ওমায়ের বিন ইসলাম
হাবীব সাহেব ছেলেকে ডেকে বললেন, “আজ বাইরে কোথাও যাস না।” মুহিব কোনো কথা বলল না। চুপচাপ নিজের রুমে চলে এলো। বাবার সঙ্গে ইদানীং তার খুব একটা কথাবার্তা হয় না। এরকম-ই মাঝেমধ্যে বাবা ডাকেন। কিছু একটা বলেন। মুহিব চুপচাপ শোনে। দরকার হলে দু-একটা উত্তরও দেয়। এর বেশি আর কোনো কথা হয় না।
এরকম ছিল না। সব স্বাভাবিকই ছিল। মায়ের আকস্মিক মৃত্যুর পরে সবকিছু কেমন যেন হয়ে গেছে। সুর কেটে গেছে আসলে। মানুষের জীবন দীর্ঘ কোনো এক গানের মতো। কোথাও একটা সুর কেটে গেলে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়।
মা-বাবা ছাড়া আর একজন মানুষের সঙ্গেই গল্প-আড্ডা হতো মুহিবের। মুয়াজ। এখনো হয়। মুয়াজ নিয়মিতই আসে। কত কথা বলে, মুহিবকে হাসানোর চেষ্টা করে। মুহিবের ভালো লাগে না এসব। তবে মুয়াজ যতক্ষণ থাকে, সময়টা ভালোই কাটে। আর কোনো বন্ধু তো নেই তার।
মুয়াজেরই ফোন এলো।
— শাপলা চত্বরে যাবি?
— কেন?
— জানিস না আজকে হেফাজতের মহাসমাবেশ!
মুহিবের মনে পড়ল। কালকে খবরে দেখেছিল। যাওয়া উচিত? বাবা তো নিষেধ করলেন। সে বলল, “তুই আয়। দেখি কী করা যায়।”
ফোন রেখে মুহিব একটা চিরকুট লিখল, “বাবা, একটু বাইরে যাচ্ছি। বিকেলের মধ্যেই ফিরব।” চিরকুটটা টেবিলে রেখে সে চুপচাপ বেরিয়ে এলো। বাসার সামনে এসে মুয়াজের অপেক্ষা করতে লাগল।
মুহিব আর মুয়াজ যখন শাপলা চত্বরে পৌঁছাল, তখন দুপুর আড়াইটা হবে। আকাশ থেকে আগুন ঝরছে। মাইকে বক্তৃতা চলছে। চারদিকে মানুষ আর মানুষ। কারো কারো হাতে তাসবিহ। মুয়াজ মুহিবকে নিয়ে একটা ভ্যানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মুহিব দেখল, তাদের কলেজেরই পাঁচ-ছয়জন ছেলে এসেছে। ভ্যানগাড়ির ওপর বড় বড় বালতিতে লেবুর শরবত বানাচ্ছে তারা। মুয়াজও তাদের সঙ্গে যোগ দিল। মুহিবের এসব কাজ করবার অভ্যাস নেই। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল। ঠান্ডা পানি দেখে মানুষ এদিকে আসতে শুরু করেছে। মুয়াজ বলল, “মুহি, ওই বালতিটা হয়ে গেছে। তুই দুটো গ্লাস নিয়ে ওইখান থেকে দেওয়া শুরু কর।”
মুহিব একটু অপ্রস্তুত হলেও তৎক্ষণাৎ সামলে নিল। সবাই কাজ করছে, সে কেন দাঁড়িয়ে থাকবে? দুটো গ্লাস নিয়ে সে শরবত দিতে শুরু করল। দীর্ঘ লাইন পড়ে গেছে মানুষের। একজনের পর একজন আসছে। এই একটুখানি লেবুর শরবত খেয়ে সে কী তৃপ্তি তাদের চোখেমুখে! একজন বৃদ্ধ মানুষ শরবত খেয়ে মুহিবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বললেন, “তোমার আম্মাকে আমার সালাম বলবা বাজান। এমন সন্তান তো সবাই জন্ম দিতে পারে না।” মুহিব খুব অবাক হলো। তেমন কিছু তো করেনি সে। মায়ের কথা মনে পড়ে গেল তার। মা বেঁচে থাকলে বাসায় ফিরে মাকে শোনাত এসব গল্প।
রোদটা একটু পড়ে এলে মানুষের ভিড় কমল। পরিবেশটা একটু ঠান্ডা হয়েছে। এদিকে মুহিবদের বরফ আর লেবুও শেষ হয়ে এসেছে। তারা সবকিছু গুছিয়ে ফেলল। মুহিবের তখন মনে পড়ল বাবার কথা। সন্ধ্যার আগেই ফিরবে বলে সে টেবিলে চিরকুট রেখে এসেছিল। মুয়াজকে একপাশে ডেকে মুহিব বলল, “আমার বাসায় যাওয়া লাগবে রে। বাবা চিন্তা করবে।”
মুয়াজ বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই তো। তুই আবার আঙ্কেলকে বলে আসিস নাই।”
মুহিব আর চিরকুটের কথাটা বলল না।
মুয়াজ বলল, “দাঁড়া, আমি বলে আসি ওদেরকে। তোকে বাসায় রেখে আমি আবার আসব।”
মুহিব বলল, “আমি একা যেতে পারব তো।”
মুয়াজ হাসল। বলল, “বড়লোকের ছেলে, রাস্তায় অনেক গন্ডগোল। তুমি তো একটা দৌড়ও দিতে পারবা না।”
মুহিব চোখ পাকিয়ে তাকাল।
মুহিব আর মুয়াজ মাত্র একটু এগিয়েছে, ঠিক তখনই একটা হৈচৈ শুরু হলো। কালো ধোঁয়ায় ভরে উঠল পুরো জায়গাটা। সঙ্গে গুলির শব্দ। লোকজন এলোপাতাড়ি ছুটতে শুরু করল। মুয়াজ মুহিবের হাত চেপে ধরে বলল, “ভয় পাস না। এইসব ফাঁকা গুলি। চোখে হাত দিয়ে রাখ। গ্যাস ছুঁড়ছে পুলিশ।”
মুহিব এক হাত দিয়ে চোখ ঢাকল। ঝাঁঝালো একটা গন্ধ চারদিকে। চোখ জ্বলছে মুহিবের। সামনেই একটা কিসের ছাউনি যেন। দুজনে দৌঁড়ে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। তখন চারদিকটা একটু পরিষ্কার হচ্ছে। আওয়াজটাও আর নেই। মুয়াজ বলল, “তাড়াতাড়ি চল মুহি। এই জায়গাটা তাড়াতাড়ি পার হতে হবে।”
ছাউনি থেকে বেরিয়ে দুজন হাঁটতে শুরু করল। মুহিব খুব শক্ত করে মুয়াজের হাত ধরে রেখেছে। হাঁটতে হাঁটতে তারা শাপলা চত্বরের সীমানাটা যখন পেরিয়ে এসেছে, তখনই একটা বিকট শব্দ হলো। মুহিব চোখ বন্ধ করে ফেলল। ভয়ে তার বুক কাঁপছে। মুয়াজের হাতও কখন যেন ছেড়ে দিয়েছে। চোখটা খুলতেই মুহিবের সামনের পৃথিবীটা দুলে উঠল। মুয়াজ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। রক্তে ভেসে গেছে তার পুরো শরীর। মুহিব খানিকক্ষণ স্তম্ভিতের মতো দাঁড়িয়ে রইল। মুয়াজের গুলি লেগেছে। কী করবে সে? কী করা উচিত এখন? চিৎকার করবে? কেউ তো নেই আশেপাশে। মুহিব মুয়াজকে কাঁধে তুলে নিয়ে দৌঁড়াতে শুরু করল। গলগল করে রক্ত পড়ছে। মুহিবের শরীর ভেঙে আসছে। একসঙ্গে এত রক্ত সে কোনোদিন দেখেনি। আর একটু এগোতে দুজন মানুষের দেখা পাওয়া গেল। তারা একটা বাইকে করে মুয়াজকে হাসপাতালে পৌঁছে দিল।
হাসপাতালের করিডোরে বসে আছে মুহিব। হাবীব সাহেব এসেছেন। মুয়াজের বাবা-মাও এসেছে। একটু পরে মুয়াজের অপারেশন হবে। মুয়াজের মা ক্রমাগত কেঁদে যাচ্ছেন। একজন নার্স এসে মুহিবকে ডাকল। মুয়াজের মানিব্যাগ আর চাবির রিং দিতে এসেছে।
চাবির রিংটা দেখল মুহিব। সে-ই দিয়েছিল দু-বছর আগে। মুয়াজ এই সাধারণ রিংটা এতদিন আগলে রেখেছে! অদ্ভুত ছেলে। মানিব্যাগটা খুলল মুহিব। পঞ্চাশ টাকার কয়েকটা মলিন নোট। কিছু কার্ড। ছোটবেলার সাদাকালো একটা ছবি। একটা টিস্যু পেপার। ওপরে তারিখ লিখে রাখা। তারা দুজন মিলে কদিন আগে একটা ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্টে খেয়েছিল, সেখানকার টিস্যু। ভেতরের পকেটে একটা চিরকুট। মুহিব চিরকুটটা খুলল।
“একদিন আমার সঙ্গে কথা বললে এমন কী ক্ষতি হয় আপনার? আজকে বিকেলে ফোন করব। ধরবেন প্লিজ।”
মেয়েলি হাতের লেখা। নিচে কারো নাম লেখা ছিল। মুয়াজ কেটে দিয়েছে। কেন কে জানে! চিঠিতে তারিখটা দেখল মুহিব। ০৪-০৫-২০১৩। তার মানে আজকে বিকেলে মেয়েটার ফোন দেওয়ার কথা ছিল! মেয়েটা কি ফোন করেছে? এত কষ্টের মধ্যেও মুহিবের একটু হাসিই পেল। জীবন কত রকমের রং দেখায় মানুষকে।
মুয়াজের অপারেশন শেষ হলো মধ্যরাতের পর। ডাক্তার আশ্বাস দেওয়ার মতো কিছু বলতে পারলেন না। সারারাত কেউ ঘুমাল না। ফিনাইল আর ডেটলের গন্ধ চারদিকে। কত রকমের রোগী আসছে এই মধ্যরাতেও। মুহিবের মনে পড়ল সেই স্কুলের দিনগুলোর কথা। আর কোনো বন্ধু ছিল না তার। এই এক মুয়াজই। কত স্মৃতি—ঘোরাফেরা, খেলাধুলা, ঝগড়া। মুহিবের মনে পড়ল, স্কুলের সময় মাঝেমধ্যেই ঝগড়া বাঁধত মুয়াজের সঙ্গে। মুয়াজের একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল—ঝগড়া হলেই সে কথা বন্ধ করে দিত। নিজের থেকে কথাও বলত না। একদিন, দুদিন, তিনদিন… তারপর একদিন মুহিবই যেত ওদের বাড়িতে। মুহিব গেলে খালাম্মা অবশ্যই পোলাও-মাংস রান্না করতেন। খাবার খেতে খেতেই মুয়াজের সঙ্গে ভাব হয়ে যেত। আহা, কী সব দিন ছিল! আজকে এত বছর পরেও তার অন্য কোনো বন্ধু নেই। শুধু এই ছেলেটাই, যে আজ হাসপাতালের সাদা বেডে শুয়ে আছে।
মুয়াজ মারা গেল ভোরের আলো ফোটার একটু আগে। প্রকৃতিতে তখন একটি নতুন দিনের আয়োজন। আস্তে আস্তে আকাশ ফর্সা হচ্ছে। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে। মুয়াজের মা স্টিলের শক্ত চেয়ারে বসে আছেন। তাঁর চোখে পানি নেই। মুহিব তাঁর পাশে গিয়ে বসল। মুয়াজের মা তার মাথায় হাত রাখলেন। মুহিবের বুক ভেঙে কান্না এলো। সদ্য ছেলে হারানো মহিলাটি তাকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “কাঁদিস না বাবা, কাঁদিস না।”
হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে নার্স এসে মুয়াজের ফোনটা দিল। এখনো বন্ধ হয়নি। চার্জ আছে। মুহিব দেখল—অনেকগুলো মিসকল এসেছে একটা নাম্বার থেকে। আর একটা টেক্সট— “বিরক্ত হন, তাই না? আর কোনোদিন আপনাকে বিরক্ত করব না। ভালো থাকবেন।”
পরিশিষ্ট
৫ মে ২০২৫।
সকাল থেকেই শারমিন দেখছে, মুহিবের মন খারাপ। কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। বিয়ের পর থেকেই দেখে আসছে, মুহিব খুব হাসিখুশি মানুষ। মুহিবকে এমন মন খারাপ করতে সে কখনো দেখেনি। তার মনটাও অবশ্য খারাপ। সেটা ভিন্ন কারণে। কারণটা এত গোপন যে, সে কাউকে কোনোদিন বলতে পারবে না।
সে গিয়ে মুহিবের কাছে বসল। বর্ষার দিন। সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা। থেমে থেমে বাতাস বইছে। শারমিন বলল, “মন খারাপ আপনার?”
মুহিব উত্তর দিল না।
শারমিন আবার জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? এমন চুপচাপ হয়ে আছেন কেন?”
মুহিব চোখ তুলে তাকাল। একটু হেসে বলল, “কিছু হয়নি তো। এমনি মন খারাপ একটু।”
“বলবেন না, তাই তো?”
মুহিব এবার একটু শব্দ করেই হাসল। বলল, “আজকের দিনটা খুব কষ্টের আমার জন্য।”
“কেন?”
মুহিব মানিব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করে বলল, “এই চিরকুটটা দেখো। তারপর তোমাকে পুরো গল্পটা বলছি।”
চিরকুটটা হাতে নিয়ে শারমিনের পুরো পৃথিবী দুলে উঠল। পৃথিবীতে অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটে সে শুনেছে, তাই বলে কি এ-ও সম্ভব? সে চিঠিটার দিকে তাকিয়েই রইল। লেখাগুলো একটুও নষ্ট হয়নি। তেমনি আছে। অথচ স্মৃতির কত জল গড়িয়েছে এই চিঠির ওপর দিয়ে!
“গল্পটা শুনবে এখন? বলি?”
মুহিবের কথায় শারমিনের সম্বিৎ ফিরল। সে বলল, “আজ থাক। মাথাটা ধরেছে। আরেকদিন শুনব।”
বলেই সে ঘরের দিকে পা বাড়াল।
মুহিব বলল, “চিঠিটা দিয়ে যাও।”
শারমিন কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠিটা ফেরত দিল। মুহিব একটু অবাকই হলো শারমিনকে দেখে। হঠাৎ করে কী হলো মেয়েটার?
রাতের বেলা ঝুম বৃষ্টি নামল।
মুহিব বলল, “আমাদের ছেলে হলে আমরা ‘মুয়াজ’ নাম রাখব।”
শারমিন বলল, “কেন?”
মুহিব উত্তর দিল না।
শারমিন পাশ ফিরে শুল। তার চোখ জলে ভরে উঠেছে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার। সে চোখ-মুখে হাত চেপে কুঁকড়ে শুয়ে রইল। মুহিব তার মাথায় হাত দিয়ে ডাকল, “এই, কাঁদো কেন? কী হয়েছে?”
বাইরে বর্ষার আকাশ ডাকল। একটা অদ্ভুত বাতাস বয়ে গেল শিরশির করে। আর একটা মেয়ের মনে এগারো বছর আগের সেই অভিমান আবার ফিরে এল। সে ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল। তার কান্না আড়াল করতেই কিনা কে জানে, সেই মুহূর্তে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল।








