মস্ত বড় পাড়া। পাড়াটার নাম সাক্ষ্যভুবন। পাড়াতে প্রায় শ’চার লোক বাস করে। সূর্য একটু পশ্চিম দিকে হেলে পড়লেই ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা উঠান জুড়ে নানান খেলায় মেতে উঠে। কাউকে তখন ঘরে আটকানো যায় না। একবার তো দুলুর মা ওকে বেঁধে রেখেছিলেন, কিন্তু কাজের কাজ হলো না। দুলু দাঁত দিয়ে দড়ি কেটে পালিয়ে এলো। আরেকবার মিলির মা মিলিকে ঘরে বন্দী করে রেখেছিলেন। কিন্তু মিলি জানালার শিক গুলো ভেঙ্গে চলে আসে। তারপর সেকি হুলুস্থুল কান্ড হলো, মিলির মা কাটারি নিয়ে ধেয়ে আসলেন। মিলি ভয়ে কাঁপছিল।
মিলিকে কান মলে নিয়ে যেতে যেতে মিলির মা সরোষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলতে লাগলেন,
‘ বয়সখান তো কম না, আইজ বাদ কাইল বিয়া দেওয়া লাগব। একটা ডিঙ্গি ফুরি, লজ্জা শরমের মাথা খাইছে? আর কোনোদিন এই তল্লাটে তোরে দেইখা লই,পাও দুইটা খোঁড়া বানাই দিমু। আইজকা তোর বাপ আউক।’
তারপর থেকে মিলি বেপাত্তা। সবাই ভাবলো মিলি আর আসবে না। কিন্তু তার দুইদিন পরেই বিকেলে মিলিকে পাড়ার উঠানে দেখা গেল। এই যে খেলার প্রতি সব ছেলে-মেয়েদের এত টান, এত আগ্রহ কিন্তু একজন আছে যার কোনো টান বা আগ্রহ নেই। ও এদেরই বয়সী কিন্তু খেলতে আসে না, শুধু দূর থেকে দাড়িয়ে নিশ্চুপ ভাবে দেখে। হাসির সময়ে ও হাসে না কান্নার সময়ে ও কাঁদে না। নিজেকে সবার থেকে গুটিয়ে রাখে। প্রয়োজনের বাইরে কথা বলে না, ওকে দেখলে মনে হয় ওর দৃষ্টি সবার মাথার ওপর দিয়ে যায়। কেমন যেন বড় মানুষ বড় মানুষ ভাব। ও নিজের মতো করে থাকে। কেউ ওকে বিরক্ত করে না।
পাড়ার বুড়ো থেকে পিচ্চি সবাই জানে ওর এই নিরবতা আর গম্ভীরতার কারণ। এই একাকিত্বের বেড়া জাল দিয়ে মেহুল নিজের চারপাশ ভরিয়ে তুলে। এই নিঃসঙ্গতাকে আপন করেই ও শৈশব থেকে কৈশোরে পা রাখে। আড়াই মাইল দূরে একটা মাধ্যমিক স্কুল। আশেপাশের গ্রামে আর কোনো স্কুল নেই। তখনকার দিনে না ছিল পিচ ঢালা রাস্তা আর না ছিল যানবাহন। রিশকা পাওয়া গেলেও ভাড়া ছিল ঢেড়। তাই সাক্ষ্যভুবনের সব ছেলে মিলে পায়ে হেঁটে ওই স্কুলে যেত।
অবশ্য দুটো মেয়ে শিল্পী আর রিতাও যেত ওদের সঙ্গে। সব ছেলেরা জুড়ায় জুড়ায় বা কখনো দল বেঁধে গেলেও মেহুল যেত একা। তবে ওকে দেখে-শোনে রাখার দায়িত্ব সবার ওপর। ওরা মেহুলকে যেমন আগলে রাখে তেমনি আদরও করে। কখনো কখনো স্কুল থেকে ফেরার সময় ওদের ঝড়, বৃষ্টি আর বজ্রপাতের সম্মুখীন হতে হয়। বৃষ্টি থেমে গেলে ওরা আসে বা রাস্তায় ঝড়,বৃষ্টি পেলে আশেপাশের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। মেহুল পকেটে করে স্কুলে পলিথিন নিয়ে যেত। পলিথিনের ভিতরে বই ঢুকিয়ে ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত সব কিছুকে উপেক্ষা করে বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হয় ।
ওর জগৎ সবার ভাবনারও অতীত। ওর উদ্দেশ্য আর ভাবনা সবার থেকে আলাদা। ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাতের মধ্যে সারাদিন-রাত থাকলেও ওর কোনো অসুখ হয়না। প্রথম প্রথম একটু একটু হলেও এখন আর হয়না। সেইবার প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় হয় সারা দেশ জুড়ে, স্কুল ঘরে তখন সাক্ষ্যভুবনের সব ছেলেমেয়েরা। শিল্পী আর রিতা আঙ্গুল টিপে তসবী পড়ে পড়ে সিনায় ফুঁ দিচ্ছিল, ছেলেরা সবাই দরজা জানালা বন্ধ করে আল্লাহ আল্লাহ জপছে। স্যার-দিদিমণিরা সবাই অফিস রুমে দরজা বন্ধ করে আছেন। ঘন্টা পারুক ভাই জোড় গলায় বলে গেছেন দরজা জানালা না খুলতে।
কিন্তু দুষ্টু রতন আর বিনু মিলে জানালা একটু ফাঁক করে দেখে বাইরে গাছগুলো হুড়মুড়িয়ে শিকড়সহ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, পাঠাগারের চাল কোথায় যে উড়িয়ে নিয়ে গেছে তার ঠাঁই-ঠিকানা নেই। স্কুল মাঠের ওপাশের নারকেল গাছটা টাডা পড়ে ঝলসে গেছে । এই আতঙ্কের সময় মেহুল হুট করে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ে, কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই। পিছনে সবাই ডাকে কিন্তু ও পিছন ফিরে তাকাল না পর্যন্ত। ঝড়ের গতিবেগ ছিল প্রচণ্ড তাই দরজা বেশিক্ষণ খুলে রাখা গেল না।
দরজা বন্ধ করে নিজের মতো করে আবার দুরূদ শরীফ, তসবী, কালিমা পড়তে লাগল সবাই । ধু ধু মাঠের বুক ছিঁড়ে রাস্তা, কোনো গাছ বা ঘর নেই। মাঠের কোথাও হলুদ ধান গুলি হেলে-দোলে পড়ছে আবার কোথাও কাটা ধানের ঢেঙ্গা গুলি সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে সোজাভাবে দাড়িয়ে আছে। খানিকটা জায়গা আসার পর মেহুল পা বাড়াতে পারেনা, ঝড় আরো বাড়তে থাকে। ঝড়ের ঝাপটায় উড়ে যাবে এমতাবস্থায় ও উঁচুনিচু রাস্তার উপর আকাশের দিকে পাষণ্ড বুক পেতে শুয়ে পড়ে।
ঝপাঝপ করে বৃষ্টি পড়ছে ওর উপর, কাদার পানি ওর চুলের গোড়ায় গোড়ায় আশ্রয় নিচ্ছে। মেহুল নিজের জগতে বিমূঢ় হয়ে পড়ে। প্রত্যেকটা বৃষ্টির ফোঁটা ওর কাছে মনে হয় সেই বিষাদময় রাতের একেকটা অশ্রুফোঁটা। এই অশ্রুকে সে মন থেকে অনুভব করে। হঠাৎ করে মেঘের গর্জন শুরু হয়, সারা আসমান এই বুঝি ভেঙ্গে পড়বে। কিন্তু তখনো মেহুল আঁতকে উঠে না। ও মেঘের গর্জন শুনতে পায় না শুনতে পায় মায়ের বেদনার্ত চিৎকার। মায়ের কন্ঠ শুনতে পেয়ে কাদায় মাখানো চোখ-মুখ রক্তাভ হয়ে উঠে ওর।
কী অদ্ভুত মেহুল হাসছে! মেঘের গর্জন বা মায়ের আর্তনাদ নয় মেহুল অনুভব করে মা ওকে ডাকছেন। কী নিষ্ঠুর মেহুল! দিব্যি বিজলি, বিদ্যুৎ, বজ্রপাতে নিজের পাষণ্ড বুক পেতে দিয়েছে। নিজের জীবনের প্রতি মায়া নেই। নেই কোনো টান। দুঃখ, কষ্ট ওকে ছুঁয় না। ও শক্ত হয়ে গেছে। জমে শক্ত হয়ে যাওয়া যাকে বলে। চোখের সামনে মা-বাবাকে মরে যেতে দেখলে কেউ কি করে নরম থাকতে পারে? ওর চোখ দুটি লাল হয় উঠে যখন ওর সামনে জেগে ওঠে ভয়াল সেই রাত। কী বৃষ্টি ছিল! টিনের চালের উপর সজোড়ে আঁচড়ে পড়া বৃষ্টির ফোটাকে সাক্ষী রেখে সেই রাতে ওর চোখের সামনে মায়ের সম্ভ্রমহানি আর বাবাকে গুলি করে হত্যা করেছে রাজাকার মতি। সেই থেকে ওর হৃদয় শক্ত হয়ে যায়। একদম শক্ত।
লেখক:আনু ইসলাম রেনী

