অরুণ বর্মন
(১)
আব্বা রাত দশটা নাগাদ বাড়ি ফিরে উঠোনে দাঁড়িয়েই আম্মুর নাম ধরে চিৎকার করে ডাক দিলো। সামিয়া—, তোর মেয়ের জন্য পাত্র দেখে এলাম।
আব্বা আম্মুর সাথে তুই-তামারি করেই কথা বলে। বাংলা সংস্কৃতিতে স্ত্রীকে তুই বলা স্বামীদের একটা স্বভাবসিদ্ধ রীতি হয়ে গেছে।
আম্মু রান্নাঘরে রান্না করছিলো। সেই অবস্থায় খুন্তিটা হাতে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয় এসে বললো তুমি কার জন্য পাত্র দেখার কথা বলছো? আমাদের দিয়ার জন্য?
আব্বা বেশ জোরালো গলায় বললো, দিয়া ছাড়া আবার কার কথা বলব? আমাদের বাড়িতে বিয়ের যোগ্য মেয়ে আর কে আছে?
আম্মু বিস্ময়ের সুরে বললো, কাকে তুমি বিয়ের যোগ্য বলছো? দিয়াকে? যার মুখ থেকে এখনও মায়ের দুধের গন্ধ যাইনি তাকে বিয়ের যোগ্য বলছো? বাচ্চা মেয়ে, মাত্র বছর চৌদ্দ-পনেরো বছর বয়স, ক্লাস টেনে পড়ে। ঐটুকু মেয়েকে তুমি বিয়ে দেবে?
আব্বা গলার স্কেলটা আরেকমাত্রা বাড়িয়ে বউকে ঝাড়ি দিয়ে বললো, মেয়ের বয়স পনেরো মানে তুই বুঝিস কত বড় হয়ে গেছে? বারো তোরো পেরোলেই মেয়েরা সাবালক হয়ে যায়। এক্ষুনি বিয়ে না দিলে পরে কি ভালো ছেলে পাবি? নানাজনে নানা কথা বলবে? ঘাড় থেকে বোঝা যতো তাড়াতাড়ি নামানো যায় ততোই ভালো। এরেপরে আরও দুটো ঘাড় থেকে নামাতে হবে, সে খেয়াল কি আছে?
আব্বা ঘাড় থেকে আরও দুটো নামানোর কথা বলতে বুঝাচ্ছে আমার পরে দুই বোনের কথা। আমরা তিন বোন, আমি বড় দিয়া জামান, বয়স পনেরো। মেজো রিয়া জামান, বয়স তেরো আর ছোট কেয়া জামান বয়স দশ। আব্বা শামসুজ্জামন, আম্মা সামিয়া জামান। আমাদের কোনো ভাই নেই।
আম্মু বেশ গর্বের সুরে বললো, কেন তোমার মেয়েরা কোনো দিক থেকে কম আছে নাকি যে এক্ষুণি ঘাড় থেকে নামানোর কথা ভাবতে হবে। আমাদের দিয়া স্কুল ফার্ষ্ট গার্ল। ভালো ছবি আঁকে, ভালো বিতর্ক করে। সব জাগায় ফার্স্ট হয়। কত প্রাইজ নিয়ে আসে। দেখতে শুনতেও ভালো। রিয়া, কেয়াও কম যায় না। কেন তাদের এতো অল্প বয়সে বিয়ের কথা ভাবতে হবে?
আব্বা অগ্নিশর্মা হয়ে আম্মুকে বললো, মাগী তুই শুধু ঘরের মধ্যে পড়ে হাড়ি ঠেলিস। বাইরির খবর কি কিছু রাখিস? দিনকাল পরপর যে কি হচ্ছে বুঝছিস সেটা? মেয়ে ঘরে থাকা মানে টেনশন। ভালো ছেলে পাইছি, এখন ভলোয় ভালোয় তার হাতে তুলে দিতে পারলেই টেনশন মুক্ত। মেয়েদের অতো লেখাপড়া শিখিয়ে কি লাভ? আর শিখতে হলে শ্বশুর বাড়ি যেয়ে শেখবে।
আম্মু যেন আব্বার ঝাড়িতে একটু নরম হয়ে গেলো। কৌতুহলি হয়ে জিজ্ঞেস করলো, তা পাত্রটা কোথায়? কি করে?
আব্বা এবার বেশ খুশি মনে বললো, পাত্র পূব-জয়নগরের রমিজ শেখের বড় ছাবাল সোহেল।
আব্বার কথা শেষ না হতেই আম্মু বললো, তা তোমাকে এ ছেলের সন্ধান দিলো কে?
আব্বার উত্তর, সন্ধান আবার কে দেবে! ছেলেইতো দিয়াকে স্কুলে যাওয়ার সময় দেখে পছন্দ করেছে। তারপর আমার কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। আমি আজ সন্ধ্যায় দোকান শেষ করে মালিককে নিয়ে গিছিলাম ওদের বাড়ি। একবার দেখাতেই পছন্দ হয়ে গেলো। ছেলে যেমন দেখতে শুনেতে ফর্সা তেমনি উঁচু-লম্বা। ছেলের বাজারে মোবাইলের দোকান আছে। আয়-ইনকামও ভালো। এমন সাধা ভাত কি কেউ পায়ে ঠেলে?
আব্বু একটা মুদি দোকানে কর্মচারির চাকরি করে।
আম্মু আব্বার কথায় দুর্বল হয়ে গেলো। যতই হোক স্বামীর উপরে কথা বলবে এমন সাহস গ্রামের বাঙালি মেয়েদের এখনও হয়নি। আর এই সুযোগ নিয়ে বাঙালি স্বামীরাও বউয়ের উপর সব কতৃত্ব ফলাতে ভুল করে না।
আম্মু সুর নরম করে বললো, তা দিয়ার মতামত কি একটু নিয়েছো?
আব্বা আবার অগ্নিমূর্তি ধরলো। দিয়ার মতামত নিতে হবে মানে? আমাকে কি তেমন পুরুষ মানুষ পাইছিস যে মেয়ের কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে? মেয়ে আমার, বিয়ে দেবো আমি, খরচ করব আমি, আর মতামত নিতে হবে মেয়ের কাছ থেকে? মেয়ে আমার কাঁধে তাই চিন্তাটাও আমার।
আমি পাশের ঘরে পড়ছিলাম। বাবার কথা শুনে আমার রাগে গা জ্বলে যাচ্ছিল। আর সহ্য করতে পারলাম না। বাইরে এসে আব্বাকে বললাম, আমি পড়ার ঘর থেকে তোমাদের কথা সব শুনেছি। তোমাকে কে বলেছে আমার জন্য ছেলে দেখতে? আমাকে এখন বিয়ে দেবে মানে? লেখাপড়া শেষ করে তারপর ওসব চিন্তা বুঝলে!
আব্বা রেগে বললো, তোর বিয়ে কি তোর ইচ্ছামতো হবে নাকি? আমি যা করবো সেটাই মানতে হবে। মেয়ে আমার ঘাড়ে, তাই কিভাবে নামাবো সে চিন্তাটা আমার।
আমিও রেগে বললাম, আমাকে যে এখন বিয়ে দেবে আমার কি বিয়ের বয়স হয়েছে? এতো ছোট মেয়েকে বিয়ে দিলে কি হয় তা তুমি জানো?
আব্বা আরও রেগে বললো, এই– বিয়ের বয়সের তুই কি বুঝিস রে। আমাকে জ্ঞান দিচ্ছিস?
আমি আব্বুকে বুঝানোর চেষ্টা করলাম, জ্ঞান দেওয়া নয় আব্বু, অল্প বয়সের মেয়েদের বিয়ে দিলে অনেক সমস্যা হতে পারে। তাদের সন্তান নেওয়ার সময় নানান জটিলতার সৃষ্টি হয়। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। স্বামীর পরিবারের সাথে মানিয়ে নিতে পারে না। তুমি কি আমাকে মেরে ফেলতে চাও?
আব্বা বিরক্তির সুরে বললো, ছিঃ ছিঃ বাবার সামনে কি সব কথা। একটু লজ্জা-শরমও নেই। স্যার ম্যডামরা স্কুলে এইসব পড়ায় বুঝি।
আমি বললাম, আব্বু এতে লজ্জা-শরমের কি হলো? আমরা গার্হস্থ্য বিজ্ঞানে মেয়েদের স্বাস্থ্য অধ্যায়ে এগুলো পড়েছি। স্যার ম্যডামরা ক্লাসে আলোচনা করেন। মেয়েরাই তো এর ভুক্তভোগী। মেয়েদের এসব বিষয় জানতে দোষের কি?
আব্বা রাগান্বিত স্বরে বললো, এই– মরতে হয় স্বামীর বাড়ি যেয়ে মরগে। আমি কথা দিয়ে আইছি। কাল এসে যদি ওদের পছন্দ হয় তবে একদিনও দেরি করব না।
আমি দেখলাম এই লোকটার সাথে রাগারাগি করে কাজ হবে না। আমি ভিন্ন কৌশল নিলাম। এবার আব্বাকে জড়িয়ে ধরে আলতো সুরে বললাম, ও আব্বু আমি এখনি বিয়ে করতে চাই না। আমি লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। আমি স্বাবলম্বী হতে চাই। তোমাদের কোনো ছেলে সন্তান নেই। আমি তোমাদের ছেলের অভাব পূরণ করতে চাই। স্কুলের স্যার-ম্যাডামরা বলেন দিয়া তোমার মেধা খুব ভালো। তুমি পড়ালেখা করলে অনেক দূর যেতে পারবে। ভালো চাকরিও করতে পারবে। আমার সোনা আব্বু তুমি এক্ষুণি আমাকে বিয়ে দিও না। ও আম্মু তুমি আব্বুকে একটু বুঝাও না!
আম্মা মুখ ঝাড়ি মেরে বললো, তোর বাপ যেটা বুঝেছে তার উপর আর কেউ বুঝাতে পারবে ভাবছিস? এখন যা তোর কপালে আছে তাই হবে। এই বলে সে রান্নাঘরে চলে গেলো।
আমি এবার কাঁদতে কাঁদতে আব্বাকে বললাম, আব্বু আমি স্কুলের ফার্স্ট গার্ল। আমি তো অন্যদের মতো না। তুমি তোমার মত পরিবর্তন করো। দেখো আমি পড়লেখা শিখে সংসারে তোমার সব দায়িত্ব নিতে পারব। আব্বু, মেয়েরা বাপ-মায়ের দায় নয়, সম্পদ। যদি তাকে সম্পদের মতো তৈরি করতে পারো। আমাকে পড়ালেখা করার সুযোগ দাও। দেখো আমিও তোমাদের সম্পদ হবো।
আব্বা রাগে গজগজ করতে করতে বললো, মেয়েরা আবার কখনো সম্পদ হয় নাকি? বড়জোর লেখাপড়া শিখে একটা চাকরি করতে পারে। তাওতো তখন টাকা-পয়সা নিয়ে ঢালে শ্বশুর বাড়িতে। বাপ-মা’র কি লাভ হয়? যা পারিস শ্বশুর বাড়ি যেয়ে করগে। মধু ঘরে রাখা মানে বিপদ। পিঁপড়ের উপদ্রব বাড়ে। বলিছি মেয়ে বিয়ে দেবো তো বিয়েই দেবো। এখন যা ঘরে যেয়ে ঘুমা। কাল ছেলেপক্ষ দেখতে আসবে। সকাল সকাল উঠে রেডি হয়ে নিস।
পুরুষ শাসিত সমাজে এই একটা সমস্যা মেয়েদের কথা কেউ শোনে না, মেয়েদের নিয়ে কেউ ভাবে না। তাদের মতামতের কোনো মূল্য নেই। পুরুষ মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নিলেও সেটাই সঠিক।
আমার আব্বা অল্পশিক্ষিত একজন মানুষ। যে যা বলে, যা বোঝায়, তাই বুঝে এসে আম্মু বা আমাদের উপর চাপানোর চেষ্টা করে। পরে শুনলাম কে নাকি তাকে বুঝিয়েছে, শামসুজ্জামান মেয়েকে এক্ষুণি বিয়ে দাও। বিভিন্ন ধর্মীয় উদাহরণ টেনে বুঝিয়েছে, মেয়ে মানুষ পনেরো পার হতে দেওয়া যাবে না। পন্য যদি একবার নষ্ট হয়ে যায় তবে সে পন্য কিন্তু কেউ কেনে না। তাই যতো তাড়াতাড়ি পারো মেয়ে বিদায় করো। মেয়েমানুষ অতো লেখাপড়া শেখানোর দরকার নেই। আর আমার আব্বা সেই কথা শুনে এসে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার জন্য নাচছে।
আমি কাঁদতে কাঁদতে ঘরে চলে এলাম। সারারাত ঘুমাতে পারলাম না। কি করব কিছুই মাথায় ঢুকছে না। ভাবতে থাকলাম আমার দীর্ঘদিনের ছোট্ট ছোট্ট সুতোয় বোনা স্বপ্নের মৌচকটাকে মৌয়াল কি এক ঢিলেই ভেঙে গুড়িয়ে দেবে?
পরের দিন বৃহস্পতিবার সকালে সময়মতো পাত্রপক্ষ এসে হাজির হলো। পছন্দ আর কি, পছন্দতো আগেই করা। একেবার আংটি পরিয়ে গেলো। আগামীকাল জুম্মাবাদ বিয়ে। আব্বা নেমে পড়লো বিয়ের যোগাড়যন্ত্রে ।
সেই থেকে আমি মুখ বন্ধ করলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম কারো সাথে কথা বলব না। শুধু আম্মুর কাছে কেঁদে কেঁদে অভিযোগ জানালাম, আম্মু আমার ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন আমি লেখাপড়া শিখে অনেক বড় হবো। মানুষের মতো মানুষ হবো। চাকরি করবো। তুমিইতো সেই স্বপ্নটা আমাকে দেখতে শিখিয়েছিলে। সে স্বপ্নটা আমার ভেঙে দিচ্ছো কেন? তুমি আব্বুকে একটু বুঝাও।
আম্মুও এর কোনো সদুত্তর দিতে পারলো না। শুধু বললো তোর আব্বুকে কেউ হয়তো মগজ ধোলাই করেছে। এখন আর কারো সাধ্য নেই তাকে বুঝাবে। তুই মা তোর আব্বুর সিদ্ধান্ত মেনে নে। তারপর ভাগ্যে তোর যা লেখা আছে তাই হবে।
আমি আম্মুকে বললাম, তোমরা যাই করো একটা কথা জেনে রাখো, আমার স্বপ্নকে আমি কিছুতেই বিক্রি করতে দেবো না।
আম্মু নিরুত্তর আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুচতে অন্যত্র চলে গেলো।
আমি বুঝে গেলাম আম্মুর দ্বারা কিছু হবে না। যা করার আমাকেই করতে হবে। অতো সহেজে অজানা ভাগ্যের হাতে আমি আমার জীবনকে তুলে দেবো না।
বাড়িতে যখন বিয়ের তোড়জোড় চলছে। তখন আমি শুয়ে শুয়ে ভাবছি কিভাবে বিয়েটাকে ভন্ডুল করা যায়।
ভাবছি আমি কি আত্মহত্যা করব? কিন্তু আত্মহত্যা করলেতো সব শেষ হয়ে গেলো। এটাতো কোনো সমাধান হতে পারে না। আমাকে বিকল্প কিছু ভাবতে হবে।
রাত যতো গভীর হচ্ছে ভাবনারা ততো ডালপালা গজাচ্ছে।
আমি শৈশব থেকেই প্রতিযোগিতা করে এসেছি ছেলেদের সংগে। ভাবছি আমার বয়সী ছেলেদেরতো কেউ বিয়ের কথা বলে না। অথচ মেয়েদের চৌদ্দ পনেরো পড়তে না পড়তেই লোকজন কেন বিয়ের জন্য অস্থির করে তোলে?
আব্বু-আম্মুরা যখন একটি ছেলে সন্তান হলো না বলে আফসোস করতো তখনই আমি ভাবতাম বড় হয়ে আমি ছেলের সমকক্ষ হবো। একজন ছেলে পিতা-মাতার জন্য যা যা করে আমিও তাই তাই করবো। এজন্য আমি সবসময় ছেলেদের সাথে নিজেকে পাল্লা দিয়ে এসেছি।
যেমন- স্কুলে ছেলে বন্ধু রজত সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসতে দেখে ভাবতাম ও পারলে আমি পারব না কেন । আমি আব্বুর কাছ থেকে জোরজবরদস্তি করে একটা সাইকেল কিনে নিছিলাম। চালানো শিখে সেই সাইকেল চালিয়ে রজতদের সাথে পাল্লা দিয়ে স্কুলে যাই। আমার সাইকেলের আগে কেউ উঠতে পারে না।
ক্লাসে পরীক্ষায় ছেলেরা ফার্স্ট হয় মেয়েরা কেন পারে না। সেই জিদ থেকে কঠিনভাবে পড়ালেখা করি এবং এখন আমি স্কুলের ফার্স্ট গার্ল।
একবার স্কুলে দৌড় প্রতিযোগিতা হলো। স্যার-ম্যাডামরা ছেলেদের জন্য আলাদা ইভেন্ট, মেয়েদের জন্য আলাদা ইভেন্ট করলো। আমি স্যার-ম্যাডামদের সাথে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে ছেলেদের দলে নাম লিখালাম এবং সেই প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দিছিলাম।
এতোকিছু পারলাম আর আজ কেন হেরে যাবো? ক্লাসের ছেলে বন্ধু রজত, ইয়সিন,ইস্রাফিল, ছাব্বির, এদের মতো আমিওতো এখনও কুঁড়ি। ফুল হয়ে ফোটার আগেই আমাকে কেন শেষ হয়ে যেতে হবে?
কোনো সমস্যা নিয়ে যখন নিবিড়ভাবে ভাবা হয় তখন হয়তো উত্তোরণের একাটা পথ বেরোয়। ভাবতে ভাবতে মাথায় একটা প্লান এলো। আচ্ছা আমিতো সবসময় নিজেকে ছেলেদের সাথে তুলনা করি তাহলে স্যার-ম্যাডামদের কাছে শুনেছি অনেক ছেলেরা নাকি বাড়ি থেকে রাগ করে বেরিয়ে লজিং থেকে পড়ালেখা করে বড় হয়েছে। তাহলে আমি মেয়ে হয়ে কেন পারব না? আমিওতো পালিয়ে দূরে কোথাও যেতে পারি।
যেমনি ভাবা তেমনি উদ্যোগ নিয়ে ফেললাম। এখনি পালিয়ে যাবো।
স্কুল ব্যাগটায় ভরে ফেললাম আমার যাবতীয় জামা কাপড়। আলমারী থেকে সন্তর্পনে বের করে নিলাম আমার বিয়ের জন্য আব্বুর যোগাড় করা একশ টাকার নোটের একটা বান্ডিল। যাতে আছে দশ হাজার টাকা। আবেগের আতিশয্যে একবারও মাথায় এলো না, মেয়েদের চারপাশের বাঘ, শিয়াল, শকুন, জোঁকের অভয়ারণ্যের কথা। একটু পা স্লিপ করলেই তারা ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে।
একটা ছোট্ট চিরকুট লিখলাম-
আব্বু, তোমার এই চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত আমি মেনে নিতে পারলাম না। জীবনটা আমার তাই সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে হবে। আমি আমার স্বপ্নকে বিক্রি করতে দেবো না। তাই চলে গেলাম বহুদূরের কোনো অজানা ঠিকানায়। আমাকে খুঁজতে যেও না। যদি কোনোদিন মানুষের মতো মানুষ হতে পারি তাহলে ফিরে আসব। ভুল করলে ক্ষমা করে দিও। ইতি- তোমাদের দিয়া।
চিরকুটটা বালিশের নীচে রেখে মাঝরাতে বেরিয়ে পড়লাম এক অজানার উদ্দেশ্যে। মনে প্রত্যয়, পায়ে ত্রস্ততা। যেভাবে হোক রাত পোহাবার আগেই আমাকে চলে যেতে হবে এদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। দূরে কোথাও। কোনো আত্মীয়-স্বজনের সাথেও রাখা যাবে না কোনো সম্পর্ক। কেউ যেন আমার সিদ্ধান্তে বাধা দিতে না পারে।
বের হওয়ার সময় ভাবলাম- একটাই তো জীবন। এ জীবন কোনোভাবেই কারো দাসত্বের হাতে তুলে দেবো না। এটা আমার জীবনে নেওয়া চরমতম রিস্ক । জিতলে বেশ, হারলে শেষ।
(২)
হেঁটে চলেছি গ্রামের পর গ্রাম। জীবনে এই প্রথম বাবা-মা ছাড়া একা একা হাঁটছি দূরের কোনো অজানা মেঠো পথ দিয়ে। মনের মধ্যে যেমন প্রতিজ্ঞা তেমনি ভয়ও কাজ করছে। কোথায় যাচ্ছি আমি? কোথায় আমার ঠিকানা? পারবো তো শেষ পর্যন্ত জিততে! হাঁটছি আর ভাবছি।
মনে পড়ছে আব্বু-আম্মু বোনদের কথা। কি করছে তারা এতক্ষণ । হয়তো আব্বু বাড়ি তোলপাড় করে ফেলছে। ভাবলাম কেউ যখন আমাকে বুঝলো না তখন আমি কেন ওদের নিয়ে ভাবতে যাবো?।
কখনো ক্ষিধে লাগলে খেয়ে নিচ্ছি একটা দোকানে ঢুকে পুরি, সিঙাড়া, পরোটা অথবা কলা, বিস্কুট, কেক। কখনো খাচ্ছি শুধুই পানি।
মেঠো পথ দিয়ে যখন হাঁটছি মনে হচ্ছে আমি সেই বিভুতি ভূষনের আঁকা চরিত্র অপু দূর্গা। কখনো রাস্তার পাশে ঘাসের উপর উড়ে বসে থাকা ফড়িংটাকে ধরে বলছি, ফড়িং তোর তো একটা স্বাধীন জীবন আছে আমার তাও নেই। তবে আজ থেকে হবে। কখনো আকাশের দিকে চেয়ে বলছি, ও আকাশ আমি যে তোমার মতো বড় হতে চাই। তোমার এতোবড় ছাদের নীচে আমার একটু আশ্রয় দিও।
সারাদিন প্রচন্ড জার্নি গেছে। কখনো পায়ে হেঁটেছি, কখনো খেয়া নৌকা পার হয়েছি, কখনো বাসে চড়েছি। এভাবে চলতে চলতে বহুদূর চলে এসেছি । কোনো এক অজানা গ্রামে।
প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। এখানে কাউকে আমি চিনি না, আমাকেও কেউ চেনে না। কি করব এখন? কোথায় রাত কাটাবো। মাঝে মাঝে কান্নাও পাচ্ছে। মনে কাজ করছে অজানা ভয়। আবার নিজেই নিজেকে সাহস যুগাচ্ছি, একটা ছেলে হলে কি করতো এখন? কোনো বাড়ি যেয়ে আশ্রয় চাইতো। আমিও তাই করব। ছেলেরা পারলে আমি পারব না কেন?
আবার ভাবছি একটা ছেলে হলেতো কোনো গাছতলায় শুয়ে বা কোনো স্কুল বারন্দায় শুয়ে রাত কাটিয়ে দিতে পারতো কিন্তু আমি কি একজন মেয়ে হয়ে তা পারব? এটাই হয়তো ছেলেদের সাথে মেয়েদের পার্থক্য।
আমি সদ্য কিশোরী হলেও বুদ্ধিতে কম নই। অতো সহজে দুর্বল হয়ে হাল ছাড়ার মানুষ আমি নই। পথে যখন বেরিয়েছি পথ একটা দিশা করে দেবে। মনে বুদ্ধি, সাহস আর কৌশল এই তিনের সমন্বয় থাকলে যে কোন কঠিন চ্যালেঞ্জ জয় করা সম্ভব।
সূর্য প্রায় পশ্চিম আকাশে ডুব দিতে চলেছে। এখনি সন্ধ্যা নামবে। আঁধারে লীন হবে পৃথিবীর লীলাময় রহস্যভূমি। এই আঁধারের পৃথিবীতে এখন আমার চাই একটা একটা নিরাপদ আশ্রয় । এই শ্বাপদ সংকুল জনপদে একা একজন কিশোরীর পক্ষে নিরাপদ আশ্রয় পাওয়া যে অমবস্যায় চাঁদ খোঁজার মতো কঠিন কাজ সেটা বুঝতে পারছি। কিন্তু প্রচন্ড মনোবল, আশা আর আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস আমাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছি।
হঠাৎ রাস্তায় আমি দেখা পেয়ে গেলাম এক অশিতিপর বৃদ্ধকে যে ভিক্ষা করে তার আশ্রয়ে ফিরছে।
আমি বৃদ্ধাকে দাদী সম্বোধন করে সালাম দিয়ে বললাম দাদী তোমার বাড়ি কোথায়?
বৃদ্ধা বললো, বাড়ি আর কোথায় পাবো। আমার ছোট্ট একটা ছাবড়া আছে সামনে বাজারের পাশে।
আমি বললাম, দাদী তোমার সাথে আর কে কে থাকে?
দাদী জবাব দিলো, আমি একলা থাকি। কেন কি দরকার?
আমি বললাম দরকারতো আছে দাদী। বলছি, এই বলে আমি বৃদ্ধাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, দাদী আমার কি একটা রাতের জন্য তোমার কাছে আশ্রয় হবে? আমি খুব বিপদে পড়ে গিছি। বাড়ির থেকে রাগ করে চলে আসছি। এখন রাতে কোথায় থাকব ভেবে পাচ্ছি না।
বৃদ্ধা দাঁতহীন তেবড়া গালে একটু হেসে বললো, তোর বাড়ি কোন জাগায় রে? কেন রাগ করলি?
আমি বললাম, সে অনেক কথা। তোমার বাসায় গেলে বলব।
যার কিছু নেই তারতো চুরি হওয়ার ভয়ও নেই তাই বৃদ্ধা যেন নিঃশ্চিন্তায় বললো, তুই থাকতে পারলে চল্ ।
আমাকে রাতে থাকার একটা আশ্রয় করে দেওয়ার জন্য আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলাম। চলে গেলাম বৃদ্ধার সাথে তার আশ্রয়ে। দেখলাম একটা দোকানের দেওয়ালের সাথে হেলান দেওয়া ভাঙাচোরা টিনের একচালা ছাবড়া। পিছনটায় ধানের নাড়া দিয়ে শতছিদ্রের বেড়া। সামনে দরজায় বাঁশের ঘেরার গায়ে একটা ময়লা ছেঁড়া কাপড় ঝুলানো। মাথা নিচু করে তার মধ্যে ঢুকলাম। বৃদ্ধা একটা টেমি জ্বালালো। মেঝেতে ধানের খড়ের উপর একটা খেজুরের পাটি বিছানো।
সারাদিনের কষ্টের পর এটাকেই মনে হলো যেন ফোমের পালংক।
বৃদ্ধা বললো, বহুদিন পর আমার এই ক্ষুদে ছাবড়ায় একটা ক্ষুদে অতিথির পা পড়েছে। আমার একমাত্র ছোট্ট নাতনীটা মারা যাওয়ার পর আর কেউ এঘরে পা দেইনি। আজ ভগবান তোকে এনে দেছে। কিন্তু তোকে যে কি দিয়ে দুটো ভাত দেবো? আমি ভিখারী মানুষ। আমারতো কিছু নেই।
আমি বললাম, তুমি থাকতে দিয়েছো এটাই অনেক। আমার কিচ্ছু লাগবে না। মুড়ি চানাচুর কিনে খেয়ে নেবো।
বৃদ্ধা বললো, তাই কি হয়? অতিথি ভগবান। নিজে না খেলেও অতিথিকে খাওয়াতে হয়। এই বলে ছোট্ট একটা হাঁড়িতে অল্পকটা চাল ও দুটো আলু দিয়ে তার ভাঙা উনুনটায় তুলে দিলো। তারপর উনুন জ্বাল দিতে তার কষ্টের কথাগুলো বলতে লাগলো।
তার নিঃসঙ্গ জীবনের কষ্টের কথা শুনতে শুনতে আমার নিজের কষ্টের কথাই ভুলে গেলাম।
বৃদ্ধা তার কথা শেষ করে বললো, দেখেছিস শুধু বকবক করে আমার কথাই বলে যাচ্ছি। তোর কথাতো শোনা হলো না। বল দেখি তুই কোথার থেকে আসছিস? তোর মা-বাবা কোথায়? তুই পালালি কেন?
আমি আমার পরিচয় গোপন রেখে বৃদ্ধাকে সব কথা খুলে বললাম। বললাম দাদী আমার একটা কাজের খুব দরকার। আমি কাজ করব আর পড়ালেখা করব। তোমার কাছে কোনো কাজ আছে?
বৃদ্ধা কাঁপা গলায় বললো, রাখ্ রাখ্ রাখ্। কদিন আগে পাশের গ্রামের হেড মাষ্টারনি বলছেলো তার একটা কাজের মেয়ে লাগবে। হেড মাষ্টারনি একা থাকে? তাকে একটু দেখাশোনা করতে হবে। পারবি তুই?
আমার চোখ চকচক করে উঠলো। আমি তো এরকমই খুঁজছিলাম। মনে মনে ভাবলাম, হয়তো আমার একটা দিশা হতে চলেছে। বৃদ্ধাকে বললাম আমি পারব। কাল সকালেই চলো না সেই মাষ্টারনির বাড়ি যাই।
রাতে আমার ঘুম হলো না। কখন সকাল হবে? কখন যাবো সেই মাষ্টারনির বাড়ি? বৃদ্ধাকে মনে হলো আমাকে সাহায্যের জন্য পাঠানো আল্লাহর ফেরেস্তা ।
সকাল হলে বৃদ্ধাকে আর সময় দিতে চাইলাম না। দ্রুত নিয়ে চললাম সেই মাষ্টারনির বাড়িতে।
আমরা যখন উনার বাড়ি পৌঁছালাম তখন উনি স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বৃৃদ্ধাকে দেখে বললেন কি খবর খালা, এতো সকালে কেন?
বৃদ্ধা আমাকে দেখিয়ে বললো এই যে তোমার জন্য একটা কাজের মেয়ে নিয়ে এলাম। মেয়েটা খুব ভালো। একে রাখতে পারো।
উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন কি নাম তোমার?
আমি বললাম, ম্যাডাম আমার নাম দিয়া ।
উনি বললেন, এইটুকু বয়সে কাজ করবে কেন? কি কাজ করতে পারবে তুমি?
আমি বললাম, যে কোনো কাজ করতে পারি। আর কেন কাজ করব? সে অনেক কথা ম্যডাম। আপনি একটু সময় দিলে সব বলতে পারি।
উনি বললেন, তোমার কথা শোনার মতো সময়তো এখন আমার হাতে নেই। তাহলে বিকালে এসো। আমি তোমার সব কথা শুনব। এই বলে তিনি স্কুলে চলে গেলেন। বৃদ্ধাকে বললাম আমি এখানে থাকি তুমি যাও দাদী। বৃদ্ধা আমাকে রেখে ভিক্ষা করতে চলে গেলো। আমি একা বিকাল চারটে পর্যন্ত উনার দরজার সামনে বসে থাকলাম।
বিকাল চারটার পরে ম্যাডাম বাড়ি এলেন। আমাকে বসে থাকতে দেখে বললেন, তুমি এখনও বসে আছো? তুমিতো বায়োজিদ বোস্তামিকেও হার মানিয়েছো।
আমি বললাম হ্যাঁ ম্যাডাম আমার যে কাজটার খুব দরকার।
উনি বললেন, আমি হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসি তারপর তোমার কথা শুনছি। তনি ভিতরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে এসে বললেন, এবার বলো তোমার কথা।
আমি আমার এই ক্ষুদ্র কৈশোর জীবনের সব কাহিনী খুলে বললাম। শুধু বাবা মায়ের নাম ও ঠিকানা বলার ক্ষেত্রে একটু মিথ্যার আশ্রয় নিলাম। আরও বললাম ম্যাডাম আপনি যা বলবেন আমি সব করতে পারব শুধু একটু পড়ালেখা করার সুযোগ দিলেই হবে।
ম্যাডাম অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি তো খুব সাহসী মেয়ে। আমি তোমার বাবা-মাকে খু৭জে বের করে বুঝিয়ে বলবো।
আমি বললাম প্লিজ ম্যাডাম আমার বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগ করবেন না। আমার চ্যালেঞ্জ আমি নিজেই মোকাবেলা করব।
ম্যাডাম বললেন, আচ্ছা তুমি খুব সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছো। এই বয়সে একটা মেয়ের পক্ষে এতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। ঠিক আছে আমারতো এখানে কেউ থাকে না। আমার ম্বামী মারা গেছে বছর পাঁচেক হলো। একটামাত্র ছেলে তাও গতবার স্টুডেন্ট ভিসায় বিদেশ গেছে। আমি এখানে একা থাকি। তুমি আমার কাছে থাকবে। তোমাকে পেয়ে আমার একাকিত্বের অবসান ঘটবে। আমিই তোমাকে পড়ালেখা শিখাবো।
আমি যেন পুরো আকাশটা হাতের মুঠোয় পেয়ে গেলাম। মনের ভিতর আনন্দের বান ডেকে গেলো তবু বাইরে নির্বিকার থাকলাম।
সন্ধ্যায় উনি আমাকে ডেকে বললেন, দিয়া আমি তোকে তুই করেই ডাকব কেমন! আর তুই আমাকে খালামনি বলে ডাকবি। তুই বলে ডাকলে বেশি বেশি আপন মনে হয়। এরপর আমকে সব কাজ বুঝিয়ে দিলো, এইটে এইভাবে করবি, ঐটে ঐভাবে করবি। এই কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমরা যেন একেঅপরের আপনার চেয়ে আপন হয়ে গেলাম। পৃথিবীতে এতো ভালো মানুষ আছে পথে না বেরোলে হয়তো জানা হতো না।
সকালে খালামনি আমাকে নিয়ে স্কুলে গিয়ে স্যার ম্যাডামদের ডেকে বললেন, একে একটু বাজিয়ে দেখুন তো।
স্যার ম্যাডামরা আমাকে নানান প্রশ্ন করলো। সহজ, কঠিন, ঘুরানো, প্যাঁচানো সব প্রশ্নের উত্তর যখন আমি ঠিকঠিক দিলাম তখন তারা খালামনির কাছে আমার প্রশংসায় ভাসিয়ে দিলেন। খালামনি বললেন, ওকে ক্লাস নাইনে ভর্র্তি করে নেন।
আমি ক্লাস নাইনে ভর্তি হলাম। পড়ালেখার জিদ আরও বেড়ে গেলো। নির্ঝঞ্ঝাটে সারাদিনরাত আরও মনোযোগের সাথে পড়ালেখা করতে লাগলাম।
পরীক্ষা হলো। প্রত্যেক পরীক্ষায় আমি প্রথম হলাম। খালামনি আমাকে তার নিজের মেয়ের মতো দেখে। কেউ এলে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয় নিজের মেয়ে বলে। দুজন মিলেই রান্নাবাড়া করি, খাওয়া-দাওয়া করি ।
খালামনির সারাদিন তার ছেলে কাব্যর কথা মনে পড়ে। সময় পেলেই আমার সাথে কাব্যকে নিয়ে অনেক গল্প করে। প্রায়ই ফোনে কাব্যের সাথে কথা বলে। আমাকে বলে কাব্য চলে যাওয়ায় তার খুব মন খারাপ হতো। আমাকে পেয়ে নাকি সেটা দূর হয়েছে।
আমিও খালামনিকে একেবার নিজের করে নিয়েছি।
প্রায় আড়াইটি বছর জীবনটা নদীর মতো ধেয়ে চললো। সব বাঁক. বাধা খালামনির আন্তরিকতার ঢেউয়ের ভেসে গেলো। কোনো বিপত্তি ছাড়াই নদীটা কলোকল শব্দে এগিয়ে চললো সাফল্যের সাগর সঙ্গমে। মনের মধ্যে এক আলোকময় ভবিষ্যৎ জীবনের হাতছানি।
অবশেষে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষা এতো ভালো দিলাম যে রেজাল্ট নিয়ে কোনো দ্বিধাই থাকলো না।
একটা বঞ্চিত মেয়ের জীবন যে এভাবে সব বাধা উৎরে সহজে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষার হল অতিক্রম করতে পারবে তা ভাবতেই পারিনি।
আল্লাহ হয়তো বঞ্চিতের এতো সুখ দীর্ঘক্ষণ সইতে পারে না। পরীক্ষা শেষ হতেই সামনে এসে দাঁড় করালো আরেক মধুময় বিপত্তি। তিন বছর পর তিন মাসের ছুটিতে কাব্য বাড়ি এসেছে। খালামনি আমাকে কাব্যের কাছে তার বোন বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
কাব্য ভাইয়া আমাকে খুব ¯েœহ করে। আমিও তাকে সম্মান করি। ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে ভাইবোনের সম্পর্ক গড়ে উঠলো।
একজনের মনের খবর আরেকজনে জানার মতো আয়না আজো আবিষ্কার হয়নি, আবিষ্কার হয়নি পরিমাপের কোনো নিক্তি। যদি এমন কিছু আবিষ্কার হতো হয়তো কারো সংসার একদিনও টিকতো কিনা সন্দেহ।
কাব্য ভাইয়ার মনের সুপ্ত বাসনা জানার মতো আয়না বা নিক্তি কোনোটাই আমার কাছে নেই। আমি তার বাহিরের সরলতায় গলে গিয়ে অন্তরের গরলতাকে বেমালুম এড়িয়ে গিছিলাম।
মাধ্যমিকের যেদিনে রেজাল্ট বের হলো বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে গেলো। আমি স্কুলের সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে পাশ করেছি। আমার রেজাল্টে খালামনি ও ভাইয়া ভীষণ খুশি।
খালামনি স্কুলে গেছে পরীক্ষার্থীদের রেজাল্ট জানতে। আমি আর কাব্য ভাইয়া বাড়িতে বসে গল্প করছি। আমি আমার আগামী জীবনের পরিকল্পনা তাকে বলছি। হঠাৎ আমার পায়ে স্পর্শ পেলাম কারো পায়ের। লজ্জ্বায় আমি পা টেনে নিলাম। কিন্তু পরপরই তার হাত আমাকে স্পর্শ করলো। সে হাতে আমি কামনার আগুন দেখতে পেলাম। তৎক্ষনাৎ সাবধান হতে গেলাম কিন্তু সে আমাকে জড়িয়ে ধরে তার ঠোঁটে আমার ঠোঁট স্পর্শ করতে প্রচন্ড অপচেষ্টা করলো। আমি সমস্ত গায়ের জোরে দুহাত দিয়ে তাকে ছিটকে ফেলে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলাম। আমি তখন থরথর করে কাঁপছি আমি । খালামনি সেই মূহুর্তে বাড়ি ফিরে এলো।
রাত্রে কাব্য খলামনিকে সরাসরি জানালো সে আমাকে বিয়ে করতে চায়। তার সিদ্ধান্ত ফাইনাল। সে নাকি আমাকে না পেলে বাঁচবে না।
খালামনিও যেন কাব্যের প্রস্তাবটা লুফে নিলো। বললো, দিয়াকে বৌমা করতে পারলেতো খুব ভালো হয়। তাকে আমি এতোদিন ধরে দেখেছি, জেনেছি, বুঝেছি। সে খুব ভালো মনের মেয়ে।
খালামনি আমাকে প্রস্তাব দিলো। দিয়া আমি তোকে বৌমা করতে চাই। কাব্য তোকে খুব ভালোবাসে। তুই আমাকে ফিরাসনে।
আমি বললাম, তা হয় না খালামনি। আমি বাবার যে সিদ্ধান্তে বাড়ি ত্যাগ করে চলে এসেছি সেই কাজ এক্ষুনি করতে পারব না। আগে লেখাপড়া শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াই তারপরে ভেবে দেখব।
কিন্তু খালামনি ও কাব্য নাছোড়বান্দা। খালামনি বললো, আমি তোকে নিজ পায়ে দাঁড়াতে সবরকম সহযোগিতা করব। তুই লোখাপড়া শিখবি। চাকরি করবি। আমার বাড়িতে মেয়ের মতো থাকবি। তুই রাজি হয়ে যা মা।
সেই থেকে কাব্যও আমার চারপাশে যেন পেঁচিয়ে থাকতে চাইলো। আমি আগে তাকে যে বিশ্বাসের চোখে দেখতাম এখন তা আর পারছি না।
ভাবলাম, এখানেও জোঁকের উৎপাত শুরু হলো! মেয়েদের জীবনে কি কোনো শান্তি নেই? তারা কি নিজের মতো করে বাঁচতে পারবে না? সিদ্ধান্ত নিলাম এই জোঁকের উৎপাত এড়াতে আবারও পথে নামব।
পরের দিন মাঝ রাতেই আগের মতো করে একটা চিরকুট লিখে তল্পিতল্পা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পথে । চিরকুটটিতে লিখলাম, খালামনি- আপনি আমার মায়ের চেয়েও অনেক বেশি কিছু করেছেন। আমি আপনার কথা ভুলতে পারব না। আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তবু আপনার কথা রাখতে পারলাম না বলে আমি দুঃখিত। আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি শিকলে বাঁধা পড়তে চাই না। । একবার যে পথ চিনে গেছে তাকে পথ আঁটকানোর সাধ্য কারো নেই। চললাম আবার কোনো এক অজানার উদ্দেশ্যে। ইতি দিয়া।
ভাবলাম এবার আর গ্রামে থাকব না। সোজা শহরে চলে যাবো।
(৩)
আমি এখন আগের থেকে অনেক এডাল্ট। এখন চোখ দেখলেই বুঝতে পারি মানুষ কি চায়। আমি ইতোমধ্যে বুঝে গেছি অধিকাংশ পুরুষ মানুষ মেয়ে মানুষ দেখলে হয় বাঘের চেয়েও ভয়ংকর, হায়নার চেয়েও হিং¯্র। সুতরাং এখন আমি পুরুষ মানুষ হতে অনেক সাবধান।
শহরে যখন প্রথম পা রাখলাম আমি দিশেহারা হয়ে চোখে ধাঁ ধাঁ দেখছি। এই আমার প্রথম শহরে আসা তাও আবার একা। এখানে সবই আমার অচেনা। কে দেখাবে পথ ? কে দেবে আশ্রয়? অজ¯্র রিকসা সাইকেল গাড়ির ভিড়ে নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছে। একজন মেয়ের জীবন চলা যে ছেলেদের মতো মসৃন নয় সেটা আমি বাইরে বেরিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
শহরে এসে আমি খুঁজতে থাকলাম একটা নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু যেখানে যাই সেখানেই দেখি শহরের মানুষগুলো কেমন যেন সাপের মতো। গ্রামের মতো সহজ সরল না। মনে মনে ভাবলাম সাপের সাথে থাকতে গেলে সাপুড়ে সাজতে হবে।
খুঁজতে খুঁজতে এক কাজের মহিলার সাথে পরিচয় হলো। বস্তিতে তার বাসায় যেয়ে উঠলাম। সেখানে দু’রাত কাটালাম। তার সাথে এক বাসায় কাজেও গেলাম কিন্তু পারলাম না। ভাবলাম এ পথ আমার নয়। আমাকে অন্যভাবে কিছু ভাবতে হবে।
তারই মাধ্যমে মেয়েদের মেসে একটা সিট খুঁজে উঠলাম। কাছে যা টাক ছিলো দু’এক মাস মেস খরচ চালানো যাবে। ভাবলাম দু’এক মাসর মধ্যেই আমাকে একটা পথ বের করতে হবে।
ক’দিন যেতেই রুমমেট তানিয়া আপার সাথে আমার ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠলো। তানিয়া আপা অনার্সের ছাত্রী। তার মাধ্যমে দুই বাসায় টিউশনি পেলাম।
পথে না বোরোলে যেমন পথ চেনা যায় না তেমনি মানুষের কাছাকাছি না গেলে মানুষ সম্পর্কে জানা যায় না। তানিয়া আপা যে এতো হেল্পফুল মানসিকতার একটা মানুষ তা তার সাথে না মিশলে বোঝা যাবে না। সে আমার অতীত জীবনের সব কাহিনী শুনে যেমন চমকে উঠলো তেমনি আমাকে শীর্ষে পৌঁছাতে সব সহযোগিতার আশ্বাস দিলো। সে-ই আমাকে শহরেরর নামকরা সরকারী কলেজে উচ্চ-মাধ্যমিকে ভর্তি করে দিলো। স্যার ম্যাডামদের কাছে ভালো ছাত্রী হিসেবে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলো।
এরপর ক্লাসে আমার পারফর্মেন্সে মেধাবী ছাত্রী হিসেবে আমি স্যার ম্যাডামদের নজরে চলে এলাম। স্যার-ম্যডামরা লাইব্রেরী থেকে বইয়ের যোগাড় দিেেলন। লাইব্রেরীতে পড়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। কলেজ থেকে মেধাবী ছাত্রী হিসেবে বৃত্তি পেলাম। আর আমাকে ধরে কে? যেন তরতর করে গাছের চুড়ায় উঠে যেতে লাগলাম। তবে সেটা যে খুব মসৃণ হয়েছে বলা যাবে না। মাঝে মাঝে অনেক জোঁকের উৎপাত সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু আমার আমার কঠোরতায় তারা হুল ফোটাতে পারিনি।
টিউশনি করে ম্যাচ খরচ চালিয়ে শেষ করলাম উচ্চমাধ্যমিক জীবন। তানিয়া আপার একান্ত সহযোগিতা, অনুপ্রেরণাও গাইডে উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করলাম। কলেজের রেজাল্টে সেরা দশে আমার নাম উঠলো।
তারপর তানিয়া আপারই অনুপ্রেরণায় অনার্সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে চান্স পেলাম। শুরু হলো নুতন পথচলা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসেও পেয়ে গেলাম খালামনি বা তানিয়া আপার মতো আরেকজন গুণী মানুষকে যিনি আমাকে নিজের সন্তানতুল্য ভালোবেসে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গতিকে মসৃন করে দিয়েছিলেন। তিনি হলেন গুলনাহার ম্যাডাম। সমাজে যেমন খারাপ মানুষ আছে তেমনি অনেক ভালো মানুষও আছে যাদের সান্নিধ্যে আমি জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছি।
গুলনাহার ম্যাডাম আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের চলার পথের এমন সহযোগী ছিলেন যে মেস খরচ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় খরচ সবজায়গাতেই তার অবদান অনস্বীকার্য। কখনো টিউশনি যোগাড় করে দিয়েছেন। কখনো নিজের পার্টস থেকে দিতেও কুন্ঠাবোধ করেন নি। ভালোবেসেছেন নিজের মেয়ের মতো।
সম্পূর্ণ টিউশনির উপর নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করা খুব একটা কঠিন কাজ। আমি সেই কঠিন কাজটাকে সহজ করে ফেলেছিলাম আমার নিষ্ঠা ও ভালোবাসা দিয়ে।
মেধাবী ছাত্রী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে মাথা উঁচু করে পড়লেখা করেছি। অবশেষে বি.এ অনার্সের উচ্চতর সেকেন্ড ক্লাস পেলাম এবং এম.এ-তে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হয়েছি। যেদিন আমি এম.এ-তে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হওয়ার রেজাল্ট পেলাম সেদিন অনেক কেঁদেছিলাম অতিত ভেবে। মনের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি আর সৎ সাহস থাকলে যে মানুষ শীর্ষে পৌঁছাতে পারে তার উদাহরণ হয়ে থাকলাম আমি ।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন শারিরীক মানসিক নানা সমস্যায় পড়িনি তা নয়। যেহেতেু আমার আগুনে ঘর পুড়েছে আগে তাই সিঁদুর রাঙা মেঘকে কিভাবে মোকাবেলা করতে হয় সে কৌশলটাও জানা আছে তাই হাজারো সমস্যাতেও আমাকে কেউ দমাতে পারিনি। পারিনি কোনো জোঁকে কাহিল করতে ।
অনার্সের পড়ালেখা চলাকালীনই বি.সি.এস পরীক্ষার প্রিপারেশন নিতাম । মনে মনে ভাবতাম বি.সি.এস দিয়ে প্রশাসনিক বড় পদের বড় কর্মকর্তা হবো। এমন উচ্চাশা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া প্রায় সকল শিক্ষার্থীর মনেই থাকে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ছিলো একটু ভিন্ন। শুধু অভিপ্রায়েই শেষ নয়, তার জন্য ছিল আমার আপ্রাণ যুদ্ধ। আমাকে বড় কিছু হতেই হবে এমন দৃঢ়তা নিয়ে লেগে থেকেছি। যাতে আমি সমাজের হাজারের মধ্যে একজন হতে পারি। যাতে আমি সমাজের আমার মতো অসহায় মেয়েদের পাশে দাঁড়াতে পারি।
(৪)
বি.সি.এস এর সর্বশেষ ধাপ ভাইভা পরীক্ষার রেজাল্ট যেদিন বের হলো সেদিন আমার প্রচন্ড জ্বর। আমি রুমে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি। আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ট বান্ধবী রূপা এসে বললো, দিয়া বি.সি.এস পরীক্ষার ভাইভার রেজাল্ট দিয়েছে দেখেছিস।
আমি বললাম, না তো! আমিতো রুমে জ্বরে পড়ে রয়েছি।
রূপা অনলাইনে সার্চ করে আমার রোলটা দেখে লাফিয়ে উঠলো। বললো দিয়া তুই এখন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়া জামান।
আমার কান যেন কোনমতে বিশ্বাস করতে পারছিলো না যে, আমি ম্যাজিষ্ট্রেট হয়েছি। আমিও ঐ অবস্থায় লাফিয়ে উঠলাম। আমার জ্বর যেন মূহুর্তে ছেড়ে গেলো। আমি তখন রুমের মধ্যে নাচতে লাগলাম। আমার চোখ দিয়ে পনি গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। এটা আনন্দাশ্রু নাকি অতিতের বঞ্চনার জবাবের অশ্রু বলতে পারব না।
আমি তক্ষুণি ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিলাম।
রূপা বললো, এক্ষুণি কোথায় যাবি?
আমি বললাম বাড়ি যাবো। আজ আমার বাড়ি যাওয়ার সময় হয়েছে। সেই দশ-এগারো বছর আগে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসার পর থেকে আজ অব্দি একটি বারের জন্যও বাড়ির সাথে যোগাযোগ রাখিনি, খোঁজখবর নেইনি। আজকের দিনটির জন্য অপেক্ষায় ছিলাম।
সন্ধ্যা নাগাদ বাড়ি পৌঁছালাম। দীর্ঘ দশ-এগারো বছর পর বাড়ি ফিরেছি। বাড়িটাও ঠিকমতো চিনতে পারছি না। অনেক বদলে গেছে।
বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম। বুকের মধ্যে কাঁপছে। আগের মতো কি সবকিছু ঠিক আছে?
একজন রোগা প্রৌড়া পুকুর থেকে ঘটিতে করে পনি নিয়ে ঘরে যাচ্ছে। যতই রোগা প্রৌড়া হোক মেয়ে মাকে চিনতে পারবে না তাতো হতে পারে না। আমি মাকে জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে বললাম, মা আমি তোমাদের বড় মেয়ে দিয়া। ম্যাজিস্ট্রেট দিয়া জামান।
মা আমার দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, তুই এখনও বেঁচে আছিস?
আমি বললাম, বেঁচে আছি মানে! আমি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছি।
মা অবাক হয়ে বললো, তুই ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিস? চল্ ঘরে চল্ ।
দেখলাম বারন্দায় একজন প্যারালাইজড বৃদ্ধ বসে আছে। মা আমার হাত ধরে টেনে তার কাছে নিয়ে বললো, এই যে তোমার বড় মেয়ে দিয়া এসেছে। আব্বুকে দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। তাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদালাম। আমিও কাঁদছি, সে-ও কাঁদছে। তারপর বললাম আব্বু আমি ম্যজিষ্ট্রেট হয়েছি।
আব্বু বললো, তুই ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিস? এতোদিন কোথায় ছিলিরে মা।
আমি বললাম সে অনেক ইতিহাস আব্বু। পরে তোমাদের সব বলব। তোমরা একটা প্রতিভাবান কুঁড়িকে সেদিন পায়ের তলে পিঁষে দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দিতে চেয়েছিলে। কিন্তু প্রতিভা কখনও চাপা পড়ে থাকে না। সে আজ একটা পরিস্ফুটিত গোলাপ হয়ে তোমাদের সামেনে এসেছে। আব্বু আজকে আামর বিয়ের সময় এবং বয়স দুটোই হয়েছে। তুমি আমার জন্য ছেলে দেখতে পারো। তবে মনে রাখবে তোমার মেয়ে কিন্তু ম্যাজিষ্ট্রেট।
আব্বু কাঁদতে কাঁদতে বললো, এখন বুঝি তুইই ঠিক ছিলিরে মা। আমি ভুল ছিলাম। তুই চলে যাওয়ার পর অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। আমি তখন আবেগে অন্ধ হয়ে গিছিলাম। তোর সেই ঠিক করা ছেলের সাথে জোর করে বিয়ে দিছিলাম রিয়াকে। তারপর রিয়ার স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি ওর সাথে ভালো ব্যবহার করিনি। রিয়ার গর্ভে পাঁচ মাসের সন্তান থাকা অবস্থায় ওরা মারধর করে ওকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। সেই থেকে ও আমাদের বাড়ি। মাত্র তেরো চৌদ্দ বছরের স্বামীহারা রিয়া সন্তান প্রসবের সময় মারা যায় যায় আরকি। মনে হলো মেয়ে-সন্তান দুটোই হারাতে চলেছি। যদিও কোনোমতে দুটোই বেঁচে গেলো তবে ছেলেটা হলো রিকেটস রোগী। কেয়াটাকে বিয়ে দিলাম। সেও শ্বশুর বাড়ি ভালো নেই। আর আমার এই অবস্থা। তোর মা-ও অসুস্থ। আমাদের দুরাবস্থার শেষ নেই। কে আমাদের দেখবে?
আমি আশ্বস্থ করে বললাম, আমি যখন এসে গিছি তোমাদের আর কোনো চিন্তা নেই। আমি সংগ্রাম করে নিজ পায়ে দাঁড়িয়েছি। আমি স্বাবলম্বি। আমিই এখন থেকে তোমাদের সংসরের সব দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নিলাম।
তারপর বললাম, আব্বু তোমরা তোমাদের মেয়েদের প্রতিভার মূল্য দিতে সেদিন কুন্ঠাবোধ করেছিলে। চিরদিন শুধু পুত্র কন্যা আলাদা ভেবে এসেছো। তাই তোমাদের আজ এই অবস্থা। আমরা সব কটা বোনই মেধাবী ছিলাম। কিন্তু তুমি কুঁড়িতেই আমাদের শেষ করে দিতে চেয়েছিলে। আজ আমি বিদ্রোহ করে বেরিয়েছিলাম বলেই মেয়েরা যে ছেলেদের মতো সব পারে সেটা প্রমান করে দিতে পারলাম।
=সমাপ্ত=








