এই দেশে আমার সন্তান কতটা নিরাপদ?

অভিভাবক হিসেবে আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য কতটুকু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না। প্রতিদিনের সংবাদপত্র খুললেই কখনো নিখোঁজ শিশু, কখনো অপহরণ, কখনো নির্যাতন, আবার কখনো কোনো শিশুর মরদেহ উদ্ধারের খবর আমাদের সামনে আসে। কিছু খবর আমরা পড়ি, কিছুক্ষণ মন খারাপ করি, তারপর পরের খবরের দিকে চলে যাই। কিন্তু যে পরিবারটি সন্তান হারায়, তাদের কাছে সেই একটি খবরই হয়ে ওঠে সারাজীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

সম্প্রতি দেশের কয়েকটি ঘটনা সেই প্রশ্নটিকেই আরও নির্মমভাবে সামনে এনেছে।

কুমিল্লায় ১৩ বছরের অপ্রতিম শুক্রবার বিকেলে বাসা থেকে বের হয়েছিল। এরপর আর ফেরেনি। নিখোঁজের প্রায় একদিন পর শনিবার তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন একটি জঙ্গল থেকে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী,তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল।

এর মাত্র কয়েক দিন আগে পাবনায় ১০ বছরের কামরুন্নাহার কলি নিখোঁজ হওয়ার সাত দিন পর একটি ডোবা থেকে বস্তাবন্দি খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার হয়। নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার থানায় জিডি করেছিল, স্বজন ও স্থানীয়রা তাকে জীবিত উদ্ধারের দাবিতে মানববন্ধনও করেছিলেন।

জামালপুরের ঘটনাটি আরও ভয়াবহ। সাত বছরের মরিয়ম আক্তার স্কুলে যাওয়ার পর আর বাড়ি ফেরেনি। তিন দিন ধরে খোঁজার পর পাশের একটি বাড়ির মেঝে খুঁড়ে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ এ ঘটনায় দুজনকে আটক করার কথা জানিয়েছে।

বাগেরহাটেও নয় বছরের রাফি আকনের নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর খাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় কয়েকজন প্রতিবেশীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

চারটি ঘটনা, চারটি পরিবার, চারটি শূন্যতা। কিন্তু প্রশ্ন একটাই- আমরা কি আমাদের শিশুদের নিরাপদ রাখতে পারছি?

একটি শিশু হারিয়ে গেলে শুধু একজন সন্তান নিখোঁজ হয় না; হারিয়ে যায় একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন। একজন মা হয়তো দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন- এই বুঝি সন্তানটি ফিরে আসবে। একজন বাবা হয়তো রাতভর ফোন হাতে বসে থাকেন- হয়তো কোনো অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসবে। একটি ছোট ভাই বা বোন হয়তো বুঝতেই পারে না, কেন তার প্রিয় মানুষটি আর বাড়ি ফিরছে না।

আর পরিবার তখন একটি মাত্র প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকে- “আমার সন্তান কোথায়?” এই প্রশ্নের চেয়ে অসহায় প্রশ্ন পৃথিবীতে খুব কমই আছে।

আমরা কি শুধু মৃত্যুর পর জেগে উঠব?
কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ পোস্ট শেয়ার করে। সবাই উদ্বিগ্ন হয়। তারপর যদি মরদেহ উদ্ধার হয়, আমরা আরও বেশি সোচ্চার হই।

কিন্তু কয়েক দিন পর? আরেকটি খবর আসে। আরেকটি ঘটনা সামনে আসে। আগের শিশুটির গল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। কিন্তু সেই শিশুটির মা-বাবার কাছে গল্পটি কখনো শেষ হয় না। তাদের ঘরে হয়তো সেই স্কুলব্যাগটি পড়ে থাকে। বিছানায় পড়ে থাকে শিশুটির জামা। টেবিলে পড়ে থাকে বই-খাতা। দরজার কাছে হয়তো এখনো কেউ অপেক্ষা করে- “এই বুঝি সে ফিরে এল!”

আমরা খবরটি ভুলে যাই। কিন্তু একটি পরিবার তার সন্তানকে ভুলতে পারে না। আজ যে সন্তানটির ছবি দেখছি, কাল সে আমারও হতে পারে।

এটাই হয়তো সবচেয়ে কঠিন সত্য। আমরা যখন কোনো নিখোঁজ শিশুর ছবি দেখি, তখন তাকে শুধু একটি খবর হিসেবে দেখা উচিত নয়। সে কারও সন্তান। কারও ভাই। কারও বোন। কারও পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।

আজ অপ্রতিমের পরিবার সন্তান হারিয়েছে। কলির পরিবার সন্তান হারিয়েছে। মরিয়মের পরিবার সন্তান হারিয়েছে। রাফির পরিবার সন্তান হারিয়েছে। কিন্তু আগামীকাল? আমরা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারি না যে এমন কোনো দুঃসংবাদ আমাদের দরজায় আসবে না। তাই প্রশ্নটা শুধু সরকারের কাছে নয়, পুলিশের কাছেও নয়- প্রশ্নটা আমাদের সবার কাছে।

আমরা কেমন সমাজ তৈরি করছি? যে সমাজে একটি শিশু স্কুলে যাওয়ার পর নিরাপদে বাড়ি ফিরবে-এই নিশ্চয়তা দিতে পারি না, সেই সমাজের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। যে সমাজে একটি শিশু নিখোঁজ হলে পরিবারকে দিনের পর দিন আতঙ্কে থাকতে হয়, সেখানে আমাদের অনুসন্ধানব্যবস্থা আরও দ্রুত ও কার্যকর করার প্রয়োজন আছে।

যে সমাজে শিশুর মরদেহ উদ্ধারের পর আমরা কয়েক দিনের জন্য উত্তেজিত হই, কিন্তু পরে বিষয়টি ভুলে যাই- সেখানে বিচার ও জবাবদিহির পাশাপাশি প্রতিরোধ নিয়েও ভাবতে হবে। কারণ আমি মনে করি একটি শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়। এটি তার অধিকার। একজন বাবা-মা সন্তানকে পৃথিবীতে আনার পর শুধু তাকে বড় করার দায়িত্ব নেন না- তারা তাকে নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকারও দিতে চান।

আমাদের সন্তানরা যেন স্কুলে যায়, খেলতে যায়, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যায়- আর সন্ধ্যায় হাসিমুখে ঘরে ফিরে আসে। একজন মা যেন দরজার দিকে তাকিয়ে আতঙ্কে না থাকেন। একজন বাবা যেন থানার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সন্তানের ছবি হাতে নিয়ে সাহায্যের অপেক্ষায় না থাকেন। আর কোনো পরিবারের কাছে যেন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে না হয়- “আমার সন্তান কোথায়?” আমাদের সন্তানদের জন্য আমরা কেবল একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ চাই না; আমরা চাই তারা সেই ভবিষ্যৎ পর্যন্ত নিরাপদে পৌঁছাক।

আমাদের সন্তানরা যেন স্কুলে যায়, খেলতে যায়, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যায়- আর সন্ধ্যায় হাসিমুখে ঘরে ফিরে আসে। একজন মা যেন দরজার দিকে তাকিয়ে আতঙ্কে না থাকেন। একজন বাবা যেন থানার বারান্দায়1 দাঁড়িয়ে সন্তানের ছবি হাতে নিয়ে সাহায্যের অপেক্ষায় না থাকেন। আর কোনো পরিবারের কাছে যেন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে না হয়- “আমার সন্তান কোথায়?”

শুধু বাবা-মায়ের সতর্কতা দিয়ে কি শিশু নিরাপদ হবে?
আমরা প্রায়ই বাবা-মাকে বলি সন্তানকে চোখে চোখে রাখুন। একা বাইরে যেতে দেবেন না। অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করুন। এসব অবশ্যই প্রয়োজনীয় শিক্ষা। কিন্তু প্রশ্ন হলো- একটি শিশুর নিরাপত্তার পুরো দায়িত্ব কি শুধু তার বাবা-মায়ের? একজন বাবা-মা কি ২৪ ঘণ্টা সন্তানের হাত ধরে রাখতে পারবেন?

সন্তান স্কুলে যাবে। মাঠে খেলবে। কোচিংয়ে যাবে। বন্ধুর বাড়িতে যাবে। বাজারে যাবে। আত্মীয়ের বাড়িতে যাবে। কখনো হয়তো কয়েক মিনিটের জন্য বাবা-মায়ের চোখের আড়ালেও থাকবে। একটি সভ্য ও নিরাপদ সমাজের দায়িত্ব হলো- সেই সময়টুকুতেও শিশুটির নিরাপত্তার জন্য একটি কার্যকর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকা।

শিশুর নিরাপত্তা মানে শুধু অপরাধ ঠেকানো নয়-
আমরা শিশু নিরাপত্তার কথা বলতে গিয়ে প্রায়ই শুধু অপহরণ বা হত্যার কথা বলি। কিন্তু নিরাপত্তা আরও বড় বিষয়। নিরাপদ রাস্তা চাই। নিরাপদ স্কুল চাই। নিরাপদ খেলার মাঠ চাই। নিরাপদ গণপরিবহন চাই। নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ চাই। শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা চাই। নিখোঁজ হলে দ্রুত অনুসন্ধানের ব্যবস্থা চাই। অভিযোগ করার পর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা চাই।

শিশু নিখোঁজের সংখ্যা কি আমাদের ভাবাচ্ছে?
শিশু নিখোঁজের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি দেশের শিশু নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার মতো একটি বিষয়। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই- এই সাত মাসে সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশু উদ্ধার হয়েছে অথবা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। তবে এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান মেলেনি, যা মোট নিখোঁজের প্রায় ১৩ শতাংশ।

একজন শিশুও নিখোঁজ থাকুক-এটা কোনোভাবেই আমাদের কাম্য নয়। প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর পেছনে রয়েছে একটি উদ্বিগ্ন পরিবার, একজন অসহায় মা, একজন উৎকণ্ঠিত বাবা এবং সন্তানের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা একটি ঘর।

দিন শেষে প্রতিটি শিশু যেন নিরাপদে তার বাবা-মায়ের কাছে ফিরে আসে, তাদের সঙ্গে হাসিখুশি সময় কাটায়- এটাই একজন অভিভাবক হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে বাবা-মাকে সারাদিন দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে না; খেলতে বা বাইরে যেতে দিয়ে বুকের ভেতর ভয় জমিয়ে রাখতে হবে না। প্রতিটি শিশু যেন নিরাপদে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়, নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যেতে পারে এবং প্রতিদিন হাসিমুখে পরিবারের কাছে ফিরে আসতে পারে। কারণ একটি শিশুর হাসি শুধু তার পরিবারের আনন্দ নয়- একটি নিরাপদ, মানবিক সমাজেরও প্রতিচ্ছবি।

লেখক: আহাদুজ্জামান তন্ময়, সহ সম্পাদক, দৈনিক আমারদেশ নিউজ।

আরও পড়ুন

নদী যদি ‘মা’ হয়, তবে তাঁকে দূষিত করি কেন?

0
গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, নর্মদা—ভারতীয় উপমহাদেশের এই নদীগুলো কেবল জলধারা নয়; কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারক। হিন্দু ধর্মে এগুলোকে ‘মা’ বলে...

আরও পড়তে পারেন

নদী যদি ‘মা’ হয়, তবে তাঁকে দূষিত করি কেন?

গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, নর্মদা—ভারতীয় উপমহাদেশের এই নদীগুলো কেবল জলধারা নয়; কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারক। হিন্দু ধর্মে এগুলোকে ‘মা’ বলে...

একটা বোমা, শত স্বপ্নের মৃত্যু,যখন স্কুল হয়ে ওঠে কবরস্থান

কল্পনা করেন একটা সাধারণ সকাল। সূর্য উঠেছে, পাখিরা ডাকছে। ইরানের মিনাব শহরের শাজারেহ তায়্যেবাহ স্কুলে ছোট ছোট মেয়েরা হাসিমুখে ক্লাসে ঢুকছে। তাদের চোখে স্বপ্নের...

ইরানি কুর্দিরা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কী করবে

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলার মধ্যেই ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আকস্মিক হামলা শুরু করে। ভেনেজুয়েলার মতো ইরানেও...