back to top
Saturday, February 28, 2026
Home মতামত উপসম্পাদকীয় গরীব চেনার রাজনীতি নাকি সিস্টেমের ব্যর্থতা?

গরীব চেনার রাজনীতি নাকি সিস্টেমের ব্যর্থতা?

শহীদুল ইসলাম, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক আমারদেশ নিউজ

0
11

বাংলাদেশে দরিদ্র সহায়তা কর্মসূচি নতুন কিছু নয়। মহামারি থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ—প্রতিটি সংকটে সরকার বিভিন্ন সময় নগদ অর্থ, খাদ্য সহায়তা বা ঘর নির্মাণ প্রকল্প চালু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে মানবিক—কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যায়: গরীব চেনা হবে কীভাবে?

আমাদের বাস্তবতা হলো, দরিদ্র নির্ধারণের দায়িত্ব প্রায়শই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ওপর ন্যস্ত থাকে। ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার–চেয়ারম্যানদের সুপারিশের ভিত্তিতে তালিকা তৈরি হয়। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব, আত্মীয়তা কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা বিনিময়ের অভিযোগ নতুন নয়। ফলে প্রকৃত দরিদ্র বঞ্চিত হন, আর সামর্থ্যবান কেউ কেউ ‘গরীবানা সনদ’ নিয়ে সুবিধা ভোগ করেন। এতে শুধু অর্থের অপচয় হয় না—রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দরিদ্র শনাক্তকরণে সবচেয়ে বড় অন্তরায় আমাদের দুর্বল করব্যবস্থা। প্রায় ১৭ কোটির দেশে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন খুব অল্পসংখ্যক মানুষ। টিআইএনধারীর সংখ্যা বাড়লেও নিয়মিত রিটার্ন দাখিলের হার কম। কর–জিডিপি অনুপাতও দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় নিচের দিকে।

এর মানে হলো—রাষ্ট্র নাগরিকের আয় সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলতে পারেনি। যখন আয় সম্পর্কিত স্বচ্ছ ও সর্বজনীন ডাটাবেইস থাকে না, তখন দরিদ্র নির্ধারণ হয় অনুমান, সুপারিশ কিংবা প্রভাবের ভিত্তিতে। ফলে পুরো সহায়তা ব্যবস্থাই ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

অনেকেই মনে করেন, কর দেওয়া মানেই বাড়তি ঝামেলা। রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া জটিল, সহায়তা নিতে গেলে অতিরিক্ত খরচ হয়, আবার অনেকের ধারণা—আয় না থাকলেও রিটার্ন দেওয়া মানেই হয়রানির ঝুঁকি। ডিজিটাল অবকাঠামো থাকলেও সেটি ব্যবহারবান্ধব নয়। ফলে স্বল্পআয়ের মানুষ তো দূরের কথা, মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশও কর ব্যবস্থার বাইরে রয়ে যায়।

সমাধান অসম্ভব নয়, বরং প্রশাসনিক সদিচ্ছা থাকলে তা তুলনামূলক সহজ।

প্রথমত, কর রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইন ও সরলীকৃত করতে হবে। খুব অল্প তথ্য দিয়ে ‘জিরো রিটার্ন’ দাখিলের সুযোগ থাকতে পারে, যাতে আয় না থাকলেও নাগরিক হিসেবে নিবন্ধিত থাকা যায়।

দ্বিতীয়ত, স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লাইসেন্সধারী ‘ট্যাক্স প্রিপেয়ারার’ তৈরি করা যেতে পারে, যারা অল্প ফিতে স্থানীয় পর্যায়ে সেবা দেবেন। এতে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে, আবার মানুষ সহজে কর ব্যবস্থায় যুক্ত হবে।

তৃতীয়ত, সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে কর ডাটাবেইস যুক্ত করা যেতে পারে। নিয়মিত আপডেট করা আয়তথ্যের ভিত্তিতে সুবিধাভোগী নির্বাচন হলে স্বচ্ছতা বাড়বে। পরিবারভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণ করলে সম্পদের অপব্যবহার কমবে।

যদি ব্যাপকসংখ্যক নাগরিক কর ব্যবস্থার আওতায় আসে—

  • রাষ্ট্র নাগরিকের প্রকৃত আয়চিত্র পাবে;
  • দরিদ্র শনাক্তকরণ হবে তথ্যনির্ভর;
  • কর রাজস্ব বাড়বে, উন্নয়ন ব্যয় টেকসই হবে;
  • আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আসবে;
  • কালো অর্থ সাদা করার প্রবণতাও কমবে।

সবচেয়ে বড় কথা, নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে উঠবে। মানুষ বুঝবে—কর দেওয়া মানে শুধু অর্থ প্রদান নয়, বরং সামাজিক সুরক্ষার অংশীদার হওয়া।

দারিদ্র্য বিমোচন শুধু অনুদান বা কার্ড বিতরণের বিষয় নয়; এটি একটি তথ্যভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার প্রশ্ন। যতদিন আমরা দরিদ্র চেনার নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি গড়ে তুলতে না পারব, ততদিন সহায়তা কর্মসূচি রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়েই থাকবে।

সম্ভবত এখন সময় এসেছে আবেগ নয়, সিস্টেম নিয়ে ভাবার। কারণ শক্তিশালী করব্যবস্থা ছাড়া টেকসই কল্যাণরাষ্ট্র কেবলই একটি আকাঙ্ক্ষা হয়ে থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here