লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস শিফা
১.
দোকানটার নাম ‘স্টেশনারি’। হ্যাঁ,এখানে শুধু স্টেশনারি আইটেমই বিক্রি হয়, যেমন: খাতা, কলম, ডাইরি,
জ্যামিতি বক্স, স্কেল ইত্যাদি। তটিনীর মনে হচ্ছে দোকানদার ভদ্রমহিলাটি ঝামেলা না নিতে চাওয়া মানুষ।
নইলে, এখন যেখানে সবাই নিজেদের দোকান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ব্যতিক্রমী নাম রাখতে চায়,সেখানে
এই ভদ্রমহিলা নিজের দোকানের নরমাল একটা নাম রেখে দিল!দোকানের জন্য নক্ষত্রতুল্য নাম না খুঁজে,
ঝামেলা থেকে বেঁচে যেতে চাইল!সেই দোকানেই বসে বসে চা খাচ্ছিল তটিনী। মনে এক সমুদ্র দ্বিধা নিয়ে
দোকানীকে বলতে লাগল,
-আন্টি? একটা দরকারি কথা ছিল আপনার সাথে।
-হ্যাঁ, বলো। কী দরকারি কথা?
নতুন যে খাতার পার্সেলটা এসেছে, সেটা তাকে গুছিয়ে রাখতে কিছুটা ব্যাস্ত ছিল সে। গোছাতে গোছাতেই সে
তটিনীকে বলতে বলে। ‘আন্টির মনোযোগ অন্যদিকে’, এটা ভেবে তটিনীর মন কিছুটা মিইয়ে আসে।
ভদ্রমহিলার নাম নিতু, কালকের ক্ষুদ্র কথোপকথনে সে এটা জানতে পেরেছে এবং তাকে খুবই আন্তরিক
মনের মানুষ বলে মনে হচ্ছিল তটিনীর। কি সুন্দর হেসে কথা বলেন। কাল যখন নিতু জিজ্ঞেস করে, সে
এইগ্রামে নতুন এসেছে কীনা? কোনো সাহায্য লাগলে যেন বলে। এমন কি চা-ও খেতে অফার করে। তখন
বিস্ময় আর কৃতজ্ঞতায় তটিনীর কান্না কান্না পায়। এজন্যই তো সে সাত সকালেই ছুটে এসেছে, ওর
হ্যান্ডমেইড ডাইরি এখানে সাপ্লাই করবে বলে। যদিও ভাইয়া এখনো সেগুলো কুরিয়ার করেছে কীনা, ও
জানেনা।
নিতুর কাজ মোটামুটি শেষ। হাত ঝাড়তে ঝাড়তে তটিনীর দিকে এসে দাঁড়ায়।
- কী যেন বলতে চাইতেছিলা?
- আব্, না থাক তেমন কিছু না।
বলে তটিনী নিচের দিকে তাকিয়ে চা পানের ভঙ্গিতে মন খারাপ লুকায়। ধুর! এত সহজেই কারো সাথে ইজি হতে
আছে নাকি? মা আর তরঙ্গ ঠিকই বলে, আসলেই আমার জ্ঞান-বুদ্ধি দিন দিন লোপ পাইতেছে। আগেও
ছিলনা, এখনও নাই।
তটিনীকে এমন চুপ থাকতে দেখে নিতু আবার তাগাদা করে, - আরে থাকবে কেন? কী বলতে চাইতেছিলা বলো। তুমি যা বলতে চাইতেছো, তাতে আমি যদি হেল্প না করতে
পারি, আমার জানামতে যে পারবে এমন কেউ থাকলে তাকে রেফার করবো নাহয়। কেউ বাইরের মানুষ বলেই
তার কাছে হেল্প চাওয়া যাবে না, এমন তো না। তাহলে মানুষ আর সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করে কী লাভ হলো,
যদি কেউ কারো উপকারেই না আসতে পারি?
তটিনী এবার বলতে সাহস পায়, - আসলে আমি তো হ্যান্ডমেইড ডাইরি বানাতে জানি, আর আমার কাছে বর্তমানে বানানো আছে অনেক
গুলো। তাই ভাবছিলাম কোথাও সেল করব। পরে তো এখানে এসে পরলাম। আর আপনারও দেখি স্টেশনারির
দোকান, তাই ভাবলাম… - এই কথা বলতে তুমি এমন ঘাইমা টাইমা যাইতেছিলা? ঠিকাছে নিয়া আইসো,আমার তো এমনিতেও কেনা
লাগে। তোমার টাও দেখবোনি। আর, আমার নাম্বার আছে না তোমার কাছে? যেকোনো প্রয়োজনে কল দিবা,
নো ভয়টয়। ঠিকাছে? - জী। আচ্ছা আন্টি এখনকার মতো আসি, এটা বলতেই আসছিলাম।
- আসো আসসালামু আলাইকুম।
- ওয়াআলাইকুমুস সালাম।
এমন আন্তরিকভাবে খুব কম মানুষই কথা বলেছে তটিনীর সাথে। ওর বড় ভাইবোন আর সাফিয়া ছাড়া আর
কারো উদাহরণ বাটি চালান দিয়েও খুঁজে পেতে ব্যার্থ হয়। অবশ্য এমন স্মৃতি থাকলে তো মনে পরবে। এখন
এই তালিকায় যোগ হলো নিতু আন্টি।বাহ্ এমন হোলহার্টেড মানুষও আছে! বেখেয়ালে হোঁচট খেয়ে জুতো ছিঁড়ে
যায় তটিনীর। তাও ওর মন ফুরফুরেই থাকে। ভালোইদিন পর ওর অনেক মন ভালো লাগছে, কেন সে এটা
হারাতে দেবে সামান্য জুতো ছিঁড়ে যাওয়ায়?
আমার সারাটাদিন
মেঘলায় আকাশ,
বৃষ্টি, তোমাকে দিলাম….
তটিনী নিজের মনকে ডেডিকেট করে মৃদুস্বরে গান ধরে। দূর থেকে তা অস্পষ্ট বলে নিতু ঠিক ধরতে পারে না,
শুধু দেখে ছেঁড়া জুতো হাতে মেয়েটা গাছ-গাছালির ফাঁক গলে চলে যাচ্ছে।
………………………
আপু,
আমি ব্যারিস্টার দম্পতি মিহির-চাঁদনীর বাসা ছেড়ে চলে যাচ্ছি। হতে পারে কয়েক দিন,কয়েক মাস অথবা
বছরখানেকর জন্য। আমার মন ভালো হলে ফিরে আসার কথা ভাববো। আমি জানি তুমি কাউকে আমার সন্ধান
দিবে না,আমি না চাইলে। তবুও বলবো না, তারা আসলে চিঠিটা যাতে তাদের দেখাতে পারো। তার প্রয়োজন
অবশ্য পরবে না, কারণ তাদের জন্যও আমি চিঠি রেখে আসছি, তাদের বালিশের নিচে। তারা এমনিতেই
জানবে।
আমি ম্যাসেজেই এসব কথা বলে দিতে পারতাম, তবে আমি কিছুদিন যাবৎ লক্ষ করতেছি যে, আমার ফোন
খুব সম্ভবত ট্র্যাক করা হইতেছে। তাই এই ব্যবস্থা। আমাকে কলে,vনেটে কোথাও পাবে না। ফোন বাসায়
রেখে যাইতেছি।
ইতি
তোমাদের তনী।
দ্যুতি ছোট বোনের এহেন দুঃসাহসে রাগ বা বিরক্ত কোনোটায় হয়না। তবে চিন্তা হয়, একা একা কোথায়
কোনো বিপদে না পরে যায়। দ্যুতি, তনীর চালাকি দেখে চিন্তার মাঝেও হালকা হাসে। তনী দুটি চিঠি দিয়েছে
ওকে। আরেক চিঠিতে, তনী কই যাচ্ছে, কীভাবে যাচ্ছে, ভাইয়াকে কী করতে বলতে হবে তা লেখা। সাথে একটা
ফোন নম্বর দেওয়া। দ্যুতি কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে ওর জমজ ভাই কিরণকে কল লাগায়।
……………………….
কিরণরা দুইদিনের ডিপার্টমেন্টাল টুরে গিয়েছিল। কাল মাঝরাতের দিকে হলে ফেরে। সকালের নাস্তা সেড়ে
এক জুনিয়রের সাথে ফোনে কথা বলছিলো, এর মাঝে বোনের কল আসায় সেটা রিসিভ করে,
- আসসালামু আলাইকুম। কী বলিশ?
- ওয়াআলাইকুমুস সালাম, তনীর ব্যাপারে কিছু জানিস?
- কী জানব? কী হয়েছে?
দ্যুতি সব বলে কিরণকে। তনীর ঠিকানা দিয়ে,ওর করণীয় কী তা বলে। কিরণ চুপ করে শোনে শুধু, সে মুহূর্তেই
কিছু একটা মনে পরায় রাগে দাঁত পিষে।
…………………………
…ওয়াম তা- ঝুল ইয়াওমা আইয়ুহাল মুজেরিমু···ন। আলাম আ’হাদ ইলাইকুম ইয়া- বানী···আ-দামা আল্লা-
তা’বুদুশ্ শাইত্ব···ন, ইন্নাহু- লাকুম আ’দুউ্উম্ মুবি···ন।…
মুহাম্মাদ চুপটি করে তার বড় ভাইয়ের শানিত কন্ঠের ক্বুরআন তিলাওয়াত শুনছে। ওর বড়ভাই আবদুল্লাহ
ওর চেয়ে ৩ বছরের বড়। মাসখানেক হয়েছে এই হৃদয়বিদারক তথ্য সে তার মায়ের কাছ থেকে উদ্ধার
করেছে। এরপর থেকে প্রতিদিন সে তার আম্মি-আব্বি, ভাইয়া, দাদাভাই-দাদুমনি, চাচ্চু মোটকথা যখন,
যাকে পাচ্ছে তাকেই জিজ্ঞেস করছে,”আজকে আমার বয়স ৭ বছর কতদিন?” কারণ মায়ের কাছ থেকে সে
এটাও জেনেছে যে, ১ বছর = ৩৬৫ দিন।এর মানে,ওর আরো ৩ টা ৩৬৫ দিন লাগবে। তবেই সে তার ভাইয়ার
সমান হবে। আর সেখানে ওর বয়স মাত্র ৫ বছর ৩৩দিন। এরই সাথে যোগ হয়েছে নতুন আরেকটা দুঃখ। আজ
সে দেরিতে ঘুম থেকে উঠেছে। আমাদের মতো ১০-১১ টায় ঘুম থেকে উঠা, সেরকম কিছু ভাববেন না যেন।
মুহাম্মাদ উঠে দেখে ওরা আব্বি আর ভাইয়া ওকে রেখেই মাসজিদে চলে গিয়েছে। দ্রুত অজু টজু সেড়ে ওউ
যাচ্ছিলো, তবে বাঁধ সাধলেন আম্মি। এমন অন্ধকারে মেজ ছেলেকে একা ছাড়তে চাইলেন না। স্বান্তনা দিয়ে
আজকের মতো বাড়িতেই স্বলাত আদায় করতে বললেন এবং পরবর্তীতে যেন ভোরে ডাকলে গড়িমসি না করে
মমতাভরে সে কথাও বললেন বার বার।
মুহাম্মাদ আর কী করে, নাক টানাটানি নিয়েই ফজরের স্বলাত আদায় করে নিল মায়ের সাথেই। সকালের
আযকারটাও সেড়ে ফেললো। ক্বুরআন পড়ার পদ্ধতি এখনো রপ্ত করে ওঠেনি, তবে আম্মির মুখে শুনে শুনে
সকাল-সন্ধ্যার আযকারের সূরা ও দুআ গুলো ও ঠোঁটের ডগায় নিয়ে ঘুরে। উচ্চারণে একবিন্দুও ভুল হয় না।
কিন্তু তাতে কী? সে তো ভাইয়ার মতো দ্রুত বড় হচ্ছে না। বড় হচ্ছে না বলে,ভাইয়ার মতো দেখে দেখে
তিলাওয়াত করতে পারছেনা। সকালে উঠেছেও দেরি করে।
সবমিলিয়ে মুহাম্মাদের কান্না কান্না অবস্থা, তা দেখে আবদুল্লাহ নরম সুুরে বলল, - এমন কাঁদছিস কেন? বুঝতে পারছি তোর মন খারাপ জন্য কাঁদছিস। তোর মতো বয়সে আমিও কাঁদতাম।
কিন্তু শোন, শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ বেশি করে দেন ।আম্মি বলেছেন না আমাদের? তুই যে কিছু সুরা
আর মাসনুন দুআ গুলো পারিশ, এজন্য শুকরিয়া আদায় কর, তাহলে ইনশাআল্লাহ, তুইও দ্রুত ক্বুরআন
পরতে পারবি।
মুহাম্মাদ আস্তে করে বলে, - আলহামদুলিল্লাহ্
আরে? আমি এটা ভুলে গেলাম কী করে? আসলেই তো আমার শুকরিয়া আদায় করা উচিত ছিল।
আলহামদুলিল্লাহ, আমার সুন্দর চোখ আছে যা দিয়ে আমি কান্না করতে পারি। এই ভেবে মুহাম্মাদ আবার
কান্নার প্রস্তুতি নিতে থাকে।
এর মাঝে মুহাম্মাদের ছোট ভাই আহমাদ চিৎকার করে জানান দেয়, সে জেগে গিয়েছে। আবদুল্লাহ বিপাকে
পরে, এই কান্নাবাহিনীকে ও কী করে শান্ত করবে?
চলবে ইনশাআল্লাহ……..








