গত ২৬শে সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর ইসিবি চত্বরে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিও’তে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা আমাদের একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হোক বা সাধারণ নাগরিক—আইনশৃঙ্খলা ও জানমালের নিরাপত্তা যেখানে হুমকির মুখে, সেখানে জনমনে তৈরি হওয়া উদ্বেগ কোনোভাবেই এড়ানো যায় না। স্টুডিওর মালিকের বরাতে জানা গেছে, কর্মীদের কোনো ক্ষতি না হলেও প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হামলার পেছনের কারণ হিসেবে জমির মালিকের কাছে চাঁদা দাবি এবং তা না পেয়ে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক কর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে ছোরাসহ আটক করা ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ ঘটনাটিকে জমি দখল সংক্রান্ত বিরোধ হিসেবে প্রাথমিক তদন্তে উল্লেখ করেছে।
ঘটনার গভীরতা এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। কিন্তু এই একটি ঘটনাই বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দিক উন্মোচন করে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ যে ব্যাপক কাঠামোগত ও মানসিক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল, তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভই ছিল চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, দলীয় ফ্যাসিবাদের অবসান এবং একটি ভীতিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা। ফ্যাসিবাদী আচরণের বিপরীতে মানুষ চেয়েছিল আইনের শাসন এবং নাগরিক নিরাপত্তা। কিন্তু বিপ্লবের পরও যখন বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি বা রাজনৈতিক পরিচয়ে আধিপত্য বিস্তারের পুরোনো চিত্র উঁকি দেয়, তখন গণমানুষের মনে চরম হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম নেওয়াটাই স্বাভাবিক।
যেকোনো ভাঙচুর বা চাঁদাবাজি—তা যে দলের নামেই হোক বা যারাই করুক—তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজে পেশীশক্তি বা অস্ত্রের জোরে রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি দখল করার চেষ্টা কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না। তবে একই সাথে আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে যে, যেকোনো অপরাধের পেছনে ঢালাওভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বা আদর্শকে দায়ী করার আগে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন। ইসিবি চত্বরের ঘটনার ক্ষেত্রে পুলিশ এখনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করেনি, বরং একে জমি সংক্রান্ত একটি বিরোধ হিসেবে দেখছে। সুতরাং, কোনো পক্ষকে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত করার আগে পুলিশের চূড়ান্ত তদন্ত ও অকাট্য প্রমাণের অপেক্ষা করাটাই দায়িত্বশীল নাগরিকের পরিচয়।
আজকের বাংলাদেশের মানুষের মূল দাবি কোনো নির্দিষ্ট দলের পুনর্বাসন বা ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্থায়ী নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং শান্তি। কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী যদি নতুন বাংলাদেশেও পুরোনো আমলের সেই দখলদারিত্ব ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চায়, তবে তা হবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তার পেছনে যত বড় খুঁটির জোরই থাকুক না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। প্রশাসন যদি এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে এখনই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ না করে, তবে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বারবার ফিরে আসবে। ক্ষমতার বদল হলেও যদি আচরণের বদল না হয়, তবে টেকসই রাষ্ট্র গঠন অসম্ভব। আমরা আশা করি, এই ঘটনার একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও সুষম তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তি প্রদান করা হবে, যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করবে।








