কমলা ইলিশ

মুহাঃতাসদীকুল হক

সেদিন অফিসের বেশ বড় একটা মিটিং ছিল। মিটিং শেষে সবার জন্য ছিল দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা। সাধারণত এই রকম মিটিংগুলোতে হয় চাইনিজ নাহলে পোলাও -রোস্ট চলে। কিন্তু আমাদের পিয়নটা সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলল আজকে নাকি পোলাও আর কমলা ইলিশ। সাথে মুরগির কলিজা-গিলা দিয়ে ডাল। সবশেষে আছে ক্ষীর। 

মাঝে মাঝেই এই মিটিংগুলোর বদৌলতে একটু গরু-খাসির দেখা মিলে। নাহলে বর্তমান বাজারের যে হাল তাতে সংসার চালানো বেশ মুশকিল। অবশ্য সংসারের এই টানটান ভাবটা আগে ছিল না। আমার বউ ইসরাত আগে একটা কলেজের শিক্ষিকা ছিল। তখন বেশ চলে যেত। ঝামেলা বাঁধল আমাদের ছেলে ফিরোজ একটু বড় হওয়ার পর। এখন সবে স্কুল যাওয়া শুরু করেছে, ওর পড়ালেখা করা,ওর দেখাশোনা সব মিলিয়ে সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। শেষে ইসরাত নিজে থেকেই চাকরিটা ছেড়ে দিল যদিও বেতনটা আমার চেয়ে বেশি ছিল।  কিন্তু সমাজ বলে একটা জিনিস আছে, সেখানে পুরুষ মানুষকেই রোজগারের দায়িত্ব নিতে হবে! থাক যাক গে সে সব কথা, ইসরাত আর আমি দুইজনই মেনে নিয়েছিলাম সবকিছু। 

কিন্তু ইসরাতের প্রায়ই মন খারাপ হত, এতদূর পড়ালেখা করেও শেষপর্যন্ত বাড়িতেই বসে থাকতে হল। একদিন তো বলেই ফেলল,” এই শোন না! আমি যদি অনলাইনে কোন ছোটখাট কিছু করি, তোমার তো কোন সমস্যা হবে না!” “আমার আবার কিসের সমস্যা হবে!তবে করবে টা কি?” “আমি নিজেও এখন কিছু ভাবি নি। দেখি কি করা যায়।” “আচ্ছা দেখ, তবে চাপ নেওয়ার কিছু নেই। আমার সামনে একটা প্রমোশন হওয়ার কথা আছে। দেখা যাক না, কি হয়!” 

এসব চিন্তা করতে করতেই প্লেটে করে পোলাও-ইলিশ-ডাল হাজির। কমলা ইলিশ দিয়ে বেশ একটা ঘ্রাণ বের হচ্ছে। কিন্তু আমার মা ছাড়া আর কাউকে তেমন এই কমলা ইলিশ রান্না করতে দেখি নাই। ছোটবেলায় এত রান্নার ভিডিও ছিল না! কোথা থেকে যেন মা রান্নাটা টুকে নিয়েছিলেন। প্রথমে ইলিশ মাছকে নুন মরিচ দিয়ে মেখে রাখতেন।পরে তেলে পেঁয়াজ বাটা মরিচ কমলার রস, কমলার খোসা কুচি কুচি করে দিয়ে বেশ কষাতেন। তারপর হালকা করে ভেজে রাখা ইলিশ ছেড়ে দিতেন। আহা মুখে জল চলে এল! ভাবতে ভাবতেই মুখে দিলাম মাছটা। মুখে দিতেই মনে হল মায়ের হাতে রান্না। শুধু আমি নই, পাশে বসা মোখলেস ভাই, অফিসের বস সবাই দেখি কমলা ইলিশের প্রশংসায় মশগুল। আর শেষে যে ক্ষীর দিল, সবাই হাত চেটেপুটে ধুয়ে নিল। থাকতে না পেরে বাসায় ফেরার পথে অফিসের পিয়নটার কাছ থেকে  নাম্বারটা নিয়ে নিলাম সেই রাঁধুনির। 

রিকশায় ফেরার পথে আজকে মনটা বেশ ফুরফুরে মনে হল। মাসের মাঝামাঝি, টাকার ভীষণ টান পড়েছে। তাও বেশ ভালোই লাগছে। ভাবছি এবার টাকাটা পেলেই ইসরাত আর বাবুটার জন্য একদিন এই পোলাও -কমলা ইলিশ নিয়ে যাব। ভাবতে ভাবতেই বাসায় পৌঁছে গেলাম। 

বেশ ক’টা দিন চোখের পলকেই কেটে গেল। মাসের শেষে হঠাৎই  প্রমোশনটা হল। আর বেতনটাও বাড়ল। এবার দুঃখ ঘুচবে। ভাবলাম এখনি ইসরাতকে ফোন দিয়ে বলি, “এটা কি ২৪৪১১৩৯…..ইসরাত বলছ কি….. প্রমোশনটা এবার পেয়ে গেছি….ওগো শুনছ নাকি”।শেষে নিজেই হেসে ফেললাম। ভাবলাম এবার পোলাও আর কমলা ইলিশ নিলে কেমন হয়! যেই ভাবা সেই কাজ। মোবাইলে সেভ করা সেই নাম্বারে একটা ম্যাসেজ করে দিলাম। ওপার থেকে ম্যাসেজ এল যে ঠিক সময় ঠিক লোকেশনে খাবার চলে আসবে। 

বাড়ি ফিরতেই সেদিন একটা খুব চেনা গন্ধ নাকে পেলাম। খুব চেনা । মনেরও ভুল হতে পারে। আজকে প্রমোশন হয়েছে। তাই বোধহয় একটু বেশি খুশিতে আছি। “জানো ইসরাত আজকে সেই প্রমোশনটা পেয়েই গেছি। তুমি যে অনলাইন বিজনেস করবে বলছিলে, সেটা আর করা লাগবে না। বরং আমিই তোমাকে মাস শেষ কিছু দিতে পারব।” ইসরাত হেসে চলে গেল। আজকে নাকি একটা সারপ্রাইজ আছে তার পক্ষ থেকে। 

রাত ন’টা বাজতে চলেছে। কিন্তু খাবার এখনও এল না।অবশ্য খাবারের জন্য সন্ধ্যার দিকেই ম্যাসেজ করে রেখেছি। কিন্তু কোন উত্তর আসে নাই। তাই আর ধৈর্য ধরতে না পেরে ফোন করেই ফেললাম। ফোন কেউ ধরল না। আর এই দিকে বউয়েরও কোন খবর নেই। কি মুশকিল রে বাবা! ওদের পেটে কি খিদে নেই রে বাপু! আমার না বলা সারপ্রাইজ শেষে যেন আমাকেই সারপ্রাইজ না করে চলে যায়! 

ঠিক দুইমিনিট পর ইসরাত হঠাৎ এসে বলল,”দেখ না কি রেঁধেছি তোমার জন্য!” বলেই আমার হাত ধরে এক টানেই উড়িয়ে নিয়ে গেল। টেবিলে পোলাও- ইলিশ মাছ। সাথে কলিজা-গিলা দিয়ে ডাল আর সেই ক্ষীর। “ওমা কখন এল এই খাবারগুলো! আরে আমি এইজন্য কতবার ফোন করলাম। একবারও ফোন ধরল না।দাঁড়াও আমি একবার কল দেই, এইরকম করলে তো চলবে না! বল!” এক হাত দিয়ে কমলা ইলিশের একটা টুকরা মুখে দিয়ে কানে ফোন ধরলাম। একদম সেই স্বাদ!ইসরাত বলল,”কেউ ফোন ধরবে না। কারণ যে রান্না করেছে সে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।”ইসরাতকে কিছুক্ষণ দেখে নিলাম। নাহ সে মজা করছে না! তাহলে কি সত্যি সে আমার ফোন করা স্পেশাল রাঁধুনি! ” ভয় পেয়ো না! এই সব রান্নার পেছনে আসল কারিগর আছেন। যাকে দেখলে তুমি একেবারে খুশিতে ফেটে যাবে।” একটু থেমে ইসরাত বলল,” মা আসুন না!” “মা! মা এসেছে, ইসরাত তুমি বলবে না? কোথায় মা?” “এই যে আমি”, বলেই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল ঘোমটা মাথায় আমার মা। 

ইসরাত আর আমার কাউকে না বলা প্রেমের বিয়ে। মা আমার এই বিয়ে তাই মেনে নিতে পারে নি। সেই থেকে মা আর ছেলের মধ্যে একটা দূরত্ব। অনেক কান ধরেছি, অনেক কান্নাকাটি করেছি। বাড়ির সবাই মেনে নিলেও মা মেনে নিতে পারে নি। আমি চলে আসি ঢাকা শহরে।একটা বাসা নিয়ে এখানে সংসার শুরু করি। প্রথম প্রথম আমাদের দুইজনের চলেই যাচ্ছিল। কিন্তু মাঝে হঠাৎই একটু আর্থিক টানাপোড়ন শুরু হয়। সেই সময় ইসরাত মায়ের কাছে যায়। আমাদের কথা বলে।তারপর এই হোমমেড ফুডের কথা বলে। মা নাকি একদম সময় নেন নি। চোখ বন্ধ করেই হা বলে দেন। ছেলের দুর্দশায় হাল ধরতে একবারও পিছু সরে দাঁড়ান নি। প্রতিজ্ঞা করেছিলেন,” যতদিন না সংসারে সচ্ছলতা ফিরছে ততদিন তিনি ছেলেকে জানাবেন না।” আজ নাকি মায়ের সেই প্রতিজ্ঞা পূরণ করেছে আল্লাহ্। তাই তিনি ছেলেকে জানাতে এসেছেন। 

আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

কত বছর পর!

কথা বলতে পারছিলাম না।

শুধু মনে হচ্ছিল—জীবনে মানুষ অনেক কিছু অর্জন করে। টাকা, পদ, প্রমোশন—সবই আসে যায়।

কিন্তু কোনো কোনো দিন বুঝতে হয়, প্রাপ্তি আসলে অন্য কোথাও!

আজ আমার নিজেকে শুধু সফল নয়, ভীষণ ভাগ্যবান একজন মানুষ মনে হচ্ছে।

আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুজন মানুষ—

দুজন অগ্নিশিখা।

একজন ভালোবাসার মানুষ, যে নিজের স্বপ্ন ছেড়ে আমার সংসারটাকে আগলে রেখেছে।

আর একজন মা, যিনি অভিমান ভুলে নীরবে ছেলের সংসারের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

দুজনেই হার মানেনি।

দুজনেই ভালোবেসে পাশে থেকেছে।

আর সেই ভালোবাসার উষ্ণ আলোয় আজ টেবিলের ওপর জ্বলজ্বল করছে আমার সবচেয়ে প্রিয় খাবার—

কমলা ইলিশ।

আরও পড়ুন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

0
হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

আরও পড়তে পারেন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

অক্টোবর রেইন

জান্নাতুল ফেরদৌস সামিয়া অক্টোবরের প্রথম বৃষ্টি। বাতাসে হালকা শীতের গন্ধ। প্রিয় রঙের 'আধাভাঙা সৈনিক'টাকে প্রতিদিনের মতো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। সৈনিক বলতে ছাতা। ওর দুটো শিক...

নীল দরজা

 সায়মা বিনতে ইসমাইল বাড়িটায় প্রথম রাতেই আমি বুঝেছিলাম, কিছু একটা ঠিক নেই। অস্বাভাবিক কিছু নয়। পুরোনো বাড়ি হলে শব্দ হবেই - কাঠের দরজা কড়কড় করবে, জানালায়...