লজ্জা

তারিকুল আমিন

বরিশালের দূর্গাপুর বাজারের কাঁঠাল বাগানের মোড়ের এক কোণে একটা ভাঙা টিনের
ছাতার নিচে বসে কলি। এদিক ওদিক গিয়ে জুতো সেলাই ও পালিশও করে। সকালে চা আর
বিস্কুট খায় এই ধুলোবালি, চামড়ার গন্ধ আর ছেঁড়া জুতোর স্তূপের মাঝেই। হাতের সুই-
সুতো দিয়ে অন্যের জীর্ণ জুতো জোড়া তালি দিয়ে ঠিক করে দিলেও, আদৌ নিজের
ভাগ্যটাকে সে কোনোদিন জোড়া দিতে পারেনি। কিন্তু অভাবের চেয়েও বড় এক অপমান
প্রতিদিন তার বুকে তীরের মতো বিঁধে রোজ।

  • ‘জুতো সেলাই…! জুতো সেলাই করি। পালিশ করে আয়নার মত ঝকঝকে তকতকে করি…!
    কেউ কী আছেন?’
    এই বলে গায়ের মেঠো পথে হাঁক দিচ্ছে। হাটের সময় ছাড়া বাকী সময় হাটে কেউ থাকে
    না, তাই সে তার বাক্স নিয়ে বের হয় গায়ের বাড়ি বাড়ি। গ্রামের প্রভাবশালী মাতব্বর সরফরাজ
    তার জাঁকজমকপূর্ণ জুতো পালিশ করাতে আসত কলির কাছে। কিন্তু সমস্যা জুতোয় ছিল
    না, ছিল মাতব্বরের বিকৃত মানসিকতায়। জুতোর ধুলো ঝাড়ার বাহানায় মাতব্বর যখন তার
    ধবধবে সাদা লুঙ্গিটা উরু অব্দি টেনে তুলত, কলির ভেতরটা ঘৃণায় ও অপমানে জ¦লে উঠত। ওই
    নোংরা ইশারায় মাতব্বরের শরীর প্রদর্শনের আড়ালে লুকিয়ে থাকত কুৎসিত লালসা। সে জানত
    কলি নিরুপায়। ক্ষমতার এই নগ্ন প্রদর্শনীর সামনে কলি যেন মাথা নিচু করে থাকতে
    বাধ্য-এটাই ছিল মাতব্বরের অহংবোধের অন্যতম হাতিয়ার। আজ রাস্তায় দেখা হয়ে যায় কলির
    সাথে।
  • ‘কীরে কলি জুতোটা একটু কালি করে দিবি না?’
  • ‘না মানে… দ্যান, কাকা..!’
  • ‘তয় আমার জুতো তোর ঐটা দিয়ে চকচকে করে দিস সুন্দরী।’
    কলি বুঝতে পেরেও না বুঝার মত করে নিরব রইল। প্রতিবারই কলি চোখ ফিরিয়ে নিত, তার
    হাতের সুইটা চামড়ার বুকে একটু বেশি জোরেই গেঁথে যেত। কিন্তু আর কতদিন? আজ
    যখন মাতব্বর আবার একই কায়দায় তার লুঙ্গি উঁচিয়ে ধরে একটা কুৎসিত হাসি দিল, তখন
    কলির হাতের সুইটা আচমকা থেমে গেল। মোড়ল বাড়ির মোড়ের বাতাসটা যেন এক
    মূহূর্তের জন্য ভারী হয়ে উঠল। কলি এবার আর চোখ নামাল না। জীবনের সব ভয়কে একপাশে
    ঠেলে, সে সোজা তাকাল মাতব্বরের চোখের দিকে। তার চোখের সেই চাউনিতে আজ ভয়ের
    বদলে ছিল এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি, যা এতদিনের জমাট বাঁধা প্রতিবাদের জানান
    দিচ্ছিল।
  • ‘কাকা পা নামান আর আপনার… মানে লুঙ্গি ঠিক করেন।
  • ‘কী কইলি…? পা নামামু…? মাগী…! এতো বড় সাহস তোর।’
  • ‘হ..! পা নামান আর লুঙ্গি ঠিক করেন।’
    দ্বীপ্ত কণ্ঠে বলে। গাঁয়ের বুড়ো থেকে ছোট সবাই দূর থেকে যেনো যাত্রাপালা দেখছে। কিন্তু
    কেউ একটু প্রতিবাদ করতে আসেনা।
  • ‘আমি মুচি হলেও আমার আত্মসম্মান আছে। যারা কাগজ কুঁড়ায় তারও আত্মসম্মান
    আছে। এটা আমার পেশা। এটা দিয়ে আমার রুটি রুজি চলে। এটা…!’
  • ‘শালী এতো বড় সাহস…! তুই আমাকে জ্ঞান দিস…?’

এই বলে চুলের মুটি ধরে ফেলে দেয়। পরে যায় কলি। কথায় আছে নারী যেমন নদীর মত স্বচ্ছ। নদীর
জল যেমন নিরবতা ভেঙ্গে ঘ্রাস করে একটি জনপথ। তেমনি প্রয়োজন হলে নারী তার দু’হাত
দিয়ে সর্বগ্রাসী রূপ দেখায়। কলি তার হাতের বাক্স দিয়ে এক বারি দেয়। এর ফলে পরে যায়
সরফরাজ খান। হেঁচকা টান দিয়ে লুঙ্গি খুলে নিয়ে হাঁটা শুরু করে।

  • ‘যদি কেউ কথা না কয়, ওরে ও অভাগা, কেউ কথা না কয়
    যদি সবাই থাকে মুখ ফিরায়ে সবাই করে ভয়-২
    তবে পরান খুলে-২
    ও তুই মুখ ফুটে তোর মনের কথা একলা বলো রে-২’
    সরফরাজ এখন নগ্ন। পুরো গায়ের মানুষ দেখছে তার উত্থিত শিশ্ন। হিন্দু নারী চেচিয়ে
    উঠে, ‘তুমি স্বয়ং মা কালী।’ লাল চোখে তাকায় তার দিকে। আর বলে,
  • ‘আমি প্রতিবাদী তাই আমি কালী, আমি অন্যায়ে করি না মাথা নত, তাই আমি সবার
    আদর্শ। যদি হতাম নিরব তাহলে ধর্ষিতা হতাম। গায়ের মানুষ আমায় বলতো ভাগ্যে লিখে
    নিয়ে এসেছিস হে পোড়া মুখি। এ কেমন সমাজ…! ছি…! আপনাদের মত মানুষের মুখে
    দেই থুথু…!’

আরও পড়ুন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

0
হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

আরও পড়তে পারেন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

অক্টোবর রেইন

জান্নাতুল ফেরদৌস সামিয়া অক্টোবরের প্রথম বৃষ্টি। বাতাসে হালকা শীতের গন্ধ। প্রিয় রঙের 'আধাভাঙা সৈনিক'টাকে প্রতিদিনের মতো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। সৈনিক বলতে ছাতা। ওর দুটো শিক...

নীল দরজা

 সায়মা বিনতে ইসমাইল বাড়িটায় প্রথম রাতেই আমি বুঝেছিলাম, কিছু একটা ঠিক নেই। অস্বাভাবিক কিছু নয়। পুরোনো বাড়ি হলে শব্দ হবেই - কাঠের দরজা কড়কড় করবে, জানালায়...