back to top
Friday, February 27, 2026
Homeমতামতইরানে সরব পশ্চিমারা, পাকিস্তানে নীরব কেন

ইরানে সরব পশ্চিমারা, পাকিস্তানে নীরব কেন

সম্পাদক
সম্পাদকhttps://amardeshnews.com/
সম্পাদক ও প্রকাশক, শহীদুল ইসলাম। ১৩৩, ফ্রি রোড, বি-৬, ৬ এনডি, বার্মিংহাম,যুক্তরাজ্য। Contact us: amaardeshnews@gmail.com

পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদের দৃষ্টিশক্তি নিয়ে বেশ গর্বিত। তাদের স্যাটেলাইট সর্বক্ষণ নজরদারিতে ব্যস্ত। অ্যালগরিদম করছে তথ্য সংগ্রহ। সাংবাদিকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো করে যাচ্ছে মেটাডাটা বিশ্লেষণ। আমাদের নিয়মিতই আশ্বস্ত করা হয়, কিছুই তাদের নজর এড়িয়ে যায় না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

দুই বছরের বেশি সময় ধরে পাকিস্তানে মুসলিম বিশ্বে অন্যতম বৃহৎ, ঐক্যবদ্ধ ও প্রকাশ্যভাবে অহিংস একটি আন্দোলন চলেছে। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছে, তবু এই আন্দোলন প্রায় কোনো আন্তর্জাতিক আলোচনাতেই স্থান পায়নি।

আদালতকে ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। গণমাধ্যমকে জোর করে নীরব করা হয়েছে। প্রতিবাদকারীদের হত্যা করা হয়েছে। প্রকাশ্যেই একটি নির্বাচন বিকৃত করা হয়েছে।

দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে একঘরে করা হয়েছে। ধীরে ধীরে আইনের মাধ্যমে তাঁকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব এসব দেখেনি, বলা যায়, সব দেখেও নীরব থেকেছে।

এই নীরবতা আর ভুল বা অসাবধানতার ফল নয়, অন্ধত্বও নয়। এটি ইচ্ছাকৃত নীতিগত সিদ্ধান্ত। পাকিস্তানের শাসকেরা যেভাবে দমন চালায়, ঠিক সেই কৌশলেই এই নীরবতা বজায় রাখা হয়েছে—প্রশাসনিকভাবে, আইনি প্রক্রিয়ায়, ধাপে ধাপে। ফলে পুরো বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিরাপদভাবে আড়াল হয়ে আছে।

এখন ইরানের দিকে তাকানো যাক। সেখানে সামান্য অস্থিরতাও ব্যাপক প্রচার পায়। প্রতিটি ঘটনাই বড় করে দেখানো হয়। একটি জ্বলন্ত ডাস্টবিন ভবিষ্যতের সংকেত হয়ে ওঠে। প্রতিটি সংঘর্ষকে নিয়তির ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। টক শো ভরে ওঠে। হ্যাশট্যাগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়।

নিষেধাজ্ঞাকে নৈতিক শুদ্ধতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। এমনকি সামরিক হামলার কথাও মানবিক উদ্বেগের ভাষায় বলা হয়। আমাদের জানানো হয়, পশ্চিমা বিশ্বের নৈতিক বিবেক এখনো পুরোপুরি জাগ্রত।

পাকিস্তানে দমননীতি তেমন দৃশ্যমান নয়। এখানে সিনেমার মতো দৃশ্য নেই। আছে কাগজপত্র, আদালতের আদেশ আর লাঠির আঘাত। আন্দোলন করলে এখানে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা হয়। মানুষ গুম হয়। বেছে বেছে হত্যা চলে। সবকিছু ঘটে নিয়ন্ত্রিত ও পরিমিতভাবে, এমনভাবে যাতে তা সহজে হজমযোগ্য থাকে। কোনো নাটক নেই। কোনো মুক্তির গল্প নেই। কোনো ভাইরাল মুহূর্ত নেই। তাই ক্ষোভও তৈরি হয় না।

এটাই প্রকৃত দ্বিমুখী মানদণ্ড। বিষয়টি গণতন্ত্র বনাম স্বৈরতন্ত্র নয়। বিষয়টি দৃশ্যমানতা বনাম শৃঙ্খলা। পশ্চিমা বিশ্ব অন্যায়ের প্রতি নয়, সাড়া দেয় দৃশ্যমানতার প্রতি। নীতির চেয়ে তারা গুরুত্ব দেয় সামঞ্জস্যকে। ইরান অবাধ্য। আদর্শগতভাবে অস্বস্তিকর। তারা আনুগত্য মানে না। পাকিস্তান সামরিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রিত। প্রয়োজনমতো ব্যবহারযোগ্য।

ইসলামাবাদে সরকার পরিবর্তন হয়েছে ২০২২ সালের এপ্রিলে। ওয়াশিংটন যা চেয়েছিল, তা পেয়েছে। এরপর আর পরিস্থিতির গভীরে তাকানোর তাগিদ নেই। তাই ইরানে দমননীতি হয়ে ওঠে সভ্যতার সংকট। আর পাকিস্তানে দমননীতি, যা আরও বিস্তৃত ও পদ্ধতিগত, তাকে বলা হয় ‘জটিল অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা’। এ বাস্তবতায় নব্য রক্ষণশীলেরা চোখ ফেরান। উদারপন্থীরা হঠাৎ সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা খুঁজে পান।

পাকিস্তানের শাসকেরা এ কারণে নীরব প্রশংসার দাবিদার বলেই মনে হয়। তারা দমনকে এমনভাবে পরিশীলিত করেছে, যাতে আন্তর্জাতিক দাতারা আতঙ্কিত না হন। টেলিভিশনে ট্যাংক নেই। গণহত্যার দৃশ্য নেই। আছে আগাম আটক, আদালতের সাজানো প্রক্রিয়া, মিডিয়া ব্ল্যাকআউট এবং মেপে নেওয়া সহিংসতা। তাদের লক্ষ্য আতঙ্ক ছড়ানো নয়, লক্ষ্য ক্লান্তি ছড়ানো—মানুষকে ধীরে ধীরে হাল ছেড়ে দিতে শেখানো।

তারা শক্তিকে ‘নিরাপত্তা’ হিসেবে উপস্থাপন করতে শিখেছে। দমনকে ‘স্থিতিশীলতা’ নামে পালিশ করে বিনিয়োগ সম্মেলনে উপস্থাপন করতে জানে। বাইরে আনুগত্য, ভেতরে নিয়ন্ত্রণ—এই সমীকরণে মানবাধিকার হয়ে ওঠে ঘরোয়া ঝামেলা। ইমরান খানের সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা এই বাস্তবতার প্রতীক।

তাঁকে বিরক্তিকর এক পাদটীকায় পরিণত করা হয়েছে। তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তাকে খারাপ আবহাওয়ার মতো দেখা হয়েছে। তাঁর কারাবাসকে আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে এটি ছিল রাজনৈতিকভাবে তাঁকে নিষ্ক্রিয় করার কৌশল। কারণ, তিনিই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সামরিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের সম্মতি সংগঠিত করতে পারতেন।

পশ্চিমা কর্মকর্তারা ও সাংবাদিকেরা এসব জানেন। তাঁদের নীরবতা অজ্ঞতার ফল নয়, এটি অঙ্ক। পাকিস্তান এমন কোনো দেশ নয়, যাকে তারা রক্ষা করতে চায়। পাকিস্তান এমন এক অংশীদার, যাকে তারা ধরে রাখতে চায়। এই ছাড়ের কারণ একটাই—পাকিস্তান প্রয়োজনমতো কাজে লাগে।

সেখানে নিষেধাজ্ঞার ছায়ায় অস্ত্র বিক্রি করা যায়। প্রয়োজনে আফগানিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। গোপন বার্তা আদান-প্রদান করা যায়। চীনের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতার নাটক মঞ্চস্থ করে দুই পক্ষের ওপরই প্রভাব রাখা যায়। এসবই করা যায় কম খরচে।

ইরান ঠিক উল্টো। তারা নিজেদের ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে চায় না। সার্বভৌমত্ব ভাড়া দেয় না। অনুমোদনের জন্য অনুনয় করে না। তাই সেখানে অস্থিরতা নৈতিক মহাকাব্যে রূপ নেয়। আর পাকিস্তানের সংগঠিত, শৃঙ্খলিত ও কৌশলগত গণ-আন্দোলন পরিণত হয় অপ্রচলিত শব্দে। এখানেই নির্মম শিক্ষা লুকিয়ে আছে।

অহিংস আন্দোলন অদৃশ্য থাকে। সংগঠনগুলো তবু আসে শাস্তির আওতায়। জনপ্রিয়তা তখন বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। দমন সফল হয় যদি তা নীরবে করা যায় এবং যদি তা পশ্চিমা স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। মনোযোগের এই নৈতিক অর্থনীতি দুর্ঘটনাবশত নয়, এটি পেশাদারভাবে গড়ে তোলা।

পাকিস্তানের শাসকেরা এই ভণ্ডামির শিকার নন। তাঁরা এর সুবিধাভোগী। তাঁরা এমন এক ভারসাম্য আয়ত্ত করেছেন, যাতে ভেতরে কর্তৃত্ব বজায় থাকে এবং বাইরে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু ভণ্ডামির মতো দমনও সুদে-আসলে বাড়ে।

যে বিশ্ব তেহরানের অস্থিরতাকে বড় করে দেখে এবং পাকিস্তানের গণদমন উপেক্ষা করে, সে বিশ্ব গণতন্ত্র রক্ষা করছে না। সে বিশ্ব কেবল নির্লজ্জ বাস্তববাদ প্রচার করছে। যে গণমাধ্যম বিশৃঙ্খলাকে আকর্ষণীয় করে তোলে এবং সংগঠনকে তুচ্ছ করে, সে গণমাধ্যম মানুষকে তথ্য দেয় না।

বরং বিকট শব্দকে সাহস আর শৃঙ্খলাকে উদাসীনতা হিসেবে ভাবতে শেখায়। আর যে পররাষ্ট্রনীতি বৈধতার চেয়ে উপযোগিতাকে পুরস্কৃত করে, তা স্থিতিশীলতা আনে না। বরং ভবিষ্যতের ভাঙনের বীজ বপন করে।

পশ্চিমা বিশ্ব এখানে নীরবে স্পষ্ট একটি বার্তা দিয়েছে—‘জোরে চিৎকার করো। আগুন জ্বালাও। নাটকীয়ভাবে রক্ত ঝরাও। তাহলে তোমাকে দেখা হবে। কিন্তু ধৈর্যের সঙ্গে সংগঠিত হও। লাখো মানুষ জড়ো করো। দৃশ্য তৈরি ছাড়াই ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করো, তাহলে তোমাকে মুছে ফেলা হবে।’ এটি নিরপেক্ষতা নয়। এটি নির্দেশনা। ইতিহাস কখনোই সেই সাম্রাজ্যগুলোর প্রতি দয়ালু হয়নি, যারা নিয়ন্ত্রণকে নিধনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে।

  • জুনায়েদ এস আহমদ পরিচালক, সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ইসলাম অ্যান্ড ডিকলোনাইজেশন, পাকিস্তানমিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
বিষয় ভিত্তিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত