ডিয়েগো গার্সিয়া বিতর্ক: মিত্রতা, সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত অনিশ্চয়তা

সাম্প্রতিক এক ক্যাবিনেট বৈঠকে Donald Trump যে মন্তব্যগুলো করেছেন—বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, ন্যাটো এবং চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে—তা শুধু কূটনৈতিক অস্বস্তিই তৈরি করেনি, বরং পশ্চিমা জোটের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনকেও সামনে এনে দিয়েছে। ব্রিটিশ বিমানবাহী রণতরীকে “খেলনা” বলে উড়িয়ে দেওয়া কিংবা যুদ্ধ-পরবর্তী সহায়তার প্রতিশ্রুতিকে ব্যঙ্গ করা—এসব বক্তব্য আসলে বৃহত্তর অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ।

এই অসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে Diego Garcia—ভারত মহাসাগরের এক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। United States ও United Kingdom-এর যৌথ ব্যবহৃত এই বেসটি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং এশিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে যেকোনো অনিশ্চয়তা স্বাভাবিকভাবেই কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করে।

সমস্যার সূত্রপাত Keir Starmer সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত থেকে। ২০২৫ সালে Mauritius-এর সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়, যদিও ডিয়েগো গার্সিয়া বেসটি দীর্ঘমেয়াদি লিজে চালু রাখার কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের যুক্তি—এতে একদিকে ঔপনিবেশিক যুগের পুরনো বিরোধের অবসান ঘটবে, অন্যদিকে সামরিক উপস্থিতিও বজায় থাকবে।

কিন্তু Donald Trump এই যুক্তিকে গ্রহণ করছেন না। তাঁর দৃষ্টিতে, সার্বভৌমত্ব হস্তান্তর মানেই কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করা। তিনি আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে এই লিজ-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা রাজনৈতিক বা আইনি জটিলতায় পড়তে পারে, যা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সামরিক অপারেশনকে বাধাগ্রস্ত করবে। তাঁর ভাষায়, এটি “দুর্বলতা” প্রদর্শনের শামিল—বিশেষ করে যখন China ও Russia-এর মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি ক্রমশ সক্রিয় হয়ে উঠছে।

এই বিতর্ক কেবল একটি দ্বীপ বা একটি সামরিক ঘাঁটি ঘিরে নয়; এটি আসলে মিত্রতার চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। ন্যাটো জোটে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ—অন্যান্য সদস্য দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয়ে ও সামরিক সক্ষমতায় যথেষ্ট অবদান রাখছে না। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই পুরনো বিতর্ককেই নতুন করে উসকে দিয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের অবস্থানও একেবারে অযৌক্তিক নয়। তারা মনে করছে, আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক বাস্তবতা মেনে চলা জরুরি। চাগোস ইস্যু বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচিত হয়েছে, এবং মরিশাসের দাবিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় কূটনৈতিক সমস্যার জন্ম দিতে পারে।

ফলে পরিস্থিতি এখন এক ধরনের দ্বৈত সংকটে আটকে গেছে। একদিকে তাৎক্ষণিক সামরিক প্রয়োজন—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ডিয়েগো গার্সিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। অন্যদিকে রয়েছে আন্তর্জাতিক আইন, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার এবং অংশীদারিত্বের নৈতিক প্রশ্ন।

সবশেষে বলা যায়, এই বিতর্ক দেখিয়ে দিচ্ছে যে আধুনিক ভূরাজনীতিতে শুধু শক্তি নয়, বৈধতা (legitimacy) এবং অংশীদারিত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ডিয়েগো গার্সিয়ার ভবিষ্যৎ হয়তো নির্ধারণ করবে না বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ, কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় প্রশ্ন উত্থাপন করেছে—মিত্রতা কি কেবল সামরিক সুবিধার ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে, নাকি তা আন্তর্জাতিক ন্যায্যতা ও আস্থার ভিত্তিতেও টিকে থাকতে হবে?

আরও পড়ুন

কিছু মানুষের অসচেতনতা কি পুরো বাংলাদেশী কমিউনিটির ইমেজ নষ্ট করছে?

পর্তুগালের রাজধানী Lisbon–এর রুয়া দো বেনফরমোসো এলাকাটি অনেকের কাছে এখন “বাংলাটাউন” নামে পরিচিত। এই এলাকায় বাংলাদেশী মালিকানাধীন দোকান, রেস্টুরেন্ট ও ছোট ব্যবসার সংখ্যা দিন...

আরও পড়তে পারেন

কিছু মানুষের অসচেতনতা কি পুরো বাংলাদেশী কমিউনিটির ইমেজ নষ্ট করছে?

পর্তুগালের রাজধানী Lisbon–এর রুয়া দো বেনফরমোসো এলাকাটি অনেকের কাছে এখন “বাংলাটাউন” নামে পরিচিত। এই এলাকায় বাংলাদেশী মালিকানাধীন দোকান, রেস্টুরেন্ট ও ছোট ব্যবসার সংখ্যা দিন...

মেধা, ক্ষমতা ও নৈতিকতা: আমাদের অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো

একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং একসময়কার উচ্চপদস্থ এক নেত্রীর গ্রেফতার—দুটি ভিন্ন ঘটনা, কিন্তু অদ্ভুতভাবে তারা একই প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করায়: মেধা ও অবস্থান কি...

ইরান: সাম্রাজ্যের কবরস্থান — ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও আমেরিকার নতুন পরীক্ষা

ইতিহাসের পাতা উল্টালে একটি বিষয় বারবার চোখে পড়ে—বিশ্বের পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যগুলো ইরান (প্রাচীন পারস্য) জয় করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। কেউ সাময়িকভাবে দখল করেছে,...