ট্রেনের জানালার ধারে বসে আনমনে বাইরে তাকিয়ে আছে রিফাহ। ট্রেনটা ধীরে ধীরে গতি নিচ্ছিল। ক্রমাগত ভাবে পেছনে সরে যাচ্ছিল দৃশ্যগুলো। আর সামনে হাজির হচ্ছিল নতুন নতুন দৃশ্য। ধুপধাপ শব্দ তুলে একটার পর একটা কামরা স্টেশনের বুক চিরে ছুটে চলছিলো উত্তরবঙ্গের দিকে। প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে গাছপালা, দোকানপাট, কাঁচাবাজার—সব পেছনে পড়ে যাচ্ছিল, ঠিক যেভাবে রিফাহর কৈশোরও পেছনে পড়ে আছে। আজ সে ট্রেনে বসে; পাশে তার বাবা—চোখেমুখে চিন্তা আর বুকভরা প্রত্যাশা। গন্তব্য রাজশাহী। উদ্দেশ্য—মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা।
“আর একটু পরেই সিরাজগঞ্জের রেলব্রিজ,” বাবা হালকা করে বললেন।
রিফাহ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। চেনা শ্যাওলা পড়া পিলারগুলো দূর থেকে দৃষ্টিসীমায় এল। সেতুর নিচে পদ্মা—আধা শুকনো, আধা চলমান। স্রোতের গর্জন নেই, কিন্তু তার মধ্যে একটা অব্যক্ত আকর্ষণ আছে। ঠিক যেন নিজের ভেতরের ভয় আর কল্পনার মতো—চুপচাপ, গভীর।
এই ট্রেন যাত্রা যেন একটা অন্যরকম উপলব্ধি নিয়ে এসেছে। কেবল একটি গন্তব্য নয়—একটা অধ্যায়ের শুরু। কাঁধে বইয়ের ব্যাগ, একজোড়া চশমা আর হৃদয়ের গভীরে হাজারো আশঙ্কা আর স্বপ্ন নিয়ে রিফাহ পা রেখেছে এক অচেনা ভবিষ্যতের দিকে।
পাশের সিটে বসে থাকা বাবা মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছিলেন—
“পর্যাপ্ত ঘুম হয়েছে তো?”
“আবেদনপত্রে ঠিক মতো ছবি দিয়েছিলে তো?”
“কলেজ কোডগুলো মনে আছে?”
রিফাহ কেবল মাথা নাড়ছিল, কিন্তু মন ছিল না কথাগুলোতে।
তার চোখে তখন ভাসছিল জয়পুরহাট ক্যাডেট কলেজের সেই শেষ ফেয়ারওয়েল রাত। ব্যাগ গুছাতে গুছাতে জুই এসে বলেছিল,
“মেডিকেলেই যাচ্ছ রিফু? আকাশের বদলে হাসপাতাল?”
রিফাহ মুচকি হেসেছিল, বলেছিল,
“চিকিৎসকও তো একধরনের জ্যোতির্বিদ, জীবন নামক গ্রহের চারপাশ ঘিরে মৃত্যুর কক্ষপথ শনাক্ত করে।”
ট্রেন হঠাৎ গতি কমালো। রাজশাহী স্টেশনের কাছে চলে এসেছে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেমেয়েগুলো—প্রায় সবই ভর্তি পরীক্ষার্থী, কাঁধে ব্যাগ, চোখে তীব্র চাপা টেনশন। কেউ কেউ চোখ বন্ধ করে দোয়া পড়ছে, কেউ আবার বুকের ভেতরে অস্ফুটে ছড়া আওড়াচ্ছে আগে পড়া কোনো বিষয়।
পরীক্ষার আগের রাত তারা থাকবে রাজশাহীতে। একটা ছোট্ট হোটেলে বুকিং দেওয়া হয়েছে আগেই। সেই হোটেলেই বাবা-মেয়ে রাত কাটাবে—রিফাহ পড়ার ভান করবে, কিন্তু তার চোখ ঘুরে ফিরে যাবে সেই পদ্মার দিকে, অথবা জুইয়ের কণ্ঠে আটকে থাকবে।
পরদিন সকালে ভর্তি পরীক্ষা।
সকাল সাতটার ভেতর পৌঁছাতে হবে পরীক্ষাকেন্দ্রে। কলেজ চত্বরে ঢুকতেই লাগলো একটা অন্যরকম শীতলতা। চিরচেনা নয়, কিন্তু খুব চেনা যেন। ভবনের ভেতর নানা ব্যাচের ছাত্রছাত্রীদের ভিড়। দেয়ালে দেয়ালে “সাইলেন্স প্লিজ”, “মোবাইল নিষিদ্ধ”—তবে কারও চোখেই নিষেধের ভয় নেই, সবার ভেতর ভয়টা আলাদা—ভবিষ্যৎ নামক অনিশ্চয়তার।
হলরুমের বেঞ্চিতে বসে রিফাহ বুঝতে পারছিল—এই একটা ঘণ্টা তার বাকি জীবনের প্রবেশপথ। যেটুকু মুখস্থ, সেটুকুই অস্ত্র। আর যেটুকু অনিশ্চয়তা, সেটুকুই সময়ের উপর ছেড়ে দেওয়া।
ঘণ্টা বাজল।
প্রথম প্রশ্নে চোখ রাখতেই চেনা একটা ইকুয়েশন। মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে সে পেন চালালো।
পরীক্ষা শেষে বাইরে বেরিয়ে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল রিফাহ। কলেজের গেটের দুপাশে অভিভাবকদের মুখে একধরনের অস্থির কৌতূহল—কারও চোখে জিজ্ঞাসা, কারও ঠোঁটে খুশির আগাম ছায়া, আর কারও মুখে নিঃশব্দ চিন্তার রেখা। রিফাহর বাবা সামনের গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন, মুখে পানি ছিটিয়ে নিচ্ছিলেন।
“কেমন হইছে?”
বাবা জিজ্ঞেস করলেন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, যেন জেনে গেছেন কোনো উত্তরই এখন চূড়ান্ত কিছু বলে না।
“ভালোই… যেটুকু পারি দিয়েছি,”
একটা নিঃসাড় উত্তর দিল রিফাহ।
রিকশা ডেকে হোটেলের দিকে রওনা হল তারা। রাস্তার পাশ দিয়ে ছুটে চলছিল মানুষ, গাড়ি আর হকারদের চিৎকার। কিন্তু এই মুহূর্তে রিফাহর মনে হচ্ছিল যেন তার চারপাশে সবকিছু ম্লান, সাদাটে হয়ে গেছে। তার কানে বাবার কথাও যেন ঠিকমতো ঢুকছিল না।
হোটেলে ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়েই বাবার সঙ্গে দুপুরের খাবার খেল সে। খাবার যেন কেমন কৃত্রিম লাগছিল। লবণ মেপে দেওয়া, ডাল কেবল গরম, কিন্তু তাতে মা’র হাতের মতো কোনো নির্ভরতা নেই।
রুমে ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে। জানালার ফাঁক গলে একটু রোদ ঢুকছে। একটা কবিতা মনে পড়ল—
“সূর্যের আলো মানেই সব উজ্জ্বল নয়, কিছু আলো ছায়া ডেকে আনে।”
বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ফাঁকা লাগছিল। পরীক্ষার চাপ না, না কোনো অনিশ্চয়তা—একটা শূন্যতা, যেন কোনো কিছু শেষ হয়ে গেল হঠাৎ। অনেকদিন ধরে যে প্রস্তুতি, যে ভয়, যে রুটিনমাফিক চিন্তা—সব এখন থেমে গেছে। এখন কিছুই করার নেই, শুধু অপেক্ষা।
হঠাৎ মা’র কথা মনে পড়ল তার। ভাবল, বাসায় একটা কল দিয়ে জানিয়ে রাখে। ফোন করতেই ওপাশ থেকে মা’র কণ্ঠ,
“কি রে মা, পরীক্ষা শেষ? খালি পেটে আছিস না তো?”
এই কণ্ঠেই এত ভালোবাসা লুকানো, এত উদ্বেগ। রিফাহ হেসে বলল,
“না মা, ভালোই গেছে। তুমি চিন্তা কইরো না।”
কথা শেষ করে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে। রাজশাহীর আকাশ তখন ধীরে ধীরে সন্ধ্যায় গড়িয়ে যাচ্ছে।
একটা চড়ুই পাখি বারান্দার রেলিংয়ে এসে বসে আছে। ছোট ছোট চোখে চারদিক দেখে নিচ্ছে—ঠিক রিফাহর মতো, একা, নতুন শহরে, এক নতুন জীবনের অপেক্ষায়।
কোথা থেকে যেন হঠাৎ জুইয়ের কণ্ঠস্বর মনে পড়ে গেল,
“তুই যদি মেডিকেলে চান্স পাস, আমায় ভুলে যাবি না তো?”
রিফাহ হেসে ফেলে মনে মনে—এমন প্রশ্ন কেউ করে? যাকে মনে রাখার জন্য কোনো চেষ্টাই করতে হয় না, তাকে ভোলা কি এতই সহজ? অবশ্য জুই নিজেও মেডিকেলেই ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছে। যদিও ওর পরীক্ষা কেন্দ্র রাজশাহীতে না। রাজশাহীতে হলে অবশ্য দেখা হতো। পরীক্ষার পর দুই বান্ধবী মিলে রাজশাহী শহরটা ঘুরে দেখা যেতো। চান্স হবে কি হবে না তাতো নিশ্চিত না। ফলে আর কবে রাজশাহী আসা হবে তাও অনিশ্চিত।
রাতে খাবার খেতে গিয়ে বাবা বললেন,
“রেজাল্ট যা-ই হোক, আমি জানি তুই নিজের জায়গায় ঠিক আছিস। মানুষ হিসেবেই তোকে আমি সবসময় ভালোবাসি।”
এই কথা শুনে অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারল না রিফাহ। চোখের পেছনে হালকা জ্বলুনি—কিন্তু সে কেঁদে উঠল না। বুকের ভিতর কেবল একটা শব্দ হচ্ছিল:
“আশা। শুধু একটা শব্দ। বাকিটা সময় বলবে।“
–চলবে..



