তিথী

মোছা: সুমাইয়া জাহান সিনথী

রাত এগারোটা। বালুয়ারি ফেরিঘাট। আগের ট্রলার ছেড়ে গেছে রাত ৯ টায়। ১১:০০ টায় পরবর্তী ট্রলার ছাড়ার কথা থাকলেও যাত্রী কম থাকায় ট্রলারের মালিক ট্রলার ছাড়তে চাচ্ছে না। এই নিয়ে কয়েকজন যাত্রী আর ট্রলারের মালিকের সাথে ঝামেলা চলছে। ভাড়া বাড়িয়ে না দিলে ট্রলার ছাড়া যাবে না, নাহলে মালিকের লস হয়ে যাবে। প্রায় আধা ঘন্টা ধরে তর্ক চলার পর আরো তিন জন যাত্রী ঘাটে আসলো সাথে একটা কফিন। সবারই গন্তব্যে যাওয়ার তাড়া আছে। তাই অগত্যা ভাড়া বেশি দিয়েই ট্রলারে উঠতে হলো। ট্রলারে ওঠার আগেই সবার ভাড়া নেওয়া হলো যেন পরে কোন যাত্রী ভাড়া নিয়ে ঝামেলা না করতে পারে। একে একে সবাই ট্রলারে উঠলো। উঠে ভেতরে রুমের মতো জায়গাটায় সবাই বসলো। 

গ্রীষ্মকাল চলছে, ভ্যাপসা গরমে সবাই অতিষ্ঠ, ট্রলার ছাড়ার পর বাইরে থেকে বাতাস আসায় অস্বস্তি একটু কমেছে। কারো চোখে ঘুম নেই, অচেনা মানুষদের সাথে এতো রাতের যাত্রায় কেউ ঘুমাতে নিরাপদ বোধও করছে না। প্রায় তিন ঘন্টা যাত্রা পথ, এর বেশিও লাগতে পারে, তাই চুপচাপ না থেকে সবাই সবার সাথে হালকা পরিচয় পর্ব সেরে নিলো । 

যাত্রীদের মধ্যে আছে অয়ন, আগে কর্পোরেট জব করলেও নিজের জীবনকে উপভোগ করতে এখন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায় আর ট্রাভেল ব্লগ বানায়। এই করেই তার একার জীবন বেশ কেটে যায়। এখন যাচ্ছে সোনারচর ও কলুরচর নামের দুটি জায়গায় ঘুরতে। 

 আছে এক দম্পতি নাম আরিফ, শিরিন; সাথে তাদের ৮ মাসের মেয়ে। তারা শহরে গিয়েছিল মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে, সেখানে এক আত্মীয় আজকের রাতটা তাদের বাসায় থেকে যাওয়ার জন্য অনেক জোরাজুরি করছিল, কিন্তু কাজ থাকায় আরিফ থাকতে রাজি হয়নি। এরপর ঘাটে পৌঁছাতে একটু দেরি করায় নয়টার ট্রলার ধরতে পারেনি। আর এই নিয়েই সেই থেকে আরিফ শিরিনের মধ্যে ঝামেলা চলছে। 

তারপর আছে সজল আর সোহেল সাথে তাদের বাবার কফিন। উনি নাকি শহরে দুই ছেলের কাছে ছয় মাস ছয় মাস করে থাকতেন। কিছুদিন ধরে অনেক অসুস্থ থাকা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। আজ দুপুরের দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তাই ওনাকে মাটি দিতে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সাথে আরও আছে সজল সোহেলের বোন জামাই। 

আরো আছে দুইজন লোক তারা তাদের ব্যবসায়ীক কিছু মালপত্র নিতে শহরে গেছিলেন, ওনাদেরও নয়টার ট্রলারে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মালপত্র নিয়ে ঘাটে আসতে দেরি হওয়ায় বেশি ভাড়া দিয়ে ১১ টার ট্রলারে উঠতে হয়েছে। একরকম বলা যায় সবাই উপায় না পেয়েই এতো রাতে যাত্রা করছে।

কিছুক্ষণ সবার সাথে কথা বলার পর রুমের বাইরে গিয়ে দাঁড়ায় অয়ন। বাইরে ভালোই বাতাস এক মুহূর্তে গরম যেন নেই হয়ে গেল। পাশে ঘুরতেই একটা মেয়ের দিকে চোখ পরলো। এই ২১-২২ বছর বয়স হবে। নাহ এই মেয়েকে তো ট্রলারে ওঠার সময় চোখে পড়েনি, তখন সব যাত্রী তো একসাথে উঠলো। আর মেয়েটা একা একা এভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে, ভয় ডর করে না নাকি! একা না থেকে রুমটার ভিতরে গিয়ে ওই মহিলার সাথে গল্প করলেও তো পারে। ভাবতে ভাবতে অয়ন মেয়েটার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

– এক্সকিউজ মি। 

মেয়েটা এমন ভাবে চমকে ওঠে যেন ভূত দেখলো । 

– সরি, সরি। আপনি এভাবে ভয় পাবেন বুঝতে পারিনি। 

মেয়েটা তখনও অবাক দৃষ্টিতে অয়নের দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা ভয় পেয়েছে ভেবে স্বাভাবিক করার জন্য জিজ্ঞেস করল- নাম কি আপনার? 

মেয়েটা এতক্ষণে অয়নের দিক থেকে তার অবাক নজর অন্যদিকে সরিয়ে বলল “তিথী”

– আমি অয়ন। ট্রলারে কখন উঠেছেন? আমরা যখন উঠলাম তখন তো আপনাকে চোখে পড়েনি। 

– আপনাদের সাথেই ছিলাম, খেয়াল করেননি হয়তো।

– ট্রলারে ওঠার আগে ট্রলারের মালিকের সাথে আমাদের অনেকক্ষণ কথা কাটাকাটি হয়েছিল। আপনি সেখানে থাকলে তো অবশ্যই চোখে পড়ার কথা। 

তিথী চুপ করে রইল।

– তো যাচ্ছেন কোথায়? 

– বাড়ি।

– এত রাতে একা একা। সাথে কেউ নেই? 

– আছে তো। 

– কে?

– বাবা।

– এখানে কোনটা আপনার বাবা? কাউকে দেখে তো আপনার বাবার বয়সী বলে মনে হচ্ছে না।

– এখানে নেই। 

– তাহলে?

– ঘাটে অপেক্ষা করছে আমার জন্য। আমি পৌঁছালেই আমাকে নিয়ে বাড়ি যাবে। 

– ওহ।

 কিছুক্ষণ চুপ থেকে অয়ন,

– আপনার এতো রাতে একা একা ট্রলারে আসা ঠিক হয়নি, কালকে দিনের বেলাতে আসতে পারতেন।

তিথী চুপ করে রইল।

– তো বাসায় কে কে আছে আপনার? 

– শুধু বাবা।

– মা?

– আমার জন্মের সময় মারা গেছে। তারপর আমার জন্য বাবা আর বিয়ে করেননি। 

– তাহলে তো আপনি আপনার বাবার খুব আদরের?

তিথীর চোখে জল টলমল করছে। কিছু একটা বুঝতে পেরে অয়ন নিজের কথা বলা শুরু করলো। 

– আমি বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ট্রাভেলার আর ট্রাভেল ব্লগার। আগে কর্পোরেট জব ছিল, ছেড়ে দিয়েছি। বাসায় আব্বু আম্মু, ভাই ভাবি আছে। আব্বু আম্মু, ভাই ভাবির সাথেই থাকে। প্রথম প্রথম আমার এই ঘোরাঘুরি, ভবঘুরে জীবন নিয়ে আব্বু আম্মুর অনেক সমস্যা ছিলো। এখন আর তেমন কিছুই বলে না। সারা বছর এখান থেকে সেখান ঘুরে বেড়ালেও বছরে দুই ঈদ বাসার মানুষের সাথেই কাটাই। এভাবেই জীবন চলছে। 

তিথী এখনো চুপ। অয়ন আবার বলতে শুরু করলো,

– বাসায় এখন আর মন টিকে না। আব্বু আম্মু এখন কিছু না বললেও মন থেকে চায় তাদের ছেলে ঘরমুখো হোক। কিন্তু তারা বোঝে না কেউ একবার ঘর থেকে বের হলে তাকে ফেরানো মুশকিল, শুধু মুশকিল না অসম্ভব বলা চলে। 

– হুম 

– আপনিও কি আমার মতো ট্রাভেলার নাকি? 

তিথী অন্যমনস্ক হয়ে- হুম।

– কোথায় কোথায় ঘুরলেন?

– কোথাও না।

অয়ন কিঞ্চিৎ বিরক্ত হচ্ছে।

– বাবাকে একা রেখে যাওয়া একদম ঠিক হয়নি আমার। আমি খুব স্বার্থপর, খুবই।

তিথীর চোখ দিয়ে জল গড়াতে লাগলো।

– আরেহ আপনি কাঁদছেন কেন! পৃথিবীতে সবাই স্বার্থপর। এই দেখেন না আমি নিজেই তো স্বার্থপরের মতো আব্বু আম্মুর প্রতি সব দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে নিজে যা ইচ্ছে সেটাই করে বেড়াচ্ছি।

তিথী আবারো চুপ।

– বাবার জন্য এতো চিন্তা হলে বাবার সাথে থাকলেই তো পারেন।

– সেটা আর সম্ভব না।

– কেনো?

তিথী আবারো চুপ। অয়ন এবার বেশ বিরক্তই হলো। মেয়েটা বড়ই অদ্ভুত, দুই একটা কি কথা বলে তারপর নিজের মধ্যে ডুবে যায়। 

– অনেকক্ষণ থেকে বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন, পা ব্যথা করছে না? ভেতরে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকুন। ওখানে এক ভদ্রমহিলা আছে, সাথে ওনার ছোট্ট মেয়েও আছে। ওদের সাথে কথা বললে ভালো লাগবে আপনার।

-না।

– তাহলে থাকেন এখানে আমি ভেতরে যাচ্ছি।

তিথী এবার বলতে শুরু করলো, 

– বাবাকে অনেক ভালোবাসি। কথাটা কখনো বলা হয়নি বাবাকে। মা মারা যাওয়ার পর থেকে আমাকে আগলে রেখেছিলো। বিয়ে করেননি, এমনকি আমাকে নানা বাড়িতেও রাখেননি, যদি নানা বাড়ির কেউ আমার প্রতি অযত্ন করে তাই। শুনেছিলাম বাবা মায়ের প্রেমের বিয়ে ছিল। আদরের মেয়ে হওয়ায় বাধ্য হয়ে নানা বিয়েটা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু মায়ের মৃত্যুটা নানা মেনে নিতে পারেননি। নানার এই দুঃখ, কষ্ট, রাগ, অভিমান সব এসে পড়লো আমার ওপরেই। নানীও একই। নানা বাড়িতে গেলে সব সময় দু্ঃছাই সহ্য করতে হয়েছে। যদিও কখনো বাবাকে এসব বলতাম না, তাও কিভাবে যেন বুঝে যেত। দাদা বাড়িতেও একই অবস্থা। তাদের কথা, মায়ের সাথে আমি মরে গেলেই হতো। তাহলে বাবার জীবনটা আর এভাবে নষ্ট হতো না। কথাটা আমার কাছেও ঠিক লাগে। মায়ের সাথে আমিও সেদিন মরে গেলেই তো পারতাম। তাহলে আর বাবার জীবনটা এভাবে নষ্ট হতো না।

– এসব কি আজেবাজে বকছেন!

অয়নের কথা তিথীর কানে ঢুকলো না। 

– মাঝে মাঝে খুব আফসোস হয়, আমার কাছে যদি মা থাকতো। বাবার আদর তো সারাজীবন পেয়েছি, যদি একটু মায়ের আদরও পেতাম। মায়ের কাছাকাছি থাকার খুব ইচ্ছা জানেন। যদি মাকে জড়িয়ে থাকতে পেতাম, ইস কি ভালোই না হতো।

অয়ন মনে মনে ভাবছে মেয়েটা সত্যিই একটা পাগল।

– আপনার ক্ষুধা পাচ্ছে না? আমার তো ভীষণ ক্ষুধা পাচ্ছে। 

বলেই অয়ন রুমের ভেতর চলে গেলো। রুমের ভেতর সবাই ঘুমে ঝিমুচ্ছে। তাই শব্দ না করে ব্যাগ থেকে বিস্কিট আর পানির বোতল নিয়ে আবার বাইরে আসলো।

– নিন বিস্কিট খান। 

– না। 

কয়েকবার বলার পরেও না নেওয়ায় অয়ন আবারও কিছুটা বিরক্ত হলো, পরোক্ষনেই মনে হলো অচেনা কারো কাছে কেনোই বা খেতে যাবে। মেয়েটা ঠিকই করেছে। অয়ন একাই খেতে শুরু করলো। 

– আমি বোধহয় একটু বেশি কথা বলি আর বেশি হাসি? 

– কই না তো। আপনার সাথে কতো বকবক করার পর একটু কথা বললেন। হাসতে তো একবারও দেখলাম না। 

– আমার কথা বলা, হাসি নিয়েও যেন সবার বিরক্তি ছিলো। মুখের উপরেই বলে দিতো মেয়েটা অভদ্র, অলক্ষী হয়েছে। মা নেই তো তাই শিক্ষাও পায়নি ঠিক মতো। অপয়া মেয়ে একটা।

– মানুষের কথায় অতো কান দিতে নেই। 

– এই কথাটা আমার আগে বোঝা উচিত ছিলো। বুঝলাম কখন? যখন সব শেষ। মানুষের কথা থেকে বাঁচার জন্য বাবাকে ছেড়েই চলে গেলাম। 

– কি শেষ? আপনি তো বাবার কাছেই যাচ্ছেন। এখন থেকে বাবার সাথেই থাকবেন, বাবার খেয়াল রাখবেন। 

তিথী আবার বেশ কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলে ওঠে- যে একবার বের হয় সে আর কখনো ফিরে না। 

অয়ন বুঝলো এই মেয়ের সাথে তর্ক করে লাভ নেই। তাই হ্যাঁ বলে সম্মতি জানালো। 

হঠাৎ ট্রলারের ইঞ্জিনের শব্দ থেমে গেলো। কি হয়েছে দেখতে অয়ন ইঞ্জিন রুমের কাছে গেলো। ট্রলারের মালিক বললো ইঞ্জিনের কি একটা সমস্যা হয়েছে, ঠিক করতে বেশ খানিকটা সময় লাগবে। ইতোমধ্যে বাকি যাত্রীদের ঘুম ভেঙে গেছে।ঘাটে পৌঁছাতে দেরি হবে জন্য সবার মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। শিরিন তো পারছে না শুধু আরিফকে চিবিয়ে খেতে। একে এতো রাতে অসুস্থ বাচ্চা নিয়ে ট্রলারে, তার মধ্যে ট্রলার একটা কফিন। এখন আবার ট্রলারের ইঞ্জিন নষ্ট হলো।

অয়ন আবার এসে তিথীর পাশে দাঁড়ালো।

– কি হয়েছে? 

– ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে গেছে।

তিথী মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে,

– আমি আসলেই অপয়া।

– এখানে আপনি নিজেকে দোষ দিচ্ছেন কেন বুঝছি না! 

ট্রলার থেমে যাওয়ায় রুমে বাতাস প্রবেশ একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। গরমে আর থাকতে না পেরে আরিফ শিরিন মেয়েকে নিয়ে বাইরে এসেছে। অয়নকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওরা কাছে আসতেই বাচ্চাটা চিৎকার দিয়ে কান্না শুরু করে দিলো। কান্না থামাতে দুজন হাটতে হাঁটতে ট্রলারের অন্যদিকে চলে গেলো। তিথী কিছুক্ষণ থ হয়ে থেকে বলল, 

– বাচ্চাটা আমাকে দেখে কাঁদলো? 

– আপনি তো আচ্ছা পাগল। ঐ আপনাকে দেখে কাঁদতে যাবে কেনো? বাচ্চা মানুষ এমনিই কাঁদে। আর ও অসুস্থ, শহর থেকে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফিরছে। 

তিথী আবার চুপ। অয়ন জিজ্ঞেস করল,

– আপনার বাসা কোথায়? 

– কলুরচর। 

– ওহ, আমি এখানে সোনারচর আর কলুরচর দেখতেই যাচ্ছি। শুনেছি এই জায়গা দুটো নাকি অনেক সুন্দর।

– হুম, একেবারে ছবির মতো সুন্দর।

– কিছু মনে না করলে একটা কথা বলতাম।

– কি?

– আপনি গাইড হিসেবে ঘুরতে সাহায্য করলে ভালো হতো। 

– নাহ।

– আচ্ছা।

ঘন্টাখানেক পর ইঞ্জিন ঠিক হলে ট্রলার আবার চলতে শুরু করে। 

– সেই থেকে এই এক জায়গায়ই দাঁড়িয়ে আছেন, পা ব্যথা করছে না?

– না।

– ভেতরে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন।

– নাহ। 

 এতক্ষণে অয়ন বেশ রেগেই গেছে তিথীর উপর। 

– আচ্ছা তাহলে থাকেন এখানে, আমি ভেতরে যাচ্ছি।

তখন রাত তিনটা। রুমে গিয়ে এক জায়গায় হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে পড়ে অয়ন। ঘুম ভাঙ্গে প্রায় চারটার দিকে। আর কিছুক্ষণ পরেই ঘাটে পৌঁছাবে। ট্রলার ঠিক ১১:০০ টায় ছাড়লে আর মাঝপথে ইঞ্জিন নষ্ট না হলে আরও দেড় থেকে দুই ঘন্টা আগেই পৌঁছাতে পারতো। রুম থেকে বের হয়ে বাইরে যায় অয়ন। তিথী এখনো ওইখানেই দাঁড়িয়ে।

– আর কিছুক্ষনের মধ্যেই আমরা ঘাটে পৌঁছে যাবো। আপনার বাবা অপেক্ষায় আছে হয়তো। ফোন করে থাকতে বলেছেন তো? 

তিথী চুপ। অয়ন বেশি কিছু না ভেবে রুমে চলে গেলো। যে যার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে। ঘাটের কাছে এক মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে আসছে। ট্রলার ঘাটে পৌঁছালো। সবাই নামতে ব্যস্ত। অয়ন বারবার এদিক ওদিক তাকালো, তিথী কোথাও নেই। মেয়েটা বড়ই অদ্ভুত, আসলেই ওর শিক্ষার অভাব, ম্যানারলেস একটা। পরক্ষণেই অয়নের মনে হলো সেও মেয়েটাকে বাকিদের মতো করেই খারাপ ভাবছে। সবাই ট্রলার থেকে নামতেই এক ভদ্রলোক সজল সোহেলের দিকে এসে বলল আমাদের কফিন অদল বদল হয়ে গেছে। ভদ্রলোক নাকি সজল সোহেলের সাথে একই হাসপাতাল থেকে একই অ্যাম্বুলেন্সে করে ঘাট পর্যন্ত এসেছিলেন। তারপর ভুলে কফিন বদল হয়ে যায়। ভদ্রলোক নয়টার ট্রলারে চলে আসে আর সজল সোহেলের ঘাটে একটা কাজ সারতে গিয়ে ট্রলারে উঠতে দেরি হয়। তারা ভালো করে দেখে বুঝে যায় ভদ্রলোকের কাছে থাকা কফিন তাদের বাবারই। তাই সেটা বুঝে নিয়ে তারা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ভদ্রলোক পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য কফিন খুলে দেখতে চায়। কয়েকজনকে ডাকলে কেউই এই আবছা আলোর ভয়ংকর পরিবেশে কফিনের কাছে আসতে চায় না। অয়ন পাশেই গাড়ি ঠিক করছিলো। ভদ্রলোককে দেখে খুব অসহায় লাগায় পাশে গিয়ে সাহায্য করতে চাইলো। দুজন মিলে কফিন খুলে লাশের মুখের উপরের কাপড় সরালো। মুখটার ওপর ফোনের ফ্লাশ লাইটের আলো ফেলে অয়ন বলল, মেয়ে? 

ভদ্রলোক পাথর হয়ে জবাব দিলো – আমার মা মরা মেয়ে।

– ওকে মায়ের পাশেই কবর দিয়েন।

আরও পড়ুন

আরও পড়তে পারেন

রক্তচাঁদের রাত

 শারমিন হক                                             ...

ভোরের হাওয়া

অরুণ বর্মন (১) আব্বা রাত দশটা নাগাদ বাড়ি ফিরে উঠোনে দাঁড়িয়েই আম্মুর নাম ধরে চিৎকার করে ডাক দিলো। সামিয়া---, তোর মেয়ের জন্য পাত্র দেখে এলাম। আব্বা আম্মুর...

কমলা ইলিশ

মুহাঃতাসদীকুল হক সেদিন অফিসের বেশ বড় একটা মিটিং ছিল। মিটিং শেষে সবার জন্য ছিল দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা। সাধারণত এই রকম মিটিংগুলোতে হয় চাইনিজ নাহলে পোলাও...