবে কাজ করে গেছেন, এবং নীরবে বিদায় নিয়েছেন। বসুন্ধরার পত্রিকার প্রথম পাতায় স্থান পেয়েছেন হামবড়ারা। রাষ্ট্রীয় সম্মান পেয়েছেন সুবিধাভোগীরা।জুলাই আন্দোলনের পর অনেকে স্বপ্ন দেখেছিলেন, বাংলাদেশ বদলাবে। যোগ্যতার মূল্য হবে। কিন্তু এই নিয়োগ সেই স্বপ্নের গালে একটি সজোরে থাপ্পড়। একজন ঋণখেলাপি গার্মেন্টস ব্যবসায়ীকে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান বানানো হলো, আর একজন আন্তর্জাতিক মানের অর্থনীতিবিদকে মব দিয়ে বের করে দেওয়া হলো। ইতিহাস এই পার্থক্যটা মনে রাখবে।
লেখক: উস্তাদ সুলতান নাঈম

