মোঃ আনারুল ইসলাম রানা
ঠিক পাঁচ মিনিট আগেই শাসক দলের ঝাণ্ডাটা সশব্দে মাটিতে ঠুকে ফেলে দিল রানা। হাতের প্লাস্টিকের পতাকার লাঠিটা ধুলোয় লুটিয়ে পড়তেই সেখানে থাকা লোকগুলোর চোখগুলো রোষে জ্বলজ্বল করে উঠল। কিন্তু রানার চোখে তখন কোনো ভয় ছিল না; সেখানে ছিল এক অদম্য সত্য আর আত্মমর্যাদার আলো।
বিএ পাশ করার পর প্রায় চারটে বছর ঘুরেছে রানা। কখনও টিউশনি, কখনও দরজায় দরজায় বায়োডাটা নিয়ে ছুটোছুটি। অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয়েই সে লোকাল পার্টির মিছিলে পা মিলিয়েছিল, যদি একটা গতি হয়। বহু অনুনয়-বিনয়ের পর পার্টির লোকাল লিডার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, পৌরসভার ক্লার্কের চাকরিটা তাকেই দেওয়া হবে। কিন্তু তার বদলে যে মূল্য দিতে হবে, তা রানার কল্পনারও বাইরে ছিল।
আজ রাতে বস্তি উচ্ছেদের নামে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করছিল পার্টির ক্যাডাররা, যাতে ওই জমিতে বড় প্রমোটারের বহুতল ভবন গড়ে তোলা যায়। আর সেই নক্কারজনক কাজের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল রানাকে।
রানা ঘাড় গোঁজ করে অত্যন্ত সুদৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘আমি বস্তিতে আগুন দিতে পারব না। আমি শিক্ষিত বেকার, খুনি নই। চাই না আমার পৌরসভার চাকরি!’
পার্টির দাদারা চকিত হয়ে থমকে গেল। দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা চোখ বড় বড় করে ধমকে উঠে বলল, ‘চাকরি চাকরি করে দুদিন আগেই তো আমাদের পেছনে ঘুরছিলিস, ক্ষেপে গিয়েছিলিস! এখন একটা সামান্য ছোট্ট কাজে এত আপত্তি কেন?’
রানা সোজা নেতার চোখের দিকে তাকাল। তার কন্ঠে কোনো কাঁপন ছিল না, ছিল এক নিষ্পাপ বিবেক বোধের তীব্র আগুন। সে শান্ত অথচ কঠোর সুরে উত্তর দিল, ‘আমি আমার সংসার চালাতে চাকরি চেয়েছিলাম, অন্যের সংসার জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য নয়!’
কথাটা বলেই আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না সে। পিছন থেকে ভেসে আসা গালিগালাজ আর হুমকির তোয়াক্কা না করে অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল। পিছন ফিরে হেঁটে চলে যাচ্ছে শিক্ষিত বেকার ছেলেটা। হাতের শূন্যতা এখন আর তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে না, বরং বুকের ভেতরের আত্মসম্মানটা আজ অনেক ভারী মনে হচ্ছে।
রাস্তার ধারের কালভার্টে এসে বসে রানা। রাতের ঠাণ্ডা বাতাস তার গা ছুঁয়ে যায়। দূরে বস্তির কুঁড়েঘরগুলোতে মিটমিট করে আলো জ্বলছে- ওখানে ঘুমাচ্ছে কতগুলো ছোট বাচ্চা, খেটে খাওয়া মানুষ। রানা ভাবল, আজ যদি সে লোভে পড়ে ওই পাপাচারের অংশ হতো, তবে হয়তো কাল তার পকেটে টাকা আসত, কিন্তু আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকানোর ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে যেত।
হেঁটে যাওয়ার সময় তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন রচিত হচ্ছে এক নতুন স্বাধীনতার গান। ক্ষুধার চাবুকের চেয়ে যে নিজের বিবেককে বড় মনে করতে পেরেছে, সে-ই তো আসল স্বাধীন মানুষ!)








