শারমিন হক
সূর্যের কর্মঘণ্টা প্রায় শেষ, তাই তো পশ্চিমে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ আয়েশ করছে। খানিক বাদেই তার রক্তিমা আভা নব্বই দশকের নববধূর বেশে ঘোমটা টেনে ডুব দেবে দূরের ওই দিঘির পাড়ের নারকেল গাছের ওপাশে। প্রত্যুষের আগে আর তার দেখা মিলবে না।
সংসারটাও হলো অনেকটা চাঁদ বা সূর্য অথবা চাকরির মতো। এখানে দায়িত্ব বেশি, প্রেম কম। পার্থক্য শুধু, সংসারে কোনো ছুটি বা কর্মঘণ্টার হিসাব নেই। আছে শুধু জীবনের হিসাব মেলানোর তাগাদা, কিন্তু হিসাব যে কারও মেলে না।
আঁচলা নদীর তীরবর্তী মায়ের শাড়ির আঁচলের মতো বিছানো ছোট একটা সবুজ-শ্যামল গ্রামে বসবাস করে জয়নাল ও তার পরিবার। পরিবার বলতে তার দুই বছর বয়সী পুত্র জয় আর একটা ভারি মিষ্টি আদরের বউ কুমকুম। জয়নাল আহ্লাদ করে কুমু বলে ডাকে। জয়নাল আর কুমুর প্রেমকাহিনি বহুদিন এ গ্রামের মানুষের চর্চার বিষয় ছিল।
জয়নাল দিনমজুরির কাজ করে। তবে তাকে ঠিক দিনমজুর বলা চলে না, কারণ তাকে শৌখিন আলসে মজুর বা সাপ্তাহিক মজুরও বলা যায়। তার মন-মর্জির ওপর নির্ভর করে সে কাজে যাবে কি যাবে না। একদিন কাজ করে যা পয়সাপাতি পায়, তা দিয়ে যদি কোনোমতে তিন বা সাত দিন পার করতে পারে, তাহলে আর কাজে যাওয়ার নাম থাকে না। কুমু তার স্বামীকে খুশি রাখতে, নতুবা যন্ত্রণাকে বুকে পাথর চাপা দিয়ে নীরবে সুখ বিসর্জন দিয়ে নদীর ধার থেকে কলমি, কচু আর কাঁটানুটি শাক তুলে দিব্যি এবেলা-ওবেলা করে সংসার গরুর গাড়ির মতো ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে কারও গাছ থেকে সজনে শাক আর কারও বাড়ি থেকে কলার মোচা, থোড়ও চেয়ে নিয়ে আসে।
জয়নাল যেদিন কাজ করে আসে, ঠিক তার পরের দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, সবজি আর মাছ বা মাংস কেনে— অতি সামান্য, যা দিয়ে সপ্তাহ শেষ হয় না। জয়ের জন্য দুধ কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই সামান্য কয় টাকায় কী বা হয়! দ্রব্যমূল্য তো এখন আকাশচুম্বী। জয়ের জন্য ইদানিং সপ্তাহে দুই-তিন দিন কাজে যেতে গিয়ে জয়নাল মেজাজ হারাচ্ছে। কুমুর সাথে আগের মতো আদুরে খুনসুটি করে না। ভালো কথা বললেও তার মেজাজ চৈত্রের দুপুরের মতো কর্কশ হয়ে যায়।
কুমু খুব নিরাশ হয়ে সারাক্ষণ শ্রাবণের সব মেঘ জড়ো করে মনের আকাশে জমিয়ে রাখে। আজকাল জয়নালকে তার খুব অচেনা লাগে। মাটির চুলার মুখে খড়ি ঠেলতে ঠেলতে মনে মনে কুমু ভাবে, আগেও তো অভাব ছিল সংসারে, কিন্তু ভালোবাসার তো অভাব ছিল না। না খেয়ে দুদিন উপোস থাকা যায়, ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করা যায়, কিন্তু ভালোবাসাহীনতায় একবেলাও থাকা যায় না।
চুলায় হাঁড়িতে চালসহ পানি, তাতে বলক উঠেছে। টগবগ করে ফুটছে ভাত— এর চেয়ে বেশি যে তার অন্তরের ভেতরটা ফুটছে। আশ্বিনের ঝাপটায় ঘরের টিনের চালের একপাশের টিন সামান্য উল্টে গেছে, তাতেই দরদর করে পানি পড়ে ঘর ভেসে যাচ্ছে। কোনোমতে বালতি, হাঁড়ি পেতে পানি ধরা হচ্ছে। ওইটুকু দুধের শিশুর গায়ে বৃষ্টির ছাঁট লাগলে ঠান্ডা লেগে জ্বর হবে, সেই ভয়ে কুমু পরম মমতায় ছেলেকে কাঁথা দিয়ে জড়িয়ে ঘরের এক কোণে বসে থাকে।
জয়নাল ইদানিং রাত করে ঘরে ফেরে। পাড়ার মোড়ে টুলু মিয়ার চায়ের দোকানে কেরাম খেলে সময় কাটায়।
টাকা দিয়ে কেরাম খেলে, জিতের চেয়ে হারের সংখ্যা জয়নালের কপালে বেশিই থাকে সবসময়। সপ্তাহ চুক্তিতে টুলুর দোকানে চা, বিড়ি খায় আর কেরাম খেলে। পাড়ার মোড়ের মুদি দোকান থেকে ইদানিং বাকি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনে। মুদি দোকানদার লালু মিয়ার সাথে ভালোই খাতির জয়নালের। জয়নালের সাথে মাঝেমধ্যে টুলু ও লালুও কেরাম খেলে। লালু যেদিন কেরামে জিতে যায়, সেদিন খিচুড়ি আর ব্রয়লার মুরগি রান্না করে সবাই মিলে খায়। তবে রান্না হয় জয়নালের বাড়িতে। এই ভোজনের সুবাদে এখন অনেকেই জয়নালের বাড়ি আসে। কুমু বিষয়টা পছন্দ করে না। জয়নালের মতো স্বামীর কাছে মাইয়া লোকের কথার কি বা দাম আছে!
জয়নাল খুশি মেজাজে কুমুকে বলল,
— তোমার ভালোলাগা, মন্দলাগার কী কারণ আছে বুঝি না। তোমার তো বউ, শুধু রান্দনের কাজ। রানবা আর খাবা। ওরা যেদিন মুরগি আর চাউল, মসলা, তেল, নুন কিন্না দিয়া যায়, সেদিন তো আমাদেরই লাভ। এই বাজারের জিনিসে আমগো আরও দুবেলা নিশ্চিন্তে চইলা যায়। তুমিও তো পোলারে নিয়া রান্দন-বারন ছাড়া গতরে হাওয়া লাগাইয়া ঘুরতে পারো।
কুমু নির্বাক চোখে তাকিয়ে থাকে জয়নালের পানে। জয়নাল বলল,
— কুমু শোনো, আমার কাজকাম করতে যে ভালা লাগে না, সে কথা জানো তুমি। আমার কেরাম খেলতে ভালা লাগে। কেরাম খেলায় না জিতাও যদি ঘরে দুই বেলার খাওন আল্লাহ জুটাই দেয়, তো মন্দ কি! সবই আল্লাহর ইচ্ছা।
কুমু বলল,
— আমার খুব ডর লাগে। এত পুরুষ মানুষের আসা-যাওয়া ভালা ঠেহে না।
জয়নাল বলল,
— আরে, ডরের কিছু নাই। বন্ধু মানুষ তারা। তাছাড়া ওরা তো ধারবাকিও দেয়, ওরা তো উপকারই করছে। মাঝেমধ্যে ওদের জন্য এইটুকু রানতে তোমার এত কষ্ট!
কুমু অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর বলল,
— কষ্ট তো রানতে লাগে না। তোমার দুবেলার খাবার খাওনের আশায় আবার সব হারাইয়া না ফেলতে হয়, সেই ডর করে।
এই বলে কুমু জয়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে। কাত হয়ে শুয়ে ভাবনার সাগরে ডুব দেয়। ডুবুরির মতো একে একে জীবন সেঁচে দুঃখের ঝিনুক তুলে আনে। সেই ঝিনুকের মধ্যেও চকচকে বেদনার নীল মুক্তো খুঁজে পায়। চারিদিকে হাতড়ে বেড়ায় একটা সুখের সাদা মুক্তোর খোঁজে, কিন্তু দেখা মেলে না। এভাবেই রাতকে ভোর করে, তারপর নিয়ম মেনে সূর্যের সাথে কর্মঘণ্টার পাল্লা চলে কুমুর।
জয়নাল বাড়িতে খায় আর দোকানে গিয়ে কেরাম খেলে, কাজকর্মে যাওয়ার কোনো বালাই নেই। বাকির খাতায় হয়েছে অনেক দেনা। লালু, টুলু কেউই আর বাকি দেয় না— আগের বাকি পরিশোধ করলে তবেই খুলবে নতুন বাকির খাতা। এমনিতেই আলসে জয়নাল, তার ওপর এতদিন কাজ না করে কেরাম খেলে সময় পার করায় শরীরে যেন শিকড় নেমে গেছে। এই শিকড় এত নিচে নেমেছে যে আর কোনো কাজ করতে ইচ্ছেই করে না।
লালু, টুলু বারবার পাওনা টাকা চাইতে বাড়িতে আসছে। দেব-দিচ্ছি করে দিন পার করছে জয়নাল। চালের ডিব্বা ঝাঁকিয়ে কুমু দেখে, চাল আছে সামান্য, আর ঘরেও অন্যান্য খাবার প্রায় শেষ। দুদিন পর হয়তো চুলাও জ্বলবে না। ছেলেটার দুধও আছে অল্প। এই পরিস্থিতিতে কুমু কী করবে বুঝতে পারে না। লালু, টুলু হুশিয়ারি দিয়ে গেছে, আগামীকাল সকালে টাকা না দিলে ঘরের চাল খুলে নিয়ে যাবে।
গভীর রাতে জয়কে ঘুম পাড়িয়ে বসে আছে কুমু। জয়নালেরও ঘুম আসছে না। হঠাৎ পাশ ফিরে দেখে, কুমু বিছানায় নেই— ঘরের কোণে বসে আছে। ঘরের উল্টে যাওয়া টিনের চাল ভেদ করে কুমুর শরীরে তেরছা চাঁদের আলো এসে পড়েছে। সেই রুপালি আলোয় কুমুকে অসাধারণ রূপবতী লাগছে। জয়নাল কামুক চোখে অপলক চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ, এরপর বিছানা থেকে নেমে এসে কুমুকে ভালোবাসার চাদর বিছিয়ে আলিঙ্গন করে সোহাগে ভরিয়ে দেয়। এরপর দুজনেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ে।
গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন কুমু। ভোরের আলো ফুটতেই কুমুর চোখে সূর্যের আলো এসে পড়ে। চোখ মেলে দেখে, ঘরে জয়নাল নেই। কুমু স্নান শেষে ঘরের কাজ করে রান্না বসায়। এত বেলা হয়ে গেল, জয়নালের খবর নেই। লালু, টুলু কয়েকবার খুঁজে গেছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল, জয়নালের খোঁজ নেই। কুমু চিন্তায় পড়ে গেল— মানুষটা আসলে কোথায় গেল! কাজে গেলেও তো সন্ধ্যায় চলে আসবে। রাত পার হয়ে পরদিন সকাল, তবুও খোঁজ নেই। লালু, টুলু আবারও হাজির। কুমু মাথা নিচু করে বলল,
— ভাই, আপনারা একটু খুঁইজা দেখেন না, কোথায় গেল মানুষটা! হঠাৎ কইরা একটা মানুষ কর্পূরের মতো তো উবে যাইতে পারে না।
লালু, টুলু আশ্বাস দেয় যে তারা জয়নালকে খুঁজে বের করবে।
দেখতে দেখতে সাতদিন পার হয়ে গেল, জয়নাল ঘরে ফেরে না। ঘরে চাল, নুন, তেল কিছুই নেই। দুইদিন ধরে পেটে দানা পড়েনি কুমুর। ছেলের দুধও শেষ। ছেলের বয়স এখন আড়াই বছরের কিছু বেশি হবে, বুকের দুধও পায় না আর। কী দিয়ে কী করবে, কুমু কিছুই বুঝতে পারে না। আশপাশের প্রতিবেশীদের কাছে টাকা, চাল ধার করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়।
লালু, টুলু দুজনেই কুমুকে সাহায্য করতে চায়— তারা আজকের এই পরিস্থিতির জন্যই এতদিন অপেক্ষা করে ছিল। রাত হলেই কুমুর ঘরে কড়া নাড়ে। কুমু ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে থাকে ঘরের কোণায়। তারা দুজনেই প্রলোভন দেখায়। কুমু কিছুতেই দরজা খোলে না। ছেলেটা ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করতে করতে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙলেই তো আবার খাইতে চাইবে। কুমু ঘরের আড়ার দিকে তাকিয়ে ভাবে, ঝুলে পড়বে নাকি। আবার ভাবে, ছেলেটার গলা টিপে মেরে এরপর নিজেও ঝুলবে ঘরের আড়ায়। ঘরের আড়ায় শাড়ি ঝুলায়, তারপর ছেলের গলা টিপে মারার জন্য হাত বাড়াতেই ছেলের নিষ্পাপ চেহারা দেখে কুমু হু হু করে কেঁদে ওঠে।
— হায় ঈশ্বর, কোথায় তুমি? মরতে যে অনেক সাহস দরকার, সে সাহস তো আমার নেই। আত্মহত্যা করে মরার চেয়ে হয়তো বেঁচে থাকা অনেক সহজ।
আবার ঘরে কড়া নাড়ার শব্দ। টুলু ফিসফিস করে ডাকে,
— কুমু, দরজা খোলো। কেউ জানবে না, তুমি আর আমি ছাড়া।
কুমু দরজা খোলে। ঘরে টুলু আসে। আজ যেন আকাশে রক্তচাঁদ উঠেছে, চাঁদের আলো কুমুর শরীরে পড়ে। চাঁদের গায়ে যেন চাঁদ লেগেছে আজ, দুই চাঁদই কলঙ্কিত। ঘরের বাইরে লুকিয়ে ছিল লালু। টুলু ঘর থেকে বের হতেই লালু জোর করে ঘরে ঢোকে। কুমুকে বলল,
— আমি কিন্তু সব দেখছি। আমাকে যদি ঘরে থাকতে না দাও, তবে লোক জড়ো করে এনে মাথা ন্যাড়া করে ঘোল ঢেলে জুতার মালা পরিয়ে গ্রামছাড়া করব।
কুমু আওলা চুল নিয়ে মাথা নিচু করে চুপ থাকে।
পরদিন সকালে টুলু দোকানের বাকির খাতায় পরিশোধ লিখে এক মাসের বাজার-সদাই দিয়ে যায়। লালুও সব টাকা পরিশোধ লিখে রাখে খাতায়, আরও কিছু টাকা কুমুকে দিয়ে যায়। বহুদিনের খায়েশ তাদের মিটে যায়।
আজ আবার কুমুর রান্নার চুলা জ্বলছে। বুকের ভেতরের চুলাও জ্বলছে, তবে চোখে কোনো অশ্রু নেই। ছেলেটা পেট ভরে খেয়ে উঠানে আনন্দে খেলছে।
তিন মাস পঁচিশ দিন পর, এক রাতে আচমকা জয়নাল ফিরে আসে। বাড়ি ফিরে দেখে সব কিছু স্বাভাবিক। কুমুকে কিছু জিজ্ঞেস করলে হুঁ, হ্যাঁ করে, কিন্তু স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। জয়নাল বলল,
— কুমু, তোমার জানতে ইচ্ছে করে না, পলায়া গেছিলাম কই?
কুমু কোনো উত্তর দেয় না। জয়নাল তার ব্যাগ খুলে একটা লাল তাঁতের শাড়ি কুমুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
— এইটা পইরা আসো, তোমারে সুন্দর মানাইবো।
কুমু বলল,
— আগে খেয়ে নাও, পরে হবে এসব।
জয়নাল বাচ্চাদের মতো আবদার করে। বাধ্য হয়ে কুমু লাল শাড়ি পরে জয়নালের সামনে আসে। জয়নাল আলিঙ্গন করে কুমুকে, নববধূকে কাছে পাওয়ার মতো আবেগী হয়ে ওঠে। জয়নালের আদর কুমুর শরীরে কাঁটার মতো বিঁধতে লাগল, কুমুর চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে গাল বেয়ে পড়ছে। জয়নাল বলল,
— এ কি বউ, কাঁদছোস ক্যান?
কুমু জল মুছে বলে,
— ও কিছু না।
পরদিন জয়নাল টুলুর দোকানে যায়। টুলু আগের মতোই স্বাভাবিক আচরণ করে। চা, বিড়ি খাওয়ার পর জয়নাল বলল,
— দেখ তো টুলু, কত বাকি আছে।
টুলু এক গাল হেসে বলল,
— এখন শুধু চা-বিড়ির দাম দিয়া যাও।
জয়নাল মনে মনে ভাবে, হয়তো সে এতদিন পরে এসেছে তাই বাকির টাকা চাচ্ছে না।
লালুর দোকানে গিয়ে সদাইপাতি নিয়ে জয়নাল বলল,
— লালু, দেখ তো কত বাকি।
লালুও ঠিক টুলুর মতো এক গাল হেসে বলল,
— এখন যা যা নিয়েছ, এই হিসাব মতো টাকা দিয়া যাও।
জয়নাল ভাবে, বন্ধু মানুষ তাই হয়তো এ কথা বলছে।
বাড়ি ফিরে দেখে চুলায় রান্না করছে কুমু। জয়নাল চুলার পাশে বসে কুমুকে বলল,
— দেখছ, কত ভালা বন্ধু মানুষ তারা! আর তুমি তো তাদের পছন্দ করতা না। আজকে তারা আমার কাছ থিকা আগের বাকির টাকা নেয়নি। কতগুলো টাকা, তা কি তোমার জানা আছে? এই দুনিয়ায় এমন বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।
কুমু যেন শুনেও কিছুই শুনছে না। হঠাৎ ওয়াক ওয়াক করে দৌড়ে কলপাড়ে গিয়ে বমি করতে শুরু করল। রাতে জয়নাল বলল,
— এই বউ, কবে থিকা বমি হয়?
কুমু বলল,
— দুই-আড়াই মাস হবে হয়তো।
জয়নাল বলল,
— আমি তো প্রায় চার মাস বাড়ি ছাড়া।
কুমু বলল,
— আমি তো ডাক্তার দেখাইনি, হিসাব কীভাবে করব। যা মনে হলো তাই বললাম।
জয়নালের মনে সন্দেহ আসে। কয়েকদিন ধরে জয়নাল ভাবতে থাকে। রাতে কুমুকে কাছে টেনে নিয়ে বলে,
— সত্যি কইরা বলো তো, কেউ কি ঘরে আসছিল যখন আমি ছিলাম না?
কুমু হু হু করে কেঁদে ওঠে। জয়নালের গলা শুকিয়ে আসে। কুমু বলল,
— ঘরে কেউ আইছিল কি না, সেই খোঁজ এতদিন পর করছ, অথচ এতদিন আমরা মা-ছেলে কী খেয়ে বাইচা ছিলাম, সে কথা একবারও মনে হচ্ছে না তোমার! পলায়া গেলা না বলে। সেদিন ছিল রক্তচাঁদের রাত। তোমার খুব ভালো বন্ধু লালু আর টুলু ঘরে এসে—
কথা শেষ করতে না দিয়েই জয়নাল কুমুর ঠোঁটে আরবি হরফ আলিফের মতো তর্জনী সোজা করে, মাথা ডানে-বামে ঘুরিয়ে বলল,
— চুপ, একদম চুপ। দেয়ালেরও কান আছে।
এই বলে কুমুকে বুকের পাঁজরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দুজনই কাঁদতে শুরু করল।
বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। সারাদিন বৃষ্টি হচ্ছে, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কুমু একটা ফুটফুটে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। গ্রামে হইচই শোনা যাচ্ছে— হায় হায়, একসাথে দুইজন মরছে রে, গ্রামের মানুষ চিৎকার করে বলতে বলতে যাচ্ছে।
কুমু বলল,
— কী হয়েছে? কারা মরছে?
জয়নাল বলল,
— যা হয়েছে, ভালো হয়েছে।
সমাপ্ত








