নীল দরজা

 সায়মা বিনতে ইসমাইল

বাড়িটায় প্রথম রাতেই আমি বুঝেছিলাম, কিছু একটা ঠিক নেই।

অস্বাভাবিক কিছু নয়। পুরোনো বাড়ি হলে শব্দ হবেই – কাঠের দরজা কড়কড় করবে, জানালায় বাতাস লাগবে, কোথাও ইঁদুর ছুটবে। কিন্তু রাত ২টা ১৭ মিনিটে যে শব্দটা হলো, সেটাকে কোনোভাবেই পুরোনো বাড়ির স্বাভাবিক শব্দ বলে মনে হলো না।

টক,টক, টক।

আমি ঘুম থেকে উঠে বসে পড়লাম।

শব্দটা এসেছিল নিচতলা থেকে।

আমাদের নতুন ভাড়া বাসার নিচতলায় একটা ঘর ছিল, যেটা সবসময় তালাবদ্ধ থাকত। দরজাটা নীল রঙের। বাড়িওয়ালা প্রথম দিনই বলেছিলেন,

ও ঘরটার কাছে যাবেন না। ওটা অনেক পুরোনো, তালা নষ্ট হয়ে আছে।

কথাটা বলার সময় লোকটার চোখ একবারও আমার দিকে ছিল না।

সেদিন বিষয়টা নিয়ে ভাবিনি।

কিন্তু সেই রাতের পর থেকে প্রতিদিন ঠিক ২টা ১৭ মিনিটে নীল দরজার ভেতর থেকে তিনবার শব্দ হতে লাগল।

টক,টক,টক।

প্রথম রাতে আমি ভয় পেয়েছিলাম।

দ্বিতীয় রাতে বিরক্ত হলাম।

তৃতীয় রাতে কৌতূহলী হয়ে উঠলাম।

চতুর্থ রাতে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

তারপরই দেখলাম,দরজার নিচ দিয়ে একটা সাদা কাগজ বেরিয়ে আছে।

আমি কাগজটা তুলে নিলাম।

মাত্র একটি বাক্য লেখা

“তুমি কি সত্যিই জানো, তোমার বাবা কী করেছিলেন?”

আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে উঠল।

বাবা মারা গেছেন ছয় বছর আগে।

তার সম্পর্কে এমন প্রশ্ন করার মতো মানুষ আমার জীবনে আর কেউ ছিল না।

পরদিন সকালে বাড়িওয়ালা আবিদ সাহেবকে কাগজটা দেখালাম।

তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

কেউ হয়তো মজা করছে।

কিন্তু ঘরটা তো তালাবদ্ধ।

পুরোনো বাড়িতে অনেক কিছুই হয়।

আমি আর কিছু বললাম না।

তবে সেদিন থেকেই বাবার কথা আমার মাথায় ঘুরতে লাগল।

বাবা খুব সাধারণ মানুষ ছিলেন। ছোট একটা ব্যবসা করতেন। সংসার চালাতেন, আমাকে পড়াশোনা করাতেন। আমি কখনো তাঁকে নিয়ে কোনো অস্বাভাবিক কথা শুনিনি।

শুধু একটা বিষয় ছিল।

বাবা মারা যাওয়ার কয়েক মাস আগে আমাকে একদিন বলেছিলেন,

মানুষের জীবনে কিছু দরজা বন্ধ থাকাই ভালো, নূর।

আমি তখন হেসে বলেছিলাম,

দরজা বন্ধ থাকলে খুলে দেখব।

বাবা আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন অনেকক্ষণ।

তারপর বলেছিলেন,

সব দরজা খোলা ভালো না।

স্মৃতিটা মনে পড়তেই আমার শরীর শীতল হয়ে গেল।

সেদিন রাতে আমি ঘুমালাম না।

রাত ২টা ১৭ মিনিটে আবার শব্দ হলো।

টক, টক,টক।

আমি বিছানা থেকে উঠে নিচে গেলাম।

নীল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলাম।

তারপর খুব আস্তে বললাম,

কে?

ভেতর থেকে কোনো উত্তর এল না।

কয়েক সেকেন্ড পর আবার তিনবার শব্দ হলো।

টক,টক, টক।

আমি দরজার হাতল ধরলাম।

তালা বাইরে থেকেই লাগানো।

কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার,তালাটা ঠান্ডা ছিল না।

যেন কিছুক্ষণ আগেই কেউ সেটা ধরে ছিল।

হঠাৎ দরজার নিচ দিয়ে আরেকটা কাগজ বেরিয়ে এল।

আমি কাগজটা তুলে নিলাম।

এবার লেখা,

“তোমার বাবা একা ছিলেন না।”

পরদিন আমি বাবার পুরোনো কাগজপত্র খুঁজতে শুরু করলাম।

আমাদের গ্রামের বাড়িতে একটা পুরোনো কাঠের বাক্স ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর মা সেটাকে আর কখনো খোলেননি।

আমি বাক্সটা খুলে দেখলাম পুরোনো কিছু হিসাবের খাতা, কয়েকটা চিঠি আর একটা ছবি।

ছবিটা দেখে আমার হাত কেঁপে উঠল।

ছবিতে বাবা দাঁড়িয়ে আছেন আরও দুজন মানুষের সঙ্গে।

একজনকে আমি চিনতাম, আবিদ সাহেব।

অন্যজনকে চিনতাম না।

ছবির পেছনে বাবার হাতের লেখা,

“১৯৯৮,তিনজনের সিদ্ধান্ত।”

আমি ছবিটা নিয়ে মায়ের কাছে গেলাম।

মা ছবিটা দেখেই মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।

এটা কোথায় পেয়েছিস?

বাবার বাক্সে।

ফেলে দে।

লোকটা কে?

মা কোনো উত্তর দিলেন না।

আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,

আবিদ সাহেবকে বাবা চিনতেন?

মা এবার ধীরে ধীরে বললেন,

সব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি না।

আমি মাকে কখনো এত অস্বস্তিতে দেখিনি।

সেদিন রাতে আবার ২টা ১৭ মিনিটে শব্দ হলো।

কিন্তু এবার তিনবার নয়।

একবার।

তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর ভেতর থেকে খুব আস্তে একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

নূর।

আমি জমে গেলাম।

আমার নাম।

কেউ আমাকে ডাকছে।

আমি দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।

কে?

কোনো উত্তর নেই।

আবার ডাক এল।

নূর, দরজাটা খুলো না।

আমি পিছিয়ে গেলাম।

কণ্ঠটা যেন পরিচিত।

কিন্তু কোথা থেকে?

পরদিন সকালে আবিদ সাহেবকে বললাম, রাতে কেউ আমাকে ডাকছিল।

তিনি চুপ করে ছিলেন।

তারপর বললেন,

তোমার বাবার কথা ভুলে যাও।

এই প্রথম তাঁর গলায় ভয় শুনলাম।

আমি বললাম,

আমার বাবার সঙ্গে আপনার কী হয়েছিল?

তিনি উত্তর দিলেন না।

বরং বললেন,

এই বাসা ছেড়ে চলে যান।

সেদিনই আমি বুঝলাম, নীল দরজার রহস্য শুধু পুরোনো কোনো ঘরের ব্যাপার নয়।

এর সঙ্গে আমার বাবার অতীত জড়িয়ে আছে।

রাতে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, দরজা খুলব।

আবিদ সাহেবের কাছ থেকে চাবি পাওয়া অসম্ভব। তাই পুরোনো তালার কারিগর ডেকে আনলাম।

রাত ১টা ৫৫ মিনিটে তালা খুলে গেল।

দরজা খোলার আগে শেষবারের মতো ভাবলাম, ভেতরে কী থাকতে পারে?

দরজা খুলতেই প্রথমে একটা পুরোনো গন্ধ নাকে এল।

ঘরের ভেতরে কোনো আসবাব নেই।

শুধু দেয়ালের পাশে একটা কাঠের টেবিল।

টেবিলের ওপর একটা টেপ রেকর্ডার।

আর তার পাশে একটা খাম।

খামের ওপর লেখা

“নূরের জন্য। যদি কখনো সে এই ঘরে আসে।”

আমার হাত কাঁপছিল।

খাম খুললাম।

ভেতরে বাবার হাতের লেখা।

“নূর,

তুই যদি এই চিঠি পড়িস, তার মানে আমি যে ভয়টা পেয়েছিলাম, সেটা সত্যি হয়েছে।

তোর কাছে একটা কথা আমি সারাজীবন লুকিয়েছি।

এই বাড়ির নিচতলায় একসময় একটা ছোট গুদাম ছিল। ১৯৯৮ সালে সেখানে আগুন লাগে। আগুনে একজন মারা যায়।

কিন্তু সবাইকে বলা হয়েছিল, সে ছিল বাইরের একজন শ্রমিক।

সত্যিটা সেটা নয়।

সে ছিল আমার ছোট ভাই, শাহেদ।

আমি আর আবিদ তখন সেখানে কাজ করতাম।

আগুনটা দুর্ঘটনা ছিল না।

কেউ আগুন লাগিয়েছিল।

আমি জানতাম কে।

কিন্তু সত্যিটা প্রকাশ করলে তোর জীবনও বিপদে পড়তে পারত।

তাই চুপ ছিলাম।

শুধু একটা জিনিস আমি কখনো করতে পারিনি শাহেদকে ভুলে যেতে।

এই ঘরটা তাই বন্ধ করে রেখেছিলাম।

যদি কখনো সত্যিটা জানার প্রয়োজন হয়, টেবিলের নিচে দেখিস।”

আমি টেবিলের নিচে তাকালাম।

সেখানে একটা ছোট ক্যাসেট ছিল।

টেপ রেকর্ডারে চালাতেই কাঁপা কাঁপা একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল।

বাবার কণ্ঠ।

আমি সব দেখেছি। আগুন লাগানোর সময় আবিদ সেখানে ছিল। কিন্তু সে একা ছিল না…

তারপর শব্দ থেমে গেল।

আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

আবিদ সাহেব?

আমি আরও শুনতে চাইলাম।

টেপের শেষ অংশে বাবার কণ্ঠ আবার শোনা গেল।

যদি নূর কখনো এটা শোনে, তাকে বলবে… তার মা যেন তাকে সত্যিটা বলে।

টেপ বন্ধ হয়ে গেল।

আমি ঘর থেকে বেরিয়ে মাকে ফোন করলাম।

মা, শাহেদ কে?

ওপাশে অনেকক্ষণ কোনো শব্দ নেই।

তারপর মা খুব আস্তে বললেন,

তুই কোথায়?

নীল ঘরে।

মায়ের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেল।

দরজাটা বন্ধ কর। এখনই।

কেন?

কারণ তোর বাবা যে সত্যিটা লুকিয়েছিল, সেটা শুধু আগুনের সত্যি না।

আমি কিছু বলার আগেই ফোন কেটে গেল।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে দরজায় শব্দ হলো।

টক,টক, টক।

আমি জমে গেলাম।

দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।

বাইরে কে?

আবার শব্দ হলো।

তারপর আবিদ সাহেবের কণ্ঠ

নূর, দরজা খোলো।

আমি উত্তর দিলাম না।

তিনি বললেন,

তুমি যা পেয়েছ, সব মিথ্যা।

আমি চুপ করে রইলাম।

কিছুক্ষণ পর তাঁর পায়ের শব্দ দূরে সরে গেল।

আমি দ্রুত টেবিলের কাগজপত্র গুছিয়ে বেরিয়ে এলাম।

কিন্তু করিডোরে এসে থেমে গেলাম।

দেয়ালের পাশে একটা পুরোনো আয়না ছিল।

আয়নার নিচে ছোট করে পেন্সিলে লেখা

“তিনজনের সিদ্ধান্ত।”

হঠাৎ বুঝতে পারলাম, ছবিতে তিনজন ছিল।

বাবা।

আবিদ সাহেব।

আর তৃতীয় লোকটি।

আমি সেই ছবিটা আবার বের করলাম।

ছবিটা ভালো করে দেখলাম।

তৃতীয় লোকটির মুখ এতদিন আমার চোখে পড়েনি।

কারণ ছবির একপাশ ছেঁড়া ছিল।

কিন্তু এবার বুঝলাম,লোকটির হাতের ঘড়িটা পরিচিত।

আমি সেই ঘড়ি বহুবার দেখেছি।

আমার মামার হাতে।

আমি সোজা মায়ের কাছে ছুটে গেলাম।

মা দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

আমাকে দেখে কিছু বললেন না।

আমি শুধু ছবিটা সামনে ধরলাম।

মামা এখানে কেন?

মা চোখ বন্ধ করলেন।

অনেকক্ষণ পর বললেন,

কারণ আগুনটা তোর মামাই লাগিয়েছিল।

আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল।

কিন্তু বাবা তো বলেছিলেন আবিদ…

তোর বাবা আবিদকে দোষী বলেননি। তিনি বলেছিলেন, আবিদ সব জানত।

তাহলে বাবা এতদিন চুপ ছিলেন কেন?

মা আমার দিকে তাকালেন।

কারণ তোর মামা শুধু আগুন লাগায়নি। আগুন লাগার রাতে তোর বাবা শাহেদকে বাঁচাতে গিয়েছিল। আর তোর মামা দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়েছিল।

আমার গলা শুকিয়ে গেল।

শাহেদ?

মা মাথা নাড়লেন।

হ্যাঁ। কিন্তু একটা ব্যাপার তুই জানিস না।

তিনি আলমারি থেকে একটা পুরোনো ছবি বের করলেন।

ছবিতে একটা ছোট ছেলে।

তার বয়স হয়তো দশ বা এগারো।

আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

মুখটা অদ্ভুত পরিচিত।

আমি ফিসফিস করে বললাম,

এটা কে?

মা বললেন,

শাহেদ।

আমি ছবিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম।

তারপর হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেল ছবির পেছনে লেখা একটা তারিখে।

১৯৯৮।

আমার জন্মেরও আগে।

আমি মাকে বললাম,

তাহলে এতদিন আমার মনে হচ্ছিল, আমি ছোটবেলায় একজনকে দেখেছি…

মা চুপ।

আমি বুঝলাম, কিছু স্মৃতি মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়া যায়।

কিন্তু মুছে ফেলা যায় না।

সেদিন রাতে আমি আর নীল দরজার সামনে যাইনি।

পরদিন বাড়িটা ছেড়ে চলে গেলাম।

সবকিছু শেষ হয়ে গেছে ভেবেছিলাম।

দুই মাস পর এক রাতে পুরোনো বাক্সটা আবার খুললাম।

ভেতরে একটা ছোট কাগজ পেলাম।

কাগজটা আগে ছিল না।

তাতে বাবার হাতের লেখা

“নূর, যদি তুই সত্যিটা জেনে ফেলিস, তাহলে একটা কথা মনে রাখিস, সবচেয়ে ভয়ংকর দরজা কাঠের হয় না। কিছু দরজা মানুষের মনে থাকে।”

আমি কাগজটা ভাঁজ করতে যাচ্ছিলাম।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে তিনবার শব্দ হলো।

টক,

টক,

টক।

আমি স্থির হয়ে বসে রইলাম।

কারণ এবার শব্দটা এসেছিল আমার নিজের ঘরের দরজা থেকে।

আর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম

রাত ২টা ১৭ মিনিট।

আরও পড়ুন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

0
হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

আরও পড়তে পারেন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

অক্টোবর রেইন

জান্নাতুল ফেরদৌস সামিয়া অক্টোবরের প্রথম বৃষ্টি। বাতাসে হালকা শীতের গন্ধ। প্রিয় রঙের 'আধাভাঙা সৈনিক'টাকে প্রতিদিনের মতো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। সৈনিক বলতে ছাতা। ওর দুটো শিক...

বটবৃক্ষ || পর্ব ১

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস শিফা১.দোকানটার নাম 'স্টেশনারি'। হ্যাঁ,এখানে শুধু স্টেশনারি আইটেমই বিক্রি হয়, যেমন: খাতা, কলম, ডাইরি,জ্যামিতি বক্স, স্কেল ইত্যাদি। তটিনীর মনে হচ্ছে দোকানদার ভদ্রমহিলাটি...