Homeমতামতসম্পাদকীয়জাইমা রহমান, চেলসি আর গল্পের অতিরঞ্জন: বাস্তবতা কোথায়?

জাইমা রহমান, চেলসি আর গল্পের অতিরঞ্জন: বাস্তবতা কোথায়?

শহীদুল ইসলাম
শহীদুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক। দৈনিক আমারদেশ নিউজ।

বাংলাদেশের রাজনীতি ও জনপরিসরে ব্যক্তিকে ঘিরে গল্প তৈরি নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে যখন সেই ব্যক্তি পরিচিত কোনো রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হন, তখন তার জীবনের নানা দিক শিক্ষা, পেশা, এমনকি শখের বিষয়ও—কখনো কখনো বাস্তবতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। সম্প্রতি জাইমা রহমান-কে ঘিরে এমনই একটি আলোচনার জন্ম হয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দু ফুটবল। আর বিশেষ করে ইংল্যান্ডের শীর্ষ ক্লাব চেলসি।

বিষয়টির সূত্রপাত একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে, যেখানে আমিনুল হক—বাংলাদেশের সাবেক জাতীয় দলের গোলরক্ষক ও বর্তমান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, জাইমা রহমান স্কুলে ফুটবল খেলতেন এবং সেখান থেকে চেলসির নারী দলের বয়সভিত্তিক সেটআপে গোলকিপার হিসেবে “সুযোগ” পেয়েছিলেন।

কিন্তু পরে তিনি নিজেই বিষয়টি পরিষ্কার করেন এটি কোনো অফিসিয়াল সুযোগ বা নিশ্চিত অন্তর্ভুক্তি নয়, বরং তিনি এই তথ্য শুনেছিলেন জাইমার বাবা তারেক রহমান-এর কাছ থেকে। এখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে: বাস্তবতা কোথায় শেষ, আর গল্প কোথা থেকে শুরু?

প্রথমেই একটি সরল তথ্য চেলসি বা তাদের নারী দলের কোনো অফিসিয়াল রেকর্ডে জাইমা রহমানের নাম পাওয়া যায় না। একটি পেশাদার ক্লাবের একাডেমি বা ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে কারও অংশগ্রহণ সাধারণত নথিভুক্ত থাকে। সেই জায়গায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি এই দাবিকে দুর্বল করে।

তার চেয়েও বড় বিষয় হলো কাঠামোগত বাস্তবতা। চেলসির মতো ক্লাবগুলোতে বয়সভিত্তিক দল (একাডেমি) সাধারণত খুব অল্প বয়স—U9 বা তার কাছাকাছি সময় থেকে শুরু হয়। নিয়মিত স্কাউটিং, ট্রায়াল, ফিটনেস টেস্ট—সব মিলিয়ে এটি একটি দীর্ঘ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া। নারী ফুটবলেও একই চিত্র চেলসি মহিলা দলের ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে জায়গা পেতে হলে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে, ১৫–১৬ বছর বয়সে নতুন করে লন্ডনে গিয়ে সরাসরি এমন একটি সেটআপে সুযোগ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন—প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। প্রতি বছর হাজারো প্রতিভাবান খেলোয়াড় ট্রায়াল দেয়, আর সাফল্যের হার খুবই কম।

সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাটি হলো জাইমা রহমান স্কুল পর্যায়ে ফুটবল খেলতেন, সম্ভবত গোলকিপার হিসেবেই। তার উচ্চতা ও শারীরিক গঠন এই পজিশনের জন্য উপযোগী ছিল এমন কথাও বিভিন্ন সূত্রে এসেছে।

লন্ডনে যাওয়ার পর তিনি স্কুল টিমে খেলেছেন এটিও বিশ্বাসযোগ্য। এমনকি কোনো পর্যায়ে স্থানীয় বা স্কুলভিত্তিক স্কাউটিংয়ের আওতায় আসা বা “আগ্রহ” প্রকাশ পাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেটিকে চেলসির একাডেমিতে সুযোগ পাওয়া বা অন্তর্ভুক্তির সমতুল্য বলা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

অর্থাৎ, “স্কুলে ভালো খেলা” আর “চেলসির হয়ে খেলার সুযোগ পাওয়া” এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্যটা অনেক বড়।

জাইমা রহমানের জীবনের যাচাইযোগ্য অংশগুলো বরং অন্য জায়গায় বেশি স্পষ্ট। ১৯৯৫ সালের ২৬ অক্টোবর ঢাকায় জন্ম, শৈশব কেটেছে খালেদা জিয়া-র পরিবারের সঙ্গে। পড়াশোনা শুরু ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকা (আইএসডি) তে।

২০০৮ সালে, যখন তার বয়স প্রায় ১৩, তখন পরিবারসহ লন্ডনে পাড়ি জমান। সেখানেই তার শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পরবর্তীতে তিনি কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন এ আইন বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং ২০১৯ সালে লিংকনস ইন থেকে বার এট ল তথা ব্যরিস্টার ডিগ্রি অর্জন করেন।

একজন যোগ্য ব্যারিস্টার হিসেবে তিনি ELMS Legal Limited-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে মূলত সিভিল ল-সংক্রান্ত কাজ করেছেন। তার পেশাগত জীবন ছিল স্বাভাবিক—ছোট ও মাঝারি মামলার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জনের পথ, যা নতুন ব্যারিস্টারদের জন্য সাধারণ বিষয়।

এই পুরো আলোচনার আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন খেলাধুলা করলে পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাস্তবে বিষয়টি উল্টোও হতে পারে। খেলাধুলা শৃঙ্খলা, দলগত কাজ, মানসিক দৃঢ়তা—এসব গুণ তৈরি করে, যা জীবনের সব ক্ষেত্রেই সহায়ক।

জাইমা রহমান যদি স্কুলে ফুটবল খেলে থাকেন, সেটি তার জীবনের একটি ইতিবাচক দিক হিসেবেই দেখা উচিত অতিরঞ্জিত গল্প বানানোর প্রয়োজন নেই।

সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, জাইমা রহমানকে ঘিরে “চেলসি সুযোগ” প্রসঙ্গটি সম্ভবত একটি অতিরঞ্জিত বয়ান। এর ভিত্তি আছে স্কুল পর্যায়ে ফুটবল খেলা, হয়তো কোনো পর্যায়ে নজরে আসা—কিন্তু সেটি বড় হয়ে এক পর্যায়ে প্রায় “ক্লাব লেভেলের সুযোগ” হিসেবে প্রচারিত হয়েছে।

রাজনীতির জগতে এমন গল্প নতুন নয়। কিন্তু তথ্য-যাচাইয়ের যুগে এসব বয়ান খুব সহজেই পরীক্ষা করা যায় আর তখনই বোঝা যায়, অনেক গল্পই আসলে বাস্তবতার তুলনায় বেশ পাতলা।

সত্যিটা তাই সহজ: জাইমা রহমানের লন্ডন জীবন ছিল মূলত পড়াশোনা ও স্বাভাবিক ছাত্রজীবন ঘিরে; ফুটবল ছিল তার একটি অংশ কিন্তু সেটিকে চেলসির গল্পে রূপ দেওয়া, নিছকই বাড়াবাড়ি।

-শহীদুল ইসলাম, সম্পাদক ও প্রকাশক। দৈনিক আমারদেশ নিউজ। বার্মিংহাম,যুক্তরাজ্য।

বিষয় ভিত্তিক সংবাদ
যোগাযোগspot_img

সর্বাধিক পঠিত