জান্নাতুল ফেরদৌস সামিয়া
অক্টোবরের প্রথম বৃষ্টি। বাতাসে হালকা শীতের গন্ধ। প্রিয় রঙের ‘আধাভাঙা সৈনিক’টাকে প্রতিদিনের মতো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। সৈনিক বলতে ছাতা। ওর দুটো শিক প্রায় অকেজো। তবু ওকে ছাড়া বের হই না। চাইলেই নতুন কাউকে ওর দায়িত্বটা দিতে পারি। কিন্তু পুরোনো জিনিসের মায়া আমি সহজে কাটাতে পারি না। কিছু জিনিসের আয়ু ফুরিয়ে এলেও মায়ার মেয়াদ বোধ হয় এত সহজে ফুরোয় না।
ব্যাগে পুরোনো ডায়েরিটাও নিয়েছি। লিখব বলে নয়, লিখতে বসার অভ্যাসটুকু ফিরিয়ে আনব বলে।
ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা পড়েছিল ২০২৪-এর অক্টোবরে। তারপর থেকে শুধু ফাঁকা পাতা। আজ আবার সেই অক্টোবর….
প্রতিদিন ভার্সিটি কিংবা টিউশনে যাওয়ার পথে তিনটি জিনিস আমার নজর কাড়ে—বিল্ডিংয়ের ধূসর রঙের বিড়ালটা, গলির মাঠের কোণে ছোট্ট টঙের দোকান আর রাস্তার মোড়ের সেই ফুলের দোকান।
বিল্ডিংয়ের বিড়ালটার নাম দিয়েছি ‘পটল’। সবজি হিসেবে পটলের বেশ কিছু গুণ থাকলেও আমার স্বাদ কুঁড়ির সঙ্গে তার ঠিক বনিবনা হয় না। তবে পটলের দোলমা, পটল-চিংড়ির যুগলবন্দি কিংবা পটলের খোসার ভর্তা হলে সে কথা আলাদা!
সে যা-ই হোক, অপছন্দের সবজির নামে বিড়ালের নাম রাখিনি। বরং ওর বোকা বোকা চাহনি, আলসেমি, সারাদিন শুয়ে-বসে কাটানো আর আমাকে দেখলেই মিউ মিউ করে আদরের আবদার জানিয়ে গা ঘেঁষে ঘুরঘুর করার ভঙ্গিটাই আমাকে ওর প্রতি বড্ড আহ্লাদি করে তুলেছে। সেই আহ্লাদ থেকেই নাম দিয়েছি ‘পটল’। নামটার মধ্যে কেমন একটা আদুরে ভাব আছে, বলতেই হয়!
আজ দেখলাম, পটল ভীষণ ব্যস্ত। ওর যে দুটো বাচ্চা আছে, তা-ই জানতাম না। আজ তাদের খাওয়াতে এতটাই মগ্ন ছিল যে আমাকে দেখে চেনা মিউ মিউ ডাকটাও দিল না। মাতৃত্বের ব্যস্ততায় আজ বোধ হয় আমার ভাগের আদরটুকু মুলতবি!
বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে স্বভাববশত চোখ পড়ল মাঠের কোণাটায়। টঙের দোকানের টুংটাং ধ্বনি আর কড়া লিকারের চায়ের ঘ্রাণে মনটা কেমন ফুরফুরে হয়ে ওঠে। বৃষ্টিভেজা বাতাসে সেই চায়ের গন্ধটুকু যেন আরও একটু বেশি করে মন টানে। নেহাত একা মেয়ে মানুষ বলে মাঝবয়সি লোকজনের ভিড়ে বসে চা খেতে যাওয়ার অস্বস্তিটা কোথায় যেন থেকেই যায়। অথচ ইচ্ছেটা ষোলো আনা।
গলি পেরিয়ে রাস্তার মোড়ের ফুলের দোকানটায় ঈষৎ উঁকি দিলাম। ডিসেম্বর মাসে নিজেকে একগুচ্ছ সাদা লিলি উপহার দেব বলে ভেবে রেখেছি। দামটা নেহাত কম নয়। তবু নিজের শখের তালিকায় অপূর্ণতার আফসোস জমিয়ে রাখতে চাই না। সব ইচ্ছেকে যে একদিনে পূরণ করতে হবে, তা তো নয়। কিছু ইচ্ছেকে নিজের জন্য একটু একটু করে গুছিয়ে রাখতেও ভালো লাগে।
সে যা-ই হোক, আজ নজর আটকে গেল দোকানের ছোট্ট বাদল ছেলেটার দিকে। কাজের প্রতি অমনোযোগের জন্য প্রায়ই মালিকের বকুনি খায় সে। আজ দেখলাম, বেশ ফুরফুরে মেজাজে কাজ করছে। মুখে হাসি নিয়ে তাকে কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখে আমার ঠোঁটেও অজান্তে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তারপর আবার গন্তব্যের পথে হাঁটা দিলাম।
চারদিকে মানুষ ছুটছে। চায়ের দোকান, ফুলের দোকান, ফুটপাত, রিকশা—সবকিছুতেই ব্যস্ততার ছাপ। অক্টোবরের বৃষ্টি যেন ঘুমন্ত শহরের গায়ে এক মুঠো ঠান্ডা জল ছিটিয়ে আচমকা জাগিয়ে দিয়েছে। ভেজা রাস্তায় জমে থাকা জল, বাতাসে মাটির সোঁদা গন্ধ আর মানুষের ব্যস্ত পায়ের শব্দে শহরটাকে কেমন নতুন মনে হচ্ছিল। অথচ নতুন কিছুই তো নয়! প্রতিদিনের চেনা শহর, চেনা পথ, চেনা মুখ—শুধু বৃষ্টির ছোঁয়ায় আজ তাদের গায়ে অন্য রকম এক সজীবতা।
আমিও আর থেমে থাকতে পারলাম না।
কাজ সেরে বাসায় ফিরে দেখি, ডায়েরিটা বৃষ্টির ছোঁয়ায় হালকা ভিজে গেছে। সাদা পাতায় কালি ছড়িয়ে যাওয়ার ভয়টুকু উপেক্ষা করে নতুন পাতায় লিখলাম—
“প্রিয় আমি, শীত আসার আগে তুমিও জাগো।”








